নিউট্রিনো কণা আলোর গতিবেগের চেয়ে ৬ কিলোমিটার দ্রুত চলতে পারে, ইউরোপের একটি বিজ্ঞানী দলের এই দাবি বিজ্ঞান জগতে রীতিমত আলোড়ন তুলেছে। জগতে আলোর গতিই হচ্ছে সর্বোচ্চ, যা কেউ অতিক্রম করতে পারে না। শত বছর আগে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দিয়ে এই বেগ আইনস্টাইনই বেঁধে দিয়েছেন, যা হচ্ছে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার। এতদিন ধরে বিজ্ঞান যা জেনে এসেছে সেটা কি এখন পাল্টে যাবে? গত সেপ্টেম্বরে সুইজারল্যান্ডের সার্ন (CERN – European Centre for Nuclear Research) ল্যাবে নিউট্রিনো নামক মৌলিক কণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে যে ফলাফল পাওয়া গেছে, তাতে বিজ্ঞানীরা চমকে উঠেছেন। ‘অপেরা’ (OPERA – Oscillating Project with Emulsion-tRacking Apparatus) নামের একটি প্রজেক্টের বিজ্ঞানীরা এই সার্ন ল্যাবরেটরি থেকেই কিছু নিউট্রিনো কণা ৭৩২ কিলোমিটার দূরে ইটালির ‘গ্রান সাসো’ ল্যাবরেটরিতে পাঠান। দেখা গেল, নিউট্রিনো কণা আলোর গতির চেয়ে এক সেকেন্ডের ৬০ বিলিয়ন ভাগের একভাগ আগে (৬০ ন্যানো-সেকেন্ড) ইটালির ল্যাবরেটরিতে পৌঁছে গেছে। এভাবে পাঠানো প্রায় ১৫,০০০ নিউট্রিনো কণিকার গতি বিজ্ঞানীরা পরিমাপ করে একই ফল পেলেন। প্রায় ছয় মাস ধরে বার বার পরীক্ষা করে অবশেষে গত নভেম্বরে তাঁরা এই আবিস্কারের খবর জার্নালে প্রকাশ করেন।

৬০ ন্যানো-সেকেন্ড সাধারণ মানুষের কাছে তুচ্ছ মনে হলেও এই তথ্য তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে। কোনো বস্তু আলোর চেয়ে দ্রুত বেগে চলতে শুরু করলে বিভিন্ন সব অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে পারে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব (Special Theory of Relativity) অনুযায়ী কোনো বস্তুর বেগ যত বাড়বে ভর ততই বাড়তে থাকবে, সময় ধীরে চলবে এবং দৈর্ঘ সঙ্কুচিত হতে থাকবে। আলোর কাছাকাছি বেগে চলতে থাকলে বস্তুর ভর অসীম হয়ে যাবে। আর অসীম ভরের কোনো বস্তুকে আলোর বেগে চালাতে হলে অসীম শক্তির দরকার। তাই বলা হয়, ভরবাহী কোনো পদার্থের পক্ষে আলোর গতিবেগ অতিক্রম করা সম্ভব নয়। আলোক তরঙ্গ-কণা ফোটনের ভর শূন্য বলে আলো নিজেই ৩ লক্ষ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে, কারণ তাতে ফোটনের ভর বেড়ে অসীমে গিয়ে দাঁড়াবার সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু নিউট্রিনোর ভর অন্যান্য মৌলিক কণার তুলনায় খুব নগন্য হলেও ফোটনের মতো শূন্য নয়। তাই সার্নের পরীক্ষায় ভর অসীম না হয়ে নিউট্রিনো কণাগুলো কিভাবে আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে ৭৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিল, সেটাই বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলছে।

তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আলোর গতিবেগ লঙ্ঘিত হতেও পারে। বিজ্ঞানী হাবলের সম্প্রসারমান মহাবিশ্বের তত্ত্ব অনুযায়ী, যে গ্যালাক্সি যত দূরে তা তত বেশি হারে পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবে। এ হিসাবে দেখা যায়, পৃথিবী থেকে ১৪ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সিগুলো আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে অপসারিত হচ্ছে। আর মহাবিষ্ফোরণের (Big Bang) ঠিক পরে আমাদের এই মহাবিশ্ব, আলোর চেয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন বেশি হারে ষ্ফীত হয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে কি আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব লংঘিত হচ্ছে না? উত্তর হলো, না। আপেক্ষিকতার তত্ত্ব মতে স্থানের মধ্য দিয়ে কোনো পদার্থ আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না। কিন্তু স্থানের নিজের সম্প্রসারণ বা স্ফীতি এই নীতি লঙ্ঘন করে না। তবে স্থির অবস্থায় ভরশূন্য নয় বলে নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে এটা খাটে না।

