প্রতিটি মুসলিমের মনের গভীরে হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে সুদূর মক্কা পাড়ি দেয়ার একটা লালিত স্বপ্ন থাকে। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। তবে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করার পাশাপাশি সময়ের চোরাপথে হারিয়ে যাওয়া ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী মক্কা ও মদিনার পথে পথে খুঁজে দেখারও একটা অদম্য ইচ্ছা ছিল আমার। সেই সুযোগও এসে গেল সহসা।

২০০৮ সালের মাঝামাঝি অস্ট্রেলিয়া থেকে চাকরি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মরু দেশ কাতারে পাড়ি জমাই। এখানে এসে দেখলাম, সৌদি আরবে যাওয়াটা অনেকটা ডাল-ভাতের মতো ব্যাপার। অনেকে বাসে কিংবা নিজের গাড়িতে চড়ে পরিবার পরিজন নিয়ে বছরে বেশ কয়েকবারও উমরা করে আসছে। দোহা শহর থেকে সৌদি সীমান্ত মাত্র ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে। সীমান্ত ফাঁড়িতে চেক-আপ সেরে আর হাজারখানেক কিলোমিটার গেলেই মক্কা। একটানা গাড়ি না চালিয়ে অনেকে রিয়াদে যাত্রাবিরতি নিয়ে নেন। ভাবলাম, মক্কার মতো কাছাকাছি রয়েছি তাই বিমানে না গিয়ে স্থলপথে গেলে কেমন হয়? তবে নতুন পরিবেশে নিজে গাড়ি চালিয়ে যাবার জন্য সাহস করলাম না। ভাবলাম বাসেই যাবো। বাসে করে গেলে যাবার পথে সৌদি মরু প্রান্তরের ধুসর রূপ দেখা যাবে আর মাটি ছুঁয়ে যাবার ভিন্ন এক অনুভূতির স্বাদ পাওয়া যাবে।

সাধারণত মার্চ মাসে উমরা ভিসা দেয়া শুরু হয়। তাই দেরি না করে ২০০৯ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে মক্কা যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। কয়েকটা ট্রাভেল এজেন্সিতে গিয়ে বিমানে যাবার ও থাকা/খাওয়ার খরচের একটা মোটামুটি হিসাব নিলাম। বাসার কাছেই দোহা গ্রুপ ট্রান্সপোর্টের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। দোহা গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে পকিস্তানীরা। শুনে প্রথমে একটু দমে গেলেও খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, ওদের ব্যবস্থাপনা ততটা মন্দ নয়। আর যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছি বাড়তি কষ্ট হলেও তার জন্য আমরা মানসিকভাবেও প্রস্তুত ছিলাম।

টিকেটের সাথে উমরা ভিসা, মক্কা ও মদিনায় থাকার ব্যবস্থাও থাকবে। শুধু খাবার আমাদের কিনে খেতে হবে। পুরো ডিলটা ভালোই মনে হল। সাথে সাথেই দোহা গ্রুপের কাছে পাসপোর্ট জমা দিয়ে দিলাম। যাবার দিনও ঠিক হল। বাস ছাড়বে এপ্রিলের ৮ তারিখ, ভোর সাতটায়।

এপ্রিলের ৫ তারিখের মধ্যেই উমরা ভিসা হয়ে গেল। যতই দিন ঘনিয়ে আসছিল ততই মনের মধ্যে অন্য এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করছিলাম। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল আসলেই আমি মক্কার যাত্রী। আবশেষে যাবার দিন চলে এল। শেষ মুহূর্তে কেনাকাটা যেমন ইহরামের কাপড়, মুনিরার জন্য বোরকা, বাম্প ব্যাগ, সেলাইবিহীন স্যান্ডেল কেনা শেষ করে ফেললাম। বইপুস্তক ঘেটে বাংলা ও ইংরেজিতে উমরা পালনের নিয়মাবলী ও দোয়ার দুটো সংস্করণ তৈরি করলাম। এগুলি থেকে আমার কন্যা মুনিরা Palm Cards তৈরি করে নিল, উমরার সময় যাতে Palm Cards দেখে দেখে দোয়া পড়া যায়।

