জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকবেলার জন্য বিশ্বের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে প্রতিবছর জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজন করে জাতিসংঘ। যা কনফারেন্স অফ দ্য পার্টি বা সংক্ষেপে কপ নামে পরিচিত। ১৯৯৫ সালে জার্মানির বার্লিনে বসেছিল প্রথম জলবায়ু সম্মেলনের আসর। এ পর্যন্ত ইউরোপের শহরগুলো সর্বোচ্চ ১৩ বার জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সে তুলনায় উত্তর আমেরিকায় হয়েছে মাত্র দু’বার, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নয়াদিল্লিতে ২০০২ সালে একবার। ২০১২ সালে আরব অঞ্চলের দেশ কাতারের রাজধানী দোহা শহরে হয় কপ-১৮। ২০১৯ সালের কপ ২৫ হয়েছে আবারো ইউরোপের শহর মাদ্রিদে।
প্রতিবছর জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও সব কপই সমান গুরুত্ব পায় না। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ১৯৯৭ সালে ‘কিয়োটো প্রটোকল’ নামে সর্বপ্রথম একটি চুক্তি হয়। এ চুক্তি অনুযায়ী বিশ্বের শিল্প সমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো বাধ্যতামূলক করা হয়। কিয়োটো প্রটোকলের বাধ্যবাধকতা শেষ হবার পর ২০১৫ সালে প্যারিস কপ-২১ সম্মেলনে আরেকটি চুক্তি হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব দেশকে ‘ন্যাশনাল ক্লাইমট অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করার কথা। এ জন্যই প্যারিস সম্মেলনের বেশ গুরুত্ব ছিল।
প্যারিস চুক্তিতে দেশগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পযুগের (১৮৫০-১৯০০) চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে রাখতে সম্মত হয়। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৪৫ শতাংশ কমিয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়। তবে আলোচনার টেবিলে যতই ঐক্যমত হোক না কেন প্যারিস সম্মেলনের পর বাস্তবে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। এজন্য ২০১৯ সালের মাদ্রিদের কপ-২৫ সম্মেলনে যেসব দেশ এখনো প্যারিস চুক্তির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ শেষ করতে পারেনি, তাদের উপর চাপ তৈরির চেষ্টা করা হয়।
এ নিয়ে প্রতি শুক্রবার স্কুলে না গিয়ে সুইডিশ সংসদের সামনে বসে আন্দোলন শুরু করে সুইডিশ শিক্ষার্থী গ্রেটা টুনব্যার্গ৷ তাঁর এই আন্দোলন সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সম্মেলন চলার সময় প্রায় ৭০ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এরপরও মাদ্রিদ সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ আন্তরিক হয়ে উদ্যোগ নিতে পারেনি। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া, বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমাতেও উন্নত দেশগুলো ছাড় দিতে চায়নি। ফলে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি যা কিনা ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবার কথা, অর্থের অভাবে সফলতার মুখ দেখছে না।
মাদ্রিদ সম্মেলনে কার্বন মার্কেট নিয়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। উন্নত দেশগুলো চীন এবং ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে ফাঁকিবাজি প্রকল্প গ্রহণ করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করেছে। এদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলো অভিযোগ করেছে, উন্নত দেশগুলো কার্বন বাজার চালুর পথ বন্ধ করে বিশ্বকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের প্যারিস চুক্তি ত্যাগ ছিল জলবায়ু সমঝোতার জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘা। পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি যে দায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণিত সত্যকে বিশ্বাস করতে চাইছেন না। উন্নত বিশ্ব প্রতিবছর উন্নয়নশীল বিশ্বকে ১০০ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করার কথা, তাতে আমেরিকা শরিক হবে না এবং প্যারিস চুক্তির আওতায় ‘লস এন্ড ড্যামেজ’ ফান্ডেও কোনো অর্থ দেবে না। অথচ যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বিশে^র অন্যতম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যমতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হচ্ছে চীন (৯.৮ গিগাটন)। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আমেরিকা (৫.৩ গিগাটন) আর এর পরই রয়েছে ভারত (২.৫ গিগাটন)। সর্বোপরি শিল্পোন্নত ১০টি দেশ বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের ৬৭.৬ ভাগই নিজেরা নিঃসরণ করে। তবে জনপ্রতি কার্বন নিঃসরণের চিত্রটা পুরোপুরি উল্টো। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশ কাতার (৫০ টন)। চীন শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যেও নেই।
স্বদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যাতে ব্যাহত না হয় সে জন্য বিশ্বের এক নম্বর কার্বন দূষণকারী দেশ চীন, বরাবরই কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার বিরোধিতা করেছে। কিন্তু চরম পরিবেশ দূষণের শিকার হয়ে কিভাবে দেশকে দূষণমুক্ত করা যায় সে নিয়ে চীন এখন হাপিত্যেশ করছে।
চীন গত জুনে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বণ নিঃসরণ ২০ শতাংশ কমিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে এবং ২০২০ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার কথাও বলছে। জলবায়ু ফ্রন্টে আরেকটি বড় অগ্রগতি হচ্ছে, বিশ্বের অন্যতম কার্বণ দূষণকারী ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০৩০ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালের তুলনায় কার্বন নিঃসরণ ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার ভয়াবহ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এতে স্ফীত হচ্ছে সাগরের জলরাশি। কার্বন নিঃসরণের মাত্রা অতীতের চেয়ে ২০১৫-২০১৯ সময়সীমায় ২০ ভাগ হারে বেড়েছে। ১৯৯৩ সাল থেকে যেখানে সাগরের জলসীমার উচ্চতা বেড়েছে গড়ে ৩.২ মিলিমিটার, সেখানে ২০১৫-২০১৯ সময়সীমায় বেড়েছে ৫ মিলিমিটারের উপর।
বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা না গেলে আগামী একুশ শতকের মধ্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানবজাতির জন্য সর্বনাশ ডেকে আনবে। পরিবেশ দূষণ এখন যে হারে চলছে তাতে একুশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন নাসার ইন্সটিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজের প্রাক্তন ডিরেক্টর জেমস হেনসেন।
তবে উন্নত দেশেগুলোতে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে যে ক্ষতি হবে তা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে তারা হয়তো পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু দুঃখজনক হল, জলবায়ু পরিবর্তনের ফ্রন্টলাইনে থাকা বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশগুলো ন্যূনতম কার্বন নিঃসরণ করেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে।
গত ২৫ বছর ধরে কার্বন দূষণকারী দেশগুলোর মধ্যে আপোস-আলোচনা চলছে কিভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানো যায়। কিন্তু এখনো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো সমঝোতা চুক্তিতে বিশ্ব একমত হতে পারেনি। চীন, আমেরিকা, ভারতের মতো দেশগুলো যদি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার বিষয়ে ঐক্যমতে না আসে তাহলে জলবায়ু সম্মেলন কখনোই ফলপ্রসূ হবে না।
কার্বন নিঃসরণ কমাতে হলে জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে কিনা করছে তার উপর নজরদারী করা দরকার। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আসছে কিনা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তার উপরও নজর রাখতে হবে।
এবার ২০২০ সালের জলবায়ু সম্মেলন বসেবে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে গ্ল্যাসগোতে বিশ্বনেতারা ঐকমত্যে পৌঁছবেন এমন আশাবাদ সবার।
