ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের অধ্যাপক জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন বসু। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অসাধারণ আবিস্কারের মাধ্যমে তিনি সাড়া জাগিয়েছিলেন বিশ্বে। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে থেকেও পাশ্চাত্যের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রাচ্যের বিজ্ঞানীরাও যে বিজ্ঞানকে নতুন পথ দেখাতে পারে সেটা প্রমাণ করেছিলেন সত্যেন বসু।

পুরো নাম সত্যেন্দ্রনাথ বসু। জন্ম ১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি, কলকাতায়। লেখাপড়ায় ছিল তাঁর অসাধারণ মেধা। ১৯১১ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সারা বাংলায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯১৩ সালে গণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক এবং ১৯১৫ সালে মিশ্র গণিতে রেকর্ড পরিমাণ নম্বর নিয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে এত ভালো রেজাল্ট করার পরও তিনি ভালো কোনো চাকরি পেলেন না। তাই গৌরীপুরের জমিদারের ছেলেকে কিছুদিনের জন্য প্রাইভেট পড়ানোর দায়িত্ব নিলেন।

জমিদার বাড়ির এই ছেলেই পরবর্তীতে হলেন সিনেমা জগতের খ্যাতিমান অভিনেতা প্রমথেশ বড়ুয়া। পাশ করার পর একটি বছর তিনি এভাবে টিউশনি করিয়ে কাটিয়ে দেন। চাকরির জন্য দরখাস্ত করলে সবার একই কথা: তাদের এত মেধাবী ছাত্রের প্রয়োজন নেই, একজন সেকেন্ড ক্লাস হলেই চলবে। অবশেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সত্যেনের ডাক পড়লো। তাঁকে পড়াতে হবে পদার্থবিদ্যা, তাও অবার আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (Relativity Theory)! আইনস্টাইন ছাড়া এই তত্ত্ব বোঝেন এমন মানুষের সংখ্যা তখন বিশ্বে বিরল। কিন্তু মেধাবী তরুণ সত্যেন এই জটিল বিষয়েই অধ্যাপনা শুরু করলেন।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের রিডার পদে যোগ দিলেন। ছাত্রদের পদার্থবিজ্ঞান পড়ানোর পাশাপাশি কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়ে গবেষণার কাজও চালিয়ে গেলেন। ক্লাসে পড়াতে গিয়েই একদিন তিনি কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের সূত্রের অসঙ্গতি টের পান। সাথে সাথেই এ নিয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ লিখে তিনি লন্ডনভিত্তিক দর্শনশাস্ত্রের একটি ম্যাগাজিনে পাঠিয়ে দিলেন। তবে সম্পাদকমন্ডলী প্রবন্ধটি প্রকাশে অস্বীকৃতি জানালেন। তবে দমে গেলেন না সত্যেন। লেখাটি এবার পাঠিয়ে দিলেন খোদ আইনস্টাইনের কাছে। বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন প্রবন্ধটির মূল্য বুঝতে ভুল করলেন না। তিনি বসুর নিবন্ধটি জার্মানিতে অনুবাদ করে নিজের মন্তব্য সহকারে জার্মানির বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন এবং সাথে নিজের নামটাও জুড়ে দিলেন। এভাবে জন্ম নিল বিখ্যাত বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের (Bose-Einstein Statistics)।

সত্যেনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে। সত্যেন বসুর নামানুসারে বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন তত্ত্ব মেনে চলা মৌলিক কণাগুলোর (ফোটন, নিউক্লিয়াস, বা আলফা পার্টিক্যাল) নাম দেয়া হল ‘বোসন’ (Boson)। উল্লেখ্য, আইনস্টাইনের নাম থাকলেও সত্যেন বসুই হলেন এই সাড়া জাগানো তত্ত্বের মূল রূপকার। তবে আইনস্টাইনের আশীর্বাদ না থাকলে হয়তো সত্যেন বসুর প্রবন্ধটি পদার্থবিজ্ঞানের জার্নালে ছাপা হতো না। পাশ্চাত্যে সাধারণত প্রাচ্য কিংবা অন্যান্য সভ্যতার অবদান তেমন একটা স্বীকৃত হয় না। স্বতন্ত্রভাবে বেতার-তরঙ্গ আবিস্কারের পরও জগদীশ বসুকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেয়া হয়নি। ৮ম শতকে মুসলিম বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার যে রেনেসাঁ শুরু করেছিলেন তার উপর ভিত্তি করেই যদিও গড়ে উঠেছে আজকের প্রযুক্তিভিত্তিক পশ্চিমা সভ্যতা; কিন্তু সে কথা পশ্চিমা মিডিয়ায় কখনোই প্রাধান্য পায় না।

বিজ্ঞানী হলেও সাহিত্য ও সঙ্গীতের প্রতি ছিল সত্যেন বসুর গভীর অনুরাগ। তিনি সংস্কৃত, জার্মান ও ফরাসি ভাষায় ছিলেন পারদর্শী। চমৎকার এসরাজ বাজাতে পারতেন। এমনকি নিজে একটি রাগও রচনা করেছিলেন। বসু ১৯৫৬ সাল থেকে দু’বছর শান্তিনিকেতনের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে তিনি জীবদ্দশায় মানুষের কাছে পৌরাণিক কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। সত্যেন বসু আবিস্কৃত তত্ত্বের ওপর গবেষণা করে ১৯৮৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ১০ জন বিজ্ঞানী পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার! অথচ সেই সত্যেন বসুরই কপালে জোটেনি নোবেল খ্যাতি। তিনি কেন নোবেল পেলেন না, এ নিয়ে ক্ষোভ এবং বিতর্কের শেষ নেই। কিন্তু তাতে কি? এই শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞানী আইনস্টাইন নিজেই সত্যেন বসুর কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, It’s a beautiful step forward… বিজ্ঞানে তাঁর অবদান কোনো পুরস্কার দিয়ে মাপা যাবে না কখনো। অসাধারণ আবিস্কার ও কীর্তির জন্য সত্যেন বসু আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

আমাদের জন্য গৌরবের বিষয় হলো, সত্যেন বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্ন থেকে দীর্ঘ পঁচিশ বছর অধ্যাপনা করেছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। ভালো লাগে যখন ভাবি, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই ক্যাম্পাস, শ্রেণীকক্ষ এবং গবেষণাগার ছিল তাঁর যুগান্তকারী তত্ত্বের উৎস। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তখন পদার্থবিজ্ঞানে যেসব বিষয় পড়ানোর মতো উপযুক্ত শিক্ষক ছিল না, আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে ওইসব বিষয়ে শুধু পাঠদানই নয় রীতিমতো গবেষণা হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড কেন বলা হতো তা সহজেই অনুমান করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন বসুর সন্মানে রয়েছে সত্যেন বসু অধ্যাপক (Bose Professor) পদ। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে এখনো সংরক্ষিত রয়েছে সত্যের বসুর কাছে আইনস্টাইনের স্বহস্তে লেখা অমূল্য চিঠি। আমার বিশ্বাস, সত্যেন বসুর অমর কীর্তির কথা স্মরণ করে আমাদের নতুন প্রজন্ম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হারিয়ে যাওয়া সোনালি অতীতকে ফিরিয়ে আনার জন্য অনুপ্রাণিত হবে।