পৃথিবীতে ঘনিয়ে আসছে মহাবিপর্যয়। ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বরই হবে আমাদের এই প্রিয় গ্রহের শেষ দিন। পেট্রিক গেরিল নামের একজন বেলজিয়ান জ্যোতির্বিদ তার বেস্টসেলার বই ‘দি আরিয়ন প্রফেসি’তে দাবি করেছেন, মহাজাগতিক দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট ভূমিকম্প ও সুনামিতে ওই দিনই ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ত্ব। প্রাচীন মায়া ও মিসরীয় সভ্যতার পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে তিনি নাকি মহাপ্রলয়ের দিনক্ষণ খুঁজে পেয়েছেন, যা হচ্ছে ২১.১২.২০১২। পেট্রিক গেরিল ২০০৫ ও ২০০৭ সালে প্রকাশ করেছেন আরও দু’টি বেস্টসেলার বই, ‘দি ওয়ার্ল্ড কেটাক্লিসম ইন ২০১২’ এবং ‘হাউ টু সারভাইভ ২০১২’।
অন্তর্জালে ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে www.hoW.osurvive2012.com নামের একটি ওয়েবসাইট। একই বিষয়ন্তু নিয়ে ২০০৯ সালে তৈরি হয়েছে সাড়া জাগানো হলিউড মুভি ‘২০১২’। ২০১২ সালের আগমনে টিভি, খবরের কাগজ ও হাজারো ওয়বেসাইটে মহাপ্রলয় নিয়ে চমকপ্রদ ভবিষ্যদ্বাণী ও প্রচারণা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়ায় যে, মানুষকে আশ্বস্ত করার জন্য ‘নাসা’ ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়, এ ধরনের ঘটনার কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য তাদের কাছে নেই। আসুন, যে সব কারণে পৃথিবী লন্ডভন্ড হয়ে যাবে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো একে একে পরখ করে দেখা যাক।
মায়া সভ্যতার ক্যালেন্ডারের সমাপ্তি: মায়া সভ্যতা উদ্ভাবিত ৫১২৫ বছরের পুরোনো ক্যালেন্ডার (Mesoamerican Long Count Calendar) ২১.১২.২০১২ তারিখে সমাপ্ত হবে। মায়ান পঞ্জিকার সমাপ্তিকে পৃথিবীর সমাপ্তি বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন পেট্রিক গেরিলসহ আরো অনেকই, যা বিজ্ঞানীরা মানতে রাজি নন। প্রতি বছর জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে আমরা যেমন গ্র্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের নতুন বর্ষের গণনা শুরু করি, ঠিক তেমনি ক্যালেন্ডারের সমাপ্তি মানবসভ্যতার বিলুপ্তির নয় নতুন কালের শুরুরই ঈঙ্গিত দেয়। উল্লেখ্য, আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে মায়া সভ্যতার বিলুপ্তি ঘটেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতশাস্ত্রে উন্নত মায়ানরা ২০১২ সালে মনুষ্য প্রজাতির বিলুপ্তির ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারলেন; অথচ নিজেদের হারিয়ে যাওয়ার দিনক্ষণ দিয়ে যেতে পারলেন না, এ কেমন কথা?
