২০১২ সালের কথা। বরগুনার ফারজানার সাথে পটুয়াখালীর একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক শওকত আলী হিরনের বিয়ে হয়। মেয়ে তুলে দেয়ার সময় যৌতুক দাবি করলে বিয়ের আসরেই সাথে সাথেই বরকে তালাক দিয়ে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন সাহসী ফারজানা। ইডেন কলেজ থেকে ১ম শ্রেণীতে ¯স্নাতকত্তোর পাশ করা ফারজানা ছাত্রজীবনে যৌতুকবিরোধী আন্দোলন করেছেন। বাস্তব জীবনে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে ফারজানা যেভাবে যৌতুকের মোকাবেলা করলেন, তা দেশের সব নারীকে যৌতুকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে উজ্জীবিত করবে। অন্যদিকে শিক্ষক হিসাবে সমাজের মূল্যবোধ সমুন্নত করার বদলে যৌতুকের দাবি করে হিরন সবার ঘৃণার পাত্র হলেন। রাষ্ট্র কর্তৃক নিষিদ্ধ যৌতুকের লোভে তথাকথিত শিক্ষিত মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা হিরনের আসল চেহারাটা বেরিয়ে এলো।
যৌতুক কেবল সামাজিক সমস্যাই নয়, একটি বিষাক্ত ব্যাধি। গরীব ধনী বলে কথা নয়, লোভের বশবর্তী হয়েই মানুষ যৌতুক নামের সোনার হরিণটি পেতে চায়। এজন্য বিভিন্ন অজুহাতও দেয়া হয়। যেমন গরীব বর অনেক সময় তার ভাগ্য উন্নয়নের জন্য যৌতুকের সাহায্য চায়, যার যোগান দিতে গিয়ে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা সহায় সম্বল সব বিকিয়ে দিয়ে হন নিঃস্ব। আর ধনীদের মধ্যে এটি হলো আভিজাত্য মাপার একটি হাতিয়ার। যৌতুকের নির্মম বেদীতে কত নিরীহ নারী যে জীবন বলি দিচ্ছেন তার হিসাব নেই। পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে যৌতুক সংক্রান্ত নির্যাতন ও হত্যার কাহিনী। যৌতুকের জন্য পুড়িয়ে হত্যা/যৌতুকের জন্য অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যা/রাজনগরে শ্বাসরোধ করে স্ত্রীকে হত্যা/যৌতুকের জন্য গৃহবধূকে এসিডে ঝলসে দিল স্বামী/নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে স্ত্রীর আত্মহত্যা ইত্যাদি। দেশজুড়ে প্রতিদিন এমন হাজারো ঘটনা ঘটছে, যা পত্রিকায় পাতায় ঠাঁই পায় না বলে আমরা জানতে পারি না।
বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ২০০৩ সালে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২২,৫০০টি। নির্যাতনের ঘটনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আত্মহত্যা কিংবা দুর্ঘটনা হিসাবে চালিয়ে দেয়া হয়। ফলে পরিসংখ্যানে আসল চিত্রটি ধরা পড়ে না। যৌতুকের জন্য যে কত সাজানো সংসার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে তার হিসাব নেই। শুধু বাংলাদেশ কেন? ভারত, নেপাল, শ্রীলংকাসহ আমাদের এই উপমহাদেশ যৌতুক নামের অভিশাপে আক্রান্ত। ভারত ও শ্রীলংকায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি পেশার ভিত্তিতে যোগ্য জামাই ক্রয় করার জন্য যৌতুকের মান নির্ধারিত হয়। সরকারি হিসাবমতে ভারতে যৌতুকের কারণে প্রতি ৪ ঘন্টায় একজন নারী আত্মহত্যা করছে, প্রতি বারো ঘন্টায় একজনকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। ২০০৬ সালে যৌতুকের কারণে ভারতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৭৬১৮টি। প্রতি বছর এই সংখ্যা গড়ে ১৫ শতাংশ করে বেড়ে চলেছে।
