২০১৭ সালে কাতারের উপর আবরোধ আরোপের পর অনেকেই ভেবেছিল, কাতারের মত ছোট্ট একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো খুব সহজেই ভেঙ্গে পড়বে। অতঃপর অবরোধের চাপ নিতে না পেরে কাতারের জনগনই সরকার পতনের আন্দোলনে রাস্তায় নেমে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং কাতারের আপামর জনতা একজোট হয়ে কাতারের শাসক শেখ তামিমের পক্ষে রাস্তায় নেমেছে। সাময়িক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে কাতার অর্থনীতি, বানিজ্য, কূটনীতি সহ সকল ক্ষেত্রে প্রতিরোধ গড়ে তুলে অবরোধের আগের চেয়ে আরো বেশী শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে দাঁড়িয়েছে। সত্যি বলতে কি, এই অবরোধ, কাতারের জন্য শাপে বর হয়ে কাতারকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।
সমুদ্র ও স্থলপথে বানিঝ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে কাতার এখন পুরো বিশ্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক নবায়ণ করেছে। ফলে কাতারে বানিজ্যের নতুন দ্বার খুলে গেছে, বৃদ্ধি পেয়েছে রপ্তানীও। কাতারের বন্দরগুলোতে পণ্যের ওঠা-নামা বেড়েছে প্রায় ২০০ শতাংশ। এই বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩.১ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও পাকিস্তানের মত দেশগুলোর সাথেও বানিজ্যিক সম্পর্কেও সূচনা করছে কাতার। ফলে এখন কাতারের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশের অনুক’ল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
কিছুদিন ধরে কাতারে বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক প্রতিযোগীতার যেনো খই ফুটছে। গত সেপ্টেম্বরে খলিফা স্টেডিয়ামে সাফল্যের সাথে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্ব ক্রীড়া প্রতিযোগীতা ২০১৯ (World Athletics Championship)। অক্টোবরে হয়েছে বিশ্ব বীচ গেমস (ANOC Beach World Beach Games)। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৪তম গাল্ফ কাপ ফুটবল এবং ফিফা বিশ্ব ক্লাব ওয়াল্ড কাপ। গাল্ফ কাপ ফুটবলে অংশ নিয়েছে সৌদি আরব, বাহরাইন ও আরব আমিরাত। অবরোধ আরোপের পর এই প্রথম বৈরী সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের উত্তেজনা চলা তিনটি প্রতিবেশী দেশের ফুটবল দলের কাতারে আগমন, ক’টনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলার ঈঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
কাতারের খাদ্য সামগ্রীর সিংহভাগ আমদানী করা হত সৌদি আরব সহ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে। ব্যবসা বানিজ্যের জন্য পন্য সামগ্রী ও কাঁচামালও আসতো আমিরাত ও অন্যান্য দেশ থেকে। কিন্তু দোহা শহরের প্রতিটি সুপার মার্কেটের তাকে এখন মেড ইন কাতার লেখা পণ্য চোখে পড়ছে।
আগে কখনো কোন পন্য কোন দেশে থেকে আসছে কিংবা কোন দেশের তৈরী তা খুঁটিয়ে দেখিনি। কিন্তু অবরোধের দুই বছর পর সুপার মার্কেটে বিস্ময়কর পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। দুধ, দৈ, বাটার থেকে শুরু সব ধরনের দুগ্ধজাতীয় পানীয়, জুস এখন কাতারে তৈরী হচ্ছে। এছাড়া প্যাকেটজাত মুরগী, শাক-সব্জী সহ রান্নার তেলও এখন মেড ইন কাতার মোড়কে বিক্রি হচ্ছে। নেদারল্যান্ডস, জার্মানী, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা থেকে কার্গো বিমানে করে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে উন্নত প্রজাতির প্রায় দশ হাজার গরু। মরুভূমির মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে গড়ে তুলেছে সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দুগ্ধ খামার। যা সত্যিই বিস্ময়কর। এখন যাবতীয় দুগ্ধজাত পন্যসামগ্রী কাতারেই উৎপন্ন হচ্ছে।
কাতার সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে আভ্যন্তরীণ খাদ্য সরবরাহে স্বয়ংসম্পূূর্নতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ফলে কাতারের কৃষিখাতে গত কয়েক বছরে রীতিমত বিপ্লব সাধিত হয়েছে। কাতারের শুস্ক আবহাওয়ার জন্য সারা বছর কৃষিকাজ অব্যাহত রাখার জন্য গ্রীন হাউস প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। গ্রীন হাউসের সংখ্যা গত বছর হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৮ সালে শুধু কৃষিখাতেই প্রায় ২৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
কাতার আগামী চার বছরের মধ্যে ৩৫০০টি গ্রীন হাউস নির্মানের পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া জাপানের সহযোগীতায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্মার্ট কৃষি প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সারা বছরব্যাপী শাক-সব্জি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। মাটির বদলে বিকল্প পদার্থ ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এভাবে চললে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কাতার আভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদা পূরণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।
আমদানী ও জ্বালানী-নির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে এসে বহুমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য কাতারে নির্মিত হচ্ছে হাই-টেক শিল্প-কারখানা। তাই কাতারের কৃষি ও শিল্পখাত, এখন দক্ষ জনশক্তি রপ্তানী ও বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র হতে পারে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হওয়ার পর, কাতারের নির্মানখাতে জনশক্তির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। তাই জনশক্তির নির্ভরশীল নয় এমন সব হাই-টেক শিল্প-কারখার নির্মিত হচ্ছে কাতারে। নির্মানখাতে জনশক্তির চাহিদা কমে গেলে কাতারে কর্মরত বহু শ্রমিকদের দেশে ফিরে যেতে হবে। তাই বাংলাদেশে সরকারকে সহসা নতুন শ্রম বাজারের সন্ধান করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশকে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশে উদ্ভাবিত কৃষি প্রযুক্তি, কৃষিবিদ এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের বিশ্ব্যাপী সুনাম রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশেও বাংলাদেশে উদ্ভাবিত বিভিন্ন পদ্ধতি কৃষি খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। বৈদেশিক রেমিট্যান্স এবং জনশক্তি রপ্তানীর ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য তাই বাংলাদেশ সরকারকে এখন থেকেই কাতারের ক্রমবর্ধমান কৃষি এবং শিল্পখাতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করার জন্য উপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।
কাতার খাদ্য সরবারহের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল। তবে এই নির্ভরতা কমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমীরের মন্ত্রণালয় কৃষিখাতে বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। খাদ্যোৎপাদনের জন্য ক্যাম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিনিস, ও ভিয়েতনামে জমি ইজারা নিচ্ছে কাতার। সম্প্রতি কৃষিকাজ করার জন্য অষ্ট্রেলিয়ায় দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার হেক্টর জমি ক্রয় করেছে কাতার।
এছাড়া আমেরিকা, ইউক্রেন ও ইউরোপের কৃষিখাতেও কাতার বিনিয়োগের কথা ভাবছে। তবে আজকের এই অবরোধ কাতারের জন্য মুখোশের অন্তরালে আর্শীবাদ বয়ে আনবে বলে আমার ধারণা। কারন আজকের এই সঙ্কট, কাতারকে খাদ্য সরবরাহের বিকল্প উৎস খুঁজে নিতে নতুন করে ভাবতে শিখাবে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূূর্নতা অর্জনে আরো সক্রিয় করে তুলবে।
অক্টোবর, ২০১৯
