কাতারের জনপ্রিয় আরবি দৈনিক পত্রিকা আল-শার্ক-এর উদ্যোগে প্রতিবছর বিভিন্ন সামাজিক এবং জনহিতকর কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ দেওয়া হয় ‘বেস্ট কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড’। এবার কাতারের শ্রেষ্ঠ প্রবাসী কমিউনিটি হিসেবে পুরস্কার পেলো ফিলিপিনো কমিউনিটি। এই পুরস্কার কাতার কর্তৃপক্ষ এবং সবার চোখে ফিলিপিনো কমিউনিটির ভাবমূর্তিকে করেছে আরও সমুজ্জ্বল।

জনসংখ্যার দিক থেকে কাতারের তৃতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হচ্ছে ফিলিপিনো কমিউনিটি। কাতারের প্রতিটি সেক্টরে ওদের সরব উপস্থিতি লক্ষণীয়। জনসংখ্যা ও মেধার দিক দিয়ে বাংলাদেশিরা অন্যান্য কমিউনিটির চেয়ে কি খুব পিছিয়ে আছে? শ্রেষ্ঠত্বের দৌড়ে আমাদের অবস্থান কোথায়? এ নিয়ে অনেকের কৌতূহলের শেষ নেই।

শ্রেষ্ঠ কমিউনিটি বিচারের জন্য নয়টি নির্ণায়ক বা মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি নির্ণায়কের মান হচ্ছে ২০ নম্বর। এভাবে সর্বমোট ১৮০ নম্বরের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত কমিউনিটিই সেরা কমিউনিটির মর্যাদা পায়। বিচারকমণ্ডলী কমিউনিটির কার্যক্রমের মধ্যে নির্ণায়কের শর্তগুলো কতটুকু পূরণ হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই নম্বর দিয়ে থাকেন। আসুন, এবার বিচারপ্রক্রিয়ার শর্তগুলোর দিকে নজর দেওয়া যাক।

মনোনয়ন পাওয়ার মোটামুটি শর্ত হচ্ছে, কমিউনিটিকে কাতারের মানবাধিকার-সংক্রান্ত সরকারি সংস্থার সঙ্গে সহযোগী হয়ে কাজ করতে হবে; কাতার সরকারের বিভিন্ন প্রজেক্ট, নির্মাণ খাতে কমিউনিটির সদস্যদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে; সরকার আয়োজিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং কাতারের জাতীয় অনুষ্ঠানমালায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে ইত্যাদি। তবে কাতারে কর্মরত শ্রমজীবীদের কল্যাণের জন্য কমিউনিটি কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সর্বস্তরের শ্রমজীবী মানুষ যাতে সেবা পায়, কেউ যাতে সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য কমিউনিটির বাস্তবায়নযোগ্য একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ওপরের শর্তগুলোর দিকে চোখ রাখলে কাতারের প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থান কোথায়, তা স্পষ্ট হয়ে আসে। কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠনের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশোর্ধ্ব। কিছুদিন পরপর ভিন্ন আঙ্গিকে জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন সংগঠন। সংগঠনের সংখ্যার দিক থেকে কাতারের অন্যান্য কমিউনিটির তুলনায় আমরা অনেক এগিয়ে আছি। নতুন সংগঠন হচ্ছে, এটা মন্দ কিছু নয়। সমস্যা হলো, অধিকাংশ সংগঠনের সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ কিংবা কার্যক্রম না থাকায় আমরা কাতারের বৃহত্তর পটভূমিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমাদের অধিকাংশ কার্যক্রম নিজস্ব কমিউনিটির মানুষের কথা মাথায় রেখেই করা হয়। কাতারের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কীভাবে সম্পৃক্ত হওয়া যায়, সে কথা আমরা তেমন ভাবি না।

মাতৃভূমি ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিন কাটাচ্ছে একটা বিশাল প্রবাসী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী। প্রবাসকে আমি বলি দ্বিতীয় আবাস। কাতারের কথাই ধরা যাক। এখানে অনেকেই ২০ থেকে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন। কেউ আছেন পরিবার নিয়ে, কেউ আবার একাই পাড়ি দিচ্ছেন এই দীর্ঘ সময়।

