প্রতিটি মুসলিমের দৈনন্দিন ধর্মীয় আচারের একটি অপরিহার্য অঙ্গ হল ওজু। কুরআন ও হাদিসে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে (কুরআন ৮ : ৪৩, ৫ : ৬) (বুখারি ভলিউম ১, বই ৪, ১৪২, ১৬১, ১৬৫, ১৮৬)। প্রতিদিন নামাজের আগে ওজুর মাধ্যমে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরিস্কার করে আমরা বিশুদ্ধতা অর্জন করি। কিন্তু লক্ষণীয়, ওজু করার সময় পানির অপচয় না করা এবং সার্বিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কথাও যে কুরআন ও হাদিসে রয়েছে, সেটা অনেক সময় আমরা বিবেচনা করি না।
আরব আমিরাতে দুবাই শহরের বেশ কিছু মসজিদে চালানো সাম্প্রতিক এক জরিপে ওজুর সময় পানি অপচয়ের নমুনা দেখে বিশেষজ্ঞরা বিস্মিত হয়েছেন। দেখা গেছে, পানির ট্যাপ বা কল ছেড়ে দিয়ে কোনো মুসল্লি জুতা মোজা খুলছেন, অনেকে পাশের কারো সাথে আড্ডা জুড়ে দিয়েছেন; এদিকে কলের মুখ দিয়ে পূর্ণবেগে ড্রেনের মধ্যে বয়ে চলেছে পানির অমূল্য স্রোতধারা। কোনো মুসল্লি আবার দীর্ঘক্ষণ ধরে ওজুতে মগ্ন, হাত পা বারবার ধুয়েই চলেছেন, পেছনে কেউ অপেক্ষা করছেন কিনা সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তার। মসজিদের গুপ্ত ক্যামেরায় এসব ধরা পড়েছে। এই ধরনের আচরণ ইসলামিক শিক্ষা ও চেতনার পরিপন্থী।
ধর্মীয় অনুশাসন পালন করার জন্য ব্যবহৃত হয় বলে ওজুর পানিকে সচরাচর অপচয় বলে গণ্য করা হয় না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যদিও ওজু করা হয়, মাত্রাতিরিক্ত পানি খরচ করলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে মিতব্যায়ী হবার যে নির্দেশ কুরআনে রয়েছে তা মেনে চলা হয় না – …eat and drink: But waste not by excess, for Allah loveth not the wasters (7:31, Yousuf Ali). শেষ বিচারের দিন ধনী গরীব সবাইকে নিজের সম্পদের হিসাব দিতে হবে। ওজুর সময় পানি অপচয় করলে তার জবাবদিহিও আমাদের করতে হবে।
উদাহরণ হিসাবে আমার কাতারের দোহা অফিসের ওয়াশরুমের কথাই ধরা যাক। দুপুর বারোটা অর্থাৎ জোহরের নামাজের পর ওয়াশরুমে প্রবেশ করলে মনে হবে যেন লঙ্কাকা- ঘটে গেছে। হ্যান্ড-ওয়াশ বেসিন, টয়লেটের কমোড, মেঝে সবকিছুই পানিতে সয়লাব। পূর্ণবেগে ট্যাপ চালিয়ে ওজু করার সময় অনেকে হ্যান্ড-ওয়াশ বেসিনের মধ্যে পা তুলে দেন। বেসিনের চারিপাশ পরিত্যক্ত পানিতে ভরা থাকে বলে ওজু করার সময় নিজের কাপড় বাঁচানো মুশকিল হয়ে যায়। আর টয়লেটে তো পা রাখাই দায়। তার মানে কি দাঁড়ালো? আমরা ওজুর মাধ্যমে নিজেকে পরিস্কার করতে গিয়ে নামাজে গমনোদ্যত অন্য একজন মুসল্লির পরিধেয় বস্ত্র দূষিত করে দিচ্ছি।
ছোটবেলা থেকে যে হাদিসটির কথা শুনে আসছি তা হল – Cleanliness is half of Iman (Faith)… (Muslim, Book 2, No. 0432) পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ধারণা ইসলামের মূল বিশ্বাসে প্রোথিত থাকলেও বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করতে আমরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি। দুঃখ হয়, আমার পশ্চিমা সহকর্মীরা যখন এ নিয়ে কটাক্ষ করেন। বৃক্ষের পরিচয় যেমন ফলে, তেমনি আমাদের কর্ম, আচার ব্যবহার দেখে অমুসলিম সমাজ ইসলাম সস্পর্কে যাতে ভুল ধারণা না পায় সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে। ওজু করার সময় যদি পানি অপচয় করা হয় তাহলে যে জন্য ওজু করা অর্থাৎ সেই নামাজ, আল্লাহর কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে সেটা সহজেই অনুমেয়।
এবার দেখা যাক ওজুর করার জন্য আমাদের রাসুল (সা.) কতটুকু পানি ব্যবহার করতেন – The Prophet used to perform ablution with one Mudd of water. (Bukhari, Vol. 1. Book4, No. 200 & Muslim). মুনাজাতের ভঙ্গিতে জড়ো করা দুই হাতের তালুর কোষে যতটুকু পানি ধরবে সেটাই হল এক মাদ, যা ৫৪৩ গ্রামের সমতুল্য। একবার ভেবে দেখুন, মহানবী কত অল্প পরিমাণ পানি দিয়ে ওজু সম্পন্ন করতেন! যুক্তির খাতিরে বলা যায়, মরুভূমিতে পানির অভাব বলেই হয়তো রাসুল (সা.) সামান্য পানিতেই ওজু সারতেন। কিন্তু নিচের হাদিসটি দেখুন- Do not be wasteful when performing wudhu even if you were at a flowing river……” (Ahmed 7025, 2/291, Ibn Majah 425,1/254).
