গেরিলা অপারেশনের সুবিধার জন্য চট্টগ্রাম শহরকে বেশ কয়েকটা ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। মুজিববাহিনী চট্টগ্রাম শহর কেসি-১ (কর্ণফুলী কন্টিনজেন্ট) গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন আমার অগ্রজ ডা. মাহবুব। কোতোয়ালী এবং ডাবলমুরিং থানার আওতায় চট্টগ্রাম শহরতলী এলাকার গেরিলা অপারেশন আমার ভাইয়ের কমান্ডেই পরিচালিত হতো। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন বলে সবাই তাকে ডা. মাহবুব বলেই ডাকতেন। তাঁর দলে ১৪/১৫ জন সদস্য ছিল। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আমার সেজদা ষাটের দশকের তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা মো. বদিউল আলম, ডা. জাফরুল্লাহ (বর্তমানে নোয়াখালী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান), এনামুল হক দানু (চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা) প্রমুখ। এছাড়া বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আমার অগ্রজ মো. আলম এবং আমি নিজেও ওই তরুণ বয়সে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করেছিলাম।

তখন চট্টগ্রাম শহরের ঘাটফরহাবেগ খলিফাপট্টি এলাকার ‘খান বিল্ডিং’-এ ছিল সেজদার বাসা। আমি তখন সেজদার বাসায় থাকতাম। সময় পেলেই বাসায় ট্রানজিস্টারের ভলিউম কমিয়ে নিয়মিত স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনতাম। প্রিয় অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল বজ্রকন্ঠ, ছক্কু মিয়ার অনুষ্ঠান, চরমপত্র, জল্লাদের দরবার ইত্যাদি। এম. আর. আক্তার মুকুল ছিলেন চরমপত্রের কথক। এসব অনুষ্ঠান শুনে ভীষণ রকম উজ্জীবিত হতাম। মতে হতো মুক্তির দিন আর বেশি দূরে নেই।

সেজদার খলিফাপট্টির বাসাটি কেসি-১ দলের গেরিলা যোদ্ধাদের একটি গোপন শেল্টার ছিল, যেখানে গেরিলা আক্রমণের পরিকল্পনা করা হত। কেসি-১ দলের যোদ্ধারা আমাদের বাসায় যাতায়ত করতেন এবং এখানে বিশ্রাম নিতেন। সময় সময় দলীয় কমান্ডার ডা. মাহবুবের নির্দেশনায় সবাই মিলে চট্টগ্রাম শহরে গেরিলা আপারেশনের পরিকল্পনা করতেন। এই বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে রাখা ছিল গেরিলা দলের অস্ত্রসম্ভার। যেমন আটার টিনের মধ্যে লুকানো ছিল বিষ্ফোরক আর খাটের নিচে বইয়ের ট্রাঙ্কের পেছনে কাঠের বাক্সে ছিল গ্রেনেড, রিভলভার ও গুলি।

একাত্তরের একটি ঘটনার কথা এখন বলব, যেদিন আমাদের পরিবারের বেশ ক’জন সদস্য রাজাকারের হাতে শহীদ হয়ে যেতে পারতো।

আফতাব নামে সেজদার একজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তিনি প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন। একদিন তার সাথে দু’জন যুবককে আসতে দেখলাম। তাদের মধ্যে একজনের নাম হচ্ছে ওয়াহিদুল আলম, যিনি অন্যদের সাথে আমাদের বাসায় আসা যওয়া করত। পরে জানতে পারি এই ওয়াহিদ ছিল পাকিস্তানী বাহিনীর চর। সে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় যুবকদের আড্ডায় আনোগোনা করত এবং পাকিস্তানীদের খবর সরবরাহ করতো। কিছুদিনের মধ্যে ওয়াহিদের সন্দেহ হলো যে আমাদের কারও সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পৃক্ততা আছে। তখন ফজলুল কাদের চৌধুরীর গুডস্হিল পাহাড়ে ‘আল শামস’ বাহিনীর হেড কোয়ার্টার ছিল। আর নজির আহমদ চৌধুরী রোডে ইকবাল হোটেল ছিল তাদের টর্চার ক্যাম্প। তবে আল শামস বাহিনী গুডস্হিল পাহাড়েও শহরের যুবকদের ধরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করতো।

একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসের কথা। একদিন সন্ধ্যায় আমাদের বাসার দরজায় খুব জোরে ধাক্কার আওয়াজ পেলাম। আমার অন্য বড় ভাই চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র মো. আলম দরজা খুলে দিতেই ৩/৪ জন আল-শামস বাহিনীর সদস্য ও বিহারী ছেলে রাইফেল হাতে ঘরে ঢুকে সার্চ করা শুরু করল। আমার ভাই মো. আলমের পড়ার টেবিলের পাশে বইয়ের তাকে শরৎচন্দ্রে কয়েকটা উপন্যাস ছিল। বইগুলো দেখে একজন রাজাকার ভাঙা ভাঙা উর্দুতে বলল, একজন হিন্দুর লেখা বই কেন রেখেছো? ওগুলো ফেলে দিও। আমার ভাই মাথা নেড়ে সায় দিলেন। রাজকারকে দেখে মনে হলো বিহারীর ছেলে, বাংলা পড়তে পারে। তার মানে এদেশেই বড় হয়েছে। কিন্তু তাদের দোসর পাকিস্তানীদের উর্দু ভাষাটা এখনও রপ্ত করতে পারেনি।

রাজাকারেরা ঘরের প্রতিটি কক্ষে তল্লাশী চালায়। আটার টিনে লোহার রড দিয়ে খোঁচা দিয়ে দেখল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে কোনো কিছুর সন্ধান পেলো না। কি সৌভাগ্য! ঠিক এর কয়েকদিন আগেই বাড়িতে মজুত করা অস্ত্র-শস্ত্রগুলো গেরিলা যোদ্ধারা অপারেশনে ব্যবহার করার জন্য নিয়ে গিয়েছিল। না হলে সেদিন যে কি হতো একমাত্র খোদাই জানেন।

আমাদের বাসায় সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে রাজাকারের দল আমাদের পাশের বিল্ডিং-এ গেল। ওই বিল্ডিং-এর দোতলায় পরিবার নিয়ে থাকতেন আমাদের এক খালাতো ভাই। আর নিচের তলায় থাকতেন আমার সেজদারই দুই বন্ধু তাহের ও রাজ্জাক। সেজদা তখন ওই বিল্ডিংয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলেন। কাকতালীয়ভাবে সেজদার বন্ধু আফতাবও ওই সময় আড্ডায় হাজির হলেন। সেদিন আমার ভাই কমান্ডার ডা. মাহবুব আমার খালাতো ভাইয়ের বাসাতেই ছিলেন। রাজাকার বাহিনী আমার খালাতো ভাইয়ের বাসায় ঢুকে সার্চ শুরু করল।

ডা. মাহবুব মেডিকেল কলেজের একটি বই হাতে নিয়ে পড়ছিলেন। তার কোলের উপর ছিল রিভলবার। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বললেন, সামনে পরীক্ষা তাই পড়ছি। পরীক্ষার কথা বলতেই রাজাকারের কমান্ডার খুশি হয়ে তাকে আর ঘাটায়নি। ওই সময় ছাত্ররা পরীক্ষা ও ক্লাস বর্জন করছিল। তাই সামরিক জান্তা চাচ্ছিল ছাত্রসমাজ পরীক্ষা বর্জন না করে ক্লাসে আসুক। ভাগ্যিস তাকে রাজাকার বাহিনীর কেউ চিনতে পারেনি। উপরন্তু, রাজাকারেরা যদি তার দেহ তল্লাশী করত তাহলে অ্যাম্বুশ করা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। অতঃপর তারা নিচ তলায় গিয়ে আমার সেজদা ও তার দু’জন বন্ধুকে বুকের মধ্যে বেয়নট চেপে ধরে রাস্তায় দাঁড়ানো জিপের দিকে নিয়ে গেল।

আল শামস বাহিনীর কমান্ডারের ডাক নাম ছিল খোকা। খোকা তখন খোলা জিপেই বসে ছিল। আমার সেজদা ও তার দুই বন্ধুকে খোকার কাছে আনা হলো। ভাগ্যক্রমে সেজদার বন্ধু আফতাব খুব ভালো উর্দু বলতে পারতেন। খোকার সাথে আফতাব ভাইয়ের আগে থেকে একটু পরিচয়ও ছিল। সেই সুবাদে আফতাব ভাই খোকাকে বহুক্ষণ বুঝিয়ে সেজদা ও তার বন্ধুদের মুক্ত করে আনলেন। সেদিন আমরা সবাই যেভাবে রক্ষা পেলাম সেজন্য আল্লাহর কাছে এখনো শোকর আদায় করি।

পরে জানতে পারলাম, আল শামস বাহিনীকে খবর দিয়েছিল সেই ওয়াহিদ। এজন্যই আমাদের কে কোথায় এবং কোন বাড়িতে আছে তা রাজাকার বাহিনীর জানা ছিল। স্বাধীনতার পর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও রাজাকার ওয়াহিদকে পাওয়া যায়নি। নিয়তির কি পরিহাস! যে মানুষটি দেশ ও জাতির সাথে করল বেইমানী, পরবর্তীতে সেই ওয়াহিদুল আলম বিএনপিতে যোগ দিয়ে চিফ হুইপ ও সাংসদও হয়েছিল।