একাত্তরের ডিসেম্বরে বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল লাল-সবুজ পতাকার দেশ বাংলাদেশ। তবে এ কথা মানতেই হবে, স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পরও মুক্তির ফসল আমরা মানুষের ঘরে তুলে দিতে পারিনি। বিশেষ করে যে তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনতা দেখেনি তাদের আমরা শোনাতে পারিনি স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস, স্বাধীনতার শুদ্ধ চেতনায় আলোকিত করতে পারছি না তাদের ভেতরটা। এই ব্যর্থতা আমাদের সবার।
পাকিস্তানের আধিপত্য থেকে আমাদের মুক্তি কেবল নয় মাসের যুদ্ধেই অর্জিত হয়নি। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাগের পর থেকে নানা ধাপ পেরিয়ে আমরা লাভ করেছি আমাদের হাজার বছরের প্রত্যাশিত স্বাধীনতা। নতুন প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে, আজকের এই স্বাধীনতা যদি না আসতো, তাহলে আমাদের মুখের ভাষা হয়তো হতো র্উদু, জাতীয় কবির আসনে কবি নজরুলের বদলে আসীন হতো ইকবাল; লাল সবুজের জার্সি পরা এক ঝাঁক ক্রিকেটারদের দেখা যেতো না বিশ্বকাপ ক্রিকেট মঞ্চে। শুধু কি তাই? আজ এক কোটির মতো বাংলাদেশী নাগরিক প্রবাস থেকে দেশে পাঠাচ্ছেন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা, যা আমাদের অর্থনীতিকে উজ্জীবিত রেখেছে। দশ হাজারেরও বেশি সামরিক বাহিনীর সদস্য জাতিসংঘের শান্তি মিশনে কাজ করে দেশের সুনাম কুড়াচ্ছেন। দেশ স্বাধীন না হলে শান্তি মিশন তো দূরে থাক, ভাগ্যের সন্ধানে বাঙালিদের এই হারে প্রবাস যাওয়া কখনোই সম্ভব হতো না।
বাংলাদেশ তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা অধ্যুষিত অঞ্চল হলেও শাসনক্ষমতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাতে। ফলে বাঙালিরা চরম জাতিগত বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়। উর্দুভাষী পাঞ্জাবী অফিসাররা সেনাবাহিনী ও প্রশাসন যন্ত্রের শীর্ষে আসীন হয়ে বাংলাদেশকে একটি উপনিবেশের মতো শাসন করে যাচ্ছিল। ওদের মুখে হরহামেশা শোনা যেতো, ‘বাঙালিরা কেবল একটি ভাষাই বোঝে, আর তা হল লাঠির ভাষা।’ আমাদের বলা হতো পাঞ্জাবী ও বাঙালি হলো ভাই ভাই। অথচ বাঙালির সাথে তথাকথিত ভাইদের মনিব-ভৃত্যের মতো আচরণ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বেনিয়াদেরও হার মানিয়ে দিয়েছিল।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছে বরারবই। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শতকরা ৭০% আসতো বাংলাদেশ সোনালি আঁশ পাট ও চা রপ্তানি করে। অথচ দেশের বাজেটের মোটা অংশ পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নের জন্যই ব্যয় করা হতো। পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এই দুই দশকে পুরো বাজেটের মাত্র ২৮.৩ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের মোট এগারোটি টেক্সটাইল কারখানার মধ্যে নয়টি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ১৯৭১ সালে কারখানার মোট সংখ্যা বেড়ে ১৭৬টি হলেও তার মধ্যে মাত্র ২৬টি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচারকৃত সম্পদের পরিমাণ ছিল আজকের হিসাবে প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
স্বতস্ত্র দেশ হিসাবে পাকিস্তানের যাত্রার শুরুতেই ছিল গলদ। পার্লামেন্ট, সরকারি মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অফিস ইত্যাদি সবকিছুই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক। কেন্দ্রীয় সরকারের রাজধানী সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের শহর ঢাকার বদলে করা হলো করাচি। ফলে সরকারি ও সামরিক বাহিনীর চাকরিতে সুযোগ সুবিধা পেতো উর্দুভাষী পশ্চিম পাকিস্তানীরা। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যেও অবাঙালি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বিস্তার করে নিয়েছিল।
সরকারি প্রশাসনে বাঙালিদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠার পর যে সব অফিসার মূলতঃ দেশ শাসন করছিলেন তাদের সবাই ছিলেন অবাঙালি। পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি ৭৪১ জন সিনিয়র সিএসপি অফিসারদের মধ্যে মাত্র ৫১ জন ছিলেন বাঙালি। তবে বাঙালি কোনো অফিসার সচিব পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন না। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের ২১ জন সচিবের মধ্যে মাত্র তিনজন ছিলেন বাঙালি। অন্যদিকে পকিস্তানের সরকারি মন্ত্রনালয়ের বাঙালি কর্মচারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ কণাংশ।
সেনাবাহিনীতেও বাঙালিদের প্রনিধিতিত্ব ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অধিকাংশ বাঙালিকে সামরিক বাহিনীর টেকনিক্যাল এবং প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার সময় পাকিস্তান সেনাবহিনীর ৩৫ জন সিনিয়র জেনারেলের মধ্যে কেবল একজন ছিলেন বাঙালি। অন্যান্য অফিসার পদে মাত্র ৫% ছিলেন বাঙালি। এর কারণ হিসাবে বলা হতো, পাঠান কিংবা পাঞ্জাবীদের মতো সেনাবাহিনীতে কাজ করার মতো শৌর্য-বীর্য নাকি বাঙালিদের নেই। জাতি হিসাবে আমাদের জন্য এটা ছিল অত্যন্ত অপমানজনক। এছাড়া পূর্ব পাকিস্তান থেকে খাজা নাজিমুদ্দীন, মোহাম্মদ আলী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো যেসব রাজনীতিবিদ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তাদের কোনো না কোনো অজুহাতে খুব কম সময়ের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।
