বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও মৌলিক পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে আমার তেমন একটা কৌতূহল ছিল না। তবে আশির দশকের শেষের দিকে বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং-এর লেখা The Brief History of Time বইটি পড়ার পর আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, মহাবিশ্বের উৎপত্তি ইত্যাদি সম্পর্কে প্রচুর আগ্রহ জন্মে। এই বিষয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের লেখা বইপত্র পড়তে গিয়ে কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত একটি বই চোখে পড়ে। বইটি হল The Ultimate Fate of the Universe (১৯৮৩), লেখক হলেন বাঙালি বিজ্ঞানী অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম। ফ্রিম্যান ডাইসন, স্টিফেন হকিং, পেনরোজ-এর মতো জগৎখ্যাত বিজ্ঞানীদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের কোনো বিজ্ঞানীও গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞান এবং সৃষ্টিতত্ত্বের মতো জটিল বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে পারেন, তা জেনে বিস্মিত হয়েছি। দেখি, কেম্ব্রিজের বিখ্যাত প্রকাশনা থেকে বেরিয়েছে তাঁর আরো দুটো বই Rotating Fields in General Relativity (১৯৮৫), An Introduction to Mathematical Cosmology (১৯৯২)। শুধু তাই নয়, জানতে পারলাম বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের বেশ আগেই তিনি সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেন এবং এ নিয়ে তাত্ত্বিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তাঁর বন্ধু তালিকায় ছিল ব্রায়ান জোসেফসন, ডাইসন, রিচার্ড ফাইনমেন, আব্দুস সালাম, স্টিফেন হকিং এবং জয়ন্ত নারলিকরের মতো দুনিয়া কাঁপানো বিজ্ঞানীরা।
তাঁর লেখা বই পড়তে গিয়ে একদিকে যেমন গর্বে ফুলে উঠছিল বুক, তেমনি আবার নিজেকে ধিক্কার দিয়েছি দেশবরেণ্য মানুষটি সম্পর্কে জানতে এত দেরি হয়ে গেল বলে। এত বড় মাপের কাজ করেছেন অথচ বিশ্বের একজন আরাধ্য বিজ্ঞানীকে নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় বাংলাদেশী মিডিয়ার নির্লিপ্ততা কাঁটা হয়ে বিঁধছিল বুকে। জাতি হিসাবে গুণী মানুষদের সম্মান দিতে আমাদের কৃপণতার যেন জুড়ি নেই।
২০০০ সালে তিনি একুশে পদক পেয়েছিলেন। অথচ এর অনেক আগে তাঁর অনেক ছাত্র পর্যন্ত এই পুরস্কার পেয়ে গিয়েছিল। জানা যায়, তৎকালীন তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা জেনারেল নুরুদ্দীন বিদেশের এক কনফারেন্সে অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামকে বহু নোবেলবিজয়ী বিজ্ঞানীদের সাথে নিবিড়ভাবে মিশতে দেখে জানতে চান, কেন জামাল নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন না? জেনারেল নুরুদ্দীন দেশে ফিরে এসেই একুশে পদকের প্রার্থী হিসাবে ড. ইসলামের নাম প্রস্তাব করেন। যার ফলশ্রুতিতে আর কালক্ষেপন না করে তাঁকে একুশে পদক দেয়া হয়।
ড. জামাল নজরুল ইসলামের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার ফুফাতো ভাই। তার বাবা খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম ছিলেন বিচার বিভাগীয় একজন মুন্সেফ। মা রাহাত আরা ছিলেন উর্দু ভাষার কবি, যিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটিকাটি সফলভাবে উর্দুতে অনুবাদ করেছিলেন।
স্কুলজীবনের কিছুটা সময় তাঁর কাটে কলকাতার মডেল স্কুল এবং চট্টগ্রাম কলিজিয়েট স্কুলে। পাকিস্তানের মারীর লরেন্স কলেজ থেকে তিনি ও লেভেল এবং এ লেভেল পাশ করেন। এরপর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে গণিতে বিএসসি অনার্স করে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যারয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করেন ১৯৬০ সালে। অতঃপর বিশ্ব গণিতের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হিসাবে খ্যাত Mathematical Tripos শেষ করে কেমব্রিজ ট্রিনিটি কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে পিএইচডি এবং পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে ডি.এস.সি. ডিগ্রি অর্জন করেন।।
অধ্যাপক ইসলামের পিএইচডি গবেষণা ছিল পার্টিক্যাল ফিজিক্স বা তাত্ত্বিক কণার ওপর। পরবর্তীতে তিনি আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, কনফর্মাল মহাকর্ষ তত্ত্ব, কোয়ান্টা ক্ষেত্র তত্ত্ব এবং কসমোলজি নিয়েও কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের শ্রোডিঞ্জার সমীকরণের আধুনিকায়নেও বিখ্যাত কাজ করে গেছেন।
