৯ এপ্রিল ২০০৯, ভোর সাড়ে তিনটায় তায়েফের প্রান্তরে এসে পৌঁছলাম। মিকাত এলাকায় ঢোকার মুখেই রয়েছে সাদা কংক্রিটের আকাশছোঁয়া মিনার যা দিয়ে মিকাতের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস থেকে নেমে মনে হল এক ভিন্ন জগতে পা রেখেছি। চারদিক শুধু সাদার মেলা। পুরো মিকাত এলাকাজুড়ে রয়েছে অসংখ্য দোকানপাট। সবখানে জ্বলছে সাদা নিয়ন বাতি, যার আলোতে মনে হচ্ছিল শুভ্র ধবল মেঘের দেশে চলে এসেছি। দোকানের ভেতরে ও বাইরো থরে থরে সাজানো সাদা রংয়ের সামগ্রী যেমন ইহরামের জন্য পরিধেয় কাপড় (যাকে বলা হয় রিদা ও ইজার), সাদা স্যান্ডেল, সাদা বাম্প ব্যাগ ইত্যাদি। মহিলা ও পুরুষদের জন্য দেখতে পেলাম আলাদা বাথরুম/টয়লেট, সাথে একটি বিশাল মসজিদ। যেদিকেই চোখ রাখি না কেন কেবল চোখে পড়ছে সাদা ইহরামের কাপড়পরা মানুষের কাফেলা। মিকাতের সমগ্র এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে কেমন এক ধরনের উত্তাপ, শোনা যাচ্ছে চাপা গুঞ্জরণ। সবার মধ্যে ব্যস্ততার ভাব, যেতে হবে সহসা অন্য কোথাও, চোখের মনিতে জ্বলছে শান্ত অথচ উৎকন্ঠাভরা আকুতি—কখন এবং কোথায় মিলবে কাক্সিক্ষত স্বপ্নের দেখা?

পর্বতমালার শিখরে গড়ে উঠেছে এই তায়েফ শহর। সমুদ্র-ভূমি থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১৮০০ মিটার। মিকাতে গোছল করে পাক পবিত্র হয়ে ইহরামের কাপড় পরে উমরার নিয়ত করতে হয়। তাই মিকাতে ব্যবহারের জন্য কাপড় চোপড়, স্যান্ডেল ও টাওয়েল আমরা বড় স্যুটকেস থেকে সরিয়ে আলাদা একটি ব্যাগে ভরে নিয়েছিলাম।

এই হল সেই তায়েফ শহর যেখানে সত্যের আহ্বান জানাতে এসে শহরবাসীর হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন আমাদের রাসুল (সা.)। সময়টা হল ৬১৯ সাল। নবুয়তপ্রাপ্তির পর পার হয়েছে প্রায় ১০ বছর কিন্তু মক্কায় মুসলিমের সংখ্যা তখনও মাত্র ২০০ জনেরও কম। তাছাড়া একই বছরে পর পর রাসুলের মমতাময়ী স্ত্রী ও সহযোদ্ধা বিবি খাদিজা ও পরম শুভাকাংখী চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর মক্কাবাসীর লাঞ্ছনা ও হুমকির মুখে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় যাচ্ছিল তাঁর। তাই মক্কার আশা অনেকটা ছেড়ে দিয়ে তিনি দক্ষিণে তায়েফ শহরের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন। ভেবেছিলেন হয়তো তায়েফবাসী তাঁর আহ্বানে সাড়া দেবে। কিন্তু সাড়া দেয়ার বদলে একদল উশৃংখল জনতা রাসুল ও তাঁর সঙ্গী জায়েদকে বিদ্রুপ করে পাথর ছুড়ে মারতে থাকে, যার আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছিল রাসুলের শরীর।

রাসুলের শরীর থেকে বহমান রক্ত জমাট বেঁধে পায়ের পাতার সাথে পাদুকা সেঁটে গিয়েছিল। শহর থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি আশ্রয় নেন একটি আঙ্গুরের বাগানে, যার মালিক ছিল একজন মক্কাবাসী। রাসুলের এই অবস্থা দেখে নিজের এলাকার মানুষ হিসাবে তার মনে দয়ার উদ্রেক হল। তিনি রাসুল (সা.) ও জায়েদকে বিশ্রামের সুযোগ দিলেন ও তার খ্রিষ্টান দাস আদ্দাসকে এক থালা আঙ্গুরও দিতে বললেন। রাসুল (সা.) আঙ্গুর খাবার আগে উচ্চারণ করলেন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’। সেই থেকে বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন মুসলিমদের মুখে এই বাক্য উচ্চারিত হচ্ছে শত কোটিবার। আদ্দাস মহানবীর (সা.) মুখে সত্যের শ্বাশত বাণী শোনার পর ইসলাম গ্রহণ করলেন। রাসুলের মিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হল না।