একাত্তরের পঁচিশে মার্চ থেকে ডিসেম্বরে বিজয়ের আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ২৬৭ দিনে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে হত্যাযজ্ঞ চালায় তা ইতিহাসের ঘৃণিত হত্যাকাণ্ডগুলির মধ্যে অন্যতম। বাঙালি নারীদের ওপর চালানো হয়েছিল যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ। যা কেবল চীনের নানজিংয়ে জাপানী বাহিনীর নৃশংসতার সাথেই তুলনা করা চলে। তাই আমরা যারা খুব কাছ থেকে পাকিস্তানী শাসকদের বৈষম্য দেখেছি, স্বাধীনতা দেখেছি, মুক্তির জন্য লড়াই করেছি, দেখেছি পঁচিশে মার্চের ভয়াল রাতের নৃশংসতা, তাদের কাছে স্বাধীনতার কোনো বিকল্প ছিল না।
তবে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর শোষন ও বর্ণবাদী নিপীড়নের কাছে হার মানেনি বাঙালি জাতি, রুখে দাঁড়িয়েছিল সবাই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। অবশেষে দীর্ঘদিনের প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালে ঢাকার রাজপথে। ভাষার দাবিতে রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দেয় কিছু অকুতোভয় তরুণ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মাধমেই যে বাঙালি চেতনার জাগরণ ঘটে, তা বেগবান হয়ে ১৯৬৬ সালে স্বায়ত্বশাসনের ৬ দফা কর্মসূচীতে রূপ নেয়। এই কর্মসূচীই দেশের আপামর জনতার মধ্যে জাগরণ ঘটিয়ে স্বাধীনতাকে অনিবার্য করে তোলে। লক্ষ্যণীয়, বায়ান্ন থেকে একাত্তরের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম এবং ছাত্রসমাজ। তাই দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনের নেতৃত্ব আজকের প্রজন্মকেই দিতে হবে।
এক অপার সম্ভাবনার দেশ হচ্ছে আমাদের এই বাংলাদেশ। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের স্বদেশের অর্জন খাটো করে দেখার মতো নয়। গত কুড়ি বছরে বাংলাদেশে মানবকল্যাণ ও সমৃদ্ধির প্রতিটি সূচকের যে ধরনের উন্নতি হয়েছে তা বিশ্বে নজিরবিহীন। আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও মানবকল্যাণের ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বের নব্য সুপারপাওয়ার ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্জন কেবল উনিশ শতকের শেষের দিকে জাপানের মেইজী সম্রাটের সময়কার অগ্রগতির সাথেই তুলনা করা চলে। দারিদ্রতা কমে গেছে। ২০০৪ সালে যেখানে বাংলাদেশের ৪৫ শতাংশ বেশি মানুষ ছিল দরিদ্রসীমার নিচে, তা এখন কমে ২৬ কণাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছাড়িয়ে গেছে ৩০ বিলিয়ন ডলার।
বায়ান্ন থেকে একাত্তরের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম এবং ছাত্রসমাজ। মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম এখন বিগতপ্রায়। দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং যে বাংলাদেশে তারা বাস করতে চায় তা অর্জনের জন্য আন্দোলনের নেতৃত্ব আজকের প্রজন্মকেই দিতে হবে এবং দেশের মানুষকে সাথে করে খুঁজে বের করতে হবে উত্তরণের পথ। তবে এজন্য আজকের প্রজন্মকে বিজয়ের প্রকুত চেতনা বুকে ধারণ করতে হবে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কেউ জীবন বাজি রেখে, কেউবা জীবন দিয়ে দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিয়ে গেছেন। ইদানিং দেখছি ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেশপ্রেমের মহড়া দিতে চাচ্ছে অনেকে। একবার ১৬ ডিসেম্বর অর্থাৎ বিজয় দিবসে ফেসবুক প্রোফাইলে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার ছবি আপলোড করার অনুরোধ জানিয়ে ইনবক্সে একটি বার্তা পাচ্ছিলাম বার বার। উদ্দেশ্য, ফেসবুকে প্রোফাইলে বিশ্ব রেকর্ড করা। এভাবে নাকি বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নাম এবং স্বদেশের প্রতি বাঙালিদের ভালোবাসার কথা তুলে ধরা হবে। বার্তাটি পড়তে গিয়ে ভীষণ হোঁচট খেলাম। যারা এই বার্তাটি পাঠাচ্ছিলেন তারা কি পাঠাবার আগে লেখাটি একবার ভালো করে পড়েও দেখেননি? বিশ্বের দরবারে দেশের নাম উজ্জ্বল করার কথা বলা হচ্ছে অথচ সেই বার্তার প্রতি বাক্যে দেখলাম বানান ভুল, বাক্য গঠনে ত্রুটি, ইংরেজি বাংলা ব্যবহারসহ মধ্যম পুরুষের সর্বনামের বিভিন্ন রূপের অবাধ সংমিশ্রন।
১৯৫২ সালে ভাষার জন্য রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েই শুরু হয়েছিল আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা অর্জনের পথচলা। আজ সেই বাংলা ভাষার ঘাড় মটকিয়ে দেশপ্রেম প্রদর্শনের যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে তা শঙ্কিত করছে। ফেসবুকে বিশ্ব রেকর্ড করে দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যায় না। সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হতে হলে, বিজয়ের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করতে হলে আমাদের সবার জীবনে প্রাণের ভাষা বাংলা শুদ্ধভাবে লিখতে, পড়তে ও বলতে জানতে হবে। তবেই জাতীয় উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।
