বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই চট্টগ্রাম নগরীর জনগণ জলবন্দী হবার আতঙ্কে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন শহরেও ভারী বৃষ্টিপাতের জন্য জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই জলাবদ্ধতা এখানকার মতো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরীর সমস্যা হচ্ছে অল্প বৃষ্টিপাতেই জলমগ্ন হয়ে যায় শহর। দিনের পর দিন পানিতে ডুবে থাকে রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকা।
চট্টগ্রাম শহরে বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৮০০ মিলিমিটারের মধ্যে ওঠানাম করে। এই ধরনের বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত এবং কার্যকর নিষ্কাষণব্যবস্থা। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামে নেই ভূগর্ভস্থ পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা বা স্টর্মওয়াটার ড্রেইনেজ সিস্টেম, নেই বাড়ি-ঘরের টয়লেট থেকে নির্গত ময়লা পানি নিষ্কাশনের জন্য সুয়ারেজ সিস্টেম। বৃষ্টি এবং ময়লা পানি নিষ্কাষণের জন্য ড্রেন, নদী-নালা, খাল-বিলের মতো উন্মুক্ত ড্রেইনেজ ব্যবস্থার ওপর পুরোপরি নির্ভর করতে হয়। কিছু কিছু বাড়ি বা স্থাপনায় সেপ্টিক ট্যাংক থাকলেও ময়লা পানি সরাসরি ড্রেন, খাল হয়ে সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ড্রেন, নদী-নালা, খাল-বিলের সীমিত ধারণ ক্ষমতার কারণে মাত্র ১০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলেই চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসা পাইপ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ করে থাকে। বৈজ্ঞানিক জরিপে দেখা গেছে, বিভিন্ন কারণে পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কে সাধারণত ৫-১০% লিকেজ থাকে এবং বড় শহরে এটা ৩৫% পর্যন্ত হতে পারে। বর্জ্য, মলমূত্র ও ময়লা পানি নদী-নালা, খাল এবং ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করছে। পাইপ নেটওয়ার্কের লিকেজের কারণে তাই সুপেয় পানিও দূষিত হতে পারে। এটা পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি।
মাছ এবং জলজ প্রাণী পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করেই বেঁচে থাকে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ লিটারে ৫ মিলিগ্রামের নিচে নেমে গেলে জলজ প্রাণী হুমকির মুখে পড়ে। অক্সিজেনের পরিমাণ ১-২ মিলিগ্রামের নিচে নেমে গলে মাছ আর বাঁচতে পারে না। চট্টগ্রামের বড় বড় খালে পানি স্থবির হয়ে আছে, নেই কোনো প্রবাহ। দূষণের জন্য পানি রং কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে। বিভিন্ন পয়েন্টে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, চাক্তাই ও মহেশ খালের পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যে নেমে এসেছে। এদিকে কর্ণফুলী নদীর পানির দূষণও চরম আকার ধারণ করেছে। সহসা ব্যবস্থা না নিলে চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণ, সুপেয় পানির উৎস কর্ণফুলী মৃত নদীতে পারিণত হবে।
জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবার জন্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ত্বরিত ও স্বল্পমেয়াদী প্রচেষ্টা হিসাবে রাস্তা-ঘাট উঁচু করা হচ্ছে। ফলে কিছুদনের জন্য রাস্তায় পানি না উঠলেও রাস্তার দু’পাশের দোকান-পাট ও ঘরবাড়ি প্লাবিত হচ্ছে। শহরের সড়কগুলো উঁচু করার কোনো প্রযুক্তিগত ভিত্তি বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। রাস্তা উঁচু করলে কি জলাবব্ধতার অবসান হবে? রাস্তার উচ্চতা বাড়ালে আশেপাশের এলাকায় কি প্রভাব পড়তে পারে সে নিয়ে কি যথাযথ অনুসন্ধান করা হয়েছে? শুধু কি তাই? নতুন বাড়ি-ঘরের ভিত্তিও রাস্তার সাথে পাল্লা দিয়ে ক্রমান্বয়ে উঁচু করে তৈরি করা হচ্ছে। রাস্তার উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে হয়তো দু’এক বছর রাস্তায় পানি উঠবে না। কিন্তু পরবর্তীতে রাস্তা আবারও উঁচু করতে হবে। এভাবে বার বার রাস্তা উঁচু করা হলে পুরো শহরটা ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যানের মতো আকাশে নির্মাণ করতে হবে। রাস্তার উচ্চতা বৃদ্ধি সমাধানের বদলে সমস্যাকে আরো ঘনীভূত করছে।
রোড ডিজাইনের নিয়মানুযায়ী রাস্তার উচ্চতা সাধারণতঃ দুপাশের জমি থেকে নিম্নস্তরে নির্ধারণ করা হয় যাতে বৃষ্টির পানি রাস্তায় নির্গমন করতে পারে। আর যথাযত ফ্লাড মডেলিংয়ের মাধ্যমে বন্যার পানির সর্বোচ্চ উচ্চতা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিটি এলাকার বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনার প্লিন্থ লেভেল নির্দিষ্ট করে দেন। কিন্তু এখানে হচ্ছে ঠিক তার উল্টো।
আগ্রাবাদ এবং ডবলমুরিং এলাকায় শেখমুজিব এবং পোর্ট কানেক্টিং সড়কের সংযোগকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হচ্ছে আগ্রাবাদ এক্সেস রোড। এই সড়কের আশেপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ব্যবসা-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, দোকান-পাট ও বাড়ি-ঘর। সম্প্রতি এই রাস্তাকে উঁচু করা হচ্ছে। ওই এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, নতুন নির্মিত ফুটপাতের সমতল থেকে রাস্তা সংলগ্ন স্থাপনাগুলো এক থেকে দেড় মিটার পর্যন্ত নিচে পড়ে গেছে। ফলে একটু বৃষ্টি হলেই সেগুলো জলমগ্ন হবে এবং রাস্তার দু’পাশের সব স্থাপনার নীচতলা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে ওই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র স্থানান্তর করা ছাড়া মানুষের আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না। দীর্ঘদীন ধরে চলা সড়ক নির্মাণ কাজের জন্য দোকান-পাটের বেচাকেনা এবং পুরো এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় জনগণ ও ব্যসায়ীরা যে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন সেই কথা কি কেউ ভেবেছেন?
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সম্প্রতি ৫,৬১৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় খাল খনন, নতুন খাল নির্মাণ, রিটেইনিং দেয়াল নির্মাণসহ অন্যান্য বেশ কিছু কাজ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে হবার কথা। এই প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে আমরা যাই করি না কেন, সমস্যার শেকড়ে না গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করলে জলাবদ্ধতা থেকে কখনো মুক্তি পাওয়া যাবে না। শহরের বিভিন্ন এলাকার রাস্তা উঁচুকরণের যে কাজ চলছে তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এ ধরনের পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন কাজ বাহ্যিক দৃষ্টিতে সুফল দিচ্ছে মনে হলেও পরবর্তীতে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।