এইভাবে তায়েফের মরুপ্রান্তরে রাসুলের রক্তের আখরে লেখা হল আরো একটি নওমুসলিমের নাম—আদ্দাস। একটা ব্যাপার লক্ষণীয় তা হল, তায়েফ গমনের তিন বছর পর অর্থাৎ ৬২২ সালে রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। ৬১০ সালে নবুয়তপ্রাপ্তির পর থেকে ৬২২ সাল—এই ১২ বছরে রাসুলুল্লাহকে ধর্মের বাণী প্রচার করতে হয়েছে ভীষণ পরিশ্রম করে, কখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, কখনও লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা সয়ে। তবে এত পরিশ্রমের পরও সফলতা মিলেছিল খুই অল্প। কিন্তু দেখা গেল, মদিনায় যাবার পর বাকি জীবনের মাত্র ১১ বছরের মধ্যেই তিনি অর্জন করলেন পরিপূর্ণ সফলতা, প্রতিষ্ঠা করলেন ইসলামিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা। ইচ্ছে করছিল সকালটা থেকে দেখে যাই তায়েফের সেই আঙ্গুরের বাগান। কিন্তু আমার যে তাড়া রয়েছে। আর মাত্র দু’ঘন্টার মধ্যেই ছাড়বে বাস।

একটি প্লাস্টিক ব্যাগে আমার কাপড় চোপড় নিয়ে ছুটে গেলাম গোসলখানায়। গিয়ে দেখি সে এক এলাহী কারবার! প্রতিটি বাথরুমের সামনে বিরাট লাইন। এখনই এই অবস্থা, না জানি হজ্জের সময় কি হবে? একটা লাইনের পেছনে দাঁড়ালাম। আমার সামনে আরো পাঁচজন। একটু বিরক্ত হচ্ছিলাম আমার পেছনের মানুষটির ঠেলাঠেলি দেখে। কিন্তু সাথে সাথেই মনে পড়ল, এখন কোন বিরক্তি, রাগ, কিংবা উষ্মা প্রকাশের সময় নয়। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সংযত করলাম। পেছনের মানুষটিকে আমার আগে দাঁড়াতে বললাম। ওই ভদ্রলোক বেশ অবাক হলেন। এভাবে প্রায় ২৫ মিনিট অপেক্ষার পর আসল আমার পালা। বাথরুমে ঢুকে পড়লাম।

ব্যাগে দেখি সাবান নেই। কিন্তু তাতে কি? দেখি বাথরুমের ছোট্ট সেল্ভ ও মেঝেতে সুগন্ধি সাবান থেকে শুরু করে শ্যাম্পু ও সেভিং রেজরও পড়ে আছে অনেক। একটা সাবান তুলে নিয়ে চটজলদি গোসল সেরে ফেললাম। ইতিমধ্যে দরজায় টোকা পড়তে শুরু করেছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে ইহরামের কাপড় পরার জন্য বাইরে একটা খেজুর গাছের নিচে দাঁড়ালাম। ইহরামের কাপড় বেশ বড় হওয়াতে নিচের অংশ অর্থাৎ ইজার পরতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। বেশ ক’বার চেষ্টার পর সফল হলাম। ইজারের উপর সাদা বেল্টটা টান টান করে বাঁধলাম আর উমরার নিয়মাবলী সংক্রান্ত পাম কার্ডগুলি বেল্টের চোরা পকেটে গুঁজে রাখলাম। মসজিদের সামনে এসে দেখি মুনিরা ও সেলী ইতিমধ্যে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। মুনিরা অবাক চোখে আমাকে দেখে বলল, ‘বাবা তোমাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে!’ আমরা সবাই নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে প্রবেশ করলাম।

মসজিদে ঢুকে চোখ বুলিয়ে দেখি ছোট বড়, বিভিন্ন বয়সের মানুষ, প্রার্থনায় নতজানু, সবার মুখে একই উচ্চারণ লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক। কিছুক্ষণের মধ্যে ফজরের আজান হয়ে গেল। নামাজ পড়ে সবাই গাড়িতে উঠে পড়লাম। ভোর ৬টার আগেই বাস চলতে শুরু করল। মহানবীর রক্ত ও ঘামে ভেজা স্মৃতির শহর তায়েফ ছেড়ে চলে যাচ্ছে বাস। পেছনে ফেলে যাচ্ছে সেই আঙ্গুরের বাগান, রাসুলের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ। দু’পাশের খেজুর গাছের সারি যেন সেই বেদনাভরা কাহিনীর নিরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিষন্ন মৌনতায়। আমরা সবাই ক’দিন পর আবার ফিরে যাবো ইট কাঠের খাঁচার নিরাপদ আশ্রয়ে। শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতা, ব্যস্ততা ও আবেগের অরণ্যে হয়ত হারিয়ে যাবে তায়েফের ক্ষণিক স্মৃতি। কিন্তু তায়েফ শহরের এই মরু প্রান্তর অনাদিকাল ধরে লক্ষ কোটি হাজ্জীদের কানে কানে শোনাবে রাসুলের কষ্ট ও বেদনার কথা শব্দহীন সংলাপে।

গাড়িতে পিনপতন নিস্তব্ধতা, কেবল থেমে থেমে উচ্চারিত হচ্ছে সমস্বরে লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক। তখনো সূর্য ওঠেনি। দূর দিগন্তে লালচে সোনালি আভা উকি দিচ্ছে। মক্কা শহরে ঢোকার বিশেষ মুহূর্তটা চোখের আড়াল করতে চাইলাম না। ড্রাইভারের ডানপাশে ঠিক দরজার কাছে রয়েছে একটি খালি আসন। সম্ভবত ড্রাইভারের সহযোগীর জন্য নির্ধারিত। তবে ড্রাইভারের সাথে কেউ নেই বলে আমি ওই সীটে গিয়ে বসলাম যাতে দু’পাশের দৃশ্য দেখতে পারি। পাহাড়ের গা ঘেঁষে বাস নিচে নেমে যাচ্ছিল সমতল ভূমির দিকে। প্রায় ৪০ মিনিট চলার পর মক্কা শহরে প্রবেশ করলাম। রাস্তার দু’পাশজুড়ে চোখে পড়ল আকাশছোঁয়া কালো রংয়ের পর্বতমালা। পাহাড়ের গায়ে কোনো লতাপাতা কিংবা গাছের রেশমাত্র‎‎ নেই। দোহা থেকে আসার পথে প্রকৃতির যে রূপ দেখেছি তা থেকে মক্কা অনেকটা ভিন্ন।

