বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের উত্তরসূরী বলে যাকে ধরা হত, তিনি হলেন কিংবদন্তি তাত্ত্বিক পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং। যে মহাবিশ্বতত্ত্ব, গ্যালাক্সি এবং নক্ষত্ররাজি নিয়ে ছিল তাঁর গবেষণা, সেই নক্ষত্রমালারই ভীড়ে নিসর্গে হারিয়ে গেলেন বিজ্ঞান জগতের অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র, স্টিফেন হকিং। বিশ্বসৃষ্টির শুরু আর শেষ কোথায়? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর নিরন্তর খুঁজে ফিরছে বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, ধর্মযাজক থেকে শুরু করে সাধারণ সচেতন মানুষ। স্টিফেন হকিং মহাজাগতিক সৃষ্টির গুপ্তরহস্য উন্মোচন করতে মানবজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন।
বিজ্ঞানীরা হন আত্মকেন্দ্রিক, কাজ করেন বিশ্ববিদ্যালয় আর গবেষণাগারের চার দেয়ালের কারাগারে। কিন্তু স্টিফেন হকিং ছিলেন এর ব্যতিক্রম। গণিত ও বিজ্ঞানপ্রেমী মানুষের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল রকস্টার কিংবা সুপারস্টার ফুটবলার তারকাদের সমতুল্য। বিশ্বমিডিয়াতে সবসময় ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। স্টার ট্রেক এবং দ্য সিম্পসনের মতো জনপ্রিয় ছায়াছবিতে তিনি অতিথি শিল্পী হিসাবে হাজির হয়েছিলেন পর্দায়।
১৯৮৮ সালে মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে তাঁর লেখা বই ‘অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া একটি বই। ৪০টি ভাষায় অনূদিত বইটির এক কোটি কপি বিক্রি হয়। শুধু তাই নয়, উপর্যুপরি ২৩৭ সপ্তাহ সানডে টাইম্স-এর বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষে থেকে বইটি গিনেজ বুক রেকর্ডের পাতায় উঠে আসে।
ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর এবং মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য ‘বিগ ব্যাং থিউরি’র জনক হচ্ছে স্টিফেন হকিং। স্টিফেন হকিং এবং তাঁর সহযোগী বিজ্ঞানী পেনরোজের যৌথ তত্ত্ব মতে মহাবিশ্বের স্থান ও কালের শুরু হচ্ছে একটি কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ বিগব্যাং থেকে এবং এর শেষ হবে কৃষ্ণগহ্বরের মৃত্যুকূপে। ‘ব্ল্যাকহোল’ হচ্ছে এক অদৃশ্য কৃষ্ণকায় দানব যা গিলে খায় সবকিছু। ব্ল্যাকহোলে পদার্থের ঘনত্ব হচ্ছে অসীম। এর ম্যাধ্যাকর্ষণ শক্তির বলয় থেকে আলোও পালাতে পারে না। ব্ল্যাকহোলের মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্রকে ঘিরে আছে এক অদৃশ্য প্রাচীর যার নাম হলো ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্ত। এই সীমানা পার হলে আর ফেরার পথ নেই।
তবে স্টিফেন হকিংয়ের মতে, কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তিনি ‘অ্যাপারেন্ট হরাইজন’ নামের একটি সীমানার প্রস্তাব করেছেন যা অস্থায়ীভাবে পদার্থ ও শক্তি আটকে রাখলেও তা ছেড়ে দেয়। তবে পুরো প্রক্রিয়টিকে ব্যাখ্যা করতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সাথে অন্যান্য মৌলিক শক্তিগুলোকে একীভূত করে একটি সমন্বিত তত্ত্বের (ইউনিফাইড গ্র্রান্ড থিউরি) প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রকৃতি জগতের চারটি বল—দুর্বল নিউক্লিয়, সবল নিউক্লিয়, মধ্যাকর্ষণ ও তুড়িচ্চুুম্বকীয় বল একসাথে মিশে ছিল মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদি অর্থাৎ বিগ ব্যাং-এর প্রথমাবস্থায়। এতএব এই চারটি বলকে সমন্বিত করা কোনো গ্র্রান্ড ইউনিফাইড থিউরিই মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারে।