আজকের প্রচলিত তত্ত্ব মতে মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) পর জন্মলগ্ন থেকে এই মহাবিশ্ব ক্রমশঃ বেলুনের মতো প্রসারিত হচ্ছে। তবে অনেকের ধারণা, এই প্রসারণ এক সময় শেষ হবে এবং মহাবিশ্ব ক্রমশ চুপসাতে থাকবে, যাকে বলা হচ্ছে (Big Crunch)। এছাড়া ২০০৩ সালে রবার্ট ক্যাডওয়েল উত্থাপন করেছেন মহাচ্ছেদন (Big Rip) তত্ত্ব। ১৯৭৬ সালে মহাবিশ্বের ভবিষ্যত বা অন্তিম পরিণতি নিয়ে ড. জামাল নজরুল একটি প্রবন্ধ The Royal Astronomical Society ত্রৈমাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ড. জামাল নজরুল মহাবিশ্ব যে সব সময় প্রসারিত হবে সেরকম একটি ধারণার কথা বলেন যা বিজ্ঞানবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি অংক কষে দেখান, আগামী ১০০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে আমাদের গ্যালাক্সি অর্থাৎ মিল্কিওয়ের সব তারার মৃত্যু হবে। হাবল টেলিস্কোপের বদান্যতায় এখন এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা যেমন সহজ, কিন্তু আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে বিশ্বের অন্তিম পরিণতি নিয়ে তাঁর ভাবীকথন ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা একটা যুগান্তকারী ব্যাপার ছিল।
জামাল নজরুলের লেখাটি ওই সময়ের বিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞানী কল্পকাহিনী লেখকদের প্রভাবিত করে। তাঁর গবেষণা প্রবন্ধটি পড়ে কৌতূহলী হয়ে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রিম্যান ডাইসন লিখলেন Time without end : Physics and biology in an open universe নামের বই।
পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধটির বিষয়ন্তু নিয়ে The Ultimate Fate of the Universe শিরোনামে ড. ইসলাম একটি বই লিখেন। ওই সময় বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন যে এই মহাবিশ^ ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু এমন একটি সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি কী হতে পারে সেটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ড. জামাল নজরুল ইসলামই প্রথম এ নিয়ে কাজ করেন এবং তাঁর বইয়ে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি কী হতে পারে সে নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত এই বইটি তাঁকে রীতিমতো সেলিব্রেটি বানিয়ে দেয়। ফরাসী, ইটালিয়, জার্মান, পর্তুগীজ, সার্ব, ক্রোয়েটসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এই বই।
বিজ্ঞানী আইনস্টাইন সম্প্রসারণশীল বিশ্ব তত্ত্বের বিপক্ষে ছিলেন। তিনি এমন একটি মহাবিশ্বের কথা ভেবেছিলেন যা সময়ের সাথে আকারে বাড়েও না, কমেও না। তাই মহাবিশ্বকে স্থিতিশীল রাখার জন্য তাঁর মহাকর্ষীয় গাণিতিক সমীকরণে তিনি একটি কাল্পনিক ধ্রুবক (লামডা) যোগ করেছিলেন। কিন্তু ১৯২২ সালে বিজ্ঞানী আলফ্রেড ফ্রিডম্যান মহাকর্ষীয় ধ্রুবক ছাড়াই সম্প্রসারণশীল এবং সংকোচনশীল মহাবিশ্বের মডেল তৈরি করে দেখান। পরবর্তীতে ১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবল দেখালেন যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল। বিজ্ঞানী জামাল নজরুল লামডা নিয়েও কাজ করেছেন এবং এর একটা সর্বোচ্চ মান (Upper limit) নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে এই ধ্রুবকটির মান প্রতি বর্গমিটারে ১০-৫০ এর কম হবে। তবে বর্তমান পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী লামডার মান ১০-৫২ বলে ধরা হয়।
গ্রহ-নক্ষত্রগুলো একই সরলরেখা বরাবর চলে আসবে বলে ২০০১ সালে গুজব রটেছিল যে বিশ্ব ধ্বংস হতে চলেছে। এতে সারা বিশ্বে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু জামাল নজরুল ইসলাম সংখ্যাতাত্বিক গণিতের মাধ্যমে দেখান যে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী গ্রহ-নক্ষত্রগুলো একই সরল রেখায় চলে আসছে। এতে আশংকার কিছু নেই।
ড. ইসলাম মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা ও উচ্চতর গবেষণা সমর্থন করতেন এবং ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করতেন। বাংলা ভাষায়ও তিনি বেশ কিছু সাড়া জাগানো বই লিখেছেন যার মধ্যে রয়েছে ‘কৃষ্ণবিবর’, ‘সমাজ দর্শন বিজ্ঞান ও অন্যান্য প্রবন্ধ’, এবং ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’ অন্যতম।।
