আমাদের অতি প্রিয় লাল সবুজের পতাকার জন্য আত্মত্যাগ করতে হয়েছে লক্ষ কোটি বাঙালিকে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের বিভিন্ন সময় কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে থাকাকালীন খুব কাছ থেকে রণাঙ্গনের বিভিন্ন কৌশল এবং যুদ্ধের ভয়াবহ রূপ দেখার সুযোগ হয়েছিল। তাই তো হৃদয়ে একাত্তরের স্মৃতিকথা এখনো অম্লান।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে অর্থাৎ ২৫ মার্চের কালোরাতে ছিলাম কুমিল্লা শহরে। কুমিল্লা শহরে দেখেছি মার্চের গভীর রাতে পাকবাহিনীর হিংস্র আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড। চট্টগ্রাম শহরে দেখেছি মুজিববাহিনীর গেরিলা যুদ্ধ, যার সাথে আমি নিজেও সম্পৃক্ত ছিলাম। অতঃপর কক্সবাজারে দেখেছি মিত্রবহিনীর বোমারু বিমানের আক্রমণ এবং বঙ্গোপসাগরে নোঙ্গর করা রণতরী বিক্রমের তুমুল গোলাবর্ষণ। আরো দেখেছি লাশের স্তূপ এবং রাজাকারবাহিনীর ক্যাম্পের অভ্যন্তরের বীভৎস দৃশ্য।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই পুরো কুমিল্লা শহরে একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সবার মুখে শুধু একটি কথা—পাকিস্তানী বাহিনী কখন ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে শহরে ঢুকবে? ২৪ মার্চের সন্ধ্যায় বাবার একজন বন্ধু বললেন, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের রাস্তায় সেনাবাহিনীকে ঠেকাতে জনতা ব্যারিকেড দিয়েছে। পাকবাহিনী যে কোনো সময় শহরে আক্রমণ চালাতে পারে। কিন্তু জনতার গড়া ব্যারিকেডে কোনো কাজ হয়নি।

২৫ মার্চের গভীর রাত। গোলাগুলির প্রচন্ড গর্জনে হঠাৎ করে ঘুম থেকে জেগে উঠেলাম। বাবা বললেন, পাকিস্তানী সৈন্যরা শহরে ঢুকে পড়েছে, লড়াই চলছে। বাবা দরজা খুলে শুধু বারান্দায় পায়চারি করছিলেন। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম ট্রেসার ও ম্যাগনেসিয়াম ফায়ারের তীব্র আলোর ঝলক। আমরা তখন কুমিল্লায়। বাবা সরকারি চাকুরে, কুমিল্লা জজ কোর্টের ঠিক উল্টোদিকের অফিসার্স কলোনিতেই ছিল আমাদের বাসা। আমি কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়ছি।

২৫ মার্চের রাতের অন্ধকারে পাক-হানাদার বাহিনী বর্বর পাশবিকতায় কুমিল্লা শহরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কুমিল্লা শহরতলীতে ছিল ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্সের হেড কোয়ার্টার। তাই কুমিল্লায় ওদের প্রথম টার্গেট ছিল পুলিশ লাইন ও ইপিআর ক্যাম্প। সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সাহসী জোয়ানরা সামান্য থ্রি নট থ্রি দিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলল। কিন্তু পাকবাহিনীর ভারী অস্ত্রের তোপের মুখে তা বেশিক্ষণ টেকেনি। ওই রাতে কুমিল্লার পুলিশ বাহিনী বলতে গেলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শহীদ হন অনেক বীর সন্তান। এদিকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি অফিসারসহ হাজারেরও বেশি সেনা সদস্যদের ওই রাতেই হত্যা করা হয়। সেনা সদস্যদের পরিবার, এমনকি ক্যান্টনমেন্ট মিলিটারি হাসপাতালের ডাক্তারাও রেহাই পায়নি পাকবাহিনীর হিংস্র থাবা থেকে।