একটু পরেই দেখলাম অমুসলিমদের জন্য এক্সিট রুটের সাইন, তার মানে আমরা অবশেষে পবিত্র হারাম এলাকায় প্রবেশ করছি। সকাল ৭:১০ মিনিটে হোটলের সামনে এসে বাস থামল। বাসে বসে মসজিদুল হারামের মিনার দেখতে পেলাম। মনে হল, হোটেল থেকে কাবাঘর খুব দূরে নয়, হেঁটেই আসা যাওয়া করা যাবে। বুধবার ভোর সাতটায় রওনা দিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় একই সময়ে মক্কা পৌছলাম তার মানে পাক্কা ২৪ ঘন্টা! তবে কাস্টম চেকপোস্ট ও তায়েফে অবস্থানের মোট ৭ ঘন্টা সময় বাদ দিলে স্বল্প বিরতিসহ সত্যিকার বাস ভ্রমণ হল ১৭ ঘন্টা। ১৪০০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য এটা গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হল।

বাস থেকে নেমেই দেখি লাগেজ নিয়ে খাবারের দোকানের চেয়ে বেশি হুড়োহুড়ি। প্রতি সপ্তাহে আমাদের মতো দোহা গ্রুপের একদল যাত্রী দোহা থেকে মক্কায় আসছে। আমাদের আগের সপ্তাহে যারা এসেছে তারা মক্কায় সাত দিন থাকার পর এই একই বাসে চড়ে মদিনা হয়ে দোহায় ফিরে যাবে। হোটেলের প্রবেশ পথ ওদের লাগেজে পরিপূর্ণ ফলে আমাদের ঢোকার কোন পথই নেই। মজার ব্যাপার হল, আমাদের লাগেজ নামাবার আগেই মদিনার যাত্রীরা তাদের মালপত্র পাল্লা দিয়ে ঠেলে বাসে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল। ফলে ওদের সাথে আমাদের মালপত্র মিশে যাচ্ছিল। ড্রাইভার মদিনার যাত্রীদের বার বার বলছিলেন কারো ব্যাগ ফেলে যাওয়া হবে না, দয়া করে দোহার যাত্রীদের নামার সুযোগ দিন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? সে এক কুরুক্ষেত্র।

যাই হোক, কোনোরকমে আমাদের লাগেজ নিয়ে রুমে গেলাম। মাঝারি আকারের রুম, রয়েছে তিনটি বেড ও সাথে ইংলিশ কমোডসহ বাথরুম। টয়লেট দেখে আমার মেয়ে মুনিরা হাফ ছেড়ে বাঁচলো। কারণ এ পর্যন্ত রাস্তায় সবখানেই ছিল দেশের মতো স্কোয়াট টয়লেট যার মেঝেতে জমে থাকে একগাদা পানি। ফলে ময়লা পানি থেকে কাপড় বাঁচিয়ে রাখা খুবই দুষ্কর। আমাদের ফ্লোরের করিডোরের এক মাথায় সবার ব্যবহারের জন্য দেখলাম একটি ছোট রান্নাঘর। দেরি না করে লাগেজ রুমে রেখেই উমরা করার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম।

কাবার উত্তর দিকে প্রায় ২০০ মিটারের মধ্যে আমাদের হোটেলের অবস্থান। কাবার এই পাশটায় রয়েছে উচু পাহাড় যার নাম হল ‘জাবালে কাবা’। এই জাবালে কাবা থেকেই পাথর নিয়ে হজরত ইবরাহিম কাবাঘর নির্মাণ করেছিলেন। জাবালে কাবার চারপাশ জুড়ে মসজিদুল হারামের সম্প্র্রসারণের কাজ চলছে। কিছুদিনের মধ্যে এই ঐতিহাসিক পাহাড়গুলি হয়ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বুলডোজারের নির্মম আঘাতে। শুনলাম আমাদের হোটেলটাও নাকি ভেঙ্গে ফেলা হবে সহসা।

কাবাঘর দর্শন: পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে নেমে চলেছি কাবার দিকে। রাস্তায় দেখলাম পুরুষ, মহিলা ও শিশুসহ মানুষের কাফেলা হেঁটে চলেছে একই গন্তব্যের পানে, কারো গায়ে ইহরাম কেউ আবার সাধারণ পোশাকে। অবশেষে সিঁড়ি বেয়ে মসজিদুল হারামের দুই মিনার বিশিষ্ট একটি বিশাল গেটের কাছে এসে দাঁড়ালাম। আমার স্ত্রী সেলী বলল, কাবা তো দেখতে পাচ্ছি না, কাবা কোথায়? আমি বললাম, এই গেইট পার হলেই চোখে পড়বে কাবা। আসার পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যন্ত্রপাতি, লোহা ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর জন্য ঢোকার পরিবেশটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল তাই একটু বিস্মিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

