আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রবিন্দু এবং চালিকাশক্তি হল সূর্য। সভ্যতার আদি কাল থেকে সূর্যকে দেবতা মেনে এই তারকার আরাধনা করতো মানুষ। বহু নামে ডাকা হয় সূর্যকে—রবি, আদিত্য, অর্ক, ভাস্কর, আরো কত কি! চন্দ্র ও মঙ্গল বিজয় করেছে মানুষ। মঙ্গলে মনুষ্য পদচারণা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে কখনো সূর্যের মুখোমুখি হবার সাহস করেনি মানুষ।
১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মানবজাতির ঔৎসুক্য এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়ণ করতে বহু চমকপ্রদ অভিযান সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’। এখন সূর্যকে ছোঁবার দুঃসাহসিক ছক আঁকছে নাসা। নাসার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে মহাকাশ যান ‘পার্কার সোলার প্রোব’। যা সূর্যের বায়ুমন্ডলে অভিযান চালাবে।
অনুসন্ধানী এই যানটি সূর্যপৃষ্ঠ থেকে ৪০ লক্ষ মাইল দূরত্বে থেকে সূর্যের বায়ুমন্ডলে অনুসন্ধান চালাবে। যানটির সর্বোচ্চ গতিবেগ হবে ঘন্টায় প্রায় ৭ লক্ষ কিলোমিটার। এই গতিতে চললে আমেরিকার ফিলাডিলফিয়া থেকে ওয়াশিংটনে যেতে সময় লাগবে মাত্র এক সেকন্ড! সূর্যের চারদিকে পার্কার চক্কর দেবে মোট ২৪ বার। এতে সময় লাগবে প্রায় ৮৮ দিন। মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নভোযান সূর্যের এত কাছাকাছি যাচ্ছে। সূর্যের সাথে পার্কার নভোযানের এই সাক্ষাৎকেই সূর্য ‘ছোঁয়া’ বলে অভিহিত করছে নাসা।
পার্কার নভোযানের আকার হবে ছোট্ট একটি গাড়ির সমান যার ওজন প্রায় ৬০০ কিলোগ্রাম। পার্কার সোলার প্রোব যেখানে গবেষণা চালাবে সেখানে প্রচন্ড উত্তাপের সাথে রয়েছে তেজস্ক্রিয় সৌর বিকিরণ। মহাকাশ যানটিকে প্রায় ১৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে পারে। এই অকল্পনীয় তাপমাত্রায় আত্মরক্ষার জন্য যানটিকে পরানো হবে ৪.৫ ইঞ্চি পুরু কার্বন ফাইবারের তৈরি কম্পোজিট বর্ম বা জ্যাকেট, যার ওজন হচ্ছে মাত্র ৭৫ কিলোগ্রাম। এই বর্ম ভেতরের যন্ত্রপাতিকে রাখবে সুরক্ষিত। কার্বন ফাইবারের সাথে অন্যান্য পদার্থের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তৈরি কার্বন কম্পোজিট পদার্থ যেমন শক্তিশালী, তেমন হালকা, উচ্চ তাপ ও চাপ সহনশীল ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থের সাথে বিক্রিয়া করে না। এছাড়া মহাকাশযানের শরীর থেকে সূর্যরশ্মিকে যতদূর সম্ভব প্রক্ষিপ্ত করে দেয়ার জন্য পুরো যানটির গায়ে একটি বিশেষ ধরনের শে^ত আবরণ লেপে দেয়া হয়েছে।
এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সূর্যের কাছাকাছি গিয়ে সূর্যের গঠনপ্রকৃতি, পরিবেশ, সূর্যের চৌম্বকক্ষেত্র, গতিবেগ, তাপমাত্রা এবং সর্বোপরি তারকাটি কিভাবে কাজ করে সেসব বিষয়ে অজানা তথ্য সংগ্রহ করা। বিভিন্ন ধরনের গ্যাসের আবরণে পরিবেষ্টিত সূর্যের বায়ুমন্ডলের সবচেয়ে বাইরের আবরণটিকে বলা হয় করোনা। সূর্যের করোনার উত্তাপ সূর্য-পৃষ্ঠ থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ গুণ বেশি। যা এখনো অজানা বিস্ময়! সূর্যের বাইরের অংশ কেন এর পৃষ্ঠের চাইতে উত্তপ্ত, তার রহস্যভেদ করতে পারে এই মিশন।
সূর্য-পৃষ্ঠে নিয়মিত বয়ে যায় সৌরকণিকার ঝড়। তবে এর সঠিক কারণ বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো অজানা। সৌরঝড়ের সময় সূর্য থেকে ব্যাপক হারে গামা, রশ্মি, প্রোটন ও ইলেক্ট্রন রশ্মির বিচ্ছুরণ ঘটতে থাকে। এই সব ক্ষতিকারক রশ্মি আঘাত হানলে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে পৃথিবী ও মানবজীবন। এর আগে সবচেয়ে বড় সৌরঝড় হয়েছিল ১৮৫৯ সালে। সেবার সেকেন্ডে তিন হাজার কিলোমিটার গতিতে প্রায় এক ট্রিলিয়ন কিলোগ্রাম উত্তপ্ত সূর্যকণিকা পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছিল। সেসময় বৈদ্যুতির অবকাঠামো বর্তমান সময়ের মতো এতটা বিস্তৃত ছিল না বলে বড় ধরনের প্রভাব মানুষের ওপর পড়েনি।
