মহাকাশবিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘ব্ল্যাকহোল’ বা ‘কৃষ্ণবিবর’। এ যেন এক অদৃশ্য কৃষ্ণকায় দানব যা গিলে খায় সবকিছু। ব্ল্যাকহোলের মধ্যাকর্ষণ বল এতই বেশি যে, কোন বস্তু এই গহ্বরে পড়লে আর কখনোই ফিরে আসে না। এমনিক আলোও এর মধ্যে চিরতের হারিয়ে যায়, বেরিয়ে আসতে পারে না।

আধুনিক ব্ল্যাকহোল তত্ত্বের জনক হলেন সুপারস্টার পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং। সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্টিফেন হকিং একবার অনলাইনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করলেন, ব্ল্যাকহোলকে ঘিরে থাকা ‘ইভেন্ট হরাইজন’ নামে কথিত সমীনা বা প্রাচীরের কোনো অস্তিত্ব নেই। যা ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ছুড়ে দেয়। ব্ল্যাকহোল নিয়ে ব্ল্যাকহোলের জনকের মুখের কথা কি ফেলনা হতে পারে? স্টিফেন হুকিংয়ের মন্তব্য নিয়ে আলোচনা করার আগে ব্ল্যাকহোলটা আসলেই কি সেটা জেনে নেয়া যাক।

কোনো নক্ষত্র যখন সমস্ত জ্বালানী পুড়িয়ে নিঃশেষ করে জীবনকালের প্রান্তসীমায় আসে, তখন সেটি নিজস্ব মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে সঙ্কুচিত হতে হতে অসামান্য ঘনত্বের একটি ক্ষুদ্র তারায় পরিণত হয়। এই ধরনের তারাকে বলা হয় ‘হোয়াইট ডর্ফ’ (শ্বেতবামন)। তবে সব তারাই জ্বালানী নিঃশেষ হলে শ্বেতবামনে রুপ নেয় না। এর একটি সীমাও বেঁধে দিয়েছেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিদ চন্দ্রশেখর। তাঁর তত্ত্ব মতে, যে সমস্ত তারার ভর সূর্যের চেয়ে ১.১৪ গুণের বেশি, সেগুলো সঙ্কুচিত হয়ে শ্বেতবামনের চেয়ে আরো ঘন ‘নিউট্রন” তারায় পরিণত হয়।

বিজ্ঞানীরা নিউট্রন তারার ঘনত্বের হিসাবও করেছেন। এক চামচ নিউট্রন তারার পদার্থের ওজন হবে প্রায় এক বিলিয়ন টন! তবে কি ধরনের নক্ষত্র নিউট্রন তারায় পরিণত হবে তারও একটা সীমা আছে। যেমন যেসব নক্ষত্রের ভর সূর্যের চেয়ে ১.১৪ থেকে ৩ গুণ বেশি, সেগুলোই কেবল নিউট্রন তারায় রূপান্তরিত হয়। এর চেয়ে বেশি ভরের তারা জ্বালানী নিঃশেষ করে সঙ্কুচিত হতে থাকে। এক সময় অভিকর্ষের চাপে সবকিছু ছোট্ট একটি জায়গায় কেন্দ্রিভূত হয়, যার ঘনত্ব হয়ে যায় অসীম। ওটাই হল সিঙ্গুলারিটি। এখানে পদার্থবিদ্যার সব নিয়ম-কানুন ভেঙ্গে পড়ে। এই সিংগুলারিটিকে কেন্দ্রে রেখে গোলকের মতো একটা জায়গা তৈরি হয়। যার সীমানার নাম ইভেন্ট হরাইজন। ওই সীমানার মধ্যে কোনও কিছ্ ুপড়লে রক্ষা নেই। এমন কি আলো গিয়ে পড়লেও ফিরে আসতে পারে না। ওই ইভেন্ট হরাইজনে ঘেরা সিঙ্গুলারিটিই হলো ব্ল্যাকহোল।

ব্ল্যাকহোলের মধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্রকে ঘিরে আছে এক অদৃশ্য প্রাচীর যার নাম হলো ইভেন্ট হরাইজন (ঘটনা দিগন্ত)। এই সীমানা পার হলে আর ফেরার পথ নেই। স্টিফেন হকিং তাঁর প্রবন্ধে ‘অ্যাপারেন্ট হরাইজন’ নামের একটি সীমানার প্রস্তাব করেছেন যা অস্থায়ীভাবে পদার্থ ও শক্তি আটকে রাখলেও তা ছেড়ে দেয়। ইভেন্ট হরাইজনের অনুপস্থিতি ব্ল্যাকহোল বলে যে কিছু নেই সে ইঙ্গিতই দেয়। স্টিফেন হকিংয়ের এই পর্যবেক্ষণ আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ধ্রুপদ পদার্থ বিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী ‘ঘটনা দিগন্ত’ থেকে কোনো কিছুু বেরিয়ে আসতে পারে না। তার মানে ব্ল্যাকহোলের মধ্যে বস্তু, তথ্য, আলো সবকিছু হারিয়ে যায়। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে ঠিক তার বিপরীত। অর্থাৎ মহাবিশ্ব থেকে কোনো কিছু হারিয়ে যেতে পারে না। স্টিফেন হকিংয়ের মতে এই সাংঘর্ষিক অবস্থার ব্যাখ্যা দিতে হলে মধ্যাকর্ষণ শক্তির সাথে অন্যান্য মৌলিক শক্তিগুলোকে একীভূত করে একটি সমন্বিত তত্ত্বের (ইউনিফাইড গ্রান্ড থিউরি) প্রয়োজন।

