জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী প্রভাব বিশ্বের জন্য বর্তমান সময়ের সন্ত্রাসী ও জঙ্গী কর্মকাণ্ডের চেয়ে আরো বেশি হুমকি স্বরূপ বলে মন্তব্য করেছেন আমেরিকার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জশ আর্নেস্ট। পৃথিবীতে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিল্প কারখানা। শিল্প কারখানা থেকে নির্গত কার্বন অধিকহারে জলবায়ুতে মিশে যাবার কারণে বাড়ছে তাপমাত্রা। ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা না গেলে আগামী একুশ শতকের মধ্যে পরিস্থিতি অপরিবর্তনীয় দশায় চলে যাবে, যেখান থেকে আর ফেরার কোনো পথ থাকবে না।

শিল্পবিপ্লবের পরই মূলত বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বাড়তে থাকে। ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসগুলো হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লোরোকার্বণ, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ১৯৫০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শিল্পোন্নত দেশগুলোর কারণে পৃথিবীতে মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ। তবে বিশ্বের প্রধান কার্বন দূষণকারীদের তুলনায় বাংলাদেশের নিঃসরণের পরিমাণ খুবই নগন্য যেমন মাত্র ০.১৭ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনপ্রতি কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমনের হার হচ্ছে মাত্র ০.৪ টন।

বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসসমূহের মাত্রার উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ফলে সূর্য থেকে যে তাপ পৃথিবীতে আসে, তার কিছু আর ফিরে যেতে পারে না, যার কারণে পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য একদিকে সমুদ্রের পানির যেমন তাপগত স্ফীতি ঘটছে তেমনি আবার গ্রিনল্যান্ড এবং এন্টার্কটিকার বরফ গলনের ফলে সমুদ্রস্তরের উচ্চতাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। বায়ুমন্ডলে যে কার্বন নিঃসরণ হয় তার এক তৃতীয়াংশ সমুদ্রের পানি শুষে নেয়। কিন্তু উষ্ণতা বেড়ে যাবার ফলে সমুদ্রের পানির কার্বন গ্যাস ধারণ করার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, ফলে যে সব কার্বন গ্যাস পানিতে দ্রবীভূত ছিল তা আবারো বায়ুমন্ডলে ফিরে আসছে। বিজ্ঞানীদের মতে গ্রিনল্যান্ডের সব বরফ যদি গলে যায় তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬ মিটার বেড়ে যাবে। কি ভয়ানক কথা! আইপিসিসি’র নতুন জলবায়ু মডেলের হিসাব মতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০০৭ সালের হিসাবের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি হারে বেড়ে চলেছে। এইভাবে চললে এই শতকের শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সর্বোচ্চ ১ মিটার পর্যন্ত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী বৈরী প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় কখনো বেশি শীত আবার কখনো কম। কখনো গরমের মাত্রা যেমন বাড়ছে তেমনি তুমুল বৃষ্টিতে ভাসিয়ে নিচ্ছে সব। রাশিয়াতে ভয়ংকার দাবদাহ, নাইজেরিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা আঘাত হেনেছে। সম্প্রতি ইউরোপও ব্যাপক বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। আমেরিকায় আঘাত হেনেছে হ্যারিকেন স্যান্ডি। আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য প্রচন্ড খরায় আক্রান্ত হচ্ছে যা গত ১০০ বছরে কখনো দেখা যায়নি। গত বছরের গ্রীষ্ম ছিল ব্রিটেনের সবচেয়ে জলসিক্ত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বেড়ে যাবার ফলে অর্থনীতি এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের দুর্ভোগ, দারিদ্রতা এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় রোগসমূহ যেমন ম্যালেরিয়া এবং কলেরার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছরে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশ্বজুড়ে ক্ষতির পরিমাণ হল আনুমানিক ২০০০ বিলিয়ন ডলার!

দুঃখজনক হলেও সত্য, জলবায়ু দুষণে বাংলাদেশের অবদান নগন্য হলেও জলবায়ু বিপর্যয়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। জার্মানীর গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ ‘ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স’ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশেকে ৯ নম্বরে রাখা হয়েছে। এ তালিকার শীর্ষে রয়েছে পুয়ের্টোরিকো, শ্রীলঙ্কা ও ডোমিনিকার মতো দেশ।

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের উপর কি ধরনের প্রভাব ফেলছে তা এখন সংক্ষেপে তুলে ধরছি:

. আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের তাপমাত্রা ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা গত ৫৪ বছরের নিবন্ধিত তাপমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট মতে তাপমাত্রা ২.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেড়ে গেলে বাংলাদেশের ২৯ শতাংশ এলাকা জলমগ্ন হবে। বাংলাদেশের বেশ কিছু অঞ্চলে বোরো ধানের চাষের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ফলনের উপর প্রভাব ফেলবে, ধান উৎপাদন হ্রাস পাবে।

. বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন বিশ্ব উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাষ্পীভবনের হার বেড়ে গিয়ে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাবে; বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে। বন্যা, ঘুর্ণিঝড়, সাইক্লোন এখন বাংলাদেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটছে। ২০০৭ সালের সিডর, আইলা (২০০৯), ভিয়ারু (২০১৩) আর সম্প্রতি কোমেনের মতো সাইক্লোন একে একে আঘাত হানছে বাংলাদেশে।

. গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার সাগরে নিম্নচাপ বেশি থাকার কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাগরে নিম্নচাপ বাড়ার মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। আইপিসিসি উদ্ভাবিত জলবায়ু মডেল নির্দেশ করছে যে, বাংলাদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০-১৫ শতাংশ অধিক বৃষ্টিপাত হবে এবং বৃষ্টিপাতের তীব্রতাও বৃদ্ধি পাবে। গত তিন দশকের বৃষ্টিপাত নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বৃষ্টিপাত বছরে প্রায় ৩ মিলিমিটার হারে বৃদ্ধি পাবে। এটা নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের জন্য দুঃসংবাদই বটে। কারণ আসছে বছরগুলোতে বর্ষার মৌসুমে বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে গেলে শহরে জলবদ্ধতা আরো বেড়ে যাবার আশংকা রয়েছে।

. বৈরী জলবায়ু পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্রে। বিশেষত শীত ও বর্ষা ঋতু তাদের বৈশিষ্ট হারাতে বসেছে। শীতকাল শুরু হচ্ছে দেরিতে আবার তার স্থিতিকালও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে অনাকাক্সিক্ষত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি এখন সাধারণ ব্যাপার।

. বন্যা, ঝড়ের প্রকোপ এবং বিরূপ আবহাওয়ার কারণে অসুখ-বিসুখ ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের দেশে। বিঘ্নিত হচ্ছে জনস্বাস্থ্য।

. গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় অবস্থিত বদ্বীপীয় ভূমি হিসেবে বাংলাদেশের একটি বিশাল এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে জলমগ্ন হবে। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কি হারে বাড়ছে সে নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা থেকে নানারকম ফলাফল বেরিয়ে আসছে। যেমন আইপিসিসির মতে, ২১০০ সালের শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বেড়ে যাবে। আর তাই যদি হয়, বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশের মূল ভূ-খন্ডের ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে এবং তাতে প্রায় ২ কোটি মানুষ বসতবাড়ি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে।

. ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জন পেথিক বাংলাদেশে সুমদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এই শতকের শেষে প্রায় ৪ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি বলে দাবি করেছেন। তবে আমেরিকার রুটগার এনার্জি ইন্সিটিটিউটের বিজ্ঞানী রবার্ট কপ প্রতিবেশী দেশ ভারতের তথ্য-উপাত্ত গবেষণা করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার ছাড়িয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন যা আইপসিসিরি ভবিষ্যদ্বাণীর অনুরূপ। এদিকে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবদেনে বলা হয়, এই শতকের শেষে নয় বরং ২০৫০ সালের মধ্যেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।

. বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। গত ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। সমুদ্রের পানি বেড়ে যাওয়ায় দ্বীপাঞ্চলের মানুষ ঢাকায় আসতে বাধ্য হচ্ছে।

. বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা সমুদ্র সমতল হতে মাত্র ১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠের স্ফীতি সংক্রান্ত উপরের যে কোনো একটি ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্যি হয় তার পরিণতি হতে পারে ভয়ংকার। তখন জলমগ্ন বাংলাদেশের লক্ষ-কোটি মানুষের জন্য নতুন কোনো আবাসভূমি খুঁজতে হবে। রাজধানী ঢাকা শহর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১ মিটার উঁচুতে অবস্থান করছে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাজনিত কারণে ঢাকা শহরও আক্রান্ত হতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করেছে।

. ইউনেসকোর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ৪৫ সেন্টিমিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে সুন্দরবনের ৭৫% ডুবে যেতে পারে। ইতিমধ্যে সুন্দরবনের কিছু অংশ সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। সুন্দরবন সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে জনপদকে আগলে রাখার জন্য রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে। সুন্দরবন আক্রান্ত হলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।

. খাবারের পানির জন্য বাংলাদেশ ভূগর্র্ভস্থ ও নদীর পানির উপর নির্ভরশীল। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার জন্য নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির জলাধার লবণাক্ত করে ফেলছে লোনা পানি। ফলে খাবারের পানির ঘাটতি দেখা দেবে। বঙ্গোপসাগরের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলভাগ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেলে লোনাপানি উপকূলীয় এলাকার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কৃষিজমি, মিঠাপানির প্রাণী ও উদ্ভিদ ধ্বংস করে ফেলবে।

. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের দেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা ব্যাপক হারে হ্রাস পাবে যা দারিদ্রতা বাড়িয়ে দেবে। বহু খরস্রোতা নদীই এখন সঙ্কীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে কৃষিকাজ ও চাষাবাদে। চাষাবাদের জমিও লবণাক্ত হয়ে চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ৬৫ সেন্টিমিটার সুমদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য দক্ষিণাঞ্চলে উর্বর উৎপাদনক্ষম জমি ৪০% শতাংশ হ্রাস পাবে।

. জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বহু নদী ও খাল মরে যাবার ফলে দেশের জীববৈচিত্রও আজ হুমকির সম্মুখীন।

. বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম হল বাংলাদেশ। যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনবসতি হল ১০৯০ জন। আর ঢাকা শহরের জনসংখ্যা এখন প্রায় ২ কোটির কাছাকাছি। নিম্ন ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষিভিত্তিক আয় কমে যাবার ফলে শহরমুখী জনসংখ্যার চাপ বাড়তেই থাকবে। ফলে ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরতলীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হবে।

বাংলাদেশ বিশ্বের পুরো কার্বন দুষণের মাত্র ০.২ শতাংশের জন্য দায়ী। তাই অন্যান্য হেভিওয়েট দেশগুলো নিঃসরণ কমাবে সেই আশায় বসে না থেকে এই সমস্যা মোকাবেলার জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। বিকল্প জ্বালানী যেমন সৌর, বায়ুশক্তি এবং সহজলভ্য বায়োগ্যাসের কথা ভাবতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। গ্রহণ করতে হবে সমন্বিত জলবায়ু নীতি। কৃষি, শিল্প ও অবকাঠমোর মতো খাতগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষার জন্য খাপ খাইয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বন্যা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষকে আগে থেকে সতর্কবার্তা পৌছে দিতে হবে। উদ্বাস্তুদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা করতে হবে।

কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য জন্য গাছের কোনো বিকল্প নাই। গাছ কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহন করে বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন ছেড়ে বৈশি^ক উষ্ণতা কমাতে সাহায্য করে। পৃথিবীর আনুমানিক ২৬% শতাংশ ভূখন্ড সবুজ আচ্ছাদন ও বনাঞ্চলে ঢাকা। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হলে পৃথিবীর ৪২ শতাংশ ভূমিতে সবুজ আচ্ছাদন গড়ে তুলতে হবে। তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিশে^র বহু দেশ বৃক্ষরোপন অভিযান শুরু করেছে।

যেমন নিউজিল্যান্ড সরকার ১০০ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করছে। ফিলিপাইন নতুন একটি আইন প্রণয়ন করেছে, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ১০টি গাছ না লাগালে তাকে ডিগ্রি দেয়া হবে না। সম্প্রতি কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো জানিয়েছেন, দেশটি ২০০ কোটি গাছ লাগাবে। নরওয়েতে গাছ কাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বনাঞ্চল উজাড় করে জনবসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। দেশের বনভূমি কমতে কমতে এখন তিন ভাগের এক ভাগে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে সহসা দেশব্যাপী গাছ লাগানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী হাতে নেয়া উচিত।

জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যবস্থাপনার জন্য উন্নত দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে দশ হাজার কোটি ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত প্রতিশ্রুত অর্থের মাত্র এক দশমাংশ অর্থাৎ ১ হাজার কোটি ডলার দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশও এই অর্থের কিছু পেয়েছে। তবে জলবায়ু ফান্ডের টাকা যাতে সঠিক খাতে বরাদ্দ করা হয় সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব রুখতে বাংলাদেশ এককভাবে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারে না। এজন্য বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। ইদানিং পরিবেশ দূষণ করার জন্য উন্নতদেশগুলো যাতে অনুন্নত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে যথার্থ ক্ষতিপুরণ দেয় তার জোরালো দাবি উঠেছে। শুধু তাই নয়, দাবি উঠেছে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য অভিবাসনের দ্বার খুলে দেয়ার। এমনকি যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি কার্বণ দূষণ করছে সেই সব দেশে বৈরী জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অভিপ্রয়াণ করার অধিকার আছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ সেন্টার ফর এডভান্সড ষ্টাডিস। তবে এজন্য বিশ্ব জনমতের দৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে যাতে ফেরানো যায় সেজন্য সচেষ্ট হতে হবে।

২০০৯ সালে মালদ্বীপের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশীদ বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সমুদ্রের প্রায় ৫ মিটার নিচে একটি ক্যাবিনেট মিটিংয়ের আয়োজন করে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় সূচিবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের সুন্দরবন। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এই সুন্দরবনের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। সুন্দরবনকে সামনে রেখে প্রচারণা চালানো যেতে পারে।