২০১৯ সালের জুলাই মাসেই পূর্ণ হল মানুষের চন্দ্র বিজয়ের ৫০ বছর। অ্যাপোলো-১১ নামের মার্কিন মহাকাশযানে চেপে নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে প্রথম মানুষ হিসেবে পা রাখেন। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই ঘটেছিল এই অভূতপূর্ব ঘটনা।

তখন ছিল না আজকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন কিংবা অসংখ্য স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল। বেতারে কান পেতে কিংবা জাতীয় টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে উন্মুখ অপেক্ষায় ছিল সবাই, কখন আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, কখন চাঁদে পা রাখবেন নীল আর্মস্ট্রং! লুনার মডিউল ঈগল থেকে মই বেয়ে চাঁদের বুকে যখন নীল আর্মস্ট্রং পা রাখলেন, সেকি উচ্ছ্বাস চারদিকে! অবশেষে কল্পলোকের চাঁদের মাটি স্পর্শ করল মর্ত্যের মানুষ।

চাঁদে পা রেখে অভিভূত নীল আর্মস্ট্রং উচ্চারণ করলেন সেই কিংবদন্তি উদ্ধৃতি, ‘একজন মানুষের এই ছোট পদক্ষেপ মানবজাতির জন্য এক বিরাট অগ্রযাত্রা’। এই প্রথম কোনো ইস্যুতে সমগ্র মানবজাতিকে এককাট্টা হয়ে উল্লাসে মেতে উঠতে দেখলো বিশ্ব। তাই এ বিজয়কে আমেরিকার একক বিজয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। মানব ইতিহাসের স্মরণীয় অধ্যায়ের যখন সূচনা হচ্ছিল, তখন আমি প্রাইমারীতে পড়ি। এই মহাকাশ যাত্রার খুটিনাটি বুঝার মতো বয়স যদিও ছিল না, তবে সাদাকালো টিভির পর্দায় নীল আর্মস্ট্রংয়ের চাঁদের মাটিতে পা রাখার দৃশ্যটি স্মৃতিতে এখনো অম্লান।

উনিশ শতকের শুরু থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রাধান্য পেয়েছ চাঁদ। চাঁদ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার আদিপুরুষ হলেন ইতালিয়ান বিজ্ঞানী গ্যালিলিও। ১৬০৯ সালে নিজের উদ্ভাবিত টেলিস্কোপ দিয়ে তিনি প্রথম চাঁদের পৃষ্ঠতল দেখতে পান। তবে মহাকাশ ও চাঁদ নিয়ে গবষেণায় আমেরিকার চেয়ে রাশিয়া ছিল বেশি এগিয়ে। মহাকাশে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ এবং মানুষ পাঠানোর কৃতিত্ব সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের। চাঁদে প্রথম অভিযানও শুরু করে রাশিয়া। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি লুনা-২ কৃত্রিম উপগ্রহ চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করে। লুনা-২ হচ্ছে চাঁদে অবতরণকারী মনুষ্যনির্মিত প্রথম বস্তু। এরপর থেকেই বলতে গেলে চাঁদে মানুষ পাঠাতে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে রাশিয়া ও আমেরিকা। তবে এই প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয় আমেরিকা।

১৯৬১ সালের ২৫ মে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ষাট দশক শেষ হবার আগেই যুক্তরাষ্ট্র চাঁদে মানুষ পাঠাবে বলে ঘোষণা দেন। প্রেসিডেন্ট যখন চন্দ্রাভিযানের কথা বললেন, তখন মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল সেটা ছিল একবারে অসম্ভব। চাঁদে পাড়ি দেয়ার জন্য বিশেষ কম্পিউটার, রকেট এবং অন্যান্য কি কি লাগতে পারে সেটাও ছিল মানুষের অজানা। ১৯৬১ সালের মে থেকে ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ের মধ্যে হাজারো সমস্যার সমাধান করে সেই অসাধ্য সাধন করেছে নাসা। এই অভিযান সফল করতে অ্যাপোলো মিশন প্রজেক্টে পারমাণবিক বোমা বানানোর চেয় তিন গুণ বেশি মানুষ কাজ করেছিল।

