ডিজিটাল যুগে বিশ্ব এখন একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশের প্রকৌশলীরা আর দেশে বসে নেই। অন্তর্জালের মাধ্যমে চাকরি নিয়ে অনেকে ছুটে চলেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। দক্ষতার সাথে কাজ করে সাফল্য অর্জন করছেন এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। এছাড়া আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরাও অন্যদের সাথে পাল্লা দিয়ে বিশে^র নামকরা বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে। তবে এজন্য আমাদের অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হতে হচ্ছে।
আমাদের দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেয়া ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতার অভাব বাংলাদেশী ইঞ্জিনিয়ারদের বিদেশে কর্মসংস্থানের বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বের খ্যাতিমান সংস্থা থেকে অ্যাক্রেডিটেশন (Accreditation) অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কারিগরী শিক্ষার অ্যাক্রেডিটেশনের-এর জন্য যেমন রয়েছে BAETE (Board of Accreditation for Engineering and Technical Education); তেমনি অ্যাক্রেডিটেশনের-এর জন্য বিশ্বের দু’টি খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠান হল আমেরিকার ABET (Incorporated as the Accreditation Board for Engineering and Technology, Inc.,) এবং জাপানের JABEE (Japan Accreditation Board for Engineering Education).
ব্যবহারিক বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ট্যাকনোলজিতে বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা অ্যাক্রেডিটেশন প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ABET। গত সাত দশক ধরে বিশ্বব্যাপী উন্নত শিক্ষার মান প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে ABET। এটা মূলতঃ আমেরিকার প্রতিষ্ঠান হলেও বিশ্বের ২৯টি দেশের প্রায় সাতশ’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ABET-এর সনদভুক্ত। এবেট-এর সনদপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রাজুয়েটদের ব্রিটেন এবং আমেরিকার মতো দেশের ভালো ভালো বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। তারা সহজেই অনেক বিষয়ের ক্রেডিট ট্রান্সফারও করতে পারে।
অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়ার রয়েছে বিভিন্ন ধাপ। একটি নির্দিষ্ট ফি দিয়ে প্রক্রিয়াটি শুরু করতে হয় যা সম্পন্ন করতে শুরু থেকে শেষ পর্যস্ত প্রায় দেড় বছর সময় লাগে। কোনো প্রতিষ্ঠান অ্যাক্রেডিটেশন পাবার জন্য দরখাস্ত করলে ABET-এর একটি বিশেষজ্ঞ দল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করতে আসে। অতঃপর প্রতিষ্ঠানটির সিলেবাস, পাঠ্যপুস্তক, লাইব্রেরি, ক্লাসরুমে শিক্ষাদান পদ্ধতি ইত্যাদি যাচাই করে তবেই অ্যাক্রেডিটেশন পাবে কিনা তার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শিক্ষার্থী এবং গ্রাজুয়েটদের মান নির্ভর করে শিক্ষকরা কি শিখাচ্ছেন এবং কিভাবে শিক্ষাদান করছেন তার উপর। শিক্ষকদের যোগ্যতা এবং শিক্ষাদান পদ্ধতির উপর তাই এবেট খুব জোর দেয়। শিক্ষকরা এবেটের নির্ধারিত মান বহাল রাখছেন কিনা সেজন্য তাদের নিয়মিত স্ব-মূল্যায়নের রিপোর্ট জমা দিতে হয়।
যদিও অ্যাক্রেডিটেশন একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া এবং এজন্য বিভিন্ন ফি বাবদ অর্থ ব্যয়ও করতে হয়, তবে অর্থ দিয়ে এর মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান অ্যাক্রেডিটেশন পেলে মনে করা হয় ওই প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষক এবং গ্রাজুয়েটদের মান একটি বিশেষ উচ্চতা অর্জন করেছে যা বিশ্বের অন্যান্য খাতিমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমতুল্য। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা নিয়ে কারো প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে না। অ্যাক্রেডিটেশন প্রতিষ্ঠানটির সাথে জড়িত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সর্বোপরি সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।
যেমন অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া ছাত্রদের নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ডিগ্রির উপর আস্থা বাড়ায়। নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং ডিগ্রি আন্তর্জাতিক মানদন্ডে স্বীকৃত; এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অত্যন্ত পরিতৃপ্তিকর অনুভূতি। বাংলাদেশের অনেক ছাত্র-ছাত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ পাড়ি দিচ্ছেন। বিদেশের ভালো বিশ্বদ্যিালয়ে ভর্তি এবং প্রয়োজনে ক্রেডিট ট্রান্সফারের সময় অ্যাক্রেডিটেশন প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিশেষ সুবিধা পায়। ক্রেডিট ট্রান্সফার করতে পারলে কোর্সের ফি বাবদ অনেক টাকার সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালগুলো ভালো ছাত্র আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা বহু গ্রাজুয়েট চাকরি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নতমানের শিক্ষা প্রদান করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তাই ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে যারা গ্রাজুয়েট হচ্ছেন তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার উপর বিশ্বব্যাপী চাকরিদাতারা আস্থা রাখেন এবং চাকরির ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেন।