আইনস্টাইন প্রকৃতি জগতের বলগুলোকে একীভূত করতে তাঁর শেষ জীবনে আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। তবে প্রফেসর আব্দুস সালাম এবং আরো দু’জন বিজ্ঞানী মিলে তড়িচ্চুম্বকিয় এবং দুর্বল নিউক্লিয় বলকে একীভূত করতে সমর্থ হন। এজন্য তারা ১৯৭৯ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু চারটি বলকে সমন্বয় করার তত্ত্ব¡ বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে।
স্টিফেন হকিং আবিস্কার করেন, কৃষ্ণগহ্বর কালো হলে কি হবে সেগুলো আবার একধরনের দ্যুতিও বিকিরণ করে। আর একদিন এই কৃষ্ণগহ্বরগুলোও বাষ্পীভূত হয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। হকিং রেডিয়েশন নামে স্টিফেন হকিং-এর এই বিকিরণ তত্ত্ব বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর আসনে বসিয়েছে তাঁকে।
১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে জন্মগ্রহণ করেন স্টিফেন হকিং। তাঁর বাবা ছিলেন জীববিজ্ঞানের গবেষক আর মা ছিলেন একজন রাজনৈতিক কর্মী। কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই হকিংয়ের আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান আর গণিতশাস্ত্রে। ১৯৬৬ সালে ২৪ বছর বয়সে কেমব্রিজ বিশ্বদ্যিালয় থেতে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চলাকালীন মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি দুরারোগ্য মটর নিউরন ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। ধীরে ধীরে তাঁর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হতে থাকে। অবশেষে জীবনের বাকি দিনগুলো তিনি হুইল চেয়ারে বসেই চলাফেরা করেছেন। এই ব্যাধি আরও কেড়ে নেয় স্টিফেন হকিং-এর কন্ঠস্বর। কন্ঠস্বর না থাকলেও তিনি ভয়েস সিনথেসাইজারের মাধ্যমে কথা বলতেন, নিজের ভাব প্রকাশ করতেন।
মটর নিউরন ব্যাধি ধরা পড়ার পর চিকিৎসকরা বলেছিলেন তিনি আর বাঁচবেন মাত্র দুই বছর। এই রোগে আক্রান্ত রোগীরা রোগ ধরা পড়ার দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই মারা যান। কিন্তু তিনি হার মানেননি। চিকিৎসকের ভবিষ্যদ্বাণী এবং প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে তিনি বেঁচে ছিলেন আরো ৪৯ বছর। প্রান্তিক ব্যাধি ও শারীরিক পঙ্গুত্বকে পরাস্ত করে তিনি চালিয়ে গেছেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা। এক সাক্ষাৎকারে স্টিফেন হকিং বলেন, মরণব্যাধি আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের পরিচর্যার দিনগুলোতে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত একটি ছেলের মৃত্যু জীবন সম্পর্কে তাঁর ধারণা বদলে দেয়। প্রতিদিনই তাঁর শেষ দিন হতে পারতো। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তিনি কাজে লাগাতে চাইতেন।
স্টিফেন হকিং-এর নতুন গবেষণা এবং মতামত শোনার জন্য মুখিয়ে থাকতো সমগ্র বিশ্ব। তবে সময় সময় তাঁর কিছু মন্তব্য প্রচুর বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্টিফেন হকিং অনলাইনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করেন, ব্ল্যাকহোলকে ঘিরে থাকা ইভেন্ট হরাইজন নামে কথিত সীমানা বা প্রাচীরের কোনো অস্তিত্ব নেই। ব্ল্যাকহোল নিয়ে ব্ল্যাকহোলের জনকের এ ধরনের মন্তব্য বিজ্ঞানী মহলে আলোড়ন তোলে।
