বন্দরনগরী চট্টগ্রাম শহরের শিক্ষা-জোন খ্যাত চন্দনপুরা এলাকার প্রায় ২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে সবুজে ঘেরা মেধাবিকাশের তীর্থভূমি কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানের পাশেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজী মোহাম্মদ মোহসিন কলেজ। কাল পরম্মপরায় বহু জ্ঞানী-গুণী কীর্তিমান মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাস, জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হয়ে শিক্ষার্থীদের দিয়েছে শুদ্ধ পথের সন্ধান। তবে যে মনীষীর হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল এই স্কুল, তিনি হলেন ত্যাগী ও ন্যায়নিষ্ঠ সংগঠক, শিক্ষা, সমাজসেবা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের কালোত্তীর্ণ মহাপুরুষ কাজেম আলী।

কাজেম আলী ১৮৫২ সনের ১১ আগস্ট চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকার উত্তরে ফরিদর পাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের প্রথিতযশা উকিল মুনশি কাসিম আলী। মাত্র নয় মাস বয়সে তিনি মাতৃহারা হলে চাচা উজির আলীর স্নেহে পালিত হন। বাল্যবয়সে মক্তব ও পাঠশালায় অধ্যয়ন শেষ করে কাজেম আলী হুগলী গমন করেন। সেখান থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে সাতকানিয়া হাই স্কুলে (বর্তমানে সাতকানিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়) শিক্ষকতা শুরু করেন। ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি স্কুলটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। একজন সফল শিক্ষক হিসেবে তাই তিনি সবার কাছে কাজেম আলী মাস্টার নামেই সমধিক পরিচিত।

ব্রিটিশ-ভারত থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান ও সূতিকাগার হলো বীর-প্রসবিনী এই চট্টগ্রাম। সেই ধারাবাহিকতায় তারুণ্যের সময় থেকেই তিনি স্বদেশী, অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনসহ নানাবিধ সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবামূলক কাজে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যাত্রামোহন সেন, এইচ.এম. পার্সিভ্যাল, শশাঙ্কমোহন সেন, মৌলভি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর মতো কিংবদন্তিদের সহযোদ্ধা হয়ে কাজেম আলী মাস্টার রেখেছিলেন অসাধারণ ভূমিকা।

কাজেম আলী মাস্টারের জীবনকাহিনি আলোচনা করতে গেলে ওই সময়ের রাজনৈতিক, বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করা আবশ্যক। ভারতে ব্রিটিশ শাসন শুরু হবার পর মুসলিমরা ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিল। ১৮৩৬ সালে দেশে আরবি ফার্সির স্থলে ইংরেজি চালু হবার পর শিক্ষা-দীক্ষায় তারা অনেক পিছিয়ে পড়ে।

তিনি লক্ষ্য করলেন, পিছিয়ে থাকা বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আধুনিক শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নাই। তাই বাঙালি সমাজকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে দেশকে জাগিয়ে তোলার জন্য ১৮৮৫ সালে চাকমা রাজার কাছ থেকে ৬০ টাকায় কেনা জমিতে নিজেই গড়ে তুললেন চিটাগাং মিডল ইংলিশ স্কুল।

ইংরেজবিদ্বেষী স্থানীয়রা তিনবার এই স্কুলটি পুড়িয়ে দেয়। কিন্তু এতে তিনি দমে যাননি। প্রতিকূল পরিবেশে লড়াই করে, অনেক চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করে তিনি স্কুলটি পুনর্গঠন করেন। পরবর্তীতে কাজেম আলী মাস্টার পিতার সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে ১৮৮৮ সালে চিটাগাং হাই ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

কাজেম আলী মাস্টার ছিলেন একজন সত্যিকারের জনদরদী ও ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ সংস্কারক। তিনি আত্মপ্রচারের চেয়ে কিভাবে জনগণের মঙ্গল করা যায় সেজন্য নিরন্তর সচেষ্ট ছিলেন। তাই জীবদ্দশায় তাঁর নামে স্কুলের নামকরণ করতে চাইলে তিনি রাজি হননি। অবশেষে তাঁর মৃত্যুর পর ১৯২৮ সালে এই স্কুলকে চট্টগ্রাম কাজেম আলী হাই স্কুল নামকরণ করা হয়। আমাদের সমাজে এমন দৃষ্টান্ত মেলা ভার।