২৫ মার্চের সেই ভয়াবহ রাতটা আমরা সবাই জেগেই কাটিয়ে দেই। সকালে বারান্দায় এসে দেখি ঘরের দেয়ালে লক্ষ্যচ্যুত এলোপাথাড়ি গুলির দাগ। বাবা রাতে বারান্দায় পায়চারী করছিলেন। ভাগ্যিস বাবার গায়ে গুলি লাগেনি। ভোরের দিকে গুলির আওয়াজ ও কামানের গর্জন কমে এলেও চলল লুটপাট আর হত্যাকাণ্ড। প্রাণচঞ্চল কুমিল্লা শহর বদলে গেল নিস্তব্ধ প্রেতপুরীতে।

এর পরের দিনগুলি অনেকটা খাঁচায় বন্দি হয়ে কেটেছে। সকালে স্কুলে যাওয়া আর সন্ধ্যায় বাসায় এসে জানালা বন্ধ করে লো ভলিউমে বিবিসি শোনা। মার্চের শেষের দিকে চাটগাঁ থেকে খবর এলো, আমার যে ভাই মেডিকেল কলেজে পড়তেন তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বিষাদের ছায়া নেমে এলো বাসায়। মা কেঁদে চললেন, বাবার মুখে কোনো কথা নেই। অফিস থেকে বাসায় ফিরে জায়নামাজে দাঁড়িয়েই তাঁর রাত কাটছিল। পাকবাহিনী যদি তাকে ধরে নিয়ে যায় তাহলে উনি এখন কোথায়? বেঁচে আছেন কি? নয় ভাই ও দু’বোনের সংসারের ৪র্থ সন্তান হলেন আমার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ভাইটি।

প্রিয়জনকে হারানোর ব্যথা বুকে চেপে কেটে গেল বেশ ক’টি মাস। একদিন সবাইকে চমকে দিয়ে ভাইয়া এলেন কুমিল্লায়। ভাইয়ার স্বাস্থ্য আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। তাঁর চোখের তারায় জ্বলছিল অন্য এক ধরনের আলো। সারা রাত ভাইয়ার মুখে শুনেছি তাঁর মুক্তিবাহনীতে যোগ দেয়ার গল্প, পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরের ভয়ংকর কাহিনি। ভাইয়া মায়ের অনুমতি চাইলে মা দোয়া করে বললেন, ‘আমার এতগুলো সন্তানের মধ্যে একজন যদি দেশের কাজে লাগে সেটা হবে গর্বের কথা। আমি তোকে দেশের জন্য উৎসর্গ করলাম।’

৭১-এর মাঝামাঝি কুমিল্লা থাকতেই বাবা চাকরি থেকে অবসর নিলেন। তখন পুরোদমে লড়াই শুরু হয়ে গেছে। আমাদের ফ্ল্যাটের পাশ ঘেঁষে একটি সড়ক চলে গেছে ভারতীয় সীমান্তের দিকে। ওই রাস্তা দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ট্রাকবোঝাই পাক-সেনা চলাচল করত। মাঝে মধ্যে কৌতুকের ছলে পাক-সেনারা ট্র্রক থেকে আমাদের কলোনির সামনের ফাঁকা মাঠে গুলি ছুড়তো আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়তো। ভীষণ আতংকের মধ্যে কাটছিল দিন।

প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তের দু’দিক থেকে পাল্টাপাল্টি কামানের গোলা বিনিময় চলত। কামানের গোলা যে কোনো সময় মাথায় পড়বে জেনেও সারতে হতো দৈনন্দিন জীবনের কর্মসূচী। একদিন বেশ ক’টি দুরপাল্লার কামানের গোলা কুমিল্লা শহরের বাজারে এসে পড়ল, মারা গেল কুমিল্লা জিলা স্কুলের একজন ছাত্র। অন্য একদিন নিশানাবিহীন গোলার আঘাতে আমাদের বাসার কাছেই একটি ফ্ল্যাটের ছাদ ফুটো হয়ে গেল। এর পর সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া নিয়মিত কামানের গোলার নিচে কাটাতে হয়েছে দিন। এর কিছুদিন পর আমরা কুমিল্লা ছেড়ে চাটগাঁ চলে এলাম।