বিজ্ঞানী হকিংয়ের পর সম্প্রতি আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী প্রফেসর লরা মারসিনি হফটনের অনলাইনে পোস্ট করা একটি প্রবন্ধ পড়ে বিজ্ঞানীরা নড়ে চড়ে বসেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ব্ল্যাকহোল বলে কিছু থাকতে পারে না। তিনি অংক কষে এটা প্রমাণ করতে পারবেন। তার দাবি সত্য হলে মহাবিশ্বের সৃষ্টি নিয়ে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যাবে বদলে, সবকিছু নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। জ্বালানী ফুরিয়ে গেলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটি নক্ষত্র কিভাবে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয় সে কথা আগেই বলেছি। তবে প্রফেসর হফটনের মতে, একটি নক্ষত্রের মৃত্যু প্রক্রিয়ার সময় ওই নক্ষত্র ভর হারাতে শুরু করবে। ফলে এক সময় নক্ষত্রটিতে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবার মতো পর্যাপ্ত ভর অবশিষ্ট থাকবে না। ফলে কোনো নক্ষত্র ব্ল্যাকহোলে রূপান্তরিত হবার আগেই স্ফীত হয়ে বিস্ফোরিত হবে। তাই আগে যেমনটা ভাবা হয়েছিল ব্ল্যাকহোল সৃষ্টির ফলে সিঙ্গুলারিটি পয়েন্ট (অদ্বৈত বিন্দু) কিংবা ইভেন্ট হরাইজনের মতো তেমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না।

প্রফেসর হফটনের গবেষণা ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্বকে যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তাতে মহাবিশ্ব সৃষ্টির বহুল প্রচারিত তত্ব ‘বিগ ব্যাং’ থিউরিই নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্ব বলে, প্রায় ১৫০০ কোটি বছর আগে এক মহা-বিস্ফোরণের মাধ্যমে অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং অসীম ঘনত্বের অবস্থা থেকেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি। এই অবস্থাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি পয়েন্ট (অদ্বৈত বিন্দু)। যার ঘনত্ব অসীম। অর্থাৎ এ বিন্দু জায়গার মধ্যে জমা আছে প্রচন্ড পরিমাণ পদার্থ। অদ্বৈত বিন্দুতে প্রচলিত বিজ্ঞানের সব সূত্র ভেঙ্গে পড়ে। তবে সিঙ্গুলারিটি বা অনন্য বিন্দুরই যদি অস্তিত্ব না তাহলে প্রশ্নের মুখে পড়বে বিগ ব্যাংক তত্ত্ব।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রকৃতি জগতের চারটি বল দুর্বল নিউক্লিয়, সবল নিউক্লিয়, মধ্যাকর্ষণ ও তুড়িচ্চুুম্বকীয় বল একসাথে মিশে ছিল বিগ ব্যাং-এর প্রথমাবস্থায়। এতএব চারটি বলকে সমন্বিত করা কোনো গ্রান্ড ইউনিফাইড থিউরিই কেবল ব্ল্যাকহোল নিয়ে যে ধাঁধার সৃষ্টি হয়েছে তার সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে ক্লাসিক তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বে¡র মধ্যেকার বিরোধের ফয়সালা করতে পারে। আইনস্টাইন প্রকৃতি জগতের বলগুলোকে একীভূত করতে তার শেষ জীবনে আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি। তবে প্রফেসর আব্দুস সালাম এবং আরো দু’জন বিজ্ঞানী মিলে তড়িচ্চুম্বকীয় এবং দুর্বল নিউক্লিয় বলকে একীভূত করতে সমর্থ হন। এজন্য তারা ১৯৭৯ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু চারটি বলকে সমন্বয় করার তত্ত্ব বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে। তাই যতদিন ব্ল্যাকহোল আছে কি নেই সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে না, ততদিন তাবৎ বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের কাছে ব্ল্যাকহোল বিস্ময়কর রহস্য হয়েই থাকবে।