৮ এপ্রিল, বুধবার ভোর সাড়ে ছ’টায় ঘর থেকে বেরুলাম। বাসস্ট্যান্ড আমার বাসার খুবই কাছে, ৫ মিনিট হাঁটার পথ। পুরো বাসে রয়েছে ৫৫ জন যাত্রী। অনেকের সাথে আছে ৮ মাসের শিশুও। যাত্রীদের মধ্যে রয়েছে ৫টি বাঙালি পরিবার। তার মধ্যে আবার দু’জন চট্টগ্রামের অধিবাসী। অন্যান্য যাত্রীদের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানী, ইন্দোনেশীয় ও ভারতীয়। ড্রাইভার পাকিস্তানী পাঠান, উর্দু ও পশতুন ছাড়া অন্য ভাষা বলতে পারে না। আরবি চালিয়ে নিতে জানে। গাড়িতে আমাদের আসন ছিল একবারে সামনের সারিতে। উঠেই দেখলাম ময়লা যাতে সঠিক জায়গায় ফেলা হয় সেই সংক্রান্ত একটি নোটিশ। নোটিশে Waste-কে লিখা হয়েছে Waist যা দেখে আমার মেয়ে মুনিরা হেসেই খুন। দুঃখজনক হলেও সত্য এই নোটিশ যাত্রীদের মধ্যে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি। গাড়ির মেঝেতে খালি পানির বোতল, চিপ্স ও প্লাস্টিক ব্যাগের ছড়াছড়ি দেখতে পেলাম।

আমার পাশের সিটে যে ভদ্রলোক বসলেন তিনিও বাংলাদেশী। নাম আব্দুল মান্নান। গাড়িতে পাশাপাশি দুটো করে সিট হওয়াতে আমাকে আলাদা বসতে হল। মান্নান সাহেব আমাদের চেয়ে বেশ সিনিয়র। প্রায় ২০ বছর ধরে কাতারে আছেন। তিনি প্রতি দু’বছর অন্তর পরিবার নিয়ে সৌদি যান। তাঁর কাছ থেকে সফরের অনেক খুটিনাটি বিষয়ে জানতে পারলাম। তিনি বললেন, যদি সৌদি চেকপোস্টে খুব দেরি না হয় পাক্কা একদিন লাগবে মক্কা পৌছতে। আর চেকপোস্টে দেরি হলে কি হবে তা সহজেই আন্দাজ করতে পারলাম।

এ কথা শুনে সেলী ও মুনিরার চোখ দুটো ছানাবড়া! আমরা কখনোই বাসে এত দীর্ঘক্ষণ ভ্রমণ করিনি। ভিসার জটিলতা না থাকলে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টার বেশি লাগাবার কথা নয়। যাই হোক, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে যখন বের হয়েছি তখন পথে যতই দেরি হোক না কেন এ নিয়ে কোন রকম দুর্ভাবনা করার দরকার নেই। যা হবার হবে।

সকাল সোয়া সাতটায় বাস ছাড়ল। সৌদি সীমান্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে। ভোরে ট্রাফিকের ভীড় ঠেলে দেড় ঘন্টার মধ্যেই কাতার কাস্টম চেকপোস্টে পৌছে গেলাম। আমাদের সবার পাসপোর্ট ড্রাইভার তার ব্যাগে ভরে কাস্টম অফিসে নিয়ে গেল। চেকপোস্টটা বেশ সাজানো গোছানো। সাথে রয়েছে একটি কফিশপ ও আধুনিক টয়লেট। আমরা কফিশপে চা খেলাম। ঘন্টাখানেকের মধ্যে পাসপোর্টে এক্সিট সিল দিয়ে ফিরে এলো ড্রাইভার। গাড়িতে গিয়ে বসার পর আমাদের সবার হাতে পাসপোর্ট দেয়া হল। কাতারী কাস্টম অফিসার এসে সবার পাসপোর্ট ও চেহারা মিলিয়ে দেখার পর আবার যাত্রা শুরু হল।