পঁচিশে মার্চের রাতে ঢাকার পতন হলেও চাটগাঁ আয়ত্তে আনতে পাকবাহিনীর বেশ সময় লাগে। এর অন্যতম কারণ ছিল কালুরঘাটে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের গড়ে তোলা সম্মিলিত প্রতিরোধ। ২৪ মার্চে চট্টগ্রাম বন্দরে তখন নোঙ্গর করেছে ‘সোয়াত’ নামের পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ। কিন্তু চট্টলাবাসী ওই অস্ত্র যাতে নামতে না পারে সেজন্য গড়ে তুলল অবরোধ। কর্ণফুলীতে ডুবিয়ে দেয়া হলো বেশ কিছু জাহাজ। ২৬ মার্চ ঢাকা বেতার পাকিস্তানীদের হাতে চলে গেলে চট্টগ্রামের কালুরঘাটের একটি অখ্যাত বেতারকেন্দ্র ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল। এই বেতারকেন্দ্র থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা সর্বপ্রথম বিশ্বকে জানানো হয়। ৩০ মার্চ এই বেতারকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলেও ২৬ থেকে ৩০, এই চারদিনের বিপ্লবী সম্প্রচার দিকহারা বাঙালি জাতির মনোবল চাঙা রাখে। বিশ্বকে জানিয়ে দেয়—বাঙালি কখনো মাথা নোয়াবে না, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে লড়াই চালিয়ে যাবে।

পাকবাহিনীর অন্যতম পথের কাঁটা ছিল এই বেতারকেন্দ্র। তাই কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু হয় তুমুল লড়াই। আমার মেডিকেলপড়–য়া ভাইয়া তখন চাটগাঁ মেডিকেল কলেজ কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে। কালুরঘাটের পতন হলে তিনি রামগড় চলে যান। একাত্তরের মে মাসে মেজর মীর শওকত আলী ও ক্যাপ্টেন অলী আহাদের নেতৃত্বে রামগড়ে পাকিস্তানের তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের সাথে মুক্তিবাহিনীর যে সর্বশেষ যুদ্ধে হয় তাতে প্রত্যক্ষ অংশ নেন। রামগড় হাতছাড়া হবার পর মেজর জিয়া, শওকত আলী ও অন্যানদের সাথে সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলার মনুবাজার ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে সিনিয়র লিডার মনোনীত হয়ে ভারতের বিখ্যাত দেরাদুন সামরিক একাডেমিতে জেনারেল উব্বানের অধীনে গেরিলা যুদ্ধের নিবিড় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

প্রশিক্ষণ শেষে কেসি-১ দলের কমান্ডার মনোনীত হন এবং চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাক-হানাদার ও রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে চাটগাঁ শহরতলীতে বড় বড় অপারেশন পরিচালনা করেন। স্বাধীনতার পর শান্তি ও শৃংখলা রক্ষার জন্য ভাইয়া চট্টগ্রাম কোতোয়ালী থানার দায়িত্ব নেন এবং যোগ্যতার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করেন। নিয়তির কি পরিহাস! নয় মাসের সম্মুখ সমর ও গেরিলা যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর গুলি ভাইয়ার শরীরে আঁচড় কাটতে না পারলেও স্বাধীনতার পর কিছু বখে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নারী অপহরণের কাজে বাধা দিতে গিয়ে তাকে গুলি খেতে হয়। রিভলবারের বুলেট বক্ষভেদ করে হৃৎপিণ্ডের পেরিকার্ডিয়ামে আঘাত হানে। তিনি মরতে মরতে বেঁচে যান।