অনেকে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে তরুণ বয়সে পা রেখেছেন কাতারের উপকূলে। অতঃপর জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো কাটিয়ে দিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন এই কাতার থেকেই। কেউ কাতারে এসেছেন শূন্য হাতে অথচ কঠোর পরিশ্রম করে এখন হয়েছেন কোটিপতি। কেউ জীবন শুরু করেছেন মার্কেটে, ফুটপাতে সামান্য ব্যবসা দিয়ে; এখন তাঁরা বড় বড় ব্যবসা এবং বহু দোকানের মালিক, নিয়োগ দিয়েছেন হাজারো কর্মচারী। দেশে গড়ে তুলছেন বিশাল মার্কেট, অট্টালিকা। কাতারে এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

আমরা এ দেশের উন্নয়নে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রম দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তার বিনিময়ে কাতার থেকেও কম পাইনি। কাতারে এসে সাফল্যের জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় বদলে গেছে অনেকের জীবন। তাই আমাদেরও কিছু দায় আছে এ দেশের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে অল্পবিস্তর অবদান রাখার। কাতারে যাতে আমরা সবাই ভালো থাকতে পারি, সেই পরিবেশ আমাদেরই গড়ে তুলতে হবে। তাই আমাদের সংগঠনগুলোকে গতানুগতিক অনুষ্ঠানমালার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার কথা ভাবতে হবে।

কাতার সরকার আয়োজিত কাতারের জাতীয় দিবস এবং দুই ঈদের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কমিউনিটি নিয়মিত অংশগ্রহণ করে থাকে। অনেক সংগঠন রক্তদান কর্মসূচিসহ সীমিত আকারে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে অন্যান্য প্রজেক্ট, যেমন কাতার ক্যানসার কাউন্সিল, হার্ট ফাউন্ডেশন, কাতার চ্যারিটি, ক্যানসার রিসার্চ সেন্টার কিংবা স্থানীয় হাসপাতালগুলোর জন্য তহবিল সংগ্রহের মতো দাতব্য উদ্যোগও আমরা নিতে পারি। আমরা জানি কাতার ধনী দেশ, আমাদের সংগৃহীত অর্থ হয়তো মনে হতে পারে খুবই অপ্রতুল। কিন্তু এ ধরনের প্রচেষ্টা পুরো কমিউনিটি সম্পর্কে গতানুগতিক ধারণা বদলে দিতে পারে।

আমরা এ দেশে থাকি। এখানকার হাসপাতালগুলোতে আমরা নিয়মিত সেবা নিচ্ছি। এদের সঙ্গে মিশে আমাদের কমিউনিটিসহ সবার জন্য কিছু করা উচিত। এতে করে আমরা যেমন ওদের মূলধারার কমিউনিটিতে সম্পৃক্ত হতে পারলাম, আবার নিজের দেশ ও কমিউনিটির পরিচয়টাও তুলে ধরলাম। আর কাতারের চিকিৎসা গবেষণায় বাংলাদেশ কমিউনিটিও কিছু অবদান রাখলো।

এই প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানসার কাউন্সিলের জন্য সিডনির বাংলাদেশ কমিউনিটির তহবিল সংগ্রহ করার কথা মনে পড়ে গেলো। ২০০০ সালের কথা। ক্যানসার কাউন্সিলের জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আমরা কিছু প্রবাসী বাংলাদেশি মিলে মর্নিং ব্রেকফাস্টের আয়োজন করা শুরু করি। যার নাম দেওয়া হলো ‘গুডমর্নিং বাংলাদেশ’। ঠিক হলো, আমরা সবাই যার যার বাড়ি থেকে সকালের নাশতা তৈরি করে আনবো। সেগুলো বিক্রি করে যা আয় হবে, তা বাংলাদেশ কমিউনিটির পক্ষ থেকে ক্যানসার কাউন্সিলকে দান করা হবে।

