রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, বন্যা, সামরিক অভ্যুত্থান—সবকিছু মিলিয়ে স্বদেশ কিভাবে চলছে তা নিয়ে শুধু বিশ্ব কেন, বাংলাদেশের খোদ নাগরিক সমাজই বিস্ময় প্রকাশ করে থাকেন। স্বাধীনতার পর পর বিধ্বস্ত অবকাঠামো এবং অর্থনীতির ওপর ভর করে বাংলাদেশ যখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল, তখন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে তিরস্কার করেছিলেন। কিন্তু গত দুই দশকে আর্থসামাজিক উন্নয়নের সুতো দিয়ে সেই ঝুড়ির তলা মেরামত করে ফেলেছে বাংলাদেশ।

তৃণমূল পর্যায়ে বাংলাদেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান যে হারে উন্নীত হয়েছে তা রীতিমতো বিস্ময়কর বলে অভিহিত করা হয়েছে কিসিঞ্জারদের অন্যতম মিত্রদেশ যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দ্যা ইকনোমিস্ট’-এর প্রতিবেদনে। বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য ও স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানই এখন বাংলাদেশের হয়ে কথা বলছে। আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও মানবকল্যাণের ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বের নব্য সুপারপাওয়ার ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরতার জন্য যারা আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিল তারাই এখন অবাক চোখে দেখছে সম্ভাবনার আলোকে ঝলসে ওঠা এক নতুন বাংলাদেশকে আর মোহিত হয়ে বলছে, ‘হে বিশ্ব! এই বাংলাদেশ থেকেই উন্নয়নের পাঠ নাও।’

গত কুড়ি বছরে বাংলাদেশে মানবকল্যাণ ও সমৃদ্ধির প্রতিটি সূচকের যে ধরনের উন্নতি হয়েছে তা বিশ্বে নজিরবিহীন। মানুষের গড় আয়ু ১০ বছর বেড়ে গিয়ে ৫৯ থেকে এখন হয়েছে ৬৯। বাংলাদেশীদের চেয়ে দ্বিগুণ সম্পদশালী হবার পরও ভারতীয়দের গড় আয়ু এখন আমাদের চেয়ে চার বছর কম। নারীশিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের অর্জনও চোখে পড়ার মতো। ২০০৫ সালের হিসাব অনুযায়ী ৯০ কণাংশেরও বেশি মেয়ে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছে। শিশু ও মায়েদের অকালমৃত্যুর হার কমেছে অনেক। জন্মের সময় শিশুর মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৯৭ থেকে কমে হয়েছে ৩৭। ভারতে এই সংখ্যা ৪৭ আর পাকিস্তানে ৫৯। এছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমেছে দুই তৃতীয়াংশ। নারী স্বাক্ষরতার হার বিস্ময়করভাবে ৩৮ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ৭৭ কণাংশ। বাংলাদেশের নারীরা এখন পুরুষদের চেয়ে গড়ে দুই বছর বেশি আয়ু আশা করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্জন কেবল উনিশ শতকের শেষের দিকে জাপানের মেইজি সম্রাটের সময়কার অগ্রগতির সাথেই তুলনা করা চলে।

অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়, জীবনযাত্রার মান বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হয়েছে তার উল্টো। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হলো মাত্র ১৯০০ ডলার যা ভারতের অর্ধেক এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারও মন্থর (৫%)। তা সত্ত্বেও, অর্থনৈতিক সূত্রের প্রতিকূলে সাঁতার কেটে বাংলাদেশ যে সামাজিক উন্নয়নের বিপ্লব ঘটিয়েছে তা বিশ্বের কাছে রোল মডেল বলে গন্য করা হচ্ছে।