যে গেইট দিয়ে আমরা প্রবেশ করছি তার নাম হল আল-ফাতাহ্, গেইট নাম্বার ৪৫। গেইটের আশে পাশে রয়েছে সুশৃংখলভাবে সাজানো জুতো রাখার জায়গা। ঢোকার মুখেই বসে আছে ক’জন খাকী পোশাকপরা পুলিশ ও হালকা সবুজ আলখেল্লা ও আরবি পোশাক পরিহিত সিকউিরিটি গার্ড। ওরা সবার হাতের ব্যাগ পরখ করে দেখছিল কোনো ভিডিও ক্যামেরা কিংবা খাবার আছে কিনা। বিসমিল্লাহ-এ-আল্লাহু আকবার বলে ভেতরে ঢুকে একটু এগিয়ে যেতেই অবশেষে দৃষ্টির সীমানায় উঠে আসল পবিত্র খানা-এ-কাবা, আল্লাাহর ঘর।

আমরা তিনজনই এই দৃশ্য দেখে অজানা এক আকর্ষণে সম্মোহিত হয়ে গেলাম। এতদিন শুধু ছবির পাতায় যে কাবার ছবি দেখেছি সেই কাবার সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলায় কেঁপে উঠল হৃদয় মন। এই কি সেই হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইলের তৈরি কাবা যার দিকে নুয়ে পড়ে বিশ্বের লক্ষ কোটি মুসলিম সমর্পন করছে নিজের সত্তাকে সৃষ্টকর্তার দরবারে প্রতিদিন? এই কি সেই কাবা যার সুরক্ষার ভার নিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা নিজেই আর পরম ক্ষমতাধর আবরাহার বাহিনী যাকে করতে পারেনি স্পর্শ? এই কি সেই কাবা যার পাদদেশ থেকে স্ফুরিত জমজমের অফুরন্ত জলধারা মেটাচ্ছে বিশ্বের তাবৎ মুসলিমের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা?

ইহরামের কাপড় পড়ে মসজিদুল হারামের মধ্যে পা রাখার পর এতদিনের আমির সাথে আজকের আমির একটা পার্থক্য অনুভব করলাম। শেষ বিচারের দিন যেমন দুই টুকরো কাপড় পড়ে সবাই হাজির হবে মহান সৃষ্টকর্তার দরবারে ঠিক তেমনি একই পোশাকে নিজের পাপে ভরা এই দেহ মন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আজ খোদার ঘর কাবার সামনে। নিজেকে খুবই অসহায় ও তুচ্ছ মনে হচ্ছিল।

ধীরে ধীরে আমরা সাদা মার্বেল পাথরে বোনা কাবার মূল চত্বরে নেমে পড়লাম আর তওয়াফরত হাজারো হাজ্জীর ভীড়ে একাত্ম হয়ে গেলাম। এপ্রিলের শুরুতেই তওয়াফরত মানুষের ভীড় দেখে অবাক হলাম। এই ভীড়ের যেন শেষ নেই। প্রথমে চেষ্টা করলাম কাবার কাছ ঘিরে তওয়াফ করতে কিন্তু কাছেই ঘেষতে পারছিলাম না। তাই ঠিক করলাম আগে তাওয়াফ সেরে নেই পরে কাবাঘরের কাছে যাবো। তাওয়াফকারীদের মধ্যে মহিলার সংখ্যা প্রায় পুরুষের সমান। গাইডসহ হাজ্জীদের বিরাট সংঘবদ্ধ দলও দখলাম। সাধারণত ইরান ও তুর্কি থেকেই হাজ্জীরা এমন বড় আকারের দলে এসে থাকেন। কিছুু ইন্দোনেশিয়ান হাজ্জীর দলও রয়েছে। দলের সহযাত্রীরা খুবই শৃংখলাবদ্ধভাবে দলের নেতাকে অনুসরণ করছে যা সত্যিই অনুকরণীয়। ইরানী গ্রুপের অধিকাংশই মহিলা। প্রতিটি গ্রুপের সদস্যদের পরিধেয় কাপড়ের পেছনে রয়েছে এক ধরনের সংকেত যাতে কেউ গ্রুপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়। গেইট ৪৫ দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে মাকামে ইবরাহিম, তাই সেখান থেকেই আমরা তাওয়াফ শুরু করলাম।

হজরে-আসওয়াদ বা কালো পাথরের কর্নারে আসতেই প্রচন্ড রকমের চাপ অনুভূত হল কারণ সবাই কালো পাথরের কাছে যেতে চাচ্ছিল। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। কালো পাথরের কাছে আসতেই উচ্চকিত কন্ঠস্বরে আল্লাহু আকবার ধ্বণিতে প্রকম্পিত হচ্ছিল অকাশ বাতাস। কাবার দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি শুধু হাত আর হাত। হাতের আঙ্গুল দিয়ে দরজার চৌকাঠ ছাড়িয়ে উঁচুতে আরো উঁচুতে ছুঁতে সবার কি প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা!

