ঈশ্বর কণা (God Paritcle) নামে খ্যাত ‘হিগ্স বোসন’ কণার অস্তিত্বের খোঁজে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে চলছিল রীতিমতো প্রতিযোগিতা। ২০১২ সালে সার্নের ল্যাবরেটরিতে এই অধরা কণার সন্ধান পাওয়ার পর চারদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের খবর পড়ে মনে হলো, ঈশ্বর কণার সাথে এই বুঝি ঈশ্বরেরও সন্ধান পাওয়া গেল। আস্তিক কিংবা নাস্তিক প্রায় সবাইকে এই বিষয়ে কৌতূহলী হতে দেখা গেছে। যে কণা নিয়ে এত হৈ হুল্লোড়, সেই কণার উৎপত্তি কিভাবে সে কথাই প্রথম বলছি।

কোনো পদার্থের ক্ষুদ্রতম অংশের নাম হল পরমাণু বা এটম। পরমাণুকে ভাঙলে পাওয়া যায় ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন। এক সময় ভাবা হতো এগুলোকে হয়তো আর ভাঙা যাবে না, এরাই হল পদার্থের মৌল কণিকা। কিন্তু সেই ধারণা এখন পাল্টে গেছে। প্রোটোন, নিউট্রনদের ভাঙতে ভাঙতে বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন আরো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণিকা। পরীক্ষালব্ধ সব মৌল কণিকাকে বিজ্ঞানীরা দু’টি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন, তা হলো—বোসন (Bosons) এবং ফার্মিয়ন (Fermions) কণা। বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের নামে যাদের নাম তারা হল ‘বোসন কণা’। যেমন ফোটন (Photons), মিসট্রন ইত্যাদি। অন্যদিকে ফার্মিয়ন নামটি এসছে ইটালি বংশোদ্ভূত আমেরিকান বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মিয়নের নাম থেকে। ফার্মিয়ন কণার তালিকায় রয়েছে মিউয়ন, টাউ, কোয়ার্ক এবং নিউট্রিনো।

বোসন কণার বৈশিষ্ট হল এদের আকৃতিগত কোনো ভর নেই, এরা শক্তি বয়ে নেয়ার কাজ করে। তাই এদের বার্তাবহ কণিকাও (Messenger Particles) বলা হয়ে থাকে। যেমন ফোটন। বিজ্ঞানীরা শক্তিকে ভরে রূপান্তরিত করেই বোসন কণার হিসেব করে থাকেন। ১৯৬৪ সালে স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিটার হিগ্স একটি মৌলিক কণার অস্তিত্ব ধারণা করতে পেরেছিলেন যা বস্তুর ভর তৈরিতে সাহায্য করে। হিগ্স কণা নামে পরিচিত সেই কণার কোনো প্রমাণ বিজ্ঞানীরা তখন দিতে পারেননি। এছাড়া মহাবিশ্বের শুরু কিভাবে তার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেলেও’ যে সব কণার কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে কেবল এই হিগ্স কণাই এ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। আজ প্রায় অর্ধ শতাব্দি পর সার্নের পরীক্ষায় সেই রহস্যময় ‘হিগ্স’ কণাকেই খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা, যা এখন ‘ঈশ্বর কণা’ নামে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।

সার্ন গবেষণাগারের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে (Large Hadron Collider) আলোর বেগে ধাবমান বিপরীতমুখী প্রোটন কণার মধ্যে সংঘর্ষ ঘটিয়ে মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) ঠিক অব্যবহিত পরের তুল্য অকল্পনীয় পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করা হয়। আর তা থেকেই দেখা মিলেছে হিগ্স কণিকা, যার ভর ১৩৩টি প্রোটন কণার মতো। উল্লেখ্য, এই কণা আবার ‘বোসন’ গ্রুপের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

স্ট্যান্ডার্ড মডেলের অনাবিষ্কৃত কণাটির গুরুত্ব সাধারণ মানুষকে বোঝাবার জন্য ১৯৯৩ সালে একটি বই লেখেন পদার্থবিদ্যায় নোবেলপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী লিও ম্যাক্স ল্যাডারম্যান। তবে বইটির নাম নিয়ে প্রকাশকের সাথে ল্যাডারম্যানের ঘটে বিপত্তি।

ল্যাডারম্যান বইয়ের নাম ‘হিগ্স বোসন’ দিতে চাইলে প্রকাশক বললেন, এই নামে বই বিক্রি হবে না, অন্য কোনো পাঠকপ্রিয় নামের কথা ভাবুন। একপর্যায়ে ল্যাডারম্যান হতাশ হয়ে বললেন, গডড্যামন পার্টিকেল (Goddamn Particle) রাখলে কেমন হয়? শেষ মুহূর্তে প্রকাশক নামটাকে একটু ছেটে দিয়ে শিরোনাম দিলেন, The God Particle. নাস্তিক বিজ্ঞানীর বইয়ের শিরোনামে হাজির হয়েছেন স্বয়ং ঈশ্বর! বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো বিক্রি হতে লাগল বই, নিমিষেই উঠে এলো বেস্টসেলারের তালিকার শীর্ষে। শুধু সস্তা জনপ্রিয়তাই নয়, এই নামকরণের পেছনে গবেষণায় সরকারি অনুদান পেতে আমেরিকার খ্রিষ্টান মৌলবাদী সিনেটরদের সমর্থন পাওয়া যাবে এমন একটা ধারণাও নাকি কাজ করছিল। এই হচ্ছে বইটি নামকরণের নেপথ্য কাহিনী।

বাজারে কাটতি বাড়ানোর জন্য ধর্মীয় অনূভূতির এ ধরনের ব্যবহার একজন বিজ্ঞানীর সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ধর্মের নাম ভেঙ্গে যারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেন তাদের আমরা ধর্মব্যবসায়ী বলি। কিন্তু ল্যাডারম্যানের মতো এমন একজন নাস্তিক বিজ্ঞানী যখন প্রকাশক রাজি হয়নি এই অজুহাতে ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করেন তখন বিস্মিত হই বৈকি। ল্যাডারম্যানের বইয়ের জন্য অনেক উৎসাহী ধর্মবিশ্বাসীরা বলতে শুরু করেছেন, অবশেষে খোদার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে বিজ্ঞানীরা।

হিগ্স কণা মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্য ব্যাখ্যায় অত্যন্ত গরুত্বপূর্ণ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মোদ্দাকথা হল, হিগ্স-বোসন কণা আবিস্কারের সাথে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তাই কেন জানি মনে হয়, বিভ্রান্তিমূলক নামকরণের কারণে মূল বিষয়বস্তু বাদ দিয়ে মিডিয়ায় যে উটকো বিতর্কের ঝড় উঠলো, তাতে বিজ্ঞানের এমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার কিছুটা হলেও কি খাটো হয়ে গেল না?