তবে এই অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি হলো অজপাড়াগাঁয়ের নারীসমাজ। ক্ষুদ্রঋণ নারীসমাজের ভাগ্য বদলে দিয়েছে, তাদের স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে। আজ পোশাকশিল্পের আশি শতাংশ কর্মী হলেন নারী। নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবারে মায়ের কর্তৃত্ব বেড়েছে। নারীরা সাধারণত নিজ পরিবার, সন্তানের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার জন্য পুরুষদের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে থাকে। তাই গ্র্রামের পরিবারগুলো নারী ক্ষমতায়নের সুফল পেতে শুরু করেছে। কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশে ঘটেছে সবুজ বিপ্লব, যা দারিদ্র দূর করতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। এছাড়া বিশ্বে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় ৭০ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো টাকা গ্রাম বাংলার চোহারা দিয়েছে বদলে।

বাংলাদেশের সব সমস্যার গোড়ায় রয়েছে অত্যধিক জনসংখ্যার চাপ। আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হয় জনসংখ্যা যেন লাগামহীন ঘোড়ার মতো কেবল ছুটেই চলেছে, এ নিয়ে কারো তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অর্জন ছোট করে দেখার মতো নয়। স্বাধীনতার পর পর তৎকালীন সরকার জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের আজকের জনসংখ্যা আরো চার কোটি বেশি হতে পারতো। চীনের মতো এক সন্তান কিংবা ভারতের জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণের মতো চরম পদক্ষেপ না নিয়ে বাংলাদেশে সরকার পরিবার ছোট রাখার জন্য স্বেচ্ছাক্রিয় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী হাতে নেয়। গ্রামেগঞ্জে বিনামূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বিতরণ ও নারীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়ার কার্যক্রম ভীষণ রকম সফল হয়। যার ফলে সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম এমন নারীদের প্রায় ৬০% এখন নিয়মিত জন্মনিরোধক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

তবে স্বদেশের উন্নয়ন সরণী এখনো কন্টকমুক্ত নয়। বেপরোয়া দুর্নীতি গিলে খাচ্ছে আমাদের চারপাশ। আইনের শাসন বলতে গেলে এখন নির্বাসনে। টিভির পর্দায় প্রতিপক্ষের চোখ উপড়ে ফেলবার হুমকি দিচ্ছেন মাননীয় মন্ত্রী, দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও দায়িত্বশীলরা বীরদর্পে আগলে আছেন তাদের পদ। সমাজ, প্রশাসন, শিক্ষাঙ্গন, এমনকি কম্যুনিটির নেতৃত্বের আসনগুলোও দখল করে আছেন জি-হুজুর মার্কা মানুষের দল। অযোগ্যতাই যেনে এখন যোগ্যতা বিচারের প্রধান মানদন্ড।

শুধু তাই নয়, দেশ ছাড়িয়ে প্রবাসী বাংলাদেশী সমাজও এখন একই ধরনের ফোবিয়ায় আক্রান্ত। প্রবাসের সুনিয়ন্ত্রিত ও সুকৃঙ্খল পরিবেশও আমাদের তেমন প্রভাবিত করতে পারছে না। অবৈধ উপায়ে মুনাফা লাভের জন্য আমাদের সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন টেন্ডার বাণিজ্যের তালিকায় এখন যোগ হয়েছে বিমান বন্দরে প্রবাসীদের লাগেজ বাণিজ্য। ভীতিকর কথা হলো, বহুবিধ বাণিজ্যের সাথে আমাদের প্রবাসী দূতাবাসগুলোরও সম্পৃক্ততার খবর আসছে।

সম্প্রতি ফিলিপাইনের সাবেক রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুটি মামলা করেছে দুদক। বলা হচ্ছে, এরকম অসাধু রাষ্ট্রদূত আরো অনেক আছে; একটু খোঁড়াখুঁড়ি করলেই কেচোর বদলে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য অপেক্ষা না করে তৃণমূল পর্যায়ে গরীবের ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব, চরম প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে থেকেও বিশ্বকে এই অসাধ্য সাধন করে দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। আর্থসামাজিক উন্নয়নে এমন বিস্ময়কর অবদানের খবর যখন পত্র-পত্রিকায় পড়ি তখন নিজেকে ভীষণ অহংকারী মনে হয়। ইচ্ছে হয় চিৎকার করে বলি:

শাবাশ বাংলাদেশ

এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়

জ¦লে পুড়ে মরে ছারখার

তবু মাথা নোয়াবার নয়