মহাবিশ্বে নিজেদের একা ভাবতে চায় না মানুষ। ত্রিজগতের কোথাও না কোথাও আমাদের মতো কিংবা আমাদের চেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী রয়েছে এমন ধারণা পোষণ করেন বহু জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও মহাকাশ গবেষক।

ভেবে দেখুন, আমরা সূর্যের যে দিকে আছি, তার ঠিক উল্টো দিকে রয়েছে আমাদের পৃথিবীর মতো আরেকটি গ্রহ। বায়ুমন্ডল, সমুদ্র পরিবেষ্টিত এই গ্রহে বসবাস করছে আমাদের মতোই কোনো মনুষ্য প্রজাতি। আমাদের মতো তারাও প্রতিদিন দেখছে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, চাঁদ আর তারকারাজি। পৃথিবীর মতো সূর্য থেকে একই দূরত্বে থাকলেও সূর্যের ঠিক উল্টোদিকে থাকায় এই গ্রহটিকে কখনোই আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব হয় না। যেমন আমাদের দেখা হয় না চাঁদের অন্য পিঠ। অবিকল পৃথিবীর মতো হওয়ায় এই রহস্যময় গ্রহটিকে বলা হয় যমজ পৃথিবী।

যমজ পৃথিবী নিয়ে মানুষের উৎসুক্যের সীমা নেই। আধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে যেমন বিজ্ঞানীরা চষে বেড়াচ্ছেন মহাকাশ, চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষণা; ঠিক তেমনি যমজ পৃথিবীর ধারণা নিয়ে রচিত হচ্ছে কল্প-বিজ্ঞান উপন্যাস, কার্টুন, টেলিভিশন সিরিজ ও হলিউড চলচ্চিত্র। বাংলাদেশে কল্প-বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার পথিকৃৎ আনোয়ার হোসেনের গল্পেও যমজ পৃথিবীর কথা রয়েছে।

পৃথিবী সূর্যের খুব কাছাকাছি না আবার সূর্য থেকে খুব বেশি দূরেও না। সূর্য থেকে পৃথিবী আজ যে দূরত্বে রয়েছে, তার চেয়ে কাছে থাকলে সূর্যের প্রখর উত্তাপে ভূপৃষ্ঠের সব পানি যেমন শুকিয়ে যেতো, ঠিক তেমনি কক্ষপথ থেকে একটু দূরে সরে থাকলে ঠান্ডায় পৃথিবী হয়তো বরফেই ঢেকে থাকত। তাই যেসব গ্রহ তাদের নক্ষত্র বা সূর্য থেকে আমাদের পৃথিবীর মতো একই দূরত্বে রয়েছে, পরিমিত তাপমাত্রার কারণে সেই গ্রহগুলোর পিঠে পানি তরল অবস্থায় থাকতে পারে। পানি হচ্ছে জীবনের মূল আধার। তাই পানি থাকলে সেসব জায়গায় প্রাণের অস্তিত্ব থাকাটা অসম্ভব কিছু নয়। নক্ষত্রকে ঘিরে প্রাণের উপযোগী যে বিশেষ এলাকা, তা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘গোল্ডিলক জোন’ নামে পরিচিত। এই এলাকায় ভাসমান জীবন ধারণের উপযোগী গ্রহকে বলা হয় গোল্ডিলক প্ল্যানেট।

২০০৯ সালে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা (নাসা) কেপলার নামের একটি টেলিস্কোপ মহাশূন্যে উৎক্ষেপন করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী কেপলারের নামে রাখা এই টেলিস্কোপের কাজ হচ্ছে সৌরজগতের বাইরে পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে বের করা এবং সেই গ্রহটি পৃথিবীর মতো কিনা তা বিশ্লেষণ করা। নক্ষত্র থেকে বিচ্ছুরিত তীব্র আলোয় ঢেকে পড়া বহু হাজার কোটি গুণ নিষ্প্রভ গ্রহ সনাক্ত করা সহজ কথা নয়। যা অনেকটা মিলিয়ন ভোল্টের সার্চ লাইটের আলোতে ২০ কিলোমিটার দূরে আকাশে ভাসমান জোনাকি পোকা সনাক্ত করার মতো। কেপলার টেলিস্কোপ এই দুঃসাহসিক কাজই করে চলেছে।