কাজেম আলী মাস্টার ছিলেন হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রতীক। রাজনৈতিক আদর্শ ও গণমানুষের স্বার্থ রক্ষায় তিনি ছিলেন আপোসহীন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে চট্টগ্রামে পরিচালিত হয়েছিল কংগ্রেস-খেলাফত কমিটির আন্দোলন। তিনি অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি, মুসলিম লীগ, চট্টগ্রাম কংগ্রেস কমিটি, খাদেমুল ইসলাম সোসাইটি, খেলাফত কমিটিসহ নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৮৯৩ সাল থেকে আমৃত্যু চট্টগ্রামের পৌরসভার চেয়াম্যান ছিলেন।

শিক্ষা বিস্তার ও নিঃস্বার্থ জনসেবার জন্য কাজেম আলী মাস্টার দুইবার ‘কায়সার-ই-হিন্দ’ গোল্ড মেডেল এবং ‘সার্টিফিকেট অব অনার’-এ ভুষিত হন। কিন্তু ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শুধু ইংরেজ প্রদত্ত উপাধি কায়সার-ই-হিন্দই পরিত্যাগ করেননি, বরং ইংরেজ প্রদত্ত ডাবল গোল্ড মেডেল এবং সার্টিফিকেট ব্রিটিশ-সরকারকে ঘৃণাভরে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া সরকার প্রদত্ত খান বাহাদুর উপাধিও বর্জন করেন তিনি। তাঁর অনন্য আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের জন্য ওই বছরই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার সময় চট্টগ্রামের এক বিশাল জনসভায় জনগণের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘শেখ-ই-চাটগাম’ উপাধি দেওয়া হয়।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষজুড়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে কাজেম আলী মাস্টার বিপ্লবের মশাল হাতে তুলে নিয়ে কা-ারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। চট্টগ্রামে বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতা ও ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের আন্দোলনে মূল উদ্যোক্তাদের একজন ছিলেন তিনি। ১৯২১ সালের ব্রিটিশ-বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের নেতা হিসেবে যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, ত্রিপুরা চরণ চৌধুরী, স্বামী দীনানন্দ, নৃপেন ব্যানার্জীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে তিনিও কারাবরণ করেন। ওই বছরই সাধারণ নির্বাচনে কাজেম আলী মাস্টার কংগ্রেসের টিকেটে ভারতীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য উপস্থাপন করার সময় অকস্মাৎ হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দিল্লি জামে মসজিদে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

কাজেম আলী মাস্টারের ৯৬তম মহাপ্রয়ান দিবসে আজ প্রশ্ন জাগে, চট্টগাম তথা বাংলাদেশ এবং এই উপমহাদেশের একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্বের অমর কীর্তির কথা কি আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি? তারা কি জানে দেশ ও জনগণের অধিকারের কথা ভেবে ব্রিটিশের দেয়া দুর্লভ উপাধিগুলো কিভাবে একে একে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই মহাপুরুষ? তারা কি জানে চরম বাধা-বিপত্তি ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে কাজেম আলী স্কুলকে টিকিয়ে রাখার ইতহাস? সত্যি বলতে কি, এই চট্টলা সন্তানের জীবনগাথা ইতিহাসের পাতায় উপেক্ষিত রয়ে গেছে। কাজেম আলী মাস্টারের জীবন সংগ্রামের ইতিহাস উপেক্ষিত বলেই আজ আমাদের নতুন প্রজন্ম লক্ষ্যভ্রষ্ট, পাচ্ছে না সঠিক পথের সন্ধান।

দুখঃজনক হলো, বর্তমানে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল উন্নয়নের কথা বলে স্কুল দখলের পায়তার করছে। ২০১০ সালের পর স্কুল কমিটি স্কুলের মাঠের অংশে ও দুটি ক্লাসরুম ভেঙ্গে দুটি মার্কেট নির্মাণ করে স্কুলটির ঐতিহ্য নষ্ট করে। এভাবে চললে কিছুদিনের মধ্যে এই মহান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বই বিপন্ন হবে।

শেখ-ই-চাটগাম পারিবারিক কিংবা সরকারি সূত্রে পাওয়া কোনো উপাধি নয়। এ হলো দেশে ও জাতির জন্য কাজেম আলী মাস্টারের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ জনগণের দেয়া উপাধি। এ হচ্ছে তাঁর জন্য দেশের মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসারই নিদর্শন। তাই তো ইতিহাসের পাতায় যতই উপেক্ষা করার চেষ্টা করা হোক না কেন, কাজেম আলী মাস্টার গণমানুষের হৃদয়ের গভীরে বেঁচে থাকবেন চিরদিন। শেখ-ই-চাটগাম কাজেম আলী মাস্টার ।

