বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু পরে ত্রিদেশীয় এক চুক্তির আওতায় তাদেরকে বিচার করার শর্তে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু গত ৪৯ বছরেও তাদের কোনো বিচার হয়নি। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য পাকিস্তানেও তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছেন এবং প্রিয়জন হারিয়েছেন তাদের জন্য এ বিষয়টি এখনো অমিমাংসিত রয়ে গেছে।
তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সহসা এদের বিচার হবে বলে জানিয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর মধ্যে যারা বেঁচে আছেন, একাত্তরে গণহত্যার বিচারের জন্য বাংলাদেশ তাদের ফেরত চাইবে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ডিসেম্বরে বিজয়ের আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ২৬৭ দিনে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে হত্যাযজ্ঞ চালায় তা ইতিহাসের ঘৃণিত হত্যাকা-গুলোর মধ্যে অন্যতম। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটেছে সেটা রাগের মাথায় ঘটানো কোনো কাজ নয় বরং সুপরিকল্পিত একটি নীল-নকশা অনুসারেই ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক রবার্ট পেইন (Robert Payne, Massacre)। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুখ্যাত পঞ্চপাণ্ডব জেনারেল ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খান, পিরজাদা, উমর খান এবং আকবর খান ছিলেন এই নীল-নকশার প্রণেতা।
পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধ চূর্ণ করার জন্য ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে হত্যাকা- চালানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের লক্ষ্যবস্তু হিসাবে তাই বেছে নেয়া হয় প্রতিবাদী ও স্বাধীনতার প্রতি সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের। বাঙালি নারীদের ওপর চালানো হয়েছে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ। তাদের শতকরা ৮০ ভাগই ছিলেন মুসলিম নারী। প্রখ্যাত আমেরিকান জার্নালিস্ট সুজান ব্রাউনমিলার এই নির্যাতনকে চীনের নানজিংয়ে জাপানী বাহিনী ও ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়াতে জার্মানীদের দ্বারা ধর্ষণের সাথে তুলনা করেছেন (Against Our Will: Men, Women and Rape, Susan Brownmiller)।
একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর যে আকস্মিক হামলা চালায় তার নাম ছিল অপারেশন সার্চলাইট। বেলুচিস্তানের কসাই বলে খ্যাত জেনারেল টিক্কা খান ছিল এই অপারেশনের হোতা। এই অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশের বড় বড় শহরগুলো দখল করে বাঙালির প্রতিরোধ নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। ঢাকা অপারেশনের কমান্ডার দম্ভভরে বলেছিলেন, তিনি ৪৮ ঘন্টার মধ্যে চার মিলিয়ন বাঙালি নিধন করে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে ফেলবেন (Eyewitness Accounts: Genocide in Bangladesh, R Jahan, 1972). পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে ইচ্ছেমতো যে কোনো কাউকে খুন করার লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল।
জার্নালিস্ট ড্যান কগিনের কাছে এক পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেন বলেছিল, We can kill anyone for anything. We are accountable to no one. (Rummel, Death By Government.) পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ভেবেছিল, ২৫ মার্চের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের পর বাঙালি জাতি নতজানু হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো। বাঙালি জনতা পেশাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের গড়ে তুলে। ফলে টিক্কা খানদেরই বাংলার মাটি ছেড়ে পালাতে হয়।
একাত্তরের পরাজয়ের পোস্টমর্টেম করার জন্য পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে তখনকার পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় তদন্ত কমিশন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরেই কাজ শুরু করে এই তদন্ত কমিশন। ৩০০ জন সাক্ষীর বয়ান ও বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই করে ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে হামুদুর রহমান কমিশন পাকিস্তান সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করে। (গুগল করলেই এই রিপোর্ট পাওয়া যাবে)।
নিহতদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রিপোর্টে পাকিস্তান সেনাবহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণকবরে নিহতের লাশ গুম করা, ধর্ষণ ও লুটপাটের সত্যতা স্বীকার করা হয়েছে। এছাড়া সেনাবাহিনীর অফিসারদের বিরুদ্ধে মদ ও নারী আসক্তির আভিযোগও এনেছে কমিশন। একটি ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে মদ্যপানরত একজন পাকিস্তানী ব্রিগেডিয়ারের কথা। ভারতীয় বাহিনীর গোলাবর্ষণে যখন ধরাশায়ী হচ্ছিল তার ব্রিগেডের জওয়ানরা, তিনি তখন নারী নিয়ে আমোদ ফূর্তিতে ছিলেন মত্ত। তবে মদ ও নারী আসক্তির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল ইয়াহিয়া ছিলেন সবার সেরা। মদে চুর হয়ে থাকার ফলে তিনি একবার পাকিস্তান সফররত সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে পারেননি। এই ছিল পাকিস্তানের মুসলিমদের স্বঘোষিত কাণ্ডারীর অবস্থা। হামুদুর রহমান কমিশন ইয়াহিয়াসহ সামরিক বাহিনীর বেশ কিছু ঊর্ধ্বতন অফিসারদের কোর্ট-মার্শালের সুপারিশ করলেও কোনো পকিস্তানী সরকার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি।
চীনের নানজিং ম্যাসাকারের কথা অনেকেরই জানা। ১৯৩৭ সালে চীনের রাজধানী শহর নানজিং দখল করার পর জাপানী দখলদার বাহিনী যে বর্বর হত্যাকা- চালায় তা ইতিহাসে বিরল। জাপানীরা প্রায় ৩ লক্ষ নিরীহ চীনা নাগরিককে হত্যা করে আর নির্মম ধর্ষণের শিকার হয় লক্ষাধিক নারী। দীর্ঘদিন ধরে জাপান সরকার এই হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালেও অবশেষে প্রায় ৬ দশক পরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোমিচি মুরায়ামা নানজিং হত্যাযজ্ঞের জন্য চীনের জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্র্থনা করেন। আমাদের ঘরের কাছেই ভারতের জালিয়ানওয়ালাবাগে ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গুলিতে হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র জনতার মৃত্যুর জন্য ব্রিটেন ক্ষমা না চাইলেও চুপ করে থাকেনি। ১৯৯৭ সালে ভারত সফরের সময় ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ জালিয়ানওয়ালাবাগের স্মৃতিসৌধে গিয়ে নিহতদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
ভুট্টোর আমলে হামুদুর রহমান কমিশন কাজ শুরু করলেও এ পর্যন্ত সব পাকিস্তানী সরকার একাত্তরের ঘটনাবলি সুকৌশলে এড়িয়ে গেছে, সৎসাহস নিয়ে কখনো ইতিহাসের মুখোমুখি হয়নি। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ দুর্নীতিবাজ হলেও তাকে সাধুবাদ জানাতে হয় এজন্য যে, তিনিই হলেন একমাত্র পাকিস্তানী রাজনীতিবিদ যিনি পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেন।
ইদানিং পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডনে হাফিজুর রহমান নামের একজন কলামিস্ট লিখেছেন, ‘আমি যদি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতাম, তাহলে সবার আগে পাকিস্তানের জনগণকে বোঝাতাম যে একাত্তরের কলংক থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। এভাবে পাকিস্তানের জনগণের সমর্থন আদায় করার পর তিন বাহিনীর প্রধানদের সাথে করে ঢাকায় যেতাম আর পল্টনে জনসভা ডেকে বাঙালি জাতির কাছে আমাদের ভুলের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতাম।’
হাফিজুর রহমানের প্রস্তাবে একজন মানবতাবাদী মানুষের আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এটা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়। তবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়াটা বাঙালি জাতির একটি প্রাপ্য অধিকার। এই অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আমাদের জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফোরামে পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে যেতে হবে। চীনে নানজিং গণহত্যার জন্য ৭৬ বছর পর যদি জাপান যদি ক্ষমা চাইতে পারে তাহলে পাকিস্তান পারবে না কেন? বাংলাদেশের জনগণের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত একাত্তরের শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে না।
