২০১৫ সালের ১৫ এপ্রিল নেপালে এক সর্বনাশা ভূমিকম্পে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বেশ কিছু এলাকা ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের তীব্রতা হিরোশিমায় আঘাত হানা আনবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী। নেপালের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল গোরখা এলাকা না হয়ে যদি কাঠমান্ডু হতো, তাহলে নেপালের রাজধানী শহর হিরোশিমার মতো হয়তো ধূলোয় মিশে যেতো। নেপালের ভূমিকম্পের আঁচ বাংলাদেশের মানুষও পেয়েছে। তবে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় বাংলাদেশে অনুভূত ভূমিকম্পের তীব্রতার মাত্রা ছিল ৪-৫, ফলে আমরা নিশ্চিত ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাই।
ভূমিকম্প কেন হয়? এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসুকের শেষ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে ভূপৃষ্ঠের প্রতিটি স্তর কয়েকটি প্লেটে বিভক্ত যাকে টেকটোনিক প্লেট বলা হয়। ভূগর্ভস্থ এই বিশাল প্লেটগুলো এক জায়গায় স্থির থাকে না, খুব মন্থর গতিতে স্থান পরিবর্তন করে। আমাদের মহাদেশ ও সাগরগুলো এই প্লেটের উপরই অবস্থান করছে। সঞ্চারণশীল এমন দু’টি টেকটোনিক প্লেট যখন এক অপরের সাথে ধাক্কা খায় তখন বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। ফলে মাটির তলদেশ কেঁপে ওঠে আর আমরা ভূকম্পন অনুভব করি। হিমালয়ের নিচে একটি ফল্ট লাইন বরাবর রয়েছে ভারতীয় এবং ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেট। ভারতীয় প্লেট বছরে ৪৫ মিলিমিটার করে স্থান পরিবর্তন করে ইউরেশীয় প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। এই দু’টি প্লেটের ঘর্ষণের ফলেই সৃষ্টি হয় নেপালের সাম্প্রতিক ভূমিকম্প। ভূতত্ত্ববিদদের মতে এই দু’টি প্লেটের পিছলে যাবার কারণেই বহুকাল আগে সৃষ্টি হয়েছিল আজকের এই হিমালয় পর্বতমালা।
ভারতীয় ও মধ্য এশীয় টেকটোনিক প্লেটের লাইনে অবস্থিত বাংলাদেশও ভূমিকম্প থেকে ঝুঁকিমুক্ত নয়। গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল বিশেষ করে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, বগুড়া, রংপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ ইত্যাদি শহর ভূমিকম্পের জন্য খুব ঝূঁকিপূর্ণ। ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের মতো প্রধান শহরগুলো মাঝারি ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। ঢাকা শহরে যেভাবে অপরিকল্পিতভাবে দালানকোঠা ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠছে, তাতে একটি মাঝারি আকারের ভূমিকম্পও ব্যপক ক্ষয়-ক্ষতি করতে পারে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল ১৯১৭ সালে সিলেট অঞ্চলে রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৭.৬। আর ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামে সংঘটিত ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছিল ২৩ জন মানুষ।
মধ্যপ্রাচ্য ও গাল্ফ অঞ্চলের দেশগুলোতে এ পর্যন্ত বড় ধরনের ভূমিকম্প না হলেও আগামীতে বড় ধরনের ভূমিকম্প হবার আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ভূতত্ত্ববিদদের দেয়া তথ্যানুযায়ী গাল্ফ অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠের নিচে সঞ্চানরণশীল এরাবিয়ান প্লেট বছরে ৩৭ মিলিমিটার হারে ইউরেশীয় প্লেটের নিচে পিছলে ঢুকে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে এই দু’টি প্লেটের মধ্যে রেষারেষির কারণে গাল্ফ অঞ্চলে একটি বড় আকারের ভূমিকম্প হতে পারে, যা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আরব উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্প সক্রিয় দেশ হচ্ছে ইরান, যার ৯০ শতাংশ এলাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে ইরানে যেসব ভূমিকম্প হয় তার আঁচ গাল্ফ অঞ্চলের দেশগুলোতেও আঘাত হানে। গত এক শতকে ছোট বড় বিভিন্ন মাত্রার ভূমিকম্পের আঘাতে ইরানে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ২০১৩ সালের এপ্রিলের ৯ তারিখ রিখটার স্কেলে ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্প হয় ইরানে যার উৎস্থল ছিল কাতার থেকে ৩৮০ কিলোমটির দূরে অবস্থিত বন্দর নগরী বুশেহর। এর প্রভাবে কাতার, আরব, আমিরাতসহ আশেপাশের দেশগুলোতে ভূকম্পন অনুভূত হয়। তবে একই মাসের ১৯ তারিখ ইরানে রিখটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। অ্যারাবিয়ান এবং ইন্ডিয়ান প্লেটের সাথে ইউরেশীয় প্লেটের ঘর্ষণের ফলেই এই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। গাল্ফ অঞ্চলের বিভিন্ন শহর যেমন রিয়াদ, দোহা, মানামা, আবুধাবি, মাসকটসহ দিল্লি ও পাকিস্তানেও ওইদিন ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে।