 

আলোকিত মানুষ তৈরির সফল কারিগর

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম শহরের শিক্ষা-জোন খ্যাত চন্দনপুরা এলাকার প্রায় ২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে সবুজে ঘেরা মেধাবিকাশের তীর্থভূমি কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানের পাশেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজী মোহাম্মদ মোহসিন কলেজ। কাল পরম্মপরায় বহু জ্ঞানী-গুণী কীর্তিমান মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাস, জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হয়ে শিক্ষার্থীদের দিয়েছে শুদ্ধ পথের সন্ধান। তবে যে মনীষীর হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল এই স্কুল, তিনি হলেন ত্যাগী ও ন্যায়নিষ্ঠ সংগঠক, শিক্ষা, সমাজসেবা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের কালোত্তীর্ণ মহাপুরুষ কাজেম আলী।

কাজেম আলী ১৮৫২ সনের ১১ আগস্ট চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকার উত্তরে ফরিদর পাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের প্রথিতযশা উকিল মুনশি কাসিম আলী। মাত্র নয় মাস বয়সে তিনি মাতৃহারা হলে চাচা উজির আলীর স্নেহে পালিত হন। বাল্যবয়সে মক্তব ও পাঠশালায় অধ্যয়ন শেষ করে কাজেম আলী হুগলী গমন করেন। সেখান থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে সাতকানিয়া হাই স্কুলে (বর্তমানে সাতকানিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়) শিক্ষকতা শুরু করেন। ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি স্কুলটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। একজন সফল শিক্ষক হিসেবে তাই তিনি সবার কাছে কাজেম আলী মাস্টার নামেই সমধিক পরিচিত।

ব্রিটিশ-ভারত থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান ও সূতিকাগার হলো বীর-প্রসবিনী এই চট্টগ্রাম। সেই ধারাবাহিকতায় তারুণ্যের সময় থেকেই তিনি স্বদেশী, অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনসহ নানাবিধ সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবামূলক কাজে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যাত্রামোহন সেন, এইচ.এম. পার্সিভ্যাল, শশাঙ্কমোহন সেন, মৌলভি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর মতো কিংবদন্তিদের সহযোদ্ধা হয়ে কাজেম আলী মাস্টার রেখেছিলেন অসাধারণ ভূমিকা।

কাজেম আলী মাস্টারের জীবনকাহিনি আলোচনা করতে গেলে ওই সময়ের রাজনৈতিক, বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করা আবশ্যক। ভারতে ব্রিটিশ শাসন শুরু হবার পর মুসলিমরা ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিল। ১৮৩৬ সালে দেশে আরবি ফার্সির স্থলে ইংরেজি চালু হবার পর শিক্ষা-দীক্ষায় তারা অনেক পিছিয়ে পড়ে।

তিনি লক্ষ্য করলেন, পিছিয়ে থাকা বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আধুনিক শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নাই। তাই বাঙালি সমাজকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে দেশকে জাগিয়ে তোলার জন্য ১৮৮৫ সালে চাকমা রাজার কাছ থেকে ৬০ টাকায় কেনা জমিতে নিজেই গড়ে তুললেন চিটাগাং মিডল ইংলিশ স্কুল।

ইংরেজবিদ্বেষী স্থানীয়রা তিনবার এই স্কুলটি পুড়িয়ে দেয়। কিন্তু এতে তিনি দমে যাননি। প্রতিকূল পরিবেশে লড়াই করে, অনেক চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করে তিনি স্কুলটি পুনর্গঠন করেন। পরবর্তীতে কাজেম আলী মাস্টার পিতার সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে ১৮৮৮ সালে চিটাগাং হাই ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

কাজেম আলী মাস্টার ছিলেন একজন সত্যিকারের জনদরদী ও ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ সংস্কারক। তিনি আত্মপ্রচারের চেয়ে কিভাবে জনগণের মঙ্গল করা যায় সেজন্য নিরন্তর সচেষ্ট ছিলেন। তাই জীবদ্দশায় তাঁর নামে স্কুলের নামকরণ করতে চাইলে তিনি রাজি হননি। অবশেষে তাঁর মৃত্যুর পর ১৯২৮ সালে এই স্কুলকে চট্টগ্রাম কাজেম আলী হাই স্কুল নামকরণ করা হয়। আমাদের সমাজে এমন দৃষ্টান্ত মেলা ভার।

