চূড়ান্ত বিজয়ের মাসখানেক আগে চাটগাঁ শহর ছেড়ে আমি কক্সবাজারে মা-বাবার কাছে চলে যাই। এসে দেখি কক্সবাজার বিমানবন্দর ভারতীয় বোমারু বিমানের ঘাঁয়ে অচল। পাকিস্তানী বাহিনী যাতে অপারেশনের জন্য বিমানবন্দর ব্যবহার করতে না পারে এজন্য রাতে ভারতীয় বিমানবাহিনী বোমা বর্ষণ করতো। আমাদের বাড়ির পেছনের উঠোনে মাঠি খুঁড়ে এল আকারের বড় ট্রেঞ্চ তৈরি করলাম সবাই মিলে। গভীর রাতে বোমারু বিমানের শব্দে যখন ঘুম ভেঙ্গে যেতো তখন সবাই দৌড়ে গিয় ট্রেঞ্চে ঢুকে পড়তাম। আমাদের বাড়ি বিমানবন্দরের এত কাছে ছিল যে বোমারু বিমান থেকে ফেলা বোমা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর বিদ্যুত ঝলকের মতো বিস্ফোরণের আলো চোখে এসে পড়ত। একদিন ট্রেঞ্চের পাশেই দেখলাম মোচড়ানো কাঁচা লোহার একটি টুকরো পড়ে আছে। বাবা উল্টে পাল্টে দেখে বললেন, এটা বোমা থেকে ছিট্কে আসা টুকরো। তিনি দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় জাপানী বোমা বর্ষণের পর একই ধরনের স্পিøন্টারের টুকরো দেখেছেন। এরপর চওড়া কাঠের ফলক দিয়ে আমাদের ট্রেঞ্চ ঢেকে দেয়া হল।
নভেম্বরের শেষের দিকে ভারতীয় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ আইএনএস বিক্রান্ত বঙ্গোপসাগরে নৌ অবরোধ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্দরে পাকিস্তানী নৌবাহিনীর যে কয়টা যুদ্ধজাহাজ ছিল তার সব ক’টাই আটকা পড়ে যায়। ডিসেম্বরের ৪ তারিখ ভারতের গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার আইএনএস রাজপুতের আঘাতে ৯৩ জন নাবিকসহ পাকিস্তানের একমাত্র সাবমেরিন পিএনএস গাজী বঙ্গোপসাগরে ডুবে যায়। ভারতের বিশাখাপত্তম পোতাশ্রয়ের অদূরেই এই ঘটনাটি ঘটে। এটা ছিল একাত্তরের নৌযুদ্ধের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। তবে গাজী সাবমেরিনের ডুবে যাওয়ার ঘটনাটি এখনো রহস্য দিয়ে ঘেরা। কারণ পাকিস্তানের তদন্তে বলা হয়, অভ্যন্তরে কোনো বিস্ফোরণ কিংবা সমুদ্রে সাবমেরিনের পাতানো কোনো মাইনের দুর্ঘটনামূলক বিস্ফোরণের জন্যই সাবমেরিন গাজী ডুবে যায়। তবে ঘটনা যাই হোক না কেন, ১৯৬৩ সালে আমেরিকা থেকে ভাড়া করা এই সাবমেরিন হারাবার পর পাকিস্তানী নৌবাহিনী আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। এছাড়া পাকিস্তানী নৌবাহিনীর সব বাঙালি অফিসার পক্ষত্যাগ করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে পাকিস্তানী ডেস্ট্রয়ার পিএসএস সিলেটসহ সব গানবোট ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ফলে পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানী নৌবাহিনীর আর কোনো অস্তিত্বই থাকে না।
মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণে পাকিস্তানী বাহিনী পূর্ব রণাঙ্গনে যখন পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে তখন নিশ্চিত পরাজয় ঠেকানোর জন্য মরিয়া হয়ে আমেরিকার দ্বারস্থ হয় পাকিস্তান। পশ্চিমা বিশ্ব এবং রাশিয়ার নের্তৃত্বে সোস্যালিস্ট ব্লকের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই তখন তুঙ্গে। এই ঠান্ডা লড়াইয়ের সমীকরণে পাকিস্তান ছিল পশ্চিমা বিশ্বের মিত্র আর ভারত ছিল বিপক্ষ শক্তি রাশিয়ার।
