একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামে বাঙালির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শরিক হয়েছিল বিশ্বের বহু দেশের অনেক মানবতাবাদী ও বিবেকবান মানুষ। বিভিন্ন পেশার এই সব সহানুভূতিশীল বিদেশি নাগরিক, কেউ কলম কিংবা ক্যামেরা হাতে নির্যাতিত বাঙালির জন্য করেছেন প্রতিবাদ, করেছেন জনমত গঠন, সাহায্যের জন্য করেছেন তহবিল সংগ্রহ। কেউ আবার সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু আমরা সেইসব মুক্তিযোদ্ধা বিদেশি নাগরিকদের যথাসময়ে সম্মাানিত করতে পারিনি। সম্মাননা দিতে না পারার বিষয়টি আমাকে বড্ড পীড়া দিত। এ নিয়ে প্রবাসে বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরাস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠিও লিখেছিলাম বেশ ক’বার।

অবশেষে ২০১১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবদান রাখার জন্য স্বীকৃতিস্বরূপ বিদেশি নাগরিকদের সম্মাননা দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা, বাংলাদেশে মৈত্রী সম্মাননা—এই তিন ধরনের সম্মাননা দেয়া হয়। এছাড়া কয়েকজনকে সম্মানসূচক বাংলাদেশী নাগরিকত্বও দেয়া হয়। বিদেশি নাগরিকদের দেওয়া এ সম্মাননার মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মাননাটি হচ্ছে বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা।

২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দফায় ২৯ দেশের প্রায় ৪০০ জন বরেণ্য রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট নাগরিক এবং সংগঠককে সম্মানিত করা হয়েছে। দীর্ঘ সাত বছর বিরতির পর আবার ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য পর্যায়ক্রমে মোট ১ হাজার ৭০০ জন বিদেশিকে স্বীকৃতি ও সম্মাননা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

জানতে ইচ্ছে করে, বাংলাদেশী না হয়েও যেসব বিদেশি নাগরিক আমাদের মুক্তি সংগ্রামে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন, জাতির দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের সন্মানিত করতে আমাদের কেন ৪০টি বছর অপেক্ষা করতে হলো?

সবচেয়ে কষ্টকর হলো, স্বাধীনতার দীর্ঘ চার দশক পর মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যকারী বিদেশি নাগরিকদের যদি সম্মাননা দেয়া যেতো, তাহলে বিশ্বে¦র দরবারে জাতি হিসাবে অনেকেই আর বেঁচে নেই। বেঁচে থাকতে সম্মাননা পাবার যে তৃপ্তি, মৃত্যুর পর সম্মাননা দিয়ে, কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কি সেই অভাব পূরণ করা যায়? শুধু তাই নয়, ৪০ বছর দেরি না করে আমাদের মর্যাদা কি অনেক বৃদ্ধি পেতো না?

প্রবাসের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে যে বিদেশি মুক্তিযোদ্ধার কথা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়, তিনি হলেন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক Ouderland, Bir Protik। তিনিই একমাত্র অবাঙালি যিনি মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য পেয়েছেন বীর প্রতীক পদক। মুক্তিযুদ্ধে অডারল্যান্ডের অবদান কিংবদন্তি হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকার বাটা জুতা কোম্পানির এক্সেকিউটিভ ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করতেন। ২৫ মার্চের কালোরাতের গণহত্যা তাঁকে বাঙালিদের পক্ষে যুদ্ধ করতে অনুপ্রাণিত করে।

তিনি নিজের অফিসের ভেতরে গোপনে মুক্তিবাহিনীদের ট্রেনিং দিতেন। ঢাকায় বেশ কিছু গেরিলা অপারেশনের পরিকল্পনা ও পরিচালনাও করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, নিয়াজী, রাও ফরমান আলীর মতো জেনারেলদের সাথে বন্ধুত্ব করে পাকিস্তানীদের পরিকল্পনার খবর মুক্তিবাহিনীদের সরবরাহ করতেন। বীর প্রতীক Ouderland আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন বহু আগে, ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, সামরিক কর্মকর্তা, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের একটি বিরাট অংশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, যাদের সবার নাম এই লেখার সংক্ষিপ্ত পরিসরে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। স্মৃতি থেকে শুধু কয়েকটি নাম পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরছি—ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, মার্কিন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি, জন এফ কেনেডি, সোভিয়েত ইউনিয়নের আন্দ্রে গ্রোমিকো, জ্যাকব মালিক, যুগোস্লোভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ত্রো, জার্মানির চ্যান্সেলর ইউলি ব্রাল্ট, জাতিসংঘের সাবেক সহাসচিব উ থান্ট, ফরাসি দার্শনিক ও সাহিত্যিক আঁদ্রে মারলো, পাকিস্তানের এয়ার মার্শাল আজগর খান, খান আব্দুল ওয়ালী খানসহ আরো অনেকে।