কাজেম আলী মাস্টার ছিলেন হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রতীক। রাজনৈতিক আদর্শ ও গণমানুষের স্বার্থ রক্ষায় তিনি ছিলেন আপোসহীন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে চট্টগ্রামে পরিচালিত হয়েছিল কংগ্রেস-খেলাফত কমিটির আন্দোলন। তিনি অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি, মুসলিম লীগ, চট্টগ্রাম কংগ্রেস কমিটি, খাদেমুল ইসলাম সোসাইটি, খেলাফত কমিটিসহ নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৮৯৩ সাল থেকে আমৃত্যু চট্টগ্রামের পৌরসভার চেয়াম্যান ছিলেন।

শিক্ষা বিস্তার ও নিঃস্বার্থ জনসেবার জন্য কাজেম আলী মাস্টার দুইবার ‘কায়সার-ই-হিন্দ’ গোল্ড মেডেল এবং ‘সার্টিফিকেট অব অনার’-এ ভুষিত হন। কিন্তু ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শুধু ইংরেজ প্রদত্ত উপাধি কায়সার-ই-হিন্দই পরিত্যাগ করেননি, বরং ইংরেজ প্রদত্ত ডাবল গোল্ড মেডেল এবং সার্টিফিকেট ব্রিটিশ-সরকারকে ঘৃণাভরে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া সরকার প্রদত্ত খান বাহাদুর উপাধিও বর্জন করেন তিনি। তাঁর অনন্য আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের জন্য ওই বছরই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার সময় চট্টগ্রামের এক বিশাল জনসভায় জনগণের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘শেখ-ই-চাটগাম’ উপাধি দেওয়া হয়।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষজুড়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে কাজেম আলী মাস্টার বিপ্লবের মশাল হাতে তুলে নিয়ে কা-ারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। চট্টগ্রামে বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতা ও ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের আন্দোলনে মূল উদ্যোক্তাদের একজন ছিলেন তিনি। ১৯২১ সালের ব্রিটিশ-বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের নেতা হিসেবে যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, ত্রিপুরা চরণ চৌধুরী, স্বামী দীনানন্দ, নৃপেন ব্যানার্জীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে তিনিও কারাবরণ করেন। ওই বছরই সাধারণ নির্বাচনে কাজেম আলী মাস্টার কংগ্রেসের টিকেটে ভারতীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য উপস্থাপন করার সময় অকস্মাৎ হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দিল্লি জামে মসজিদে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

কাজেম আলী মাস্টারের ৯৬তম মহাপ্রয়ান দিবসে আজ প্রশ্ন জাগে, চট্টগাম তথা বাংলাদেশ এবং এই উপমহাদেশের একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্বের অমর কীর্তির কথা কি আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি? তারা কি জানে দেশ ও জনগণের অধিকারের কথা ভেবে ব্রিটিশের দেয়া দুর্লভ উপাধিগুলো কিভাবে একে একে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই মহাপুরুষ? তারা কি জানে চরম বাধা-বিপত্তি ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে কাজেম আলী স্কুলকে টিকিয়ে রাখার ইতহাস? সত্যি বলতে কি, এই চট্টলা সন্তানের জীবনগাথা ইতিহাসের পাতায় উপেক্ষিত রয়ে গেছে। কাজেম আলী মাস্টারের জীবন সংগ্রামের ইতিহাস উপেক্ষিত বলেই আজ আমাদের নতুন প্রজন্ম লক্ষ্যভ্রষ্ট, পাচ্ছে না সঠিক পথের সন্ধান।

দুখঃজনক হলো, বর্তমানে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল উন্নয়নের কথা বলে স্কুল দখলের পায়তার করছে। ২০১০ সালের পর স্কুল কমিটি স্কুলের মাঠের অংশে ও দুটি ক্লাসরুম ভেঙ্গে দুটি মার্কেট নির্মাণ করে স্কুলটির ঐতিহ্য নষ্ট করে। এভাবে চললে কিছুদিনের মধ্যে এই মহান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বই বিপন্ন হবে।

শেখ-ই-চাটগাম পারিবারিক কিংবা সরকারি সূত্রে পাওয়া কোনো উপাধি নয়। এ হলো দেশে ও জাতির জন্য কাজেম আলী মাস্টারের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ জনগণের দেয়া উপাধি। এ হচ্ছে তাঁর জন্য দেশের মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসারই নিদর্শন। তাই তো ইতিহাসের পাতায় যতই উপেক্ষা করার চেষ্টা করা হোক না কেন, কাজেম আলী মাস্টার গণমানুষের হৃদয়ের গভীরে বেঁচে থাকবেন চিরদিন।