এবার চেষ্টা করে দেখলাম কালো পাথরের কাছে যেতে কিন্তু একজন বিশাল দেহের হাজ্জী মারদাঙ্গা মুডে যেভাবে সবাইকে ঠেলে হজরে আসওয়াদের দিক থেকে বেরিয়ে আসল তাতে জনতার চাপে মুনিরার স্যান্ডউইচ হয়ে যাবার দশা। আপাতত হাল ছেড়ে দিলাম। যাই হোক, যথারীতি তাওয়াফ শেষ করে মাকামে ইবরাহিমের পেছনে দাঁড়িয়ে দুই রাকাআত নামাজ শেষ করলাম। মাকামে ইবরাহিম আগে কাবার সংলগ্ন ছিল কিন্তু হজ্জ/উমরার অংশ হিসাবে দুই রাকআত নামাজ পড়ার সময় তাওয়াফের বিঘ্ন ঘটে বলে হজরত উমর একে কাবাঘর থেকে একটু দূরে সরিয়ে আনেন।

নামাজ শেষ করে সাঈ করতে রওয়ানা দিলাম। সাফা মারওয়ার মধ্যে সাঈ করার সময় পায়ের গোড়ালীতে ও পাতায় ব্যথা অনুভব করছিলাম। আমার কন্যা ও স্ত্রীরও দেখি একই অবস্থা। ভেবে দেখলাম, খালি পায়ে মার্বেল পাথরের উপর হাঁটার জন্যই হয়ত এই ব্যথা। সাঈ শেষ করে সবাই মিলে দোয়া করে প্রায় সকাল দশটার দিকে ফিরে হোটেলে এলাম। প্রায় দু’ঘন্টার মতো লাগল প্রথম উমরা শেষ করতে। আমি হোটেলের কাছেই একটি সেলুনে গেলাম চুল কাটতে। যাবার পথে দুপুরের খাবার কিনে নিয়ে গেলাম। বাসে ঠিকমতো ঘুম হয়নি কারো, তাই সবাই খুব ক্লান্ত। হোটেলে ফিরে খাওয়া দাওয়া শেষ করেই সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম থেকে উঠে মসজিদুল হারামে আবার ফিরে গেলাম। আসরের নামাজের পর মনে হল কাবার আশেপাশে ভীড় একটু কমে এসেছে। তাই তাওয়াফরত মানুষের সাথে কাবাঘরের কাছে চলে আসলাম। কাবাঘরের পশ্চিম দেয়ালে এসে সবাই গিলাফ ধরে দোয়া করলাম। গিলাফ ধরার সঙ্গে সঙ্গে খোদার খুবই কাছাকাছি মনে হল নিজেকে, মনে হল ভীষণ ভাগ্যবান। এই কি সে ঘর যেথায় থাকেন জগতের অধিশ্বর খোদা? খোদা তুমি থাক কোথায়? কোথায় তোমার বসবাস? কোথায় পাবো তোমার দেখা?

এরপর আবার চেষ্টা করলাম কালো পাথরের কাছে যেতে। কাবার পূর্ব দেয়ালে দরজার দিক থেকে দেখলাম মেয়েদের একটা লাইন তৈরি হয়েছে। আমার স্ত্রী সেলীকে বললাম চেষ্টা করে দেখতে। কিন্তু সবাইকে ঠেলে অনেকটা যুদ্ধ করে হজরে আসওয়াদের দিকে যেতে হবে বলে কেন জানি না আমি উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম। মনে হল, আমি পাথর হয়ত স্পর্শ করতে পারবো কিন্তু এভাবে ইবাদতের পবিত্রতা নষ্ট হবে। তাই পাশ কেটে কাবার দরজায় হাত রাখলাম।

সমস্যা হল, কেউ একবার দরজার কাছে গেলে আর সরে আসতে চান না। আমি এবার বেশ সহজে জায়গা পেলাম। আমার পাশে কেউ হাত তুলে কেউবা আবার কাবার দরজা আঁকড়ে ধরে জানাচ্ছে তাদের মিনতি। কান্নার সাইমুম ঝড়ে ভেসে যাচ্ছে অনেকে, কেঁপে কেপে উঠছে তাদের শরীর। আমি কিছুক্ষনের জন্য হলেও নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেললাম। বাইরে যদিও তখন কড়া রৌদ্দুর কিন্তু আমার বুকের উঠোনে মনে হল যেন টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। সেলীর সাথে দেখা হতেই ওর চোখে মুখে দেখলাম প্রাপ্তির দ্যুতি। সেলী হজরে আসওয়াদ ছুঁতে পেরেছে। এরপর সবাই কাবার উত্তরে অর্ধবৃত্তাকার এলাকায় (আল-হিজর) নামাজ পড়লাম। এই আল-হিজরাতেই ছিল বিবি হাজেরার ছোট্ট কুঁড়েঘর। জানা যায়, হজরত ইবরাহিম বিবি হাজেরা ও শিশু ইসমাইলকে এই জায়গাতেই নির্বাসনে রেখে চলে যান। আল-হিজরের সবটুকুই (বিবি হাজেরার ঘর) আগে কাবাঘরের অর্ন্তভুক্ত ছিল। কিন্তু আজকের যে কাবাঘর আমরা দেখছি তাতে কেবল আল-হিজরার টুকরো অংশ সন্নিবেশিত হয়েছে। অন্য এক সূত্রমতে এই আল-হিজরাতেই বিবি হাজেরা ও ইসমাইলকে (আ.) সমাহিত করা হয়েছে। তবে এর সত্যতা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে।