তিনি একজন পদার্থবিজ্ঞানী হলেও ধর্ম, অর্থনীতি, দর্শন থেকে শুরু করে সঙ্গীত, সাহিত্য, শিল্পকলা এমনকি ইতিহাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর দখল ছিল অসামান্য। ড. জামাল নজরুল ইসলামের দুটি অপ্রকাশিত বই রয়েছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে Introduction to the mathematical economics. এই বইটিতে তিনি অর্থনীতিকে একটি বিজ্ঞানের বিষয় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ড. ইসলাম স্বনির্ভর অর্থনীতির প্রবক্তা ছিলেন। বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতার বিরুদ্ধে কথা বলতেন। পদ্মাসেতু নির্মাণে আভ্যন্তরীন অর্থায়ন ব্যবস্থা নিয়ে আইএমএফ-এর খবরদারীকে দেশের আভ্যন্তর বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে মনে করতেন। একবার ঢাকায় অর্থনীতিবিদদের এক সম্মেলনে বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদরা যখন বিশ্বব্যাংকের সাহায্যে নেয়ার পক্ষে মতামত দিচ্ছিলেন তখন বিভিন্ন যুক্তি ও তথ্য দিয়ে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশেকে উঠে দাঁড়াতে হলে বিদেশি সাহায্যের কোনো প্রয়োজন নেই।’ স্বাবলম্বী অর্থনীতির স্বপ্নদ্রষ্টা সেই ড. জামাল নজরুল ইসলামই আজ নেই আমাদের মাঝে।
ড. জামাল নজরুল ক্যারিয়ারের সবচয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নেন ১৯৮৪ সালে। কেমব্রিজের মর্যাদাপূর্ণ চাকরি, সুরক্ষিত জীবনের মোহ এবং গবেষণার অফুরন্ত সুযোগ ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে ফিরে আসেন স্বদেশে। তবে তিনি একা এলেন না, সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত ফেলে রেখে সাথে নিয়ে এলেন পুরো পরিবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে অধ্যাপনার সুযোগ দিতে চাইলেও তিনি পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামেই ফিরে গেলেন। আর শিক্ষকতার জন্য বেছে নিলে অপেক্ষাকৃত কম খ্যাত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে। তবে এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে একটি অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি করা আবশ্যক ছিল। কিন্তু তা সম্ভব না হলে গণিত বিভাগে একটি অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করে তাকে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ৩ হাজার টাকা বেতনের অধ্যাপক পদে তিনি যোগ দেন।
দেশের জন্য অপার সম্ভাবনাকে বিসর্জন দিয়ে স্বদেশের মাটিতে তাঁর ফিরে আসা রূপকথার গল্পেই মতোই মনে হয়। কত সহজে ইউরোপ আমেরিকায় তিনি সফল বৈজ্ঞানিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারতেন। এ সর্ম্পকে তিনি বলেছেন, ‘স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকার চিন্তা আমার কখনোই ছিল না। বিদেশে আপনি যতই থাকুন না কেন, নিজের দেশে নিজের মানুষের মধ্যে আপনার যে গ্রহণযোগ্যতা এবং অবস্থান সেটা বিদেশে কখনোই সম্ভব না।’
ড. জমাল নজরুল যখন দেশে ফিরলেন তখন তিনি ছিলেন খ্যাতির তুঙ্গে। যখন তিনি বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কারের দিকে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই তিনি সবকিছু ফেলে চলে দেশপ্রেমের টানে ফিরলেন বাংলাদেশে। ড. ইসলাম যদি বিদেশে থেকে যেতেন তাহলে অনেক আগেই নোবেল পুরস্কার পেতেন। একথা বলেছেন স্বয়ং ভারতের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। এই প্রসঙ্গে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ডাইসন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘দেশকে সেবা দিতেই ফিরেছিলেন জামাল নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জামাল ইসলামের প্রতি আমার অসম্ভব শ্রদ্ধা।’
দেশে ফিরেই ড. জামাল নজরুল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্বীয় ও গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে মৌলিক গবেষণার জন্য Research Center for Mathematical and Physical Sciences (RCMPS) নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান করেন, যার উদ্বোধন করেন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম। পৃথিবীর সেরা গণিতবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানীরা এখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। তাঁর উৎসাহে ঘনিষ্ঠ বন্ধু তুখোড় বিজ্ঞানী নার্লিকার ভারতে প্রতিষ্ঠা করেন Inter-University Centre for Astronomy and Astrophysics (IUCAA) এবং বিজ্ঞানী নীল টুুরক দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠা করেন African Institute for Mathematical Sciences.
