বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান পরিমাপ করার জন্য জরিপ চালিয়ে প্রতি বছরই র্যাংকিং বা মেধাক্রম তালিকা প্রকাশ করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কিছু সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, খ্যাতিমান পত্রিকা ও ম্যাগাজিন এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে থাকে। এর মধ্যে QS এবং The Times Higher Education World University Rankings অন্যতম।
ছঝ র্যাংকিং-এর কথাই ধরা যাক। প্রায় ২,০০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যাচাই-বাছাই করে বিশ্বের শীর্ষ চারশ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তালিকা তৈরি করেছে Quacquarelli Symonds (QS) নামের এই প্রতিষ্ঠান। যে সব সূচকের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূূল্যায়ন করা হয়েছে তা হল – একাডেমিক সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদীক্ষার মানের সুনাম, চাকরিদাতা সংস্থার কাছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা প্রাজুয়েটদের গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা অবকাঠামো, শিক্ষকদের একাডেমিক প্রকাশনার সংখ্যা, শিক্ষকরা ছাত্রদের পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছেন কিনা সেজন্য ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত, আর আন্তর্জাতিক সুনাম পরিমাপের জন্য রয়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও ছাত্র সংখ্যা ইত্যাদি।
বিশ্বের ৩৩,০০০ হাজারেও বেশি শিক্ষাবিদ ও ১৬,০০০ চাকরিদাতা কোম্পানি ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে জরিপ চালিয়ে ২০২০ সালের মেধাক্রম তালিকা তৈরি করেছে QS। প্রতিটি জরিপেরই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। তবে যে ধরনের সূচক ও সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে এ ধরনের জরিপ করা হয়, তার ফলাফল একেবারে উপেক্ষা করা যায় না।
২০২০ সালের QS র্যাংকিংয়ে শীর্ষে রয়েছে বিখ্যাত এমআইটি এবং দ্বিতীয় স্থানে আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম দশটি স্থানই পাঁচটি আমেরিকান এবং চারটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলে। কর্নেল, ইয়েল এবং প্রিন্সটনের মতো খ্যাতিমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ডিঙ্গিয়ে যুগ্নভাবে ১১তম স্থান দখল করেছে সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর। এদিকে চীনের সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় উঠে এসেছে ১৬ নম্বরে। অন্যদিকে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় ২২, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ২৯, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর ২৮ আর সৌদি আরবের কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয় ১৮৬ নম্বরে রয়েছে। তবে অবাক করা কথা হল, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র্যাংকিংয়ের শীর্ষ শতকের তালিকা থেকে ছিটকে পড়েছে। ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ‘ইঞ্জিনিয়িারিং ইন্সটিউিট অব টেকনলজি, মুম্বাই’-এর অবস্থান হল ১৫২। QS র্যাংকিং-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বাংলাদেশের অন্যান্য শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান ৮০০-১০০০ এর মধ্যে। আর এশিয়ান ছঝ র্যাংকিং-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটের অবস্থান যথাক্রমে ১৩৫ এবং ২০৭।
স্পেনের সরকারি গবেষণা সংস্থা CSIC বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১২,০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং (ওয়েবোমেট্রিক্স র্যাংকিং অফ ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিস) বের করে থাকে। এই র্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশের র্যাকিং-এ শীর্ষে থাকা বুয়েটের অবস্থান হল ১৭৯৪, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯০৯, রাজশাহী ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যথাক্রমে ২২৭৫ এবং ৩০৩৯, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ২১০১ এবং চুয়েট ৩৭১৪। যে চারটি সূচক CSIC জরিপের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে তা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ওয়েবপেইজের সংখ্যা, বাইরের সাইট থেকে বিশ্বদ্যিালয়ের ওয়েবসাইটে কতটি লিংক এসেছে তার সংখ্যা, সাইটে সংরক্ষিত পিডিএফ ফাইলের সংখ্যা, গুগল স্কলারে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের কতগুলো গবেষণাপত্র আছে এবং সাইটেশন এসেছে ইত্যাদি।
কোনো জরিপই ত্রুটিহীন নয়। তবে বিভিন্ন জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি জরিপেই আমাদের জানা বিশ্বের সেরা বিশ্বদ্যিালয়গুলো বরাবর তালিকার প্রথম দিকে থাকছে। আবার সিঙ্গাপুরের দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠান প্রথমে পিছিয়ে থাকলেও অনেক ধাপ পেরিয়ে প্রথম দিকে চলে আসছে। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বরাবরের মতো র্যাংকিং-এর তালিকার নিচের দিকেই থেকে যাচ্ছে। তাই শ্রেষ্ঠত্বের দৌড়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় যে অনেক পিছিয়ে আছে সেটা বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়।