বাঙালি পাড়ায়: জোহরের নামাজের সময় এসেছি কাবায়। এশার নামাজ শেষ করার পর দারুণ খিদেয় সবার পেট চো চো করছিল। আমাদের হোটেলের আশেপাশের এলাকায় খাবারের দোকানের স্বল্পতা দেখে খুবই অবাক হলাম। হজ্জের সময় মতো মানুষের খাবার আসবে কোত্থেকে? শুনেছি কাবার অদূরে মিসফালা এলাকায় রয়েছে বহু বাংলাদেশী খাবারের দোকান। তাই আর দেরি না কের ডাল-ভাতের খোঁজে বেরুলাম।

মক্কা ও মদিনার হোটেল, দোকানপাট থেকে শুরু করে প্রায় সব জায়গায় রয়েছে বাঙালি যার অধিকাংশই হলেন চট্টগ্রামের অধিবাসী। আমাদের হোটেলের ম্যানেজার থেকে শুরু করে বয় বেয়ারা পর্যন্ত বাঙালি। জানতে পারলাম, কাবার দক্ষিণের আব্দুল আজিজ গেট নং ১ পার হয়ে সোজা গেলেই পড়বে মিসফালা, আর সেটাই হল বাঙালি পাড়া। শুনে একটু দমে গেলাম। তার মানে আমাদের হোটেল থেকে পুরো মসজিদুল হারাম পার হয়ে যেতে হবে। খুব একটা দূরে নয় তবে সবার পায়ের যা অবস্থা এই দূরত্বকে অনেক দূর মনে হচ্ছিল।

১ নং গেইটের কাছে হিল্টন হোটেলের পাশ দিয়ে নেমে গেছে মিসফালার রাস্তা। মিসফালার দিকে হেঁটে চললাম। রাস্তায় মানুষের ঢল। এশার নামাজ শেষ করে সবাই সেদিনের মতো যার যার গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছেন। রেসকোর্সে মিটিং শেষ হলে রাস্তায় যেমন মানুষের ঢল নামে ঠিক তেমন। রাস্তার দু’পাশে ফেরিওয়ালাদের ভীড়। বোরকা, টুপি, জায়নামাজ, ছাতা, ঘড়ি থেকে শুরু করে সবই বিক্রি হচ্ছে। দামও সাধারণ দোকানের চেয়ে ৫/১০ রিয়াল কম। কিছু কেনাকাটাও করা হল। কাউন্সিলের গাড়ি আসছে খবর পেয়েই দেখি ফেরিওয়ালার দল ঝট্পট্ সব গুটিয়ে নিয়ে যেদিক পারে দে দৌড়। সবুজ সংকেত পেয়ে আবার আসছে ফিরে। ফেরিওয়ালা দোকানদারদের প্রায় সবাই হলেন আফ্রিকান মহিলা। আরও দেখলাম রাস্তার মাঝখানে বসে/শুয়ে থাকা কিছু ফকির। ছোট ছোট শিশু ও বোরকাপরা মহিলাও ভিক্ষা করছে। এদের দেখে আফ্রিকার কোনো দেশের বলে মনে হল। তবে টাকা দিতে গেলেই লেগে যায় ভিক্ষুকদের মধ্যে রীতিমত চুলোচুলি। পেশাদার ভিক্ষুকই বটে!

সামনেই দেখলাম সারি সারি জুয়েলারীর দোকান। আর কিছুদুর এগুলেই চোখে পড়ল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও এশিয়া রেস্টুরেন্ট। চট্টগ্রাম রেস্টুরেন্টে বসে আলু ভর্তা, ডাল, মাছ তৃপ্তি ভরে খেলাম সবাই। আমাদের হোটেলে কোন রেস্তোরাঁ না থাকায় খাওয়া দাওয়ার সমস্যা হচ্ছিল। তাই পাশের দোকান থেকে দুটো ছোট ডেক্চি কিনে নিলাম ও বাংলা দোকান থেকে কয়েক বেলার খাবারও কিনে পার্সেল করে নিলাম। পরে ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে চুলোয় গরম করে খেতাম। এইভাবে একটা বড় ধরনের ঝামেলা মুক্ত হলাম।

পরে বাসের সহযাত্রীদের সাথে আলাপ করে জানতে পারলাম তাদের অনেকেই ফ্রোজেন করে পুরো সপ্তাহের খাবার ও চালও নিয়ে এসেছেন। এই ব্যাপারটা আমাদের জানা ছিল না। আরো জানতে পারলাম, আল ফাতাহ্ গেট, যেটা দিয়ে আমরা সাধারণত প্রবেশ করি, তার ঠিক বাইরে ছিল অনেক বাঙালি খাবারের দোকান। কিন্তু কিছুদিন আগে ওই সব দোকানপাট তুলে দেয়া হয়েছে। মক্কা বিশেষ করে মসজিদুল হারামের চারিপাশ দ্রুত বদলাচ্ছে প্রতিদিন।

মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে: আছর থেকে এশা নামাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি পুরো মসজিদুল হারাম ঘুরে ঘুরে দেখলাম, ছাদেও গেলাম। মসজিদের ভেতরে কিছুদূর পর পর রয়েছে টেপ লাগানো জমজম পানির ট্যাংক। পাশেই রয়েছে প্লাস্টিক গ্লাস। ঠান্ডা ও সাদা দু’ধরনেরই পানি রয়েছে। যতদিন মক্কায় ছিলাম পানি কিনে খেতে হয়নি। ছোট বড় বোতল এমনকি বড় কন্টেইনারেও জমজমের পানি ভরে নিচ্ছে সবাই। পানির ট্যাংক খালি হলেই সঙ্গে সঙ্গে বদলে দিচ্ছে সেবকের দল।