১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে অ্যাপোলো-১১ রকেটে চেপে নীল আর্মস্ট্রংদের যাত্রা শুরু হয়। মিশন অধিনায়ক আর্মস্ট্রংয়ের সহযাত্রী ছিলেন মাইকেল কলিন্স ও এডউইন অলড্রিন। যাত্রা শুরু হবার বার মিনিটের মধ্যে রকেট পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছে যায় এবং শুরু হয় চাঁদের অভিমুখে মহাযাত্রা। তিন দিনের মাথায় ১৯ জুলাই অ্যাপোলো-১১ চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে। চন্দ্রযানের প্রথম অংশ কমান্ড মডিউল চাঁদের কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করতে থাকে আর অপর অংশ লুনার মডিউল ২০ জুলাই চাঁদে অবতরণ করে। নভোচারীরা চাঁদের বুকে ছিলেন প্রায় সাড়ে একুশ ঘন্টা। ২৪ জুলাই চন্দ্র বিজয়ীরা ফিরে আসেন পৃথিবীতে। এর মধ্য দিয়েই শেষ হয় মানুষের প্রথম চন্দ্র অভিযান।

নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে নামার প্রায় ১৯ মিনিট পর তাঁর সহযাত্রী বাজ অলড্রিনও নেমে আসেন। নভোচারীরা চাঁদের বুকে তোলেন অসংখ্য ছবি, ব্যাগে পুরে নিয়ে নেন প্রায় ২২ কেজির মতো চাঁদের মাটি ও শিলা। মজার কথা হল, নভোচারীর বিখ্যাত বুটের যে ছবি আমরা দেখি সেটা কিন্তু আর্মস্টংয়ের চাঁদের বুকে রাখা প্রথম পদচিহ্ন নয়। এটা আর্মস্ট্রংয়ের ক্যামেরায় তোলা বাজ অলড্রিনের বুটের চিহ্ন। শুধু তাই নয়, চাঁদের বুকে নীল আর্মস্ট্রংয়ের সমুখ থেকে তোলা কোনো ছবি নেই। যে ছবিটা আমরা দেখি সেটা অলড্রিনের। অবশ্য আর্মস্ট্রংয়ের পেছন দিকে তোলা কয়েকটি ছবি রয়েছে।

অ্যাপালো-১১ যাত্রা করার তিন দিন আগেই চাঁদে অনুসন্ধান চালানোর জন্য সোভিয়েত রাশিয়া পাঠিয়েছিল মানুষবিহীন রোবটযান লুনা-১৫। আমেরিকার আগে চাঁদের মাটির নমুনা পৃথিবীতে এনে বিশ্বকে চমক দিতে চেয়েছিল আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া। মার্কিন নভোচারীরা যখন চাঁদের মাটিতে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন, তখন লুনা-১৫ চাঁদের চতুর্দিক প্রদক্ষিণ করছিল। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা বহু চেষ্টা করেও লুনা-১৫-কে চাঁদে নামাতে পারেননি।

চাঁদের বুকে নভোচারীরা রেখে আসেন কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, আমেরিকার পতাকা, পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধের মানচিত্র এবং একটি ক্ষুদ্র সিলিকন মেসেজ ডিস্ক, যার মধ্যে রেকর্ড করা আছে পৃথিবীর ৭৩টি দেশের প্রধানসহ আমেরিকার কয়েকজন প্রেসিডেন্টের বাণী। দেড় ইঞ্চি ব্যাসের এই ডিস্ক এমন টেকসই করে তৈরি করা হয়েছে যে তা হাজার বছরেরও বেশি সময় চাঁদের বুকে টিকে থাকবে।