বিশ্বের অনেক খ্যাতিমান পদার্থবিজ্ঞানী সার্নের ফলাফল নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। আইস্টাইনের তত্ত্ব বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে বহুবার, কখনো এক চুল পরিমাণও বিচ্যুতি কিংবা অসঙ্গতির খবর আসেনি। তাই সংশয়বাদী বিজ্ঞানীদের অভিমত হলো, সার্নের পরীক্ষায় কোথাও কোনো ভুল রয়েছে যা এখনো আমাদের চোখে পড়ছে না। যেসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি ধরা পড়েছে সেগুলো হলো, আপেক্ষিকতার প্রভাব, সময়ের ক্রমাঙ্কন, নিউট্রিনোর পাড়ি দেয়া দূরত্বের মাপ, সঠিকভাবে নিউট্রিনো কণা শনাক্তকরণ ইত্যাদি। জেনেভার সার্ন এবং ইটালির গ্রান সাসোর ল্যাব, এ দু’জায়গার ঘড়ির উপর মহাকর্ষ বলের প্রভাব হিসাবে না নেয়ায় লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের বিজ্ঞানী কার্লো কন্টাল্ডি সার্নের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর মতে, গ্রান সাসোর তুলনায় সার্নের অবস্থান পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরে হওয়ায় মহাকর্ষ বলের তারতম্যের কারণে সার্নের ঘড়ি গ্রান সাসো থেকে সামান্য ধীরে চলবে।

এদিকে ইটালির গ্রান সাসোতে, ‘ইকারুস’ (ICARUS) নামের পরীক্ষায় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল সার্ন হতে ইটালিতে পাঠানো নিউট্রিনো কণাগুলো থেকে বিকীর্ণ শক্তি মেপে দেখেছেন। আলোর চেয়ে বেশি বেগে নিউট্রিনো ভ্রমণ করলে নিউট্রিনোগুলো ইলেকট্্রন ও পজিট্রন বিকিরণ করে শক্তি ক্ষয় করে ফেলার কথা। কিন্তু ইকারুস পরীক্ষায় শক্তি ক্ষয় হবার কোনো প্রমাণ মেলেনি। এখানেও বিজ্ঞানীরা ‘অপেরা’ গবেষণার ফলাফলের সাথে মিল খুঁজে পাননি।

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েল্স-এর তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ভিক্টর ফ্ল্যামবম অপেরা গবেষণার ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট নন। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৮৭ সালের সুপারনোভার ((SN 1987A) উদাহরণ তুলে ধরেন। ১৬০,০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই সুপারনোভা পর্যবেক্ষণের সময় বিজ্ঞানীরা দেখেন, সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় নির্গত ফোটন ও নিউট্রিনো কণা একই সময়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে। অপেরা পরীক্ষামতে, নিউট্রিনো যদি আলোর চেয়ে দ্রুত চলতো তাহলে ফোটনের চেয়ে ৪ বছর আগেই তাদের পৃথিবীতে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু আসলে তা ঘটেনি, কারণ ১৯৮২-৮৩ সালে কোনো নিউট্রিনোর সন্ধান বিজ্ঞানীরা পাননি।

বিজ্ঞানের কোনো তত্ত্ব কিংবা সূত্র চিরস্থায়ী নয়। পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে অসঙ্গতি ধরা পড়লে পুরোনো তত্ত্ব প্রত্যাখান করে নতুন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়। আইনস্টানের আবির্ভাবের আগে নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হবে এমন কথা কেউ কখনো ভাবেনি। নিউটন ছিলেন সেই সময়কার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তার সূত্র দিয়ে মানুষের দিব্যি কাজ চলে যাচ্ছিল। কিন্তু ১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের যুগান্তকারী আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব নিউটনীয়ন বিশ্বের ধ্যান-ধারণাকে পুরো পাল্টে দেয়। তেমনি ভরবাহী কণা যদি আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে চলতে পারে, তাহলে এতদিনের অলঙ্ঘনীয় আইনস্টাইনের তত্ত্বেরও পূনর্মূল্যায়ন করতে হবে। পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তিগুলো নিয়েও আবার নতুন করে ভাবতে হবে। তবে অপেরা গবেষণার ফল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার জন্য বহু স্বতন্ত্র গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। ইতিমধ্যে ফলাফল যাচাই করার জন্য সার্ন গবেষণার তথ্য-উপাত্ত বিশ্বের বিভিন্ন বিজ্ঞানীর কাছে পাঠানো হচ্ছে। চূড়ান্ত রায় জানার জন্য হয়তো আমাদের আরো অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।