আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের মূল ভিত্তি হল ‘আলোর বেগ সর্বাবস্থায় ধ্রুব’। অর্থাৎ জগতের ভরবাহী কোনো বস্তু আলোর গতিবেগ অতিক্রম করতে পারবে না। আলোর গতি সর্বোচ্চ নয় বলে ইউরোপের জগদ্বিখ্যাত ল্যাবেরটরি সার্নে (CERN – European Centre for Nuclear Research) কর্মরত একদল গবেষকদের দাবির কথা শুনে বিশ্বের বিজ্ঞানী সমাজ বৈদ্যুতিক ঘা খাওয়ার মতো চমকে উঠেছেন। এ কি কথা? শত বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত আইনস্টাইনের স্বতঃসিদ্ধ কি তাহলে মিথ্যে হতে চলেছে?

সুইজারল্যান্ডের সার্ন ল্যাবে মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটন করার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০০৮ সালে সার্নের ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘লার্জ হেড্রন কলাইডারে’ (Large Hadron Collider), পরমাণু কণিকার মধ্যে অতি উচ্চ বেগে টক্কর ঘটিয়ে মহা বিস্ফোরণ বা Big Bang-এর ঠিক পর মূহুর্তে কী ঘটেছিল সেই দৃশ্যপট তৈরি করার জন্য যে পরীক্ষা করা হয়, তা বিশ্বে আলোড়ন তোলে। বিজ্ঞানীদের ভয়, এই পরীক্ষার সময় যে ধরনের তাপমাত্রা উৎপন্ন হবে (৩ ট্রিলিয়ন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড!), তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি করবে। আর এই ব্ল্যাকহোল কিছুদিনের মধ্যে বিশাল আকার ধারণ করে বিশ্বকে গিলে ফেলবে। খোদ মানবজাতির অস্তিত্ব যখন বিপন্ন হতে চলেছে তখন কি চুপ করে থাকা যায়? তাই বেশ কিছু বিজ্ঞানী ইউরোপিয়ান মানবাধিকার কমিশনের আদালতে এই পরীক্ষা বন্ধ করার জন্য রীতিমতো মামলা ঠুকে দেন। তবে বাস্তবে ভয়ংকর তেমন কিছু ঘটেনি। এই ধরনের পরীক্ষার সময় ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি হয় ঠিকই কিন্তু সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

এই সার্ন ল্যাবরেটরিরই একটি প্রজেক্ট হল ‘অপেরা’ (OPERA – Oscillating Project with Emulsion-tRacking Apparatus). এই প্রজেক্টে বিজ্ঞানীরা নিউট্রিনো নামক মৌলিক কণা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তারা সার্ন ল্যাবরেটরি থেকে কিছু নিউট্রিনো কণা ৭৩০ কিলোমিটার দূরে ইটালির ‘গ্রান সাসো’ ল্যাবরেটরিতে পাঠান। দেখা গেল, নিউট্রিনো কণা আলোর গতির চেয়ে এক সেকেন্ডের ৬০ বিলিয়ন ভাগের একভাগ আগে (৬০ ন্যানো-সেকেন্ড) ইটালির ল্যাবরেটরিতে পৌঁছে গেছে। এভাবে পাঠানো প্রায় ১৫,০০০ নিউট্রিনো কণিকার গতি বিজ্ঞানীরা পরিমাপ করে দেখলেন, নিউট্রিনো কণাগুলো আলোর গতিবেগের (সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার) চেয়ে ৬ কিলোমিটার দ্রুতবেগে ভ্রমণ করেছে। প্রায় ছয় মাস ধরে বার বার পরীক্ষা করে অবশেষে গত নভেম্বরে তাঁরা এই আবিস্কারের খবর প্রকাশ করেন।

সাধারণ মানুষের কাছে ৬০ ন্যানো-সেকেন্ড সময়ের ব্যবধান নগন্য মনে হলেও তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানে এর প্রভাব অকল্পনীয়। কারণ, কোনো বস্তু আলোর চেয়ে দ্রুত বেগে চলতে শুরু করলে অদ্ভুত সব ব্যাপার ঘটতে পারে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব (Special Theory of Relativity) অনুযায়ী, কোনো বস্তুর বেগ যত বাড়বে ভর ততই বাড়তে থাকবে, সময় ধীরে চলবে এবং দৈর্ঘ সঙ্কুচিত হতে থাকবে। আলোর কাছাকাছি বেগে চলতে থাকলে বস্তুর ভর অসীম হয়ে যাবে। আর অসীম ভরের কোনো বস্তুকে আলোর বেগে চালাতে হলে অসীম শক্তির দরকার। তাই ভরবাহী কোনো পদার্থের গতিবেগ আলোর গতিবেগ দ্বারা সীমিত।

তবে আলোক তরঙ্গ-কণা ‘ফোটন” ভরশূন্য বলে আলোর বেগে চললে ফোটনের ভর বেড়ে গিয়ে অসীমে দাঁড়াবার সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু নিউট্রিনোর ভর অন্যান্য মৌলিক কণার তুলনায় খুব নগন্য হলেও ফোটনের মতো শূন্য নয়। তাই সার্নের পরীক্ষায়, ভর অসীম না হয়ে নিউট্রিনো কণাগুলো কিভাবে আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে ৭৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিল, সেটাই অনেক বিজ্ঞানীর মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি করেছে।