কেপলার আবিষ্কৃত গ্রহগুলোর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করে। যেমন গ্রহটি কত দিন পর পর তার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, গ্রহটি পৃথিবীর তুলনায় কত বড়, গ্রহটি তার সূর্য থেকে আসা রশ্মিকে কি পরিমাণ ঢেকে দিচ্ছে, গ্রহটি গোল্ডিলক জোনের মধ্যে আছে কিনা ইত্যাদি। এখন কোনো গ্রহ যদি তার সূর্যকে এক বছর বা তার কাছাকাছি সময়ে একবার প্রদক্ষিণ করে তাহলে সেই গ্রহটি পৃথিবীর মতো হওয়ার সম্ভবনা খুব বেশি।

আকাশে তোলার পর কেপলার টেলিস্কোপ আমাদের ছায়াপথ ‘মিল্কি ওয়ে’তে প্রাণ থাকার উপযোগী কোনো গ্রহ আছে কিনা তা খুঁজে বের করার জন্য সিগনাস নক্ষত্রপুঞ্জের নক্ষত্ররাজি নিরীক্ষা করতে থাকে। ২০০৯ সাল থেকে প্রায় দেড় লক্ষ নক্ষত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর আজ পর্যন্ত ৪,৬০০টি ভিন গ্রহের সন্ধান পেয়েছে কেপলার। তার মধ্যে সূর্যের মতো অন্য কোনো নক্ষত্রের চারদিকে ঘুর্ণায়মান পঞ্চাশটিরও বেশি পৃথিবী সাদৃশ গ্রহের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় কয়েকটি গ্রহের বৈশিষ্ট এখন তুলে ধরছি।

২০১১ সালের ডিসেম্বরে পৃথিবী থেকে ৬০০ আলোকবর্ষ দূরে কেপলার-২২বি নামক গ্রহের হদিস মেলে। উল্লেখ্য, এক আলোকবর্ষ ৯৪৪ হাজার কোটি কিলোমিটারের সমতুল্য! পৃথিবীর বিভিন্ন বৈশিষ্টের সাথে এর মিল রয়েছে। কেপলার-২২বি সূর্যের মতোই একটি নক্ষত্রের চারদিকে ঘুরে চলেছে। সেই নক্ষত্রকে এক পাক দিতে গ্রহটির সময় লাগছে ২৯০ দিন। পৃথিবীর সময় লাগছে ৩৬৫ দিন। কেপলার-২২বি তার সূর্য থেকে অনেকটা আমাদের পৃথিবীর মতোই দূরত্বে রয়েছে।

এই গ্রহটির বায়ুমন্ডলের আনুমানিক তাপমাত্রা হল ২২ ডিগি সেলসিয়াস। যা পৃথিবীর তাপমাত্রার কাছাকাছি। আয়তনে গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে ২.৪ গুণ বড়। পৃথিবীর সাথে এতটা মিল থাকায় বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, কেপলার-২২বি গ্রহে শুধু পানি বা বায়ুমন্ডলই নয় সেই সাথে প্রাণের বিকাশেরও প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এই আবিস্কারে উদ্দীপ্ত হয়ে অনেক বিজ্ঞানী এটিকে পৃথিবীর যমজ গ্রহ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে এই গ্রহটি কঠিন গ্যাসীয় না তরল সে নিয়ে বিজ্ঞানীর এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি। এছাড়া মনুষ্য বসবাসের জন্য এই গ্রহে সাগর, মাছ, বিভিন্ন ধরনের পশু, পক্ষী এবং গাছপালা আছে কিনা সেই ব্যাপারে বিশদ জানা এখনো বাকি।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে জীবনধারণের উপযোগী আরো দু’টি গ্রহের সন্ধান দেয় কেপলার। প্রথম গ্রহটির নাম কেপলার-৪৩৮বি, দ্বিতীয় গ্রহটি হচ্ছে কেপলার-৪৩২বি। কেপলার-৪৩৮বি পৃথিবী থেকে ৪৭০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং নিজের নক্ষত্রকে প্রতি ৩৫ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করছে। গ্রহটি আকারে পৃথিবীর চেয়ে ১২ শতাংশ বড়। অন্যদিকে পৃথিবী থেকে কেপলার-৪৩২বি গ্রহের দূরত্ব হল ১,১০০ আলোকবর্ষ। নিজের নক্ষত্রকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় ১১২ দিন। এটি আকারে পৃথিবীর চেয়ে ৩০ গুণ বড়। দুইটি গ্রহই পাথুরে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওখানে মানুষ বসবাস করতে পারবে কিনা সেটা এখনো নিশ্চিত নয়।

