২০১৯ সালের ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঝরে পড়ে ২৫টি তাজা প্রাণ। আগুন থেকে বাঁচতে আটকে পড়া মানুষ জানালা দিয়ে যেভাবে ঝাঁপ দিচ্ছিল, তা দেখে মনে হচ্ছিল যেন নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য দেখছি। বিভিন্ন খাতে দেশের অগ্রগতি তাক লাগিয়ে দিচ্ছে বিশ^কে ঠিকই। কিন্তু বনানীর মতো বড় একটি দুর্ঘটনা দেশের অগ্রযাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিচ্ছে। আজ দেশব্যাপী যেসব বড় বড় স্থাপনা তৈরি হচ্ছে তাতে বিল্ডিং কোডের নিয়মকানুন মানা হচ্ছে কি?

গত এক দশকে সারা দেশে প্রায় দেড় লাখেরও বেশি অগ্নি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে হাজারো মানুষ। শুধু ২০১৮ সালেই সাড়ে আট হাজার আবাসিক ভবনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে দেশে যার ২৪ শতাংশ ঘটেছে রাজধানী শহর ঢাকায়। বাংলাদেশ ফায়ার সার্র্ভিসের মতে, এসব অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ হচ্ছে শর্র্ট সার্কিট, চুলার আগুন এবং সিগারেটের টুকরা। সিগারেটের টুকরা নেভানো কি খুবই কঠিন কাজ? অথচ সামান্য খামখেয়ালরি জন্য আমরা মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি আর বিনষ্ট হচ্ছে হাজার কোটি টাকার সম্পদ। রাজধানী শহর যদি এতটা অরক্ষিত থাকে তাহলে দেশের অন্যান্য শহরের অবস্থা কি হতে পারে তা খুব সহজেই অনুমেয়।

নব্বই দশকের শেষের দিকে এফআর টাওয়ার নির্মাণের পর থেকে সবকিছু যেন বহাল তবিয়তেই চলছিল। কিন্তু ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর একে একে যাবতীয় অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসছে। রাজউক এবং ফায়ার সর্ভিসের দেয়া তথ্যানুযায়ী, প্রথমত ১৮ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের জন্য অনুমোদন নেয়া হলেও টাওয়ারের মালিক নকশা বহির্ভূত আরো চারতলা নির্মাণ করেন। এছাড়া এই ভবনে ছিল না অগ্নি নিরাপত্তার জন্য ন্যূনতম কোনো সিস্টেম এবং জরুরি প্রস্থানের জন্য অগ্নি সুরক্ষিত সিঁড়ি। রাউজক ও ফায়ার সর্ভিসেরে ইন্সপেক্টরদের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে কিভাবে অবৈধ চারতলা নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হলো তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। উন্নত দেশে নির্মাণকাজের বিভিন্ন স্তরে কাজের অগ্রগতি মনিটর করা হয়। কর্তৃপক্ষের প্রশিক্ষিত ইন্সপেক্টর কাজ নিয়মমাফিক হচ্ছে কিনা তা নিরীক্ষা করে সার্টিফিকেট প্রদান করলে তবেই পরবর্তী স্তরের কাজ শুরু করা যায়। এভাবে নিয়মের ব্যত্যয় করে কোনো কিছু নির্মাণ করলে তা সহজেই ধরা পড়ে।

বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ৫০০ জনের বেশি বাসিন্দা থাকলে সেই স্থাপনা বা ভবনে কমপক্ষে দুইটি জরুরি প্রস্থানের জন্য সিঁড়িপথ থাকতে হবে। আগুন থেকে নির্গত ধোঁয়া নিঃশ্বাসের সাথে শরীরের ভিতরে প্রবেশ করলে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তাই যাতে আগুন এবং ধোঁয়া প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য ফায়ার এক্সিটের দরজা নিশ্ছিদ্র হতে হবে, আগুনের আঁচ থেকে সুরক্ষার জন্য সিঁড়িপথের দেয়াল বিশেষভাবে নির্মিত হবে। এছাড়া ফায়ার এক্সিটের দরজায় থাকবে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আলোকিত এক্সিট বা প্রস্থান চিহ্ন, যা অন্ধকারে পথ নির্দেশ করবে। ভয়ংকর কথা হলো, এফআর টাওয়ারের মতো ঢাকায় বহু সুপার মার্কেট, হোটেল এবং টাওয়ার রয়েছে যা আগুন থেকে সুরক্ষিত নয়।

ঢাকা নগরীর বিভিন্ন ভবন এবং স্থাপনাগুলো যেন এক একটি মৃত্যুকূপ। ২০১৭ সালে ফায়ার সার্ভিস ঢাকায় একটি জরিপ চালায়। দেখা গেছে, জরিপকৃত ৩৭৮৬ স্থাপনার মধ্যে ৯৬ কণাংশই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড চালু হয় ২০০৬ সালে। এর আগে নির্মিত দালানে অগ্নি নিরাপত্তা প্রদানের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা ছিল না। তবে যেসব দালানে অগ্নি নির্বাপনের ব্যবস্থা ও জরুরি নির্গমনের পথ নেই সেগুলো বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অতি তাড়াতাগি হালনাগাদ করে নিতে হবে। তা না হলে এরকম দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে এবং বন্ধ হবে না লাশের মিছিল।