বিশ্বের নামকরা কিছু সঙ্গীতশিল্পীও বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের কথা তুলে ধরেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউ ইয়র্কের মেডিসন স্কয়ারে আয়োজিত কনসার্টের কথা আমার আজো মনে পড়ে। কনসার্টের শিরোনাম ছিল The Concert for Bangladesh – George Harrison & Friends। পন্ডিত রবি শংকর ও বিটল্স খ্যাত জর্জ হ্যারিসন এই কনসার্টের আয়োজন করেন। তখন চলছিল মুক্তিযুদ্ধ। মেডিসন স্কয়ারে উপচে পড়া ৪০ হাজার দর্শকের সামনে জর্জ হ্যারিসন, ‘বাংলাদেশ’ গানটির মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে আহ্বান জানান। হ্যারিসনের সেই গান কি ভোলা যায়?

আরেকজন সঙ্গীত শিল্পী যিনি গিটার হাতে নিয়ে বিশ্ববিবেককে স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সরব করে তুলেছিলেন, তিনি হলেন Joan Baez। শুধু সঙ্গীত শিল্পীই নন,  Joan Baez হলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার একজন নির্ভীক মানবাধিকার কর্মী। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, তিয়েনমান স্কয়ারের ম্যাসাকার থেকে শুরু করে ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন Joan Baez, লিখেছেন প্রতিবাদী গান। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেয়ার জন্য তিনি দু’বার কারাবরণ করেন। ১৯৭১ সালে বায়েজের বয়স ছিল মাত্র ৩০।

২৫ মার্চের গণহত্যার কথা জানতে পেরে গিটার হাতে তুলে নেন জোয়ান, রচনা করেন কালজয়ী গান Song of Bangladesh. এই গানটিতে পাকিস্তানী ঘাতকদের নির্মম গণহত্যার চিত্র হৃদয়ছোঁয়া সুরের জাদুতে তিনি যেভাবে চিত্রিত করেছেন, তা বাংলা গানেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। গানটির প্রথম কয়েকটি চরণ তুলে ধরছি:

Bangladesh, Bangladesh

When the sun sinks in the west

Die a million people of the Bangladesh

এর পর Joan Baez আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কনসার্টের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেন এবং বিশ্ববাসীর কাছে পাকবাহিনীর নৃশংসতার কাহিনি তুলে ধরেন।

একাত্তরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম ঘাঁটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল। তাই ২৫ মার্চের রাতে পাকবাহিনীর আক্রোশের অন্যতম লক্ষ্যস্থল ছিল এই ছাত্রাবাস। মার্চের কালোরাতে পাকবাহিনী ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে অবস্থান নিয়ে ট্যাংক দিয়ে ইকবাল হলে নির্বিচারে গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। এছাড়া হলের সামনে পুকুরের পাড় থেকেও নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত ছাত্রদের উপর মর্টার ও মেশিনগানের গুলি বর্ষণ করা হয়। ওই রাতে ইকবাল হলে কমপক্ষে ২০০ ছাত্রের তৎক্ষনাত মৃত্যু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের ইকবাল হলে পাকবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের মর্মস্পর্শী কাহিনি Song of Bangladesh গানটির পংক্তিমালায় উঠে এসেছে এভাবে:

…And the students at the university

Asleep at night quite peacefully

The soldiers came and shot them in their beds…

Joan Baez-এর গানটি শোনার পর নতুন প্রজন্মের অনেকেই নিজ থেকে জানতে চেয়েছে স্বাধীনতার কথা, বাংলাদেশের কথা। প্রশ্ন করেছে, কেন হলো মুক্তিযুদ্ধ? কেন সেই গণহত্যা? প্রবাসে বেড়ে ওঠা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার কাজ অনেক সহজ করে দিতে পারে মাত্র ৫ মিনিটের এই অসাধারণ গান। রবি শঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসনের পাশাপাশি জোয়ান বায়েজকেও খুব সহসা সম্মানিত করা হবে, এই কামনা করছি।