জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী সর্বনাশা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে চলেছে। বিশ্বের নেতৃবৃন্দ যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য চূড়ান্ত ব্যবস্থা না নেন তাহলে আগামী একুশ শতকের মধ্যে পরিস্থিতি আপরিবর্তনীয় দশায় চলে যাবে যেখান থেকে আর ফেরার কোনো পথ থাকবে না।
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার পরিষদ (আইপিসিসি) কিছুদিন পর পর বিশ্ব জলবায়ুর বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের পূর্বাভাষ নিয়ে গবেষণা রিপোর্ট বের করে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের জলবায়ু সংক্রান্ত প্রায় ৯০০০ গবেষণালব্ধ ফলাফল সঙ্কলন করে প্রকাশিত হয়েছে পঞ্চম মূল্যায়ন রিপোর্ট (এআর৫)। এই রিপোর্টে প্রকাশিত জলবায়ু মডেলের হিসাব অনুযায়ী ২০ শতকে বিশ্বের বায়ু এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ০.৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেড়েছে, আর ২১০০ সালের মধ্যে পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে ৪.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এসে দাঁড়াবে। ২০২২ সালে এই রিপোর্টের ষষ্ঠ সংস্করণ বের হবার কথা।
শিল্পবিপ্লবের পরই মূলতঃ বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বাড়তে থাকে। ক্ষতিকর গ্রিনহাউস এই গ্যাসগুলো হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লোরোকার্বন, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি। বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসসমূহের মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ফলে সূর্য থেকে যে তাপ পৃথিবীতে আসে তার কিছু আর ফিরে যেতে পারে না, যার কারণে পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা না গেলে, বিশ্বে পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় অবশ্যাম্ভাবী।
এ বছর কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ হচ্ছে ৩৯৬ পিপিএম যা গতবছরের চেয়ে ২.৯ পিপিএম বেশি। নেদারল্যান্ড পরিবেশ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বন নির্গমনের হার ২.৯ শতাংশ বেড়ে গিয়ে এ বছর রেকর্ড ৩৫ গিগাটনে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে বৈশ্বিক নিঃসরণের অর্ধেকের চেয়ে বেশি আসছে অর্থনৈতিক পাওয়ারহাউস যেমন চীন (২৯%), আমেরিকা (১৬%) এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (১১%) থেকে। এভাবে অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদির নির্গমনের পরিমাণ আগের মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য একদিকে সমুদ্রের পানির যেমন তাপগত স্ফীতি ঘটছে তেমনি আবার পর্বতের বরফ শীর্ষ, গ্রিনল্যান্ড এবং এন্টার্কটিকার বরফ গলনের ফলে সমুদ্রস্তরের উচ্চতাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। বায়ুমন্ডলে যে কার্বন নিঃসরণ হয় তার একতৃতীয়াংশ সমুদ্রের পানি শুষে নেয়। কিন্তু উষ্ণতা বেড়ে যাবার ফলে সমুদ্রের পানির গ্যাস ধারণ করার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে যে সব কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস পানিতে দ্রবীভূত ছিল তা আবারো বায়ুমন্ডলে ফিরে আসছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রিনল্যান্ডের সব বরফ যদি গলে যায় তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬ মিটার বেড়ে যাবে। কি ভয়ানক কথা! আইপিসিসি’র নতুন জলবায়ু মডেলের হিসাবমতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০০৭ সালের হিসাবের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি হারে বেড়ে চলেছে। এইভাবে চললে এই শতকের শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সর্বোচ্চ ১ মিটার পর্যন্ত বাড়বে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক কথা হলো, কার্বন নিঃসরণ এই মুহূর্তে পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেও এ পর্যন্ত যে পরিমাণ কার্বন বায়ুমন্ডলে নির্গত হয়েছে তার প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অগামী কয়েক শতাব্দী ধরে বেড়েই চলবে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী মতে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা যদি ১ মিটার বাড়ে তাহলে ২১ শতকের সমাপ্তিকালের মধ্যে মালদ্বীপ, পাপুয়া নিউগিনি, বার্বাডোজ, কিরিবাতিসহ প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দ্বীপপুঞ্জ পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। ডুবে যাবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের সমুদ্র উপকুলবর্তী নীচু এলাকা। মালদ্বীপ হলো ছোট ছোট কোরাল দ্বীপপুঞ্জের সমন্বয়ে গঠিত একটি দেশ, যার অধিকাংশ ভূমি সমৃদ্রতল থেকে মাত্র ১.৫ মিটার উপরে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংস্থার মতে, সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় মালদ্বীপের অধীন ১২০০ দ্বীপ ডুবে যাবে, গৃহহীন হবে ৪ লক্ষ মানুষ। ২০০৯ সালে মালদ্বীপের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশীদ বৈরী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তার দেশের ওপর যে সর্বনাশা দুর্যোগ ধেয়ে আসছে সেদিকে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সমুদ্রের প্রায় ৫ মিটার নিচে একটি ক্যাবিনেট মিটিংয়ের আয়োজন করে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
মালদ্বীপের চেয়ে কোনো অংশেই কম ঝুঁকির মধ্যে নেই বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলভাগ। সমুদ্রপৃষ্ঠের স্ফীতি ফলে লোনাপানি উপকূলীয় এলাকার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কৃষিজমি ও মিঠাপানির প্রাণী ও উদ্ভিদ ধ্বংস করে ফেলবে। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের তাপমাত্রা ১.৫০ থেকে ২.০০ সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ফলে বাষ্পীভবনের হার বেড়ে গিয়ে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাবে; বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে।
পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী বৈরী প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় কখনো বেশি শীত আবার কখনো কম, কখনো মাত্রাধিক গরম, কখনো তুমুল বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে সব। রাশিয়াতে ভয়ংকার দাবদাহ, নাইজেরিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা আঘাত হেনেছে। সিডর-আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ইউরোপও ব্যাপক বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। আমেরিকায় আঘাত হেনেছে হ্যারিকেন স্যান্ডি। আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য প্রচন্ড খরায় আক্রান্ত হচ্ছে যা গত ১০০ বছরে কখনো দেখা যায়নি। ২০১২ সাল আমেরিকার ইতহিাসের সবচেয় উষ্ণ বছর হিসাবে গন্য করা হচ্ছে। এ বছরের গ্রীষ্ম ছিল ব্রিটেনের সবচেয়ে জলসিক্ত। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বেড়ে যাবার ফলে অর্থনীতি এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের দুর্ভোগ, দারিদ্রতা এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় রোগসমূহ যেমন ম্যালেরিয়া এবং কলেরার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছরে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশ্বজুড়ে ক্ষতির পরিমাণ হল আনুমানিক ২০০০ বিলিয়ন ডলার!