বহুতল ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ১০ ফুট পর পর প্রতিটি তলার ছাদে বসাতে হয় স্প্রিংলার সিস্টেম। কোনো তলার তাপমাত্রা ৬২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড অতিক্রম করলেই স্প্রিংলার সিস্টেম থেকে ঝরনার মতো পানি ঝরে পড়ে আগুন নির্বাপনে সাহায্য করে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা থেকে থেকে দেখা গেছে, স্প্রিংলার সিস্টেম থাকলে হতাহতের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

বহুতল ভবনে আরো থাকবে আগুন লেগেছে একথা সবইকে জানিয়ে দেবার জন্য পিএ সিস্টেম এবং কন্ট্রোল রুম। প্রতিটি তলায় থাকবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন ফায়ার ওয়ার্ডেন যিনি জরুরি অবস্থার সময় এগুলো তদারকি করবেন। থাকবে স্মোক ডিটেক্টর বা ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র। প্রতি ৫৫০ বর্গফুট আয়তনের জন্য থাকবে একটি করে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র। প্রতি তিন মাস পর পর দিতে হবে ফায়ার ড্রিল বা অগ্নিনির্বাপক প্রশিক্ষণ।

আগুন নেভানোর কাজে পানির প্রাপ্যতা সহজ করতে উন্নত দেশে দালান কিংবা স্থাপনার থেকে কমপক্ষে ৫০ ফুট দূরত্বের মধ্যে থাকে অগ্নি নির্বাপন কাজে ব্যবহৃত বিশেষ পানিকল বা ফায়ার হাইড্রেন্ট। ঢাকায় রাস্তার ধারে ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন করার দাবি উঠেছে বহুদিন ধরে। কিন্তু এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়েনি।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকার ৭০ শতাংশ রাস্তা এতই সরু যে অগ্নিনির্বাপক গাড়ি চলতে পারবে না। চলতি আইন অনুযায়ী অগ্নি নির্বাপক গাড়ি চলাচলের জন্য রাস্তা কমপক্ষে নয় মিটার চওড়া হওয়া উচিত। আর দমকল বাহিনীর গাড়ি রাখার জন্য দালানের সামনে কমপক্ষে ৪.৫ মিটার চওড়া খালি জায়গার দরকার রয়েছে। কিন্তু ঢাকাসহ অন্য শহরে এসব কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে তৈরি হচ্ছে বাড়ি-ঘর, স্থাপনা।

জরুরি পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে আমাদের ফায়ার সার্ভিস একং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে পুরোপরি প্রস্তুত নয়, এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ড তা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। পলিথিন পেঁচিয়ে দমকল বাহিনীর পাইপের ফুটো বন্ধ করার জন্য কিশোর নাঈমের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, পরিকল্পনাবিহীন হেলিকপ্টারের ঝুলন্ত বাকেট দিয়ে আগুন নেভানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা সেই দীনতাকেই সবার সামনে এনে দিয়েছে। বাকেটের পানিও জায়গা মতো পৌছানোর আগেই নিঃশেষ হয়ে গেল। উন্নত দেশে অগ্নি নির্বাপন কাজ পরিচালনা জন্য রয়েছে কার্যকর পরিকল্পনা। ভবন বা স্থাপনার আকার অনুযায়ী এই পরিকল্পনা তৈরি বাধ্যতামূলক করা উচিত।

বড় আকারের অগ্নিকাণ্ড মোকাবেলা করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনবল, আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। নগর পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে শহরের সরু রাস্তাগুলো প্রশস্ত করার পাশাপাশি নতুন কোনো রাস্তা যাতে আগের মতো নিয়ম ভেঙ্গে নির্মিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। অতিসত্ত্বর পর্যাপ্ত পরিমাণ ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন করতে হবে।

তবে দুর্ঘটনা রোধের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির অন্য কোনো বিকল্প নাই। অগ্নিকাণ্ডের সময় আতঙ্কিত হয়ে মানুষ অনেক সময় লাফ দেয়া ও আগুনের মধ্য দিয়ে পথ খোঁজার চেষ্টা করে। নিজেকে রক্ষা করার জন্য কি কি পদক্ষেপ নেয়া উচিত তা গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণার ব্যবস্থা করলে অনেক অযাচিত মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।

মূল অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে অহরহ তৈরি হচ্ছে ভবন, বাড়ছে অগ্নিঝুঁকিসহ নানা দুর্ঘটনা। রাজউক, ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নির্মাণকাজে নীতিমালার সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি হচ্ছে অনিয়মের একটি প্রধান কারণ। দুর্নীতি এবং দায়িত্বে অবহেলা করেছেন এমন কর্মচারীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে আগামীতে এমন ঘটনা না ঘটে।

তবে কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য নাগরিকদের দায়িত্বভার রয়েছে অনেক। মুনাফা কিংবা অর্থ সাশ্রয়ের লোভে আমরা অন্যায়ের আশ্রয় নেই, আইন ফাঁকি দিয়ে রাস্তা দখল করে বাড়ি-ঘর তৈরি করি। আমাদের লোভের আগুনে পুড়ে নির্দোষ প্রাণের মৃত্যু ঘটছে। কিন্তু এসব করতে গিয়ে আমরা যে নিজেদের তৈরি মৃত্যুফাঁদে পা দিচ্ছি এবং আমরা নিজেরাও যে একদিন লাশের মিছিলের সাথী হতে পারি সে কথা হয়তো আমরা ভাবি না।