কিন্তু এখন যদি একই ধরনের বিপর্যয় ঘটে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। এর ফলে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, কৃত্রিম উপগ্রহগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির খাতে নামবে ধ্বস। পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও বিদ্যুৎ সরবরাহে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেব। ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্স-এর পরিসংখ্যান মতে কোনো রকমের পূর্বাভাস ছাড়া সৌরঝড় যদি আমেরিকায় আঘাত হানে তার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এছাড়া আমেরিকার একটি বড় অংশ বছরখানেক বিদ্যুৎবিহীন হয়ে অন্ধকারে থাকবে।
বিখ্যাত মহাকাশ বিজ্ঞানী প্রফেসর ইউজিন নিউম্যান পার্কারের সম্মানে এই মহাকাশযানটির নাম দেয়া হয়েছে ‘পার্কার সোলার প্রোব’। এই প্রথমবারের মতো জীবিত কোনো ব্যক্তির নামে নাসা তাদের মিশনের নামকরণ করল, যা নজিরবিহীন সম্মানের।
বিজ্ঞানী পার্কার পঞ্চাশ দশকের মাঝাামাঝি সৌরঝড় এবং করোনার অস্তিত্ত্ব নিয়ে যুগান্তকারী তত্ত্ব¡ আবিস্কার করেন। ১৯৫৮ সালে এই তাত্ত্বিক আবিস্কার নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধ তিনি এস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে প্রকাশের জন্য পাঠান। কিন্তু জার্নালের দুজন নিরিক্ষকই পার্কারের তত্ত্বতে সংশয় প্রকাশ করে প্রবন্ধটি প্রকাশের অযোগ্য বলে প্রত্যাখান করলেন। তবে পার্কারের ভাগ্যদেবী ছিলেন সুপ্রসন্ন। ওই সময় জার্নালটির প্রধান সম্পাদক ছিলেন বিজ্ঞানের আরেক দিকপাল ১৯৮৩ সালের জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সুব্রামানিয়াম চন্দ্রশেখর। কথায় বলে, রতনে রতন চেনে। ইউজিন পার্কারের আবিস্কারের গুরুত্ব ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর। তাই নিরিক্ষকদ্বয়ের মতামত উপেক্ষা করে তিনি প্রবন্ধটি জার্নালে প্রকাশ করেন। প্রবন্ধটি প্রকাশের দু’বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৬০ সালে কৃত্রিম উপগ্রহের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পার্কারের তত্ত্ব প্রমাণিত হয়। এভাবে জীবন পেলো পার্কারের যুগান্তকারী তত্ত্ব।
প্রায় একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল বোসনকণার জনক বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের জীবনে, আজ থেকে প্রায় নয় দশক আগে। কোয়ান্টাম কণা নিয়ে সত্যেন বোসের প্রবন্ধ লন্ডনের একটি প্রসিদ্ধ জার্নাল ছাপাতে অস্বীকৃতি জানালেও, যিনি তাঁর আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তিনি আর কেউ নন, আধুুনিক বিজ্ঞানের বরপুত্র স্বয়ং আইনস্টাইন! জার্নাল থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সত্যেন বোস তার প্রবন্ধটি সরাসরি পাঠিয়ে দেন খোদ আইনস্টাইনের কাছে। বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন প্রবন্ধটির মূল্য বুঝতে ভুল করেননি। তিনি বসুর নিবন্ধটি জার্মানীতে অনুবাদ করে নিজের মন্তব্য সহকারে জার্মানীর বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন এবং সাথে নিজের নামটাও জুড়ে দিলেন। এভাবে জন্ম নিল বিখ্যাত বোস-আইনস্টাইন তত্ত্বের।
পার্কার যানটি প্রথমে পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে শুক্রের কক্ষপথে প্রবেশ করবে। তারপর বুধের কক্ষপথ অতিক্রম করে প্রায় সাত বছর পর সূর্যের কক্ষপথে পৌঁছাবে। ২০২৫ সালে মিশনটির কার্যক্রম শেষ হবে।
পার্কার মহাকাশযান বহন করছে একটি মাইক্রোচিপ। এতে থাকবে বিজ্ঞানী পার্কারের একটি ছবি, তাঁর যুগান্তকারী প্রবন্ধের কপি এবং একটি ধাতব ফলক যাতে সূর্যের উদ্দেশ্যে পার্কারের দেয়া বাণী খোদাই করা থাকবে। শুধু তাই নয়, অন্য একটি মাইক্রোচিপে সবাইকে নিজের নাম নথিভুক্ত করারও সুযোগ দিয়েছে নাসা। ২০১৮ সালের ২৭ এপ্রিলের মধ্যে যারা নথিভুক্ত হয়েছেন তাদের নামও এই মহাকাশযানের সাথে প্রদক্ষিণ করবে সূর্য।
