মহাবিশ্বে আমরা একা নই, মহাজগতের অন্য কোনো গ্রহে আছে আমাদের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী কিংবা আমাদের চেয়ে উন্নত কোনো সভ্যতা। এ নিয়ে মানুষের ঔৎসুক্যের শেষ নেই। শুধু তাই নয়, কোনো কারণে পৃথিবী যদি ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়, তখন মনুষ্য প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য সৌরজগতের অন্য কোনো গ্রহে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখছে মানুষ বহুদিন ধরে।

২০০৯ সালে মঙ্গল গ্রহ থেকে ছিটকে আসা উল্কাপিন্ডের অভ্যন্তরে বিজ্ঞানীরা এককোষী জীব বা মাইক্রোব ফসিলের সন্ধান পাবার পর সম্প্রতি মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠে বহমান নোনাপানির সন্ধান পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। সৌরজগতের চতুর্থ গ্রহ হচ্ছে মঙ্গল গ্রহ। মঙ্গলের ঘূর্ণন কাল এবং ঋতু পরিবর্তন অনেকটা পৃথিবীর মতো হওয়ায় সেখানে প্রাণের উদ্ভবের পরিবেশ থাকতে পারে এমন একটা কৌতূহল বরাবরই ছিল বিজ্ঞানীদের। তাই এই আবিস্কার মঙ্গল গ্রহে বসতি গড়ার স্বপ্নকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।

আজ থেকে ৪০০ বছর আগে জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিওর টেলিস্কোপ দিয়ে মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণের পর থেকে লাল রংয়ের এই গ্রহ মানবজাতির কল্পনাপটে রহস্যের জাল বুনে আসছে। অতঃপর ১৯৬৫ সালে প্রথমবারের মতো নাসার আকাশযান মেরিনার-৪ মঙ্গল গ্রহ অভিযানে যায়। মেরিনারের পাঠানো আলোকচিত্র এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত থেকে গ্রহটিতে তরল পানির অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা ঘণীভূত হয়।

মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ এবং ভূপৃষ্ঠের গভীর থেকে সংগৃহীত শিলা পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, মঙ্গল গ্রহে একসময় বহমান নদী, মহাসাগর ছিল যাতে মাইক্রোব প্রজাতির জীবন থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তাহলে এইসব জলাশয়ের পানি গেল কোথায়? মঙ্গলের ভর পৃথিবীর মাত্র এক দশমাংশ এবং এর বায়ুমন্ডলও বেশ পাতলা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠের অভিকর্ষীয় শক্তি তুলনামূলকভাবে অনেক কম হওয়ায় তরল পানির অধিকাংশই ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবশিষ্ট পানি জমাট লবণ কিংবা ভূপৃষ্ঠের নিচে বরফ হয়ে জমে আছে।

বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহে যে নোনাপানির খোঁজ পেয়েছেন সেটা হচ্ছে মূলত দ্রবীভুত লবণ, যা ক্লোরেট্স এবং পারক্লোরেট্স-এর সংমিশ্রণ। তবে এই পানির উৎস কি কিংবা এর রসায়ন কি সে সম্পর্কে এখনো কোনো স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়নি। নোনা পানি হলেও তাতে কি? বিশোধন প্রক্রিয়ায় খুব সহজেই এখন লবণাক্ত পানি থেকে বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করা হচ্ছে। তাই এই দ্রবীভুত লবণই দিচ্ছে মঙ্গলের বুকে পানির প্রাপ্যতার আগাম বার্তা যা বিজ্ঞানীদের প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।