মসজিদুল হারাম পরিস্কার করা ও পানি সরবরাহ ইত্যাদি করার জন্য রয়েছে একঝাঁক সবুজ পেশাক পারিহিত সেবকের দল। এদের অধিকাংশই হলেন বাঙালি। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বিরতিহীনভাবে এরা কাজ করে চলেছে। এক মুহূর্তের জন্যও তাদের শিথিল হতে দেখলাম না। হয়ত আল্লাহর ঘর বলে এ ধরনের আন্তরিকতা যদিও এদের বেতন হল খুবই অল্প। সত্যি বলতে কি, এই ক্লিনারদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই কাবার পবিত্রতা অক্ষুন্ন রয়েছে। প্রতি ওয়াক্তের নামাজের সময় দিনে পাঁচবার কাবাঘরের দরজার ঠিক নিচের উন্মুক্ত দেয়াল, কালো পাথর ইত্যাদি পারিস্কার করা হচ্ছে। কাবার ব্যবস্থাপনাকে ধন্যবাদ জানাতে হয় এজন্য।

এছাড়া মসজিদের সব জায়গাতেই শেল্ভজুড়ে থরে থরে সাজানো রেয়েছে কুরআন। হাজীদের অনেকেই কুরআন কিনে এখানে রেখে যান সওয়াবের জন্য। এছাড়া বিভিন্ন তলায় উঠার জন্য রয়েছে লিফ্ট ও চলমান সিঁড়ি। ওমরা ও হজ্জের সময় বিবিধ কারণে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। তাই প্রতি ওয়াক্তের নামাজের পর পরই জানাজার নামাজ পড়ানো হচ্ছে। অনেক লাশ মক্কা ছাড়া অন্যান্য এলাকা থেকেও আসছে কাবায় জানাজা পড়ানোর জন্য। হজ্জ করার সময় যদি কারো মৃত্যু হয় তাহলে ইচ্ছে করলে তাকে মক্কায় কবর দেয়া যাবে।

কাবা ও মসজিদুল হারাম এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা সত্যিই প্রসংশনীয়। দুই ধরনের নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে। খাকি পোশাক পরিহিত পুলিশ ও মেটে রংয়ের আলখেল্লা ও মাথায় সৌদি স্কার্ফ পরিহিত ধর্মীয় পুলিশ বা মুত্তাওয়া। মুত্তাওয়ার কাজ হল ওয়াহাবী মতবাদভিত্তিক ধর্মীয় অনুশাসন পালিত হচ্ছে কিনা তার খবরদারী করা। সৌদিতে মুত্তাওয়াদের রয়েছে প্রচুর ক্ষমতা।

যদিও মসজিদে সাধারণত পুরুষ ও মহিলাদের জন্য থাকে আলাদা জায়গা কিন্তু কাবাই হল একমাত্র ব্যতিক্রম যেখানে মহিলা ও পুরুষ একসাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে পারেন। সাধারণ মসজিদের সাথে একে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। কিন্তু প্রতি ওয়াক্তের নামাজের সময় মহিলাদের যে রকম নির্মমভাবে সরিয়ে দেয়া হচ্ছিল তা আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি।

কাবার চতুর্দিকে তাওয়াফ করার জন্য যে বৃত্তাকার খোলা চত্বর তাকে বলে মাতাফ। তবে মাতাফে মহিলাদের জন্য যে পরিমাণ জায়গা দেয়া হয়েছে তা পুরো এলাকা অর্থাৎ পুরুষদের জন্য দেয়া জায়গার তুলনায় খুবই নগন্য। এছাড়া মসজিদুল হারামের ভিতরে মহিলাদের জন্য নির্ধারিত জায়গা উঁচু গ্রিল দিয়ে ঘেরাও করা যা দেখতে অনেকটা খাঁচার মতো ফলে নামাজের জায়গায় বসে কাবাঘর কিংবা ইমামকে দেখা যায় না। অথচ দু’দশক আগেও মহিলাদের নামাজ পড়ার জায়গা মাটিতে শুধু একটি সীমারেখা টেনে নির্ধারিত করা ছিল। আল্লাহর ঘরে এসেও এ ধরনের বিভাজন আমি মেনে নিতে পারছিলাম না।

মদিনায় মসজিদে নববীতে এখন মহিলাদের আর রাসুলের রওজার কাছে ধারে যেতে দেয়া হয় না। শুনলাম মাতাফের ছোট্ট এলাকা থেকেও মহিলাদের সরানোর প্রস্তাব দিয়েছে কাবা এফেয়ার্স রিভিউ প্যানেল। ইসলামের ইতিহাসে, রাসুলের সময়ও মহিলাদের কাবার কাছে বসে প্রার্থনা করার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়নি। কিন্তু এখন এ কি ঘটছে? মহিলাদের মাতাফ এলাকা থেকে সরানোর জন্য রিভিউ প্যানেলের যুক্তি হল ভীড় কমানো, মহিলাদের নিরাপত্তা, তাওয়াফের সময় মানুষ চলাচল ও টিভি সম্প্রসারনের সুবিধা করে দেয়া। তার মানে কাবার চারপাশ কেবল থাকবে পুরুষদের দখলে, এই কথা কোথায় লেখা আছে রিভিউ প্যানেল কি বলতে পারবেন?