সংশয়বাদী বিজ্ঞানীদের অভিমত হল, সার্নের পরীক্ষায় কোথাও কোনো ভুল রয়েছে যা এখনো আমাদের চোখে পড়ছে না। যেসব বিষয় নিয়ে তাদের সন্দেহ হচ্ছে সেগুলো হলো, আপেক্ষিকতার প্রভাব, সময়ের ক্রমাঙ্কন, নিউট্রনের পাড়ি দেয়া দূরত্বের মাপ, সঠিকভাবে নিউট্রিনো কণা শনাক্তকরণ ইত্যাদি। জেনেভা এবং ইটালিতে সময় মাপার সময় এ দু’জায়গার ঘড়ির উপর মহাকর্ষ বলের প্রভাব হিসাবে না নেয়ায় লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের বিজ্ঞানী কার্লো কন্টাল্ডি সার্নের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর মতে, গ্রান সাসোর তুলনায় সার্নের অবস্থান পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরে হওয়ায় মহাকর্ষ বলের তারতম্যের কারণে সার্নের ঘড়ি গ্রান সাসো থেকে সামান্য ধীরে চলবে।

এদিকে ইটালির গ্রান সাসোতে, ‘ইকারুস’ (ICARUS) নামের পরীক্ষায়, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল সার্ন হতে ইটালিতে পাঠানো নিউট্রিনো কণাগুলো থেকে বিকিরণ শক্তি মেপে দেখেছেন। আলোর চেয়ে বেশি বেগে নিউট্রিনো ভ্রমণ করলে নিউট্রিনোগুলো ইলেকট্রন ও পজিট্রন বিকিরণ করে শক্তি ক্ষয় করে ফেলার কথা। কিন্তু ইকারুস পরীক্ষায় শক্তি ক্ষয় হবার কোনো প্রমাণ মেলেনি। এখানেও বিজ্ঞানীরা ‘অপেরা’ গবেষণার ফলাফলের সাথে মিল খুঁজে পাননি।

বিজ্ঞানের কোনো তত্ত্ব কিংবা সূত্র চিরস্থায়ী নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অসঙ্গতি ধরা পড়লে পুরোনো তত্ত্ব প্রত্যাখান করে নতুন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়। সেই কথাই এখন বলছি। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের কথা। আইনস্টাইন তখন সবেমাত্র পিএইচডি ডিগ্রি শেষ করে সুইস প্যাটেন্ট অফিসে একটি তৃতীয় শ্রেণীর কেরানির চাকরি করছেন। সেই সময় নিউটনই ছিলেন বিজ্ঞান জগতের শাহানশাহ। ১৬৮৭ সালে নিউটনের লেখা ‘প্রিন্সিপিয়া’ গ্রন্থে বর্ণিত মহাকর্ষ তত্ত্ব দিয়েই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কাজ চলে যাচ্ছিল।

নিউটন তাঁর অভিকর্ষ তত্ত্ব দিয়ে প্রমাণ করলেন, জগতে স্থির বলতে কিছু নেই, সবই গতিশীল। ওই যুগে কালের নিরপেক্ষতা (Absolute Time) সম্পর্কে সবার বিশ্বাস ছিল সুদৃঢ়। কিন্তু আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে যুগান্তকারী আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব দিয়ে বদলে দিলেন নিউটনের ধ্যান ধ্যারণাকে। তিনি বললেন, স্থান (Space) ও কাল (Time) সবই আপেক্ষিক। জগতের কোনো কিছুুই আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চলতে পারে না। আর আলোর কাছাকাছি বেগে চলতে থাকলে বস্তুর ভর অসীম হয়ে যাবে। পদার্থের ভর ও শক্তি সম্পর্কিত মাত্র তিন অক্ষরের একটি ছোট্ট সমীকরণ (E=mc2) দিয়ে তিনি সেটা প্রমাণও করলেন।

এই আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আইনস্টাইনকে বানিয়ে দিল বিজ্ঞানের নতুন সুপারস্টার। কিন্তু তাই বলে আমরা যদি মনে করি নিউটনের সূত্র ভুল, সেটা ঠিক হবে না। যখন বস্তুর গতিবেগ থাকে অল্প তখন নিউটন এবং আইনস্টাইনের তত্ত্ব একই রকম ফলাফল দেয়। কেবল বিশেষ ক্ষেত্রেই নিউটনের সূত্র ভেঙ্গে পড়ে। যেমন যখন মাধ্যাকর্ষণ বল প্রচন্ড বেশি হয়, অথবা বস্তু কণা যখন আলোর বেগের কাছাকাছি চলতে থাকে। পরবর্তীতে আইনস্টাইন নিউটনের মহাকর্ষকেই আপেক্ষিকতার আলোকে ব্যাখ্যা করে দিলেন নতুন তত্ত্ব, ‘আপেক্ষিকতার ব্যাপক তত্ত্ব’ (General theory of Relativity). তাই আজকে যারা আইনস্টাইনের তত্ত্ব মিথ্যে হয়ে গেল বলে সন্দেহ করছেন তাদের ধারণা ঠিক নয়। নিউট্রিনো আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চললেও আইনস্টাইনের তত্ত্ব ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে না, কিছু ধ্রুবকের মান পরিবর্তিত হয়ে হয়তো এই তত্ত্ব আরো ব্যপকতা লাভ করবে।

প্রয়াত জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞানী কার্ল স্যাগানের ভাষায়, Outstanding statements require outstanding proof, অর্থাৎ অসাধারণ দাবির জন্য অসাধারণ প্রমাণ দেয়া দরকার। আইনস্টাইনের তত্ত্ব গত এক শতকে হাজারো পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে বার বার। কখনো কোনো ধরনের বিচ্যুতি কিংবা সংশয় পরীক্ষার ফলাফলকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাই সার্নের বিজ্ঞানীরা যদি তাদের অসামান্য দাবিকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে আরো বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অসাধারণ প্রমাণ পেশ করতে হবে।