যৌতুকের অপরাধ বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৮০ সালে যৌতুকবিরোধী আইন পাশ করে। এই ধারায় অপরাধী ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর কারাদন্ড আর সর্বনিম্ন ২ বছর এবং জরিমানা ৫ হাজার টাকা। কিন্তু এই আইন যৌতুকের অপরাধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন পাশ করা হয়। পাত্রীপক্ষের কাছে যারা যৌতুক চাইবে এই আইনের আওতায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। কিন্তু শুধু আইন করে যে আপরাধ বন্ধ করা যায় না, ফারজানার ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
যৌতুকের বিরুদ্ধে সবাই মিলে সামাজিকভাবে আমাদের লড়তে হবে, যৌতুক প্রথা প্রতিহত করতে হবে। কেউ যৌতুক চাইলে সঙ্গে সঙ্গে আদালতের সাহায্য নেয়া উচিত। যৌতুকলোভী কিছু মানুষ যদি উপযুক্ত শাস্তি পায়, তাহলে যৌতুক চাইবার আগে বরপক্ষ দ্বিতীয়বার ভেবে দেখবে। এজন্য উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
সমস্যা হলো, যৌতুকবিরোধী আইন থাকলেও কিভাবে আইনের আশ্রয় নিতে হয় তা অনেকের জানা নেই। সামাজিক চাপ ও লোক-লজ্জার ভয়ে, কিংবা সন্তানের কথা ভেবে অনেক সময় নারীরা মুখ খোলেন না, নির্যাতনের সাথে আপোস করে চলেন। একসময় মুক্তির কোনো পথ না পেয়ে আত্মহত্যাকেই বেছে নেন। ফারজানার মতো শিক্ষিত মেয়েরা আলোকবর্তিকা হয়ে এসব নির্যাতিত নারীদের যৌতুকের অগ্নিকুন্ড থেকে বেরুবার পথ দেখাতে পারেন।
আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মভীরু। আলেমসমাজ, ইমামদের কথা তারা মন দিয়ে শোনেন এবং তা পালন করার চেষ্টা করেন। যৌতুকের মতো গুরুতর সামাজিক সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য আমাদের ধর্মীয় নেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের ধর্মীয় নেতারা এ ব্যাপারে তেমন সোচ্চার নন। যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্তরের মানুষ প্রতিবাদ জানাচ্ছে। প্রতিবাদে ও বিক্ষোভে আমাদের বড় বড় ধর্মীয় নেতাদের অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তাদের এ ধরনের নিরবতা বৃহত্তর সমাজকে ভুল সংকেত পাঠাতে পারে। তাই আলেমসমাজকে ওয়াজ-মাহফিল ও জুমার খুতবায় যৌতুক যে শরিয়তবিরোধী এ কথা বলে জনগণকে যৌতুক বর্জন করার জন্য দিক-নির্দেশনা দিতে হবে। যৌতুক দেয়া নেয়া হয় এমন সব বিয়ে না পড়িয়ে তারা নজির স্থাপন করতে পারেন।
যৌতুক বন্ধ করার জন্য সবাই নারী সমাজকেই প্রতিবাদী হতে বলেন। কিন্তু শাসনের বেড়ী দিয়ে শৃংখলিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা গর্জে উঠার শক্তি পাবে কোথায়? তাই এ ক্ষেত্রে পুরুষদের দায় দায়িত্ব নারীদের চেয়ে অনেক বেশি বলেই আমি মনে করি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে গড়ে তোলা অনিয়মের দেয়াল পুরুষদেরই ভাঙ্গতে হবে। বিয়ের সময় যৌতুক নেব না, এ কথা পুরুষদের মুখ দিয়ে আগে উচ্চারিত না হলে যৌতুকের অভিশাপ থেকে নারীদের মুক্তি পাবার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখি না।