বাংলাদেশে রয়েছে Bangladesh Professional Engineers Registration Board (BPERB)। ২০১১ সালে একটি স্বয়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসাবে এই বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ড বাংলাদেশে ইঞ্জিনিয়ারিং পেশায় কাজ করার জন্য Professional Engineer (PEng.) সার্টিফিকেশন দিয়ে থাকে। একজন পেশাদার প্রকৌশলীকে তার কারিগরী জ্ঞান এবং দক্ষতা নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করতে হয় যাকে বলা হয় Continuing Professional Development (CPD). উদাহরণস্বরূপ অস্ট্রেলিয়ায় চাটার্ড প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং (CPENG.) সর্টিফিকেশন বহাল রাখার জন্য প্রতি তিন বছর অন্তর ঈচউ চৎড়ভরষব হালনাগাদ করতে হয়, না হলে সার্টিফিকেট বাতিল হয়ে যায়। বাংলাদেশেও এ ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত যাতে প্রকৌশলীরা নিজের পেশাগত যোগ্যতা সমুন্নত রাখার জন্য সতর্ক থাকেন। উন্নত বিশ্বের অন্যান্য পেশাদার সংগঠনের মতো CPD Development-এর জন্য BPERB’র কিছু সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম থাকা দরকার।
বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক মানের অ্যাক্রেডিটেশন না থাকায় প্রকৌশলীদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। প্রবাসে চাকরিতে দরখাস্ত করলে চাকরিতাদা কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশের ডিগ্রি ও শিক্ষার মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য উন্নত দেশের প্রকৌশলীদের পেশাদার সংগঠনগুলোর সাথে সহযোগিতা ও যোগাযোগ বাড়নো অত্যন্ত জরুরি। ইঞ্জিনিয়ার্স অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, হংকং, আয়ারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, ব্রিটেন, সিঙ্গাপুর, আমেরিকাসহ বেশ কিছু দেশের সাথে পারস্পরিক স্বীকৃতিমূলক চুক্তি করেছে ফলে ওইসব দেশের প্রকৌশলীরা ইঞ্জিনিয়ার্স অস্ট্রেলিয়ার সমমানের সদস্যপদ পায়। এজন্য কোনো বিশেষ পরীক্ষা দেয়া কিংবা ডিগি অ্যাসেসম্যান্ট করাতে হয় না। আইইবি এ নিয়ে ভাবতে পারে। বাংলাদেশ এখন International Engineering Alliance (IEA) এবং International Professional Engineers Agreement (IntPE) এর প্রভিশনাল সদস্যপদ পেয়েছে। পূর্ণ সদস্যপদ পেলে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা অনেক এগিয়ে যাবে।
আশার কথা হল, দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আগামী জুন ২০২০ থেকে বাংলাদেশ ওয়াশিংটন অ্যাকোর্ডের পূর্ণ স্বাক্ষরকারীর মর্যাদা পাচ্ছে। তার মানে জুন’২০ থেকে আমাদের প্রকৌশলীদের degree assessment এর জন্য অন্য কোনো দেশের দ্বারস্থ হতে হবে না, ঢাকার আইইবি’তেই তা করা হবে। ওয়াশিংটন অ্যাকোর্ডে স্বাক্ষরকারী অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও আমেরিকার মতো দেশগুলো এখন আইইবি’র assessment গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। যেমন ইঞ্জিনিয়ার্স অস্ট্রেলিয়ার সদস্য হবার জন্য Competency Demonstration Report (CDR) লিখে বাংলাদেশী প্রকৌশলীদের ব্যাচেলর ডিগ্রির মূল্যায়ন করতে হবে না। সরাসরি সদস্য হতে পারবেন। এই অর্জন হাজারো বাংলাদেশী প্রকৌশলীর উচ্চশিক্ষা, অভিবাসনসহ স্বপ্ন পূরণের দুয়ার খুলে দেবে। উল্লেখ্য, আইইবি অস্ট্রেলিয়া চ্যাপ্টারের নেতৃত্ব এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টার জন্যই বলতে গেলে এটা সম্ভব হয়েছে। সাথে কেন্দ্রীয় আইইবি প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী সবুরের অকুন্ঠ সহযোগিতা তো ছিলই। এই সফলতার জন্য যেসব প্রকৌশলী কাজ করেছেন তাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
এই স্বীকৃতি পাবার পর আইইবি এবং বিএইটিএ-এর দায়িত্ব আরো অনেক বেড়ে গেল। অ্যাক্রিডেটশনের সুনাম যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বিএইটিএ’র অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে যাতে অ্যাক্রিডিটেশনের মান সমুন্নত থাকে। এছাড়া বিএইটিএ যথাযথ প্রক্রিয়ায় অনুসরণ করে অনুমোদন দিচ্ছে কিনা সেদিকেও নজর রাখতে হবে। আগামীতে আইবি এবং বিএইটিএ-কে ওয়াশিংটন অ্যাকোর্ড অনুসরণ করা হচ্ছে সে বিষয়েও কঠোর হতে হবে, না হলে অডিটে ধরা পড়ার আশংকা রয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের র্যাংকিং অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি সংযুক্ত। বিশ্ব র্যাংকিং-এ জায়গা করে নিতে গেলে একটি ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যাক্রেডিটেশন নেয়া আবশ্যক। যদিও অ্যাক্রেডিটেশন একটি বেশ কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া; কিন্তু আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য এর কোনা বিকল্প নেই।