পাকিস্তানের ডাকে সাড়া দিয়ে একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট নিক্সন আমেরিকার ৭ম নৌবহর গালফ অফ টনকিন থেকে বঙ্গোসাগরের দিকে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই বহরে ছিল পারমাণবিক শক্তি চালিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ ইউএসএস এন্টারপ্রাণজ, যা ৭০টি বোমারু বিমান বহন করার সক্ষমতা রাখত। এছাড়া আরো ছিল বেশ ক’টি গাইডেড মিসাইল ক্রুজার এবং ডেস্ট্রয়ার। প্রায় একই সাথে আমেরিকার অন্যতম মিত্রদেশ ব্রিটেনের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ঈগল ভারতের পশ্চিম উপকূলের সমুদ্রসীমার দিকে এগুতে থাকে। এভাবে ব্রিটিশ নৌবাহিনী ভারতের পশ্চিম উপকূল এবং ৭ম নৌবহর বঙ্গোপসাগর দিয়ে পূর্ব উপকূল নিয়ন্ত্রণ করার প্ররিকল্পনা করে।
ওরা ভেবেছিল এতে ভারত ভীত হয়ে পিছু হটবে। কারণ দুই পরাশক্তির বিশাল নৌশক্তির বিরুদ্ধে লড়বার জন্য ভারতের ছিল আইএনএস বিক্রান্ত, যা কেবল ২০টি হালকা যুদ্ধবিমান বহন করছিল। এছাড়া এও শোনা যায়, পূর্ব পাকিস্তানে কোনঠাসা হয়ে থাকা প্রায় এক লক্ষ পাকিস্তানী সেনাদের কক্সবাজার থেকে উদ্ধার করারও পায়তারা করছিল ৭ম নৌবহর। ১৯৭০ সালে ভারত রাশিয়ার সাথে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তিমতে ভারত কোনো বহিঃশক্তি দ্বারা আক্রান্ত হলে রাশিয়া ভারতের পক্ষ হয়ে লড়বে। ঠিক এক বছর পরই এই প্রতিরক্ষা চুক্তি যে ভারতের ত্রাতা হিসাবে আবির্ভূত হবে তা হয়তো ভারতও আশা করেনি। এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য ভারত মিত্রদেশ রাশিয়ার সাহায্য চায় এবং দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর করার অনুরোধ জানায়।
ভারতের অনুরোধে সাড়া দিয়ে রাশিয়া আমেরিকা ও ব্রিটেনের সম্ভাব্য দ্বিমুখী আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য ১৩ ডিসেম্বর ভøাদিভোস্টক থেকে আনবিক ক্ষমতা সম্পন্ন নৌবহর পাঠায়। কিন্তু রাশিয়ার মিসাইলের পাল্লা ৩০০ কিলোমিটারের কম হওয়ায় দূর থেকে তারা আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজকে নিশানা নিতে পারছিল না। তাই রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজগুলো চরম ঝুঁকি নিয়ে আমেরিকা ও ব্রিটেনের নৌবহরকে বেশ কাছ থেকেই ঘিরে ফেলে। পুরো কাজটা রাশিয়া এমন কৌশলে এবং নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে যে পানিতে ভেসে উঠা রাশিয়ার সাবমেরিন দেখে যখন আমেরিকা ও ব্রিটেন বিষয়টি জানতে পারে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তারা বুঝতে পারে, ভারতের সমুদ্র সীমানায় যেতে হলে এখন রাশিয়ার একগাদা পারমাণবিক অস্ত্র সম্ভারে সজ্জিত ক্রুজার, ডেস্ট্রয়ার এবং সাবমেরিন ডিঙ্গিয়ে যেতে হবে। এভাবে রাশিয়া পাকিস্তানের মিত্রবাহিনীর পুরো পরিকল্পনাকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ব্যর্থ করে দেয়। ঘটনা বেগতিক দেখে অবশেষে ব্রিটিশ নৌবহর মাদাগাস্কারের দিকে উল্টো যাত্রা শুরু করে এবং আমেরিকার নৌবহর বঙ্গোপসাগরে ঢোকার আগেই ফিরে যায়। আরব সাগরের বুকে তিন পরাশক্তি রাশিয়া, আমেরিকা এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর শ্বাসরুদ্ধকর এই নিরব লড়াই একাত্তরের যুদ্ধের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