কাবার তোয়াফ এলাকায় (মাতাফ) দিন রাত্রি ভীড় থাকে। কিন্তু নিরাপত্তার নামে মহিলাদের সরিয়ে দিতে হবে এ কেমন কথা? তার মানে পুরুষদের উপস্থিতির জন্য যে ভীড় হচ্ছে, নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে সেটা গন্য করার কি দরকার নেই? মনে রাখতে হবে, কাবায় মহিলারা পুরুষদের মন ভোলোাতে যান না। অন্যান্য সবার মতো জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে কাবার কাছে খোদার সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে যান। আর রিভিউ প্যানেলের কাছে কাবার টিভি সম্প্রচার মহিলা হাজ্জীদের ইবাদতের চেয়ে কেন বড় মনে হল ভেবে পাই না।

মাতাফ থেকে মহিলাদের সরানোর কাজ করে থাকেন মুত্তাওয়ার দল। ওয়াক্তের নামাজের সময় হতেই দেখা যাচ্ছে কোন মহিলা হাজ্জী তখনো তাওয়াফ শেষ করেননি অথচ মুত্তাওয়া তাদের পেছনে পাঠিয়ে দিচ্ছে। নামাজের জন্য মাতাফে ইতিমধ্যে অনেকেই বসে গেছেন এই অবস্থায় পেছনে যাওয়া অনেকটা অসম্ভব আর তখন মসজিদের ভেতরে ও বাইরে মহিলাদের জন্য নির্ধারিত এলাকাও পরিপূর্ণ, কোথাও ঠাঁই পাবার জো নেই। মুত্তাওয়াদের অনেক সময় মহিলাদের গায়ে হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিতে দেখলাম। মহিলাদের সরানোর জন্য দিনে পাঁচবার মুত্তাওয়ার দল যে সময় ও শক্তি ব্যয় করছে তা যদি অন্য কাজে ব্যয় করতেন তাহলে হাজ্জীদের অনেক উপকার হত।

আপাদমস্তক কালো কাপড়ে ঢাকা মহিলা পুলিশও দেখলাম টহল দিতে। আরো রয়েছে মহিলা ক্লিনার। ডিজিটাল ও ভিডিও ক্যামেরা দেখলে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেও মানুষ ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। যেমন আমি ছবি তুলেছি। মোবাইল ফোনে ছবি তোলা সবচেয়ে সহজতর মনে হল। একবার আমার ডিজিটাল ক্যামেরা কেড়ে নেয় পুলিশ, তবে সিম কার্ড বের করতে ব্যর্থ হলে আবার ফেরত দিয়ে দেয়। উল্লেখ্য মসজিদুল হারামের ছাদে বসানো হয়েছে চারটি টিভি ক্যামেরা যা দিয়ে প্রতি ওয়াক্তের নামাজ সরাসরি সৌদি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়ে থাকে। মদিনার মসজিদে নববী থেকেও তাই করা হয়।

১০ এপ্রিল, শুক্রবার। আজ মক্কায় আমাদের দ্বিতীয় দিন। ফজরের নামাজ পড়েই উমরার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। আমার মেয়ে মুনিরা খুবই ক্লান্ত তাই ওকে এবার সাথে নিলাম না। মক্কার অনতিদূরেই (৬ কিমি) রয়েছে হজরত আয়েশার স্মৃতি বিজড়িত বিশাল মসজিদ আল-তানিম যাকে আয়েশা মসজিদও বলা হয়। হজরত আয়েশা হজ্জের পর পর উমরা করতে চাইলে রাসুল (সা.) তাঁকে আল-তানিমে গিয়ে ইহরাম বাঁধার নির্দেশ দেন। এই ঘটনাটি ঘটে রাসুল (সা.)-এর বিদায় হজ্জের সময়। সেই থেকে মক্কার অধিবাসী ও যারা মক্কায় হজ্জ কিংবা উমরা করার জন্য আসছেন তাদের জন্য ইহরাম বাঁধার মিকাত হল এই মসজিদ এলাকা। ট্যাক্সি নিয়ে উমরা মসজিদে গেলাম ভাড়া মাত্র ১০ রিয়াল।

তখনো ভোর হয়নি। আকাশের জানালা দিয়ে ভোরের সূর্য কেবল উঁকি দিতে শুরু করেছে দূরের দিগন্তে। গোসলখানায় গিয়ে তেমন ভীড় পেলামনা। গোসল সেরে দু’রাকাত নামাজ পড়ে মাইক্রোবাসে চড়ে মসজিদুল হারামে চলে আসলাম। কাবা তাওয়াফের সময় পায়ে আবারও বড্ড ব্যথা পাচ্ছিলাম। আর সাই করার সময় আমি রীতিমত খোঁড়াচ্ছিলাম। এভাবে অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পুনরায় উমরা শেষ করলাম।

মক্কায় প্রতি নামাজের ওয়াক্তের সময় দোকান-পাট সব বন্ধ করে সবাই নামাজ পড়তে চলে যান। অবাক করা কথা হল, কেউ তাদের দোকান এক টুকরো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন কেউবা আবার সম্পূর্ণ খোলা রেখে নিশ্চিন্তে নামাজ পড়তে চলে যান। দোকানজুড়ে খোলা পড়ে থাকে যাবতীয় সামগ্রী। বিংশ শতাব্দীতে এমন ঘটনা মক্কায় আসার আগে কখনো কোথাও চোখে পড়েনি। বিশ্বের কোথাও এটা সম্ভব কিনা জানি না।