নাসার কৃত্রিম উপগ্রহ ‘র্মাস রিকন্যাইসেন্স অর্বিটার’ মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠে গাছের ছড়ানো শেকড়ের মতো কতগুলো রেখার ছবি পাঠায় যার নাম দেয়া হয় ‘রেকারিং স্লোপ রিনেই’। ১ মিটার থেকে ১০ মিটার প্রশস্ত রেখাগুলো দেখতে মরুভূমির বুকে শুকিয়ে যাওয়া সরু নদী-নালার চিহ্ন বলেই মনে হয়। কৃত্রিম উপগ্রহের পাঠানো চিত্র পরীক্ষা করে ‘রেকারিং স্লোপ রিনেই’-এর উপর স্তরে জমাট লবণের সন্ধান মেলে। এই জমাট লবণ গ্রীষ্মকালে মঙ্গলের বাতাসে ভাসমান জলীয়বাষ্পের সাথে মিশে তরল নোনাপানির আকারে প্রবাহিত হয় এবং তাপমাত্রা কমলে মিলিয়ে যেতে শুরু করে। তাপমাত্রা-২৩ ডিগ্রির উপরে উঠলেই এই লবণাক্ত পানির প্রবাহ দেখা দেয়। এমন কম তাপমাত্রায় পানি জমে যাবার কথা। কিন্তু তা হয় না। কারণ দ্রবীভুত লবণ পানিকে শূন্য ডিগ্রির অনেক নিচেও তরল রাখে।

প্রাচীন অভিযাত্রীরা যখন অজানা বিশ্বের অন্বেষণে বের হতেন, তখন তারা পানির আধার যেমন নদী, হ্রদ কিংবা সমুদ্র উপকূল ধরেই এগুতেন। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা মঙ্গলগ্রহে প্রাণের সন্ধান করার জন্য একই পথে অগ্রসর হয়েছে। পৃথিবীর যেখানে রয়েছে পানি তার আশেপাশেই থাকে প্রাণের অস্তিত্ব। অর্থাৎ আগে পানির খোঁজ করো। তাই বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, মঙ্গল গ্রহে যদি পানির সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে পানি প্রবাহের কাছাকাছিই খুঁজে পাওয়া যাবে প্রাণ। পৃথিবীতে জীবনের শুরু এককোষী ক্ষুদ্র প্রাণী বা মাইক্রোব দিয়ে। নাসা আশা করছে, পৃথিবীতে প্রাণের প্রাচীনতম লক্ষণ হিসাবে স্বীকৃত এককোষী মাইক্রোবের সন্ধান একদিন মিলবেই এই মঙ্গল গ্রহে।

২০১১ সালে পাঠানো নাসার বিশেষ রোবোটিক যান কিউরিওসিটি মঙ্গলের মাটি ও পরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আসছে। কিন্তু মঙ্গলের যেসব এলাকায় পানি রয়েছে সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করতে পারছে না কিউরিওসিটি। কারণ এই আকাশযান পৃথিবী থেকে বহন করে নিয়ে যেতে পারে মাইক্রোব যা খুব সহজেই কলুষিত করতে পারে মঙ্গলের পানি। তখন আলাদাভাবে ওই গ্র্রহের জীব বা প্রাণীকে চিহ্নিত করা দুষ্কর হয়ে পড়বে। মাইক্রোব অতি ছোট্ট জীবিত গুল্ম-বীজ ও প্রাণী যা চরম পরিবেশে বেঁচে থাকে। আমাদের চারপাশ, সারা পৃথিবীজুড়েই এরা বিরাজ করছে। তাই মাহকাশযানগুলোকে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করার সময় পরিপূর্ণ মাইক্রোবমুক্ত রাখাটা মহাকাশ বিজ্ঞানীদের জন্য হবে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।

উল্লেখ্য, সত্তর দশকের শেষের দিকে মহাকাশযান ভাইকিং মঙ্গলের বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করার পর দুটো রোবোটিক যান মঙ্গলের পৃষ্ঠে নিক্ষেপ করে। এই পদ্ধতিতে পৃথিবীর জীবাণু দিয়ে মঙ্গলের পরিবেশ সংক্রমিত করার সুযোগ নেই। কিউরিওসিটি রোবোটিক যান যদি নিরাপদে কাজ করতে না পারে, তাহলে ইউরোপ ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে ভাইকিংয়ের আদলে মহাকাশযান ‘এক্সো-র্মাস’ পাঠানোর কথা ভাবা হচ্ছে।