‘ভূচুম্বকীয় বিপরীতীকরণ’ (Geomagnetic Reversal) – পৃথিবীটা নিজেই হল এটি বিশাল চুম্বকক্ষেত্র। পৃথিবীর ভৌগলিক উত্তর গোলার্ধে রয়েছে চুম্বকীয় উত্তর মেরু আর দক্ষিণ গোলার্ধে রয়েছে চুম্বকীয় দক্ষিণ মেরুর অবস্থান। দীর্ঘ সময় পর এই মেরুগুলো একে অন্যের স্থান বদল করে অর্থাৎ উত্তর মেরু হয় দক্ষিণ আর দক্ষিণ হয় উত্তর মেরু। আজ থেকে প্রায় ৮ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর শেষ বিপরীতীকরণ হবার প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর মেরু বিপরীতীকরণের সময় পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্র কিছু সময়ের জন্য কমে যেতে পারে। ফলে সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর রশ্মি পৃথিবীতে ঢুকে পড়ে জীবজগতের ক্ষতি করতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে কিন্তু তাতে জীবকুল বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। আর ওই সময় ভূমিকম্প কিংবা সুনামি হবার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণও নেই।
সুপারনোভা বিস্ফোরণ: একটি তারা যখন জ্বালানী নিঃশেষ করে তার জীবনকালের শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়ায়, নিজস্ব ভরের কারণে সৃষ্ট মধ্যাকর্ষণের প্রভাবে সেটি তখন প্রবলভাবে সঙ্কুচিত হতে থাকে। সঙ্কুচিত হতে হতে একসময় প্রচন্ড সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে বাইরের স্তরটি ভেঙ্গেচুরে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই সুপারনোভার বিকিরণ এতই শক্তিশালী যে, যদি পৃথিবীতে এসে পড়ে তাহলে কোনো প্রাণেরই অস্তিত্ব থাকবে না।
জ্যোতির্বিদদের হিসাব অনুযায়ী, সাধারণতঃ প্রতি শতবর্ষে একটি কিংবা দু’টি সুপারনোভার বিস্ফোরণ ঘটে থাকে। তবে ওজন স্তর ভেদ করে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি করতে হলে কথিত সুপারনোভার বিস্ফোরণ পৃথিবী থেকে কমপক্ষে ৫০ আলোকবর্ষ দূরত্বে ঘটতে হবে। আর ৫০ আলোকবর্ষের চেয়ে কাছাকাছি দূরত্বের মধ্যে সুপারনোভা হতে পারে এমন কোনো তারার সন্ধান বিজ্ঞানীরা এখনো পাননি। এখানে উল্লেখ্য, সব তারাই কিন্তু সুপারনোভায় রুপ নেয় না। যেসব তারার ভর সূর্যের ভরের ১.৪ গুণের (চন্দ্রশেখরের সীমা) বেশি, কেবল সেগুলোই সুপারনোভা হতে পারবে। তাই দেখা যাচ্ছে, আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সূর্যের সুপারনোভা হবার কোনো সম্ভাবনা নেই।
সূর্যের মৃত্যু কিংবা মহাবিশ্বের সঙ্কোচন: পৃথিবীর শক্তির উৎস হল সূর্য। নিজের জ্বালানী (মূলতঃ হাইড্রোজেন) পুড়িয়ে একদিন সূর্যের মৃত্যু হবে, যার ফলে পৃথিবীরও হবে বিনাশ। কিন্তু সূর্যের জ্বালানী ফুরিয়ে যাবার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে কমপক্ষে আরও পাঁচশ কোটি বছর রয়েছে বাকি। সময়ের শুরুতে মহা বিস্ফোরণের (Big Bang) পর থেকে আমাদের এই মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, একসময় আবার মহাসংকোচনের মাধ্যমে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে মহাবিশ্ব ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আগামী ৫০,০০০ কোটি বছরের মধ্যেও নেই।
মহাকাশে ভাসমান গ্রহাণুর সাথে সংঘর্ষ: ২০১২ সালে বিশাল একটি গ্র্রহাণুর আঘাতে পৃথিবী ধ্বংস হবার কথাও বলা হচ্ছে। ‘নিবিরু’ নামের একটি গ্রহের সাথে পৃথিবীর ধাক্কা লাগার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল ২০০৩ সালে। কিন্তু ২০০৩ সাল নির্বিঘেœ পার হয়ে যাওয়ার পর সংশোধিত তারিখ দেয়া হয়েছে ২০১২ সাল। ২০১০ সালে পৃথিবীর পাশ কেটে যাওয়া ‘এলেনিন’ নামের একটি ধূমকেতু নিয়েও একই ধরনের আতঙ্ক ছড়ানো হয়। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, মহাজাগতিক কোনো বস্তুর সাথে টক্কর লেগে পৃথিবী ধ্বংস হবার মতো ঘটনা ঘটে থাকে মাত্র ১০ লক্ষ বছরে একবার। তাই ২০১২ সালে এমন কোনো সংঘর্ষ হবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে প্রতিদিনই আমাদের মহাকাশ স্ক্যান করে চলেছেন। কোনো ধূমকেতু কিংবা গ্রহাণু যদি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসতেই থাকে, সেটা আমাদের আগেভাগেই জানার কথা।
২০১২ পেরিয়ে এখন চলছে ২০২০। নির্বিঘেœ কেটে গেছে আলোচিত ওই দিন ২১.১২.২০১২। সত্যি বলতে কি, উপরে বর্ণিত মহাজাগতিক দুর্ঘটনা কখন যে ঘটবে সেটা যথাযথ নির্ধারণ করার পদ্ধতি যেহেতু আমাদের জানা নেই, অকস্মাৎ এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা একবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু তাই বলে কিছু মনগড়া ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাস করে শঙ্কার মধ্যে দিন যাপনেরও কোনো মানে হয় না।