১৫ মিনিটের মধ্যেই সীমান্তের ওপারে সৌদি সালওয়া চেকপোস্টে এসে পৌছলাম। সময় তখন সকাল সোয়া দশটা। সৌদি চেকপোস্টেটাই দেরি হবার মূল কারণ বললেন পাশের ভদ্রলোক। একবার গাড়ির ভীড় থাকাতে সৌদি চেকপোস্টে নাকি সারারাত কেটে যায়। শুনে ভড়কে গেলাম। ভাবলাম পৌছতে পারব তো? সৌদি চেকপোস্টের বাহ্যিক অবস্থা দেখে হতাশ হলাম। কাতার চেকপোস্ট থেকে সৌদি চেকপোস্টে ঢুকে সবকিছু ভীষণ দৃষ্টিকটু মনে হল। কংক্রিটের ছাউনি দেয়া চেকপোস্ট দেখে কমলাপুর রেল স্টেশনের কথা মনে পড়ে গেল। বাস ও মোটরগাড়ির জন্য রয়েছে আলাদা লেন। মোটরগাড়িতে যারা যাচ্ছেন তাদের অনেকেই হলেন সৌদি কিংবা কাতারী, কাস্টম অফিসাররা তাদের নিয়েই অনেক সময় ব্যস্ত থাকেন। ফলে বাস যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষার দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

সৌদি চেকপোস্টে যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য ওয়েটিং রুম কিংবা কোন কফিশপ নেই। ছাউনির নিচে বসার জন্য রয়েছে কিছু ভাঙ্গা বেঞ্চ। বেশ গরম পড়ছে বলতেই বাঙালি ভদ্রলোক বললেন, এখন অনেক ভালো সময়, জুন জুলাইয়ের প্রচন্ড গরমে ছোট বাচ্চা ও পরিবারসহ যাত্রীদের ঘন্টার পর ঘন্টা এই খোলা প্লাটফর্মেই কাটাতে হয়। ভাবতেই কষ্ট হল। ভাগ্য ভালো আমাদের সামনে রয়েছে মাত্র একটি বাস, ফলে দেরি হবার সম্ভাবনা কম। খোদাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম। সব লাগেজ প্লাটফর্মে নামানো হল। কাস্টম সিকিউরিটি অফিসার কুকুর দিয়ে গাড়ির ভেতর/বাহির ও ইঞ্জিন ঘরও খুলে পরীক্ষা করলেন। বোরকা পরার কারণে শুধু মেয়েদের বডি সার্চ করা হল যাতে বোরকার আড়ালে কিছু পাচার করা না যায়। আবার কিছুু মহিলা যাদের মুখও ঢাকা কিংবা শুধু চোখ দেখা যায় তাদের আলাদা করে নিয়ে গিয়ে পাসপোর্টের সাথে চেহারা মিলিয়ে দেখা হল। সবকিছু শেষ করে গাড়ি যখন ছাড়ল সময় তখন দুপুর ১২:৩০ মিনিট। জোহরের আজান হয়ে গেছে। সবাই নামাজ পড়ার জন্য উসখুস করছে। কিন্তু ড্রাইভার বললেন ১৫০ কিলোমিটার দূরে হফুফে গিয়েই নামাজ ও দুপুরের খাবার খাওয়া হবে।

রাস্তার সাইনবোর্ড থেকে হিসাব করে দেখলাম দোহা ও মক্কার দূরত্ব প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার। সাথে ছিল Wikimapia থেকে প্রিন্ট করা একটা রুটম্যাপ। সৌদি হাইওয়ে ৮৫ ধরে বাস যাচ্ছিল। কাতার সীমান্ত থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে সৌদি শহর হফুফ। হফুফ থেকে রিয়াদ হয়ে হাইওয়ে ৪০ ধরে অবশেষে আমরা মক্কা যাব। বাসে যাবার কথা শুনে আমাদের আত্মীয় স্বজনদের অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন নিরাপত্তার কথা ভেবে। সৌদি রাস্তা সম্পর্কে সবার যা ধারণা তা শুনে আমি নিজেও দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছিলাম। কিন্তু রাস্তায় নেমে দেখি যতটা শুনেছি ততটা নয়। হাইওয়েগুলি ভীষণ প্রশস্ত, নিখুঁত, দুই দিকে ৩টি করে ছয়টি লেন। কিছুক্ষণ পরপর রয়েছে আরবি ও ইংরেজিতে বড় বড় রোড সাইন যাতে রয়েছে শহরের নাম, দূরত্ব ইত্যাদি। রাস্তা হারাবার ভয় নেই। যে যার মতো ধীরে কিংবা স্পীডে গাড়ি চালিয়ে ছুুটছে নিজস্ব গন্তব্যের দিকে।