২০১৫ সালের জুলাই মাসে পৃথিবীর চেয়ে পাঁচ গুণ বড় কেপলার-৪৫২বি নামের আরেকটি গ্রহের সন্ধান পাওয়া যায়। পৃৃথিবী থেকে প্রায় ১৪০০ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এই গ্রহটি পাথুরে এবং ঘন বায়ুমন্ডল পরিবেষ্টিত। এতে রয়েছে প্রচুর পানি এবং আগ্নেয়গিরি। এই গ্রহটি নিজের কক্ষপথে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় ৩৮৪ দিন যা পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ১৯ দিন বেশি। আর যে সূর্য বা নক্ষত্রকে পরিভ্রমণ করছে সেটা আমাদের সূর্যের তুলনায় ১০% বড় এবং ২০% বেশি উজ্জ্বল।

উপরের যে সব গ্রহের কথা বললাম, তার সব কটাই আমাদের সৌরজগতের ত্রিসীমানার মধ্যে নেই। আলোর গতিতে না চললে বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে আমাদের সৌরমন্ডলের বাইরে ভেসে বেড়ানো এসব গ্রহের কাছে ধারেই যাওয়া যাবে না। কিন্তু ২০১৬ সালে জার্মান বিজ্ঞান সাময়িকীর একটি খবর মহাকাশ গবেষকদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়, পৃথিবী থেকে মাত্র ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে প্রক্সিমা সেন্টরি নামের নক্ষত্রকে ঘুরপাক খাওয়া একটি গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে। তার মানে আলোর ২০ শতাংশ গতিতে ছুটে চললে পৃথিবী থেকে ওই গ্রহে যেতে সময় লাগবে মাত্র ২০ বছর। বিজ্ঞানীদের বিশ^াস, আগামীতে এই গতি সম্পন্ন মাহকাশযান মানুষ তৈরি করতে সমর্থ হবে। এছাড়া আমাদের সৌরমন্ডলের কাছে ধারেই ৪.৩ আলোবকবর্ষ দূরে রয়েছে আলফা সেন্টরি এ এবং বি নামের দুটো নক্ষত্র। এই দুটো তারকার গোল্ডিলক জোনে আবাসযোগ্য গ্রহ থাকার সম্ভাবনা ৮৫ শতাংশ। তাই এই গ্রহ সম্পর্কে আরো জানতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন সবাই।

কেপলার উৎক্ষেপনের আগে ১৯৯০ সালে মহাশূন্যে পাঠানো হয় দূরবিক্ষণ যন্ত্র হাবল টেলিস্কোপ। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের আয়ত্তে থেকে ৬০০ মাইল উপর থেকে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করছিল হাবল টেলিস্কোপ। অন্যদিকে কেপলার টেলিস্কোপ ঘুরছে সূর্যের চারদিক, নজর রাখছে আমাদের সৌরজগত ছাড়িয়ে বহুদূরে মিল্কিওয়ে ছায়াপথের নক্ষত্রপুঞ্জে।

কেপলার মিশনের আগে পৃথিবী সাদৃশ গ্রহ কিংবা যমজ পৃথিবীর অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু কেপলার টেলিস্কোপ হাজারো গ্রহের অস্তিত্বের নিশ্চিত প্রমাণ দিয়ে জ্যোতির্বিদ্যাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। কেপলার মিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, কেবল মিল্কিওয়ে ছায়াপথেই বাসযোগ্য গ্রহের সংখ্যা পৃথিবীর জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। জ্যোতির্বিদদের মতে, সৌরজগতের বাইরে গড়ে দুটি তারার মধ্যে অন্তত একটিতে পৃথিবীর মতো গ্রহ থাকতে পারে। এই মহাবিশ্বে ছায়াপথ বা গ্যালাক্সির সংখ্যা যদি আনুমানিক ১০০ কোটিরও বেশি হয়, তাহলে মহাবিশ্বে যমজ পৃথিবীর সংখ্যা যে কত হতে পারে তা কল্পনা করাও কঠিন।

মানুষ থেমে নেই, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটছে দুর্বার গতিতে। কেপলার মিশনের সাফল্য এই ব্রহ্মান্ডে যে আমরা একা নই, সেই বিশ্বাসকে আরো জোরালো করেছে।