প্রথম আয়োজনে মাত্র ৩০০ ডলারের মতো আয় হলো। ধীরে ধীরে এই অনুষ্ঠান সিডনি শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো। বিস্ময়কর কথা হলো, এ পর্যন্ত দেড় লাখ ডলারেরও বেশি অস্ট্রেলিয়ান ক্যানসার কাউন্সিলে দান করা হয়েছে। বাংলাদেশ কমিউনিটির এই দাতব্য কাজের কথা ফলাও করে অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে এ ধরনের অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রী পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব, সরকারি কর্মকর্তা এবং শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা নিয়মিত যোগ দিচ্ছেন।

কাতারে বিশ্ব শ্রমিক ও পরিবেশ দিবস খুব গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। এসব অনুষ্ঠানে আমাদের উপস্থিতি দরকার। কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২-এর আসর সমাগত প্রায়। বিশ্বকাপের আগে যাতে কাতারে কর্মরত শ্রমিকদের নিয়ে মিডিয়ার কোনো বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, এ জন্য কাতার সরকার খুবই সচেতন। কাতার সরকারের প্রত্যাশা হলো, লেবার ক্যাম্পে বসবাসরত শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশাপাশি প্রবাসী কমিউনিটিগুলোও বিশেষ ভূমিকা রাখুক।

বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় কাতারে কর্মরত নবাগত শ্রমিক ও গৃহকর্মীদের জন্য ট্রেনিং সেন্টারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কাতার মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় চাকরির শর্ত ও বেতন নিয়ে মালিক কিংবা কোম্পানির সঙ্গে বিবাদ মেটানো সম্ভব। কিন্তু কোথায় ও কীভাবে মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করতে হবে, সে বিষয়ে অনেকেই অজ্ঞ। এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য মানবাধিকার কমিশনে বাংলাদেশ কমিউনিটির একজন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিনিধি দরকার।

উল্লেখ্য, কাতার সরকার কিংবা দূতাবাসের অনুমোদিত কমিউনিটি কার্যক্রমই কেবল শ্রেষ্ঠ কমিউনিটি বিচারের জন্য বিবেচিত হয়। তাই শ্রেষ্ঠ কমিউনিটির শিরোপা অর্জন কমিউনিটির স্বীয় দূতাবাসের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া সেরা কমিউনিটির পুরস্কারটি তাদের মান্যবর রাষ্ট্রদূতের হাতেই তুলে দেওয়া হয়। এতে শুধু কমিউনিটিই নয়, দূতাবাসও বিশেষ মর্যাদার আসনে সমাসীন হয়।

আমাদের মধ্যে বিভক্তি আছে ঠিকই। কিন্তু এই বিভক্তির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা শক্তিকে কাজে লাগাতে কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে একমাত্র দূতাবাস। এ ক্ষেত্রে সরাসরি অংশগ্রহণ না করে দূতাবাস হতে পারে অনুপ্রেরণার বাতিঘর, দিতে পারে দিকনির্দেশনা। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, বারবার আমন্ত্রণ জানানোর পরও কমিউনিটির অনুষ্ঠানে কাতারি সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা অংশগ্রহণে দ্বিধাবোধ করেন। আমন্ত্রণ জানানোর সময় দূতাবাসের সক্রিয় সহযোগিতা এই প্রবণতা পাল্টে দিতে পারে।

কমিউনিটির কার্যকলাপ এবং সর্বোপরি আচরণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সস্তুষ্ট না থাকলে এ ধরনের পুরস্কার আশা করা যায় না। কর্তৃপক্ষের আনুকূল্য, সাহায্য ও সহযোগিতা পেতে হলে বাংলাদেশে কমিউনিটির ভাবমূর্তি আরও অত্যুজ্জ্বল করে তুলে ধরতে হবে সবার কাছে, তবেই এই পুরস্কার আমাদের হবে।

সেপ্টেম্বর