বাসের ভিতর চোখ বুলিয়ে দেখি অনেকেই তন্দ্রাচ্ছন্ন। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে আমি বাইরে চোখ রাখলাম। চারিদিক ধূ ধূ রৌদ্দুর আর মরুভূমি। দূরে মরীচিকার মতো দেখা যাচ্ছিল কিছু আবার হঠাৎ করেই শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছিল। মরুদ্যানের নির্জনতা ভেঙ্গে ছুটে চলেছে বাস সমুখের দিকে। কিন্তু কেন জানি না বুকের মধ্যে আমার ভাবনাগুলো স্মৃতির হাইওয়ে ধরে ছুটে যাচ্ছিল উল্টোদিকে। কখনো ভাবিনি দীর্ঘ দু’দশকেরও বেশি অস্ট্রেলিয়ায় কাটানোর পর আবার অন্য কোথাও যাবো চাকরি নিয়ে। সত্যি বলতে কি, মধ্যপ্রাচ্য ছিল আমার পছন্দের তালিকারও বাইরে। অথচ সেই আমি এখন দোহার বাসে চড়ে যাচ্ছি মক্কায়। দেখলাম, জীবনের অনেক কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। শত চেষ্টাতেও ইচ্ছের শেকল দিয়ে ওদের বাঁধা যায় না। জীবনে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে যা খালি চোখে অসম্ভব বলে মনে হয়। এটাকেই হয়ত সবাই বলে নিয়তি, যা হচ্ছে অন্য একজন শক্তিধরের নিয়ন্ত্রণে।

হঠাৎ করে এক ঝাঁক উটের সারি দেখে সম্বিত ফিরে পেলাম। কিছু দূর পর বেশ কিছু উটের খামার দেখতে পেলাম। কিন্তু যেদিকে চোখ যাচ্ছে দেখছি কিছুটা মেটে রংয়ের সারি সারি বালির ঢিবি আর হাই-ভোল্টেজ পাওয়ার লাইন। বালির ঢিবির মাথায় রয়েছে ধূসর রংয়ের কিছু টুকরো লতাপাতা। এছাড়া সুবজ বলতে গেলে কিছুই চোখে পড়ল না। দিগন্তজুড়ে তেমন কোন পাহাড়ও দেখছিলাম না। ম্যাপে চোখ বুলিয়ে দেখলাম, হফুফ থেকে রিয়াদের চারিপাশ মোটামুটি সমতল, মক্কার কাছাকাছি এলাকা হল উঁচু ভূমি।