মঙ্গলে বসতির সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে এই গ্রহে শ্বাস নেয়ার জন্য নেই অক্সিজেন। তাছাড়া শীতের সময় তাপমাত্রা নেমে যায়- ৮৭ ডিগ্রিতে। এই প্রতিকূল পরিবেশে কিভাবে মানুষের জন্য আবাসস্থল নির্মাণ করা যায় সে নিয়ে স্থাপত্যবিদ এবং বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। পৃথিবী থেকে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে মঙ্গল গ্রহে কিছু তৈরি করা আর্থিক বিচারে সম্ভব নয়। কারণ এক কিলোগ্রাম ওজনের নির্মাণসামগ্রী মঙ্গলে দ্বীপান্তর করতে লাগতে পারে কোটি ডলার। তাই মঙ্গলের মাটি দিয়ে কিভাবে নির্মাণ করা যায় সে নিয়ে ভাবছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। কিন্তু শুধু নির্মাণসামগ্রী থাকলেই হবে না। আবাসস্থল বানানোর জন্য চাই যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি। খুব বড় কিংবা খুব ভারী যন্ত্রপাতি রকেটে বহন করে নিয়ে যাওয়া যাবে না। আর নির্মাণকাজের জন্য শ্রমিক হিসাবে ভাবা হচ্ছে রোবটের কথা। তার মানে যন্ত্রপাতি রোবটের মতো মঙ্গলে নেমেই নিজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করবে।

পৃথিবী থেকে মঙ্গলের দূরত্বের জন্য রোবটদের নিয়ন্ত্রণ করে নির্মাণ কাজ পরিচালনা একটা জটিল সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ মঙ্গল থেকে পৃথিবীর দূরত্ব হচ্ছে চার কোটি কিলোমিটার। ফলে কম্পিউটারের কার্সার এক পয়েন্ট থেকে অন্য স্থানে নড়তে সময় লাগবে ৮ মিনিট। ভেবে দেখুন, এভাবে কাজ করা সম্ভব কিনা।

মঙ্গলে যন্ত্রপাতির জন্য দরকার সৌর জ্বালানীর এবং নির্মাণসামগ্রী তৈরির জন্য প্রসেসিং প্ল্যান্ট। এছাড়া তৈরি করতে হবে প্রাথমিক অবকাঠামো যেমন অবতরণের ক্ষেত্র, রাস্তা, অবকাঠামোকে বিকিরণ থেকে রক্ষাকারী আবরণ বা দেয়াল এবং নভোযান রাখার জন্য হ্যাঙ্গার। এসব নির্মিত হলে তবেই মানুষ যেতে পারবে মঙ্গলে।

নাসা ২০৩০ সালের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে নাসার আগেই ২০২৪ সালের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে একটি ডাচ এনজিও। ছয় বিলিয়ন ডলারের এই প্রজেক্টের নাম হল ‘র্মাস ওয়ান’। ইতিমধ্যে দুই লক্ষেরও বেশি মানুষ এই বিরল অভিযানের অভিযাত্রী হতে ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। তবে বহু যাচাই বাছাইয়ের পর কেবল ২৫ জনকে ‘র্মাস ওয়ান’ মিশনের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তবে এটি হবে ওয়ানওয়ে বা একমুখো মিশন। অর্থাৎ যারা মঙ্গল গ্রহে যাবেন তারা আর পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারবেন না। মঙ্গলের মাটিতেই হবে তাদের সমাধি।

আমাদের প্রিয় পৃথিবীতে জনসংখ্যা ও পরিবেশ দূষণের চাপ যে হারে বেড়ে চলেছে তাতে কিছুদিন পর পৃথিবী বাসের অয়োগ্য হযে যাবে। মনুষ্য প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মঙ্গল কিংবা বাসযোগ্য গ্রহে অভিবাসন অপরিহার্য্য। না হলে ডাইনোসরের মতো মানুষ্য প্রজাতিও একদিন বিলীন হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে। মঙ্গলে যাওয়া এখন অনেকটা সায়েন্স ফিক্শন চলচ্চিত্রের মতো মনে হলেও ভেবে দেখুন, শত বছর আগে মানুষ কি ভেবেছিল বিমানে চড়ে শূন্যে ভেসে বেড়াবে? চাঁদে পা রাখবে? তেমনি এখন চলচ্চিত্র, উপন্যাসে মঙ্গল গ্রহে বসতি নিয়ে যে স্বপ্নের জাল বুনছে, আগামী কোনো একদিন তা যে সত্যি হবে না সে কথা বলি কি করে?