আমাদের উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানের করতে হলে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন এনে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ দিতে হবে পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে প্রতি দশজন ছাত্রের জন্য রয়েছে একজন শিক্ষক। অথচ আমাদের দেশে এই অনুপাত কয়েক গুণ বেশি। গবেষণা হল বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণের অন্যতম সূচক। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকায় ‘Publish or Perish’ নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণায় মনোযাগী হতে অনেকটা বাধ্য করেছে। গবেষণার কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। তবে তরুণ ও মেধাবীদের কাছে শিকক্ষকতা পেশা আকষর্ণীয় করে তুলতে না পারলে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণার জন্য সরকারি সহযোগিতা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ উদ্যোগে গবেষণায় বিনিয়োগ করার জন্য বেসরকারি সেক্টরকে উৎসাহিত করতে হবে।
বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের রয়েছে একটি সোনালি অতীত। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২১ থেকে ১৯৪৫ সালে পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছেন জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন বসু। বোস-আইস্টাইন সমীকরণের (Bose–Einstein Statistics) সুবাদে আইনস্টাইনের সাথে চিরস্থায়ীভাবে জুড়ে রয়েছে তাঁর নাম। সত্যেন বসুর মতো একজন অসাধারণ বিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে ছাত্রদের কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও রেডিয়েশনের জটিল তত্ত্ব ব্যাখ্যা করছেন, ভাবতে গেলে কেমন এক ধরনের নষ্টালজিয়া পেয়ে বসে।
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতেই হয়। একবার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপকের পদ খালি হলে সত্যেন বসু ওই পদের জন্য দরখাস্ত করলেন। কিন্তু ডক্টরেট ডিগ্রি না থাকায় সত্যেন বোসের মতো জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানীকেও নিয়ম ভেঙ্গে প্রফেসর পদে পদোন্নতি দেয়া হল না। তখন সত্যেন বসুর গুরু স্বয়ং আইনস্টাইন কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করে বললেন, ‘তোমরা কি পদার্থবিজ্ঞানে সত্যেনের চেয়ে যোগ্য কাউকে পাবে?’ এভাবে তিনি প্রফেসরের পদ লাভ করেন।
এখন মেধাকে পাশ কাটিয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়ে যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে তাতে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে গেলে মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। লাল নীল বিভিন্ন প্যানেলের অন্তরালে রাজনীতি আর বাড়তি আয়ের জন্য শিক্ষকরা নিজের ছাত্রদের ঠকিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন অধ্যাপনার দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়েছেন।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সেই ঐতিহ্য আর নেই। সম্প্রতি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের পিএইচডি গবেষণা ৯৮ শতাংশ হুবহু নকল বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষকের থিসিসে ভুল তথ্য সংযোজন করার অভিযোগে তার পিএইচডি ডিগ্রি বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে হচ্ছে চরম অনিয়ম। পরীক্ষার ফলাফল ও গবেষণাকে প্রাধান্য না দিয়ে মেধা তলিকার নিচ থেকে টেনে এনে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল, প্রশ্নপত্র ফাঁস ইত্যাদির কারণে শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পেশাদারিত্ব এবং সততা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। বিশ্বমানের যে কোনো প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা অকল্পনীয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হল, ছাত্রসমাজের একটি বড় অংশ শিক্ষার চেয়ে রাজনীতিচর্চাকে মাত্রাধিক প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে ক্যাম্পাসে খুন, মারামারি, টেন্ডার বাণিজ্য ও ভোগ-দখলের ঘটনা ঘটছে অহরহ।
বিশ্বায়নের এই যুগে সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর র্যাংকিং বাড়ানোর অন্য কোনো বিকল্প নেই। না হলে আমাদের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা এবং চাকরির ক্ষেত্রে পেছনেই পড়ে থাকবে। ইদানিং কোনো গবেষকের গবেষণার মান h-index, citation counts কিংবা journal impact factors এর মতো কিছু নির্ণায়ক দিয়ে পরিমাপ করা হয়। অর্থাৎ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের গবেষণার মান কতটুক, সেটা গুগলে একটি শব্দ টাইপ করেই নির্ধারণ করা সম্ভব। তাই অনলাইনের শক্তিকে এখন উপেক্ষা করার আর কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করার জন্য সবাইকে এখনই আটঘাট বেধে নামতে হবে। না হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একদিন কবি আল মাহমুদের ‘ডাকাতদের গ্রাম’ হয়ে বিশ্বের বুকে পরিচিতি পাবে।