এভাবে চলতে চলতে দুপুর দু’টার দিকে হফুফ পৌঁছলাম। স্থানীয় একটি পেট্রোল স্টেশনে বিরতি দেয়া হল। পেট্রোল স্টেশনটা বেশ বড়, রয়েছে খাবারের রেস্টুরেন্ট, মসজিদ, টয়লেট ও বেশ বড় ওজু করার জায়গা। গাড়ি থেকে নেমেই সবাই নামাজ পড়ে নিলাম। খাবারের দোকানে গিয়ে দেখি ম্যানেজার থেকে শুরু করে প্রায় সবাই বাংলাদেশী ও চট্টগ্রামের অধিবাসী। তবে খাবারের অর্ডার দিতে গিয়ে প্যাসেঞ্জারদের হুড়োহুড়ি দেখে অবাক হলাম। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। অথচ আমরা সবাই যাচ্ছি ধর্মীয় ব্রত পালন করতে। কোথায় গেল সেই ধৈর্যধারণের কথা? মনে হল খাবার বোধহয় এখনই শেষ হয়ে যাবে। যে পারছে অন্যকে ডিঙিয়ে খাবারের অর্ডার দিচ্ছেন। কে কার আগে কিউতে দাঁড়িয়ে তা দেখার হুশ নেই কারো। ১৫ মিনিটের মধ্যেই কিন্তু অর্ডার দেয়া শেষ। কি দরকার ছিল এই তাড়াহুড়োর? কে জানে, এটা হয়ত আমাদের চিরাচরিত স্বভাবেরই অংশ। আমরা যে পরিবেশেই থাকি না কেন এই স্বভাবের পরিবর্তন হয়ত কখনোই হবে না।

জোহরের পর বিরতিহীনভাবে গাড়ি চলতে থাকল। মাগরিবের সময় প্রায় ৬:২০ এর দিকে নামাজের ছোট্ট বিরতি দেয়া হল। আমি একটু স্ট্রেচিং করে নিলাম। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকাতে পিঠে সমস্যা হচ্ছিল। হাতে করে চা নিয়ে আবার গাড়িতে উঠলাম। ড্রাইভার বললেন, রাত দশটার আগে কোনো বিরতি নেই। গাড়ি রিয়াদ শহর বাই-পাস করে চলে গেল। যাবার সময় দূরে রিয়াদ শহরের ঝলমলে বাতি দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, রাস্তায় বেশ কিছুদূর পরপরই রয়েছে বালির বস্তা দিয়ে ঘেরা সুরক্ষিত সৌদি পুলিশ ফাঁড়ি। ফাঁড়ির কাছে আসতেই সব গাড়ি ধীরে চলছিল। কোনো কোনো গাড়ি থামিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদও করছিল। রাত ৮টার দিকে হঠাৎ করে শুরু হল প্রচন্ড ধূলোঝড় ও সাথে বৃষ্টি। জরুরি লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বাস চলছিল খুব ধীরে। ধুলো মিশ্রিত বৃষ্টির কাদাপানিতে বাসের উইন্ডশিল্ড হয়ে যাচ্ছিল কালো। ভয় হচ্ছিল, কারণ ২/৩ মিটার দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পরেই দেখি শাক-সব্জি ভর্তি একটি ট্রাক রাস্তার একপাশে উল্টে পড়ে আছে। প্রায় আধঘন্টার মধ্যে ঝড় বৃষ্টির এলাকা থেকে আমরা বেরিয়ে আসলাম, আবার সাবলীল গতিতে চলতে থাকল বাস।

রাত দশটার দিকে গাড়ি থামল একটি পেট্রোল স্টেশনে। রাতের খাবার খেতে হবে। রাস্তার ধারের এই রেস্টুরেন্টগুলোর মান বেশ উন্নত। আরবী, বাঙালি, পাকিস্তানী, ভারতীয় সব ধরনের খাবারই এখানে পাওয়া যায়। এবার আমরা আরবি খাবার খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। একটি বড় প্লেটে পোলাওর মতো হালকা হলুদ রংয়ের ভাত, সাথে দুভাগ করা গ্রিলড্ চিকেন ও সালাদ দেয়া হল। খুবই সুস্বাদু, এক কথায় অসাধারণ! ইশার নামাজ ও খাবার শেষ করে আবার গাড়িতে চড়ে বসলাম। একসময় কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। মাইকে ড্রাইভারের কন্ঠে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। সময় দেখি ভোর ৩টা। ড্রাইভার বললেন, আর দশ মিনিটের মধ্যে আমরা তায়েফের মিকাতে পৌঁছে যাব। এখানেই এহরাম বাঁধতে হবে। তায়েফ মক্কা থেকে খুব বেশি দূরে নয়, মাত্র ৯০ কিলোমিটার। ফজরের নামাজের পরপরই আবার শুরু হবে মক্কার পথে যাত্রা।