সাইক্লোন, ঘুর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখন কোথায় আঘাত হানবে সেটা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জানা যায় এবং এর গতিপথও নির্ণয় করা যায়। ফলে দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য জনসাধারণকে আগে থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া যায়। ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা কোনো রকমের পূর্বাভাস ছাড়াই আর্বিভূত হয়।
তবে বড় মাপের কোনো ভূমিকম্পের আগে ওই এলাকায় সাধারণতঃ ছোটখাটো কম্পন হয়ে থাকে যা বিজ্ঞানের ভাষায় ফোর-শক বলা হয়। এই ধরনের কম্পন সম্ভাব্য ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিলেও ভূমিকম্প কখন এবং ঠিক কোথায় হবে তা বলে দেয় না। এছাড়া ছোটখাটো ভূকম্পন হলেই য়ে ভূমিকম্প হবে তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাই ভূমিকম্প নিয়ে সব দেশের পূর্বপ্রস্তুতি থাকা জরুরি। দেশের নাগরিকদেরও এ সময়ে কি করণীয় সে নিয়ে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি।
দালান ও স্থাপনা নির্মাণের সময় ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা নিলে ক্ষয়-ক্ষতির ঝুঁকি কমে যায়। জাপান হচ্ছে তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাপান ভূকম্পনের দেশ। জাপানে প্রতি বছর প্রায় ২০০০ ভূকম্পন হয়। তবে জাপানের ভবনগুলোতে উপযুক্ত ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা থাকায় বড় মাত্রার ভূমিকম্পেও ক্ষয়-ক্ষতি হয় সামান্য। যেমন জাপানে ২০১১ সালের প্রলয়ংকরী টোহুকো ভূমিকম্পে ১৮,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়। অবাক করা কথা হল, রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার এই ভূমিকম্পে নিহত মানুষের অধিকাংশই প্রাণ হারিয়েছিলেন ভূমিকম্প নয় বরং সুনামির কারণে।
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাপানে ভূমিকম্পের অল্প সময় আগে মানুষকে সতর্কবার্তা দেয়া হয়। যেমন ২০১১ সালের টোহুকো ভূমিকম্পের মাত্র ১ মিনিট আগে টোকিওর মানুষ সতর্কবাণী পায়। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য এত কম সময় কি যথেষ্ট? বিজ্ঞানের এই উন্নয়নের যুগেও ভূমিকম্পের উৎস, সঠিক দিন-ক্ষণ হিসাব করে পূর্বাভাস দেয়ার কোনো পন্থা এখনো আবৃস্কিত হয়নি। তবে আশার কথা হল, গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (জিএনএসএস) ব্যবহার করে ভূমিকম্প ও সুনামির সঠিত পূর্বাভাস দেয়া যাবে বলে দাবি করেছেন জাপানের একজন বিজ্ঞানী, জাপান আর্থকোয়েক সায়েন্স এক্সপ্লোরেশন এজেন্সির এডভাইজার সুঞ্জি মুরাই। ভুপৃষ্ঠর গভীরে টেকটোনিক প্লেটের সঞ্চারণের ফলে ভূত্বকের উচ্চতার পরিবর্তন হয়। জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির উচ্চতার সুক্ষ্ম পরিবর্তন সনাক্ত করে ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস দেয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানী মুরাই।
২০১১ সালের জাপানের ভূমিকম্পের তথ্য উপাত্ত পরীক্ষা করে তিনি তার নতুন গবেষণালব্ধ ফলাফলের সত্যতা প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। টোহুকো ভূমিকম্পের উৎসস্থলের আশেপাশের কন্ট্রোল স্টেশনের ডাটা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ভূমিকম্পের আগে বিভিন্ন সময়ে ভূত্বকের উচ্চতার লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটছে। তবে ঘটনার মাত্র তিনদিন আগে ভূত্বকের উচ্চতার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে যা ড. মুরাইয়ের মতে ভূকম্পনের সঠিক আগাম সংকেত দিতে পারে। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানীর মতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে টেকটোনিক প্লেটের সঞ্চালন এবং ভূ-চ্যুতিও সনাক্ত করা সম্ভব। নিত্যদিনের জিএনএসসের ডাটা বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পের আঘাত হানার যদি দুই তিন দিন আগে যদি সংকেত পাওয়া যায় তাহলে লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা পাবে।