গাণিতিক হিসাব ড. ইসলাম মাথা খাটিয়ে করতে পছন্দ করতেন। তাঁর বাসায় কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ কোনোটাই ছিল না। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কম্পিউটারে অনেক কাজ করা যায়, তবে সব নয়। আমার কাজের জন্য কম্পিউটার দরকার হয় না।’ তাঁর ধারণা ছিল, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম টেলিভিশন, মোবাইল ইত্যাদরি প্রতি আসক্ত এবং এ কারণে তারা লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে। তিনি একবার ছাত্রদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের মোবাইলগুলো পুকুরে ফেলে দাও।’
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের কোনো অংক দু-তিন পাতার বেশি লম্বা হলেই গবেষকরা কম্পিউটারের শরণাপন্ন হন। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ আরশাদ মোমেনের লেখা থেকে জানা যায়, এক বক্তৃতায় ১০ পৃষ্ঠা লম্বা একটি সমীকরণ তিনি দেখিয়েছিলেন কম্পিউটার ব্যবহার না করে। দিব্যদৃষ্টি ছাড়া এ রকম লম্বা সমীকরণ সমাধান করা একবারেই অসম্ভব।
বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম ছাড়াও পরিবেশ, সামাজিক ও নাগরিক অন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন। পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের (Forum for Planned Chittagong) জন্মলগ্ন থেকেই এর সভাপতি হিসাবে তিনি চট্টগ্রাম নগর ও পরিবেশ উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। উন্নয়নের নামে শহর, নদী-নালা দখলের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে লড়েছেন, রুখে দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধেও তিনি অবদান রেখেছিলেন। ১৯৭১ সালে ব্রিটেন ও চীনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে বাংলাদেশে পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণ বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন।
ড. জামাল নজরুল ইসলাম ভালো গাইতে পারতেন এবং ছবি আঁকতে খুব পছন্দ করতেন। ভালোবাসতেন রবীন্দ্র-নজরুল সঙ্গীত, গালিবের গজল, মুহাম্মদ রফি, সায়গল ও হেমন্তের গান, বাজাতেন পিয়ানো ও সেতার। তাঁর বাসায় নিয়মত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জলসা হত। তিনি মনে করতেন সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ না থাকলে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া যায় না। তিনি দেশকে ভালোবাসতেন। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী শাহরিয়ার খালেদ বলেন, ‘বাড়িতে গেলেই স্যার পিয়ানোতে জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে শোনাতেন।’
ড. ইসলাম ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ ৭৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম একটি বাসযোগ্য পৃথিবী এবং ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। দেশে তরুণদের বিজ্ঞান গবেষণায় আকৃষ্ট করার স্বপ্ন দেখতেন। বাংলাদেশকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই তিনি নিজের ক্যারিয়ারকে বলি দিয়ে দেশে ফিরেছিলেন।
ড. জামাল নজরুল ইসলাম বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞানচর্চা ছাড়া একটি জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। এজন্য লন্ডনের বাড়ি বিক্রিলব্ধ অর্থ, বইয়ের রয়্যালিটিসহ নিজের সব সঞ্চয় ঢেলে দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি উচ্চমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান। আমাদের সমাজে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীর কদর নেই বলে তরুণসমাজ আলোকিত পথের সন্ধান পাচ্ছে না। সংঘাতে জর্জরিত আজকের বিশ্বে ড. জামাল নজরুলের মতো দেশপ্রেমিক, পরোপকারী ও নিষ্ঠাবান বিজ্ঞানীর খুবই প্রয়োজন।
এই কিংবদন্তি বিজ্ঞানীকে শ্রদ্ধা জানাতে চট্টগ্রাম মুসলিম হলে আয়োজিত নাগরিক স্মরণ সভায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে শুনেছি তাঁর স্ত্রী ড. সুরাইয়া এবং কন্যা সাদাফ সা’দের মুখে বিজ্ঞানী সম্পর্কে বহু না বলা কথা। কথা। গিয়েছি চট্টগ্রাম শহরতলীর জিইসি মোড়ে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের অফিসে। অফিসে গিয়ে দেখি ফোরামের সভা চলছে। সভাকক্ষের মাঝখানে টেবিলের এক মাথায় যে চেয়ারে স্যার বসতেন, সেটা খালি রেখেই সভার কাজ চলছে। শূন্য চেয়ারটির তাকিয়ে কেমন এক অজানা কষ্ট এবং আবেগে আবিষ্ট হয়ে পড়ছিলাম বারবার। ভাবছিলাম, আহা, এই ক্ষণজন্মা মনীষীর সাথে যদি কখনো দেখা হতো একবার?