বিমানের বেমাবর্ষন দেখেছি কিন্তু যুদ্ধজাহাজ থেকে তেড়ে আসা গোলাবর্ষণ যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা আগে জানা ছিল না। ডিসম্বরের ১০ তারিখ হবে। বিকেলে কক্সবাজার শহরতলীর বড়বাজার থেকে বাসায় ফিরছি। বাসার কাছাকাছি আসতেই দেখি বিকট গর্জন করে মাথার উপর দিয়ে লালচে গোলা উড়ে যাচ্ছে বড়বাজারের দিকে। একের পর এক ছুটছে গোলা। প্রচন্ড শব্দে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। পথচারীরা আতঙ্কে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছিল। কি হচ্ছে ঠিক বুঝা যাচ্ছিল না। আশেপাশের অনেকের মতো আমিও কানে আঙ্গুল দিয়ে রাস্তার পাশের ঢালু দিকটায় শুয়ে পড়লাম। গোলার গর্জনে যেভাবে মাটি কেঁপে কেঁপে উঠছিল তাতে মনে হলো যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। উপরের আকাশটা কেমন লাল বর্ণ ধারণ করেছিল। প্রায় আধঘন্টা ধরে চলল এই লঙ্কাকাণ্ড। গোলাবর্ষণ শেষ হবার পর বাসার দিকে ছুটলাম। মা-বাবা তো চিন্তায় অস্থির। পরে জানতে পারলাম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের অদূরেই নোঙর করেছে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ বিক্রান্ত। এই জাহাজের কামান থেকেই বর্ষিত হচ্ছিল গোলা। কিছুদিন ধরে আকাশ থেকে যে বোমা বর্ষিত হচ্ছিল সেগুলোও যুদ্ধজাহাজ বিক্রান্ত থেকে উড়ে আসা বোমারু বিমানেরই কারসাজি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পশ্চাদপসরণরত পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যাতে কক্সবাজারের সৈকত দিয়ে পালাতে না পারে সেজন্যই এই গোলাবর্ষণ।
যাই হোক, এর কয়েকদিন পর সম্ভবত ১৬ ডিসেম্বর রাতে ভারতীয় মেরিন সেনারা যুদ্ধজাহাজ থেকে কক্সবাজার শহরে ঢুকে পড়ে এবং কক্সবাজার হিলটপ সার্কিট হাউজে অবস্থান নেয়।
অনেক রক্তপাত, ত্যাগ ও তিতিক্ষার পর দেশ স্বাধীন হয় একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। চূড়ান্ত বিজয়ের সেই দিনটির অনুভূতি ঠিক লিখে প্রকাশ করতে পারবো না। সে কি উল্লাস চারিদিকে! মনে হচ্ছিল বুকের যে অংশে একটা তীব্র ব্যথা ছিল তা কর্পুরের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, মগজের মধ্যে তীব্র ঘৃণার যে কীট লালন করছিলাম তার দংশন বন্ধ হয়ে গেছে। ওইদিনই আমরা সবাই ছুটে গেলাম কক্সবাজার বিমানবন্দরে। দেখি বিমানবন্দরের রানওয়েতে বোমার আঘাতে তৈরি হয়েছে বিশাল সব গর্ত। যেন ছোটোখাটো পুকুর। কোনো কোনো গর্ত ভরে আছে পানিতে। বিমানবন্দরের একটি কক্ষকে রাজাকার বাহিনী বানিয়েছিল টর্চার সেল। রুমের ভিতর গিয়ে শিউরে উঠলাম। দেয়ালে, মেঝেতে ছোপ ছোপ রক্ত আর চারিদিক গুলির চিহ্ন। সাগর পাড়ে গিয়ে দেখলাম নোঙর করে আছে দানবাকৃতির যুদ্ধজাহাজ বিক্রান্ত।
১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে বাবাকে দেখতাম রেডিওর পাশে বসে মনোযোগ দিয়ে যেসব দেশ বাংলাদেশেকে স্বীকৃতি দিচ্ছে তার একটি তালিকা তৈরি করতে। সেই তালিকায় নতুন কোনো দেশের নাম যোগ হলে সঙ্গে সঙ্গে উচ্চস্বরে তিনি বাড়ির সবাইে ক ডেকে জানিয়ে দিতেন। তখন আমেরিকার ৭ম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে হানা দিতে পারে শোনা যাচ্ছিল। এ নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন বাবা। আমাদের বললেন, দেখিস আমেরিকা স্বীকৃতি দিলে পাকিস্তান আমাদের আর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
জানুয়ারির প্রথম দিকে কেসি-১ গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কক্সবাজার আসেন বিবিসির বিখ্যাত সাংবদিক মার্ক টালি। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে মার্ক টালি ছিলেন বিশ্ববাসীর কাছে রণাঙ্গনের খবর জানানো একমাত্র অবলম্বন। রেডিওতে কান পেতে তাঁর কন্ঠস্বর শোনার অপেক্ষায় থাকতো পুরো জাতি। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। কক্সবাজার সৈকতের ঝাউবনে মার্ক টালি এবং মুজিবাহিনীর বিজয়ী সেনাদের সাথে নিয়ে ছবি তোলার এক বিরল সুযোগ হয়, যা এখনো আমাকে আলোড়িত করে।
