জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার পরিষদের (আইপিসিসি) একটি বিশেষ রিপোর্টে দেয়া হয়েছে কঠিন সতর্কবার্তা—পৃথিবীকে আবাসযোগ্য রাখতে হলে আমাদের হাতে রয়েছে মাত্র ১২ বছর। ২০১৮ সালে প্রকাশিত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী এক যুগের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে রাখা না গেলে ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হব আমরা। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী বৈরী প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার অর্থনীতি এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশে কৃষির উৎপাদনশীলতা ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে, বেড়ে গেছে দারিদ্রতা ও মানুষের দুর্ভোগ।

বৈশি^ক তাপমাত্রা আর মাত্র ০.৫ ডিগ্রি বেড়ে গেলেই বিশ^জুড়ে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তাপামাত্রার এই সামান্য হেরফেরের জন্য অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ‘গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ’সহ সমুদ্রের কোরাল প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং আর্কটিক অঞ্চলে বরফের গলন বহু গুণ বেড়ে যাবে। সুপেয় পানি লভ্যতা ৫০% শতাংশ কমে যাবে। বিশ্বজুড়ে বনাঞ্চলের দাবানল বেড়ে গিয়ে তাপ-জনিত মৃত্যুর সংখ্য বেড়ে যাবে। কৃষিখাতে শস্য ও ফসলের পরাগায়ণে সহায়ক পোকা-মাকড়ের আবাস ৫০ শতাংশ হ্রাস পাবে, যা কৃষিখাতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্রের পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ক্রমশ যাচ্ছে কমে এবং বেড়ে যাচ্ছে অম্লত্ব। অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ২ ডিগ্রি হলে, সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ ৩০ লক্ষ টন কমে যাবে।

জলবায়ু সংক্রান্ত আইপিসিসি’র এই রিপোর্টে আসন্ন বিপর্যয় উপশমের লক্ষ্যে ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের প্যারিস চুক্তিতে বৈশি^ক তামপাত্রা ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। পৃথিবীর অন্যতম কার্বন দূষণকারী দেশ আমেরিকায় ক্ষমতায় এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো জলবায়ুবিদ্বেষী প্রেসিডেন্ট। যিনি ঘরোয়া রাজনীতিতে ফায়দার জন্য বিশ্ব মানবতার ভবিষ্যতকে জলাঞ্জলি দিতে এতটুকু কুন্ঠিত নন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে ধাপ্পাবাজি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে তিনি সরে এসেছেন। আমেরিকার পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কোনো ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করেছেন। আমেরিকার সাম্প্রতিক বিধ্বংসী হ্যারিকেন, কেপ টাউনের খরা, আর্কটিক বনাঞ্চলের তীব্র দাবানল ইত্যাদি জলবায়ু পরিবর্তনেরই ঈঙ্গিত বহন করে। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘুম ভাঙ্গছে না।

জীবাশ্ম জ্বালানী দ্বারা সৃষ্ট কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক গ্যাস, বৈশ্বিক উষ্ণতার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত এবং প্রমাণিত। অথচ সেই জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার যে শুধু বেড়েই চলেছে তা নয়, জীবাশ্ম জ্বালানী ব্যবসায়ীরা দেশে দেশে রাজিনীতিতে প্রভাব খাটাচ্ছে। নিজেদের পছন্দের রাজনীতিকরা যাতে ক্ষমতায় আসে সেজন্য প্রচুর অর্থ ঢালছে। এদিকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট উগ্র ডানপন্থি জায়ার নলসোনারো ট্রাম্পের মতো প্যারিস জলবায়ূু চুক্তি থেকে থেকে সরে যাওয়ার কথা বলেছেন। এছাড়া আমাজনের ঘনবর্ষন বনাঞ্চল কৃষি ও খনি কাজের জন্য খুলে দেয়া হচ্ছে তাঁর অন্যতম এজেন্ডা। তাই সঙ্গত কারণেই ব্রাজিলে জায়ারের বিজয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে চরম উচ্ছ্বসিত করেছে। এদিকে ট্রাম্পের সুরে সুর মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন জলবায়ু সম্মেলনের মতো ছাঁইপাশের জন্য তাঁদের কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই বলে মন্তব্য করেছেন।

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রডের মধ্যে রাখতে হলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৪৫ শতাংশ কমিয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে শূন্যে নিয়ে আসতে হবে। তার মানে আগামী দু’এক বছরের মধ্যে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে নবায়নযোগ্য বা সবুজশক্তি চালিত কেন্দ্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে। এ ব্যাপারে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে ব্রিটেন। ব্রিটেন ১৯৯০ সাল থেকে আজ অবধি কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ৪০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। বিশে^র সবচেয়ে বড় কয়লা রপ্তানিকারক দেশ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। গত বছরে অস্ট্রেলিয়ার কয়লা রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৮ কোটি টন। অস্ট্রেলিয়া যদিও ২০৫০ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক সকল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু বিশ^ব্যাপী ১৩৯০টি নতুন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলেছে।

বিশ^ব্যাপী যে হারে কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, তা দেখে মনে হচ্ছে আমরা ৩-৪ ডিগ্রি বৈশ্বিক তাপমাত্রার দিকে দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তবে হার মানলে চলবে না। যে করেই হোক, বিশ্বকে কয়লাভিত্তিক জ্বালানী থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানীর দিকে নিয়ে যেতে হবে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনীতি নিয়ে গবেষণায় এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে আজ বাস্তব সত্য, অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার যেন সে কথাই বলে দিচ্ছে। আশা করছি, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণে রাজনীতিকরা এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাকে প্রাধান্য দেবেন।