প্রতিবছর জলবায়ু সম্মেলন হচ্ছে কিন্তু তাতে শিল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো মধ্যে মতবিরোধের কোনো সুরাহা হয়নি। আর্ন্তজাতিক মুদ্রা তহবিলের পরিসংখ্যান মতে চীনের অর্থনীতি এখন আমেরিকাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে শীর্ষস্থান দখল করলেও কার্বন দূষণকারী দেশের তালিকারও র্শীষে রয়েছে চীন। তাই কার্বন দূষণ নিরসনে তাদের দায়-দায়িত্ব আর খাটো করে দেখার মতো নয়। তবে চীন, ভারত, ব্রাজিলসহ অন্যান্য কিছু দেশ যুক্তি দিচ্ছে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধির উচ্চহার সত্ত্বেও তাদের জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ এখনো দ্ররিদ্রসীমার নিচে বাস করছে। তাই কার্বন নিঃসরণ কমানোর সিদ্ধান্ত নিলে ওই দেশের অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বেইজিংসহ চীনের বেশ কিছু শহরে বায়ু দূষণ এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে সেই শহরগুলো প্রায় ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। বায়ু দূষণের কারণে মহাসড়ক বন্ধ, এমনকি ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা হরহামেশা ঘটছে। বায়ু দূষণের কারণে চীনে বছরে আনুমানিক ১২ লক্ষ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে এবং এই একই কারণে চীনের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৬ বছর কমে গেছে।
তবে নভেম্বরের এপেক সম্মেলনকে সামনে রেখে চীন পরিবেশ দূষণ প্রশমনের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে। এই সম্মেলনে আসছেন ওবামা, পুতিন ও সিনজো আবেসহ অন্যান্য অনেক নেতবৃন্দ। বিশ্বকে ধোঁয়াশাবিহীন পরিচ্ছন্ন বেইজিং উপহার দেয়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। মানুষকে গাড়ি বাসায় রেখে গণপরিবহনে যাতায়াত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বেইজিং শহরের আশেপাশের অনেক ফ্যাক্টরি, শিল্প প্রতিষ্ঠান বেশ কিছুদিনে জন্য বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এমনকি আকাশে সিলভার আয়োডাইড স্প্রে করে কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টিপাত ঘটানোর কথাও ভাবছে কর্তৃপক্ষ।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত কি পরিমাণ বাড়বে তার নির্ভুল হিসাব কোনো বৈজ্ঞানিক মডেল দিয়ে বের করা সম্ভব নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন যে খারাপের দিকে যাচ্ছে তাতে আর দ্বিমত থাকার অবকাশ নেই। তাই জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে কোনা পার্থক্য না রেখে সবাইকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে হবে।
পরিবেশবান্ধব পৃথিবী নির্মাণের মূল অন্তরায় হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। তবে দেশের আম-জনতার মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি করতে পারলে বায়ুমন্ডলে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন রোধ করার জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা যাবে। সম্প্রতি নিউইয়র্র্ক শহরে হয়ে গেল একটি ভিন্ন ধরনের পথ সমাবেশ ‘পিউপল্স ক্লাইমেট মার্চ’। এতে লিওনার্ডো ডিকেপ্রিওর মতো সেলিব্রেটিসহ সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ অংশ নেন এবং কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করার জন্য স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তোলে নিউইয়র্ক শহরের রাজপথ। একইভাবে লন্ডন, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরের আয়োজিত হয়েছে জলবায়ু রোড মার্চ।
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে যে বৈরী জলবায়ু তৈরি হচ্ছে তাতে বিশ্বের উন্নয়ন এবং মানবজাতির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন এখন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলেও পৃথিবীর জলবায়ুকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া আর সম্ভব নয়। যে পৃথিবীতে আমরা বসবাস করছি তার পরিচর্যার দায়িত্বও আমাদের। তাই সময় থাকতে সচেতন না হলে আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী একদিন দানব হয়ে আমাদেরকেই গ্রাস করবে।