চাঁদে ভ্রমণকারী নভোচারীদের অনেকেই চাঁদে এলিয়েন বা বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব থাকার দাবি করছেন বলে জানা যায়। এর মধ্য বাজ অলড্রিন এবং অ্যাপোলো-১৪ তে চেপে চাঁদে যাওয়া নভোচারী এডগার মিশেল অন্যতম। বাজ অলড্রিন চাঁদের পৃষ্ঠে অ্যাপোলো-১১ নভোযানকে ঘিরে বেশ কিছু রহস্যময় আলোর বস্তুকে ঘুরতে দেখেন বলে দাবি করেন। যদিও এর পক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, চাঁদের বুকে রেখে আসা স্মারকচিহ্নগুলো একদিন উন্নততর কোনো সভ্যতার এলিয়েনদের চোখে পড়বে। তখন পৃথিবীর মানচিত্র দেখে তারা মানবজাতির সাথে যোগাযোগ করতে সচেষ্ট হবে।

চাঁদ যে গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে, ঠিক সেই গতিতে নিজের অক্ষের উপর ঘুরে বলে চাঁদের একটি পিঠই পৃথিবী থেকে আমরা দেখতে পাই, যা চাঁদের ভূপৃষ্ঠের ৫৯ শতাংশ। আমাদের দৃষ্টির অগোচরে রয়ে যাওয়া বাকি ৪১% অংশকে ডার্ক সাইড বলা হয়। মহাকাশ গবেষণায় প্রথমে কিছুটা অমনোযাগী থাকলেও, পৃথিবীর অন্য এক পরাশক্তি চীন আর পিছিয়ে থাকতে চায়নি। এ বছরের শুরুতে ৩ জানুয়ারি চাঁদের যে অংশটি পৃথিবী থেকে দেখা যায় না, সেই দিকে মনুষ্যবিহীন রোবটযান চ্যাঙ-ই ৪ নামিয়েছে চীন। চন্দ্রপৃষ্ঠে একটি জীবমন্ডল স্থাপন করে ওই চন্দ্রযানটি সেখানে একটি চারা গাছ রোপন করে। এছাড়া ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে চীন। অন্যদিকে জাপান চাঁদের মেরুতে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে।

অপয়া অ্যাপোলো-১৩ বাদ দিয়ে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত মোট ৬ বার এপোলো মিশনের মাধ্যমে চাঁদের বুকে মানুষের পা পড়ে। কিন্তু সেই থেকে নাসা আর কোনো চন্দ্রাভিযান পরিচালনা করেনি। কিন্তু চীনের চাঁদে মানুষ পাঠানোর ঘোষণা দেয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে আমেরিকা ও নাসা। ষাট দশকের মতো একুশ শতকেও সবার আগে চাঁদে মানুষ পাঠাবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে আমেরিকা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা আবারো চাঁদে নভোচারী পাঠাবে বলে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর আমেরিকা ও রাশিয়ার মিত্রদের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই শেষ হলেও সংঘাতে ভরা পৃথিবীতে দিকে দিকে এখন চলছে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা। পরাশক্তিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেতে আছে প্রক্সি যুদ্ধে। তবে আমেরিকার আবারো চাঁদে মানুষ পাঠানোর সংকল্প দেখে মনে হচ্ছে ষাট দশকের মতো মহাকাশকেন্দ্রিক প্রতিযাগিতা আবার জমে উঠেবে। উন্নত দেশগুলোর বহু কোম্পানি চাঁদে খনি অভিযান চালিয়ে সোনা, প্ল্যাটিনামের মতো দুর্লভ ধাতু আরোহন করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।

অ্যাপোলো-১১-এর চাঁদে অবতরণ বিশ শতকের সবচেয়ে সেরা অর্জন। দ্রুতগতির কম্পিউটার, মাইক্রোচিপ তৈরির মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ওই সময়। অ্যাপোলো মিশন একতাবদ্ধ করেছিলে সমগ্র মানবজাতিকে। তাই মহাকাশ গবেষণায় সুস্থ প্রতিযোগিতা বিশ্বের জন্যকল্যাণ বয়ে আনতে পারে।