পৃথিবীর ৯৭.৫ ভাগ পানি লবণাক্ত বা পানের অযোগ্য। বাকি ২.৫ ভাগের আবার দুই তৃতীয়াংশ হল বরফ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর পানির মাত্র ০.০৮ ভাগ মানুষের ব্যবহারে উপযোগী! জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্বে পানির চাহিদা যেমন বাড়ছে তেমনি পানিও ব্যাপক হারে হ্র্রাস পাচ্ছে। ঢাকাসহ অন্যান্য শহরগুলোতে এখন পানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিনিয়ত ভূ-গর্ভস্থ পানির উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের হিসাবে সারাবিশ্বে ১১০ কোটি মানুষ নিরাপদ পানি পান করতে পারে না। প্রতিবছর ৫০ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে দূষিত পানির কারণে, মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিন ৬ হাজার নিষ্পাপ শিশুর। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০২৫ সাল নাগাদ ৪০০ কোটি মানুষ পানির অভাবে ভুগবে। তবে এ নিয়ে মানুষ খুব একটা উদ্বিগ্ন বলে মনে হয় না। কাতারে জনপ্রতি দৈনিক পানি খরচের পরিমাণ হল ৫০০-৫২০ লিটার আর আরব আমিরাতে ৫৫০ লিটার! এটা উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের চেয়েও বেশি। যেমন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের বাড়ি-ঘরে জনপ্রতি দৈনিক পানির চাহিদা হল ৩০০-৩৫০ লিটার।
মধ্যপ্রাচ্যে পানির চেয়ে গাড়ির পেট্রোল সস্তায় কেনা যায়। তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে পানি যে কত মূল্যবান, ক’দিন আগে ওমানের সুলতানের একটি মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, তেলের খনির বদলে পানির সন্ধান পেলেই এখন তিনি সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন। কাতারের পানির উৎস হল সমুদ্র। সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় পরিশোধন করে সুপেয় করা হয়, যাতে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রচুর বিদ্যুৎ ও জ্বালানী। কার্বন দূষণের শিকার হচ্ছে পরিবেশ, সবুজ গ্যাস নির্গমনের ফলে ওজোন স্তর ক্ষীণ হয়ে আসছে, যা মানবজাতির অস্তিত্ত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমরা একটু সচেতন ও দায়িত্বশীল হলে বিশ্বের পানি সংরক্ষণে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারি। সুখের কথা হল, প্রতিটি মুসলিমের এই সুযোগ রয়েছে দিনে অন্তত পাঁচবার, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে ওজু করার সময়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমরা যা করতে পারিঃ
. পানির কল পুরো না খুলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওজু শেষ করা;
. ওজুর প্রস্তুতি পর্বে ট্যাপ খোলা না রাখা;
. পানির ট্যাপে water saving device যুক্ত করা, যা দিয়ে পানির অপচয় খরচ ৭০ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব;
. পরিবারের সদস্য ও বন্ধু বান্ধবদের ওজু করার সময় রয়ে সয়ে পানি খরচ করার জন্য সচেতন করা;
. স্কুল, কলেজে ভিডিও প্রদর্শনের মাধ্যমে সচেতনতা গড়ে তোলা ইত্যাদি।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ যে সব উদ্যোগ নিতে পারেন:
. খুতবার সময় ইমামদের পানির অপচয় রোধ করার জন্য কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মুসল্লীদের তাগাদা দেয়া;
. জুমার সময় হ্যান্ডবিল বিতরণ করা;
. আজানের পর সংক্ষিপ্ত ঘোষণা দেয়া যা রেকর্ড করেও বাজানো যেতে পারে;
. ওজুর ব্যবহৃত পানি পরিশোধন করে পুনঃব্যবহার করা;
. বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ওজুর জন্য ব্যবহার করা;
. পানির ট্যাপে water saving device যুক্ত করা, ইত্যাদি।
দুবাইয়ের একজন ভারতীয় প্রকৌশলী গবেষণা করে দেখেছেন, ওজু করার সময় মুসল্লিরা সর্বোচ্চ ২-৩ লিটার পর্যন্ত পানি খরচ করে থাকেন। বিশ্বের বর্তমান মুসলিম জনসংখ্যা হল প্রায় ১৫০ কোটি। যদিও বাংলাদেশসহ অনেক দেশে পুকুর কিংবা চৌবাচ্চার পানি দিয়ে ওজু করা হয়, তবুও হিসাবের খাতিরে ধরা যাক ওজুর জন্য দিনে প্রতিটি মুসলিম গড়ে ১ লিটার করে পানি খরচ করেন, তাহলে সেটার যোগফল গিয়ে দাঁড়াবে ৪,০০০ সুইমিং পুল ভর্তি পানির সমান! তাই একটু দায়িত্বশীল হয়ে ওজুর পানি খরচ করলে পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি আমরা আল্লাহ ও রাসুলেরও সস্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হবো। মহানবী (সা.) বলেছেন:
‘There will be people from my nation who will transgress in making supplications and in purifzing themselves.” (Ahmad, Abu Dawud and An-Nasa’i).