মনুষ্য প্রজাতিকে টিকিয়ে রখার জন্য অন্য গ্রহে বসতি স্থাপনার কথা যেমন আমরা ভাবছি। ঠিক তেমনি অন্য কোনো গ্যালাক্সির গ্রহে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানী নিঃশেষ হয়ে গেলে পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য গ্রহে এসে ভীড় জমাতে পারে এলিয়নসের দল। আমাদের চেয়ে বহু উন্নত এলিয়েনরা তখন মানবজাতিকে পরাজিত করে যাবতীয় সম্পদ কেড়ে নেবে। বিবিসি চ্যানেলে প্রচারিত এক ডকুমেন্টারিতে মহাবিশ্বে যে এলিয়েন আছে সেটা নিশ্চিত এবং এলিয়েনরা পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি সরূপ বলে মন্তব্য করেন বিজ্ঞানী হকিং।
ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম বইয়ে শূন্য থেকে কিভাবে মহাবিশে^র সৃষ্টি হতে পারে সে সম্পর্কে তিনি যেমন ধারণা দিয়েছিলেন তেমনি আবার এও বলেছিলেন, যখন আমরা সার্বজনীন বা সমন্বিত তত্ত্বের সন্ধান পাবো, সেদিনই ঈশ্বরের মনকে (মাইন্ড অফ গড) আমরা বুঝতে পারবো। এ নিয়ে তুমুল বিতর্কের ঝড় ওঠে। কেউ বলেন স্টিফেন হকিং নাস্তিক, আবার কেউ যুক্তি দেখান, সার্বজনীন তত্ত্বের কথা বলে তিনি প্রাকারান্তে ঈশ্বরের অস্তিত্বই মেনে নিয়েছেন।
কিন্তু ২০১০ সালে প্রকাশিত ‘দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন’ বইয়ে স্টিফেন হকিং তাঁর মাইন্ড অফ গড মতবাদ থেকে সরে এসেছেন বলেই মনে করা হয়। তার মতে, পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র মেনে প্রাকৃতিকভাবে বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমে এই মহাবিশ্ব একা একা সৃষ্টি হয়েছে। এর পেছনে স্বর্গীয় কোনো হাত নেই।
পদার্থবিজ্ঞানে অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ১৯৭৪ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশ রয়্যাল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন। এর পাঁচ বছর পর ১৯৭৯ সালে তিনি ক্যামব্রিজে গণিতের লুকেসিয়ান প্রফেসরের পদ অর্জন করেন যা এর আগে আইজ্যাক নিউটনের মতো জগতসেরা বিজ্ঞানী ধারণ করেছেন।
উলফ পুরস্কার, কোপলি পদক, এডিংটন পদক, হিউ পদক, আলবার্ট আইনস্টাইন পদকসহ কত ডিগ্রি আর পুরস্কার যে স্টিফেন হকিং পেয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। ব্রিটিশ নাগরিক হয়েও ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট ওমাবার কাছ থেকে তিনি আমেরিকার সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘মেডাল অফ ফ্রিডম’ লাভ করেন। কিন্তু অন্য একজন কিংবদন্তি বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের মতো তাঁর ঝুলিতে কেবল ছিল না নোবেল পুরস্কার। অথচ তাঁর তত্ত্বের ওপর গবেষণা করে অনেক বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। নোবেল কমিটির এই খেয়ালিপনা নিয়ে বিজ্ঞানীদের ক্ষোভের শেষ নেই। যেমন বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিস্কার করেন সেই ১৯০১ সালে। অথচ নোবেল পুরস্কার পান দীর্ঘ দুই দশক পর ১৯২১ সালে।
২০১৮ সালের ১৪ মার্চ ওপারে পাড়ি জমান বিজ্ঞানের বরপুত্র স্টিফেন হকিং। তিনি বলতেন, আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না তবে আমি সহসা মরতেও চাই না। কারণ আমার যে অনেক কিছু করার বাকি। দুরারোগ্য ব্যাধি, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং মৃত্যুর কালো হাতছানিকে জয় করে অপরিসীম সাহস এবং অধ্যাবসায় দিয়ে তিনি অসাধ্য সাধন করেছেন। যা যুগে যুগে মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।
