মক্কার পথে পথে: মক্কায় আমাদের তিন দিন থাকা হবে। এই অল্প সময়ের মধ্যে শহরের প্রধান ঐতিহাসিক জায়গাগুলো ভালো করে ঘুরে দেখার পরিকল্পনা শুরু করলাম। আমাদের হোটেল থেকে একটু বামদিকে নেমে গেলেই পড়ে জান্নাতুল মওলা। জান্নাতুল বাকির পরেই ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবরস্থান হল এই জান্নাতুল মওলা। এখানে রাসুলের নিকটাত্মীয় থেকে শুরু করে রয়েছে অসংখ্য সাহাবি, ইমাম ও ইসলামিক চিন্তাবিদদের কবর। তবে কোন চিহ্ন না থাকায় কবর শনাক্ত করবার উপায় নেই। উল্লেখ করার মধ্যে রয়েছে বিবি খাদিজা, নবীর পুত্রসন্তান কাসিম, আসমা বিনতে আবু বকর, আবু তালিব, আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর, রাসুলুল্লাহর পূর্বসুরী আব্দুল মানাফ, হাশিম, রাসুলের দাদা আব্দুল মুত্তালিবসহ আরো অনেক পারবারিক সদস্যের কবর।
জান্নাতুল মওলাতে নতুন ও পুরাতন দুটো ভাগ রয়েছে। পুরনো ভাগে রয়েছে উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গের কবর এবং ওখানে আর কোন নতুন কবর দেয়া হয় না। মহানবী (সা.) নিয়মিত জান্নাতুল মওলা জিয়ারত করতে আসতেন। একটু সামনেই রয়েছে মসজিদে জ্বিন। মসজিদের দু’পাশ ঘেঁষে রয়েছে দোকানপাট, ফলে কাছে না গেলে বোঝার উপায় নেই যে এটা ইসলামিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ।
এর পর গেলাম রাসুলুল্লাহর জন্মস্থান দেখতে। মসজিদুল হারামের মারওয়া পাহাড়ের দিক থেকে বের হলেই এটা চোখে পড়বে। একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, সেই যুগে মক্কার পুরো বসতি গড়ে উঠেছিল কাবাঘরকে ঘিরে। ফলে দেখা যায়, কুরাইশ ও অন্যান্য বংশের সব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের বসতবাড়ি কাবার এক কিলোমিটারের মধ্যে। রাসুলের জন্মস্থানে একটি লাইব্রেরি নির্মাণ করা হয়েছে যা প্রায়ই বন্ধ থাকে। দিনের বেলায় দেখলাম, দরজার একপাটি খোলা কিন্তু প্রবেশ পথ এক টুকরো কাঠ দিয়ে আগলে রাখা হয়েছে কেউ যাতে ঢুকতে না পারে। লাইব্রেরি বিল্ডিংসহ এলাকার অবস্থা খুবই করুণ। বিল্ডিংয়ের দেয়ালে দেখলাম অনেক আঁকাজোঁকা। সিঁড়িতে জমে আছে ময়লা। লাইব্রেরির দরজার পাশেই কাঁথা কম্বল নিয়ে শুয়ে আছে একজন ছিন্নমূল মানুষ। মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবের জন্মস্থানের এই করুন পরিণতি দেখে বিস্মিত ও ব্যথিত হলাম।
মসজিদুল হারামের অদূরে রয়েছে একটি কবরস্থান যেখানে মক্কায় ইসলাম প্রসার হওয়ার আগে মেয়ে শিশুদের জ্যান্ত কবর দেয়া হত। অবাক করা ব্যাপার হল, কাবার খুব কাছে হলেও এই জায়গায় কোনো বিল্ডিং তোলা হয়নি, এখনো খালি রয়েছে। আমার ধারণা এখানে কুরাইশ নেতাদেরও কবর রয়েছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কবরস্থানের দিকে তাকাতেই শরীরটা শীতল বরফের মতো হিম হয়ে যাচ্ছিল।
মনে হলো, এই তো এইখানে কত শিশু আসতো বাবার হাত ধরে। ভাবত, বাবার সাথে যাবে অনেক দূর বেড়াতে। কিন্তু কখনো কি জানত বাবার যে হাতটা পরম নির্ভরতায় ধরে সে হাঁটছিল সেটাই দানব হয়ে তাকে গ্র্রাস করবে? এ কেমন নিষ্ঠুরতা? একজন বাবা কি করে এতটা পাষন্ড, নির্দয় হতে পারে? মনে হচ্ছিল এই নীলিমায় হয়ত এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে হাজারো শিশুর আর্তনাদ, বুকফাটা কান্না, বাঁচার আকুতি। এভাবে না জানি হঠাৎ করে থমকে গেছে কত সম্ভাবনামুখর জীবন। বেশিক্ষণ ওখানে দাঁড়াতে পালামনা। সেলীর মনটাও দেখলাম বেশ খারাপ। সেদিনের মতো হোটেলে ফিরে গেলাম। হোটেলে গিয়ে আমার মেয়ে মুনিরাকে বুকের মধ্যে টেনে নিলাম। মুনিরা বলল, কি হয়েছে বাবা তোমার? বললাম, কিচ্ছু না।
পরদিন আবার বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। ট্যাক্সি নিলাম। সারাদিনের ভাড়া ১০০ রিয়াল। ক্যাব ড্রাইভার বাঙালি, নাম হাবীব। কিছুদুর যাবার পর জানতে পারলাম, হাবীব কক্সবাজারে আমার খালাম্মার পাশের বাড়িতে থাকে। অবাক হলাম কাকতলীয়ভাবে এমন দেশের বাড়ির একজনকে পাওয়াটা। হাবীব ২৪ বছর ধরে মক্কায়। আর চিন্তা রইল না। হাবীব সময় নিয়ে আমাদের মক্কা শহর ঘুরিয়ে দেখালো আর বিভিন্ন জায়গার কিছু ঐতিহাসিক তথ্যও দিল।
হাবীব আমাদের নুর ও সওর পাহাড়, মিনা, মুজদালিফা থেকে শুরু করে অনেক জায়গায় নিয়ে গেল। দেখলাম, হাজার বছরের পুরানো বেলাল মসজিদ ভেঙ্গে কিভাবে প্রাসাদ গড়ে উঠেছে। এ নিয়ে হাবীবের আফসোসের অন্ত নেই। শুধু হাবীব নয়, এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই একটা চাপা ক্ষোভ দেখলাম। কিন্তু কি করার আছে! আরাফাত পাহাড়ে গেলাম যাকে জাবালে রাহমাতও বলা হয়ে থাকে। এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে মহানবী বিদায় হজ্জের ভাষণ দেন। এখানেই নাকি হজরত আদম ও হাওয়া নিজেদের খুঁজে পান। আর তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে বলতে হয় এটা হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানেও দেখলাম কর্তৃপক্ষের নিদারুন অবহেলা। জাবালে রাহমাত ছোট্ট একটি পাহাড়, উঠতে লাগে ১০ মিনিটেরও কম সময়। কিন্তু পুরো পাহাড়টা দেখলাম মূলত ফেরিওয়ালাদের দখলে।
পাহাড়ের উপরে রয়েছে ছোট আকারের সমতল ভূমি যার মধ্যখানে একটি সাদা মিনার। কিন্তু দর্শনার্থীদের পাশাপাশি ফেরীওয়ালাদের ভিড়ে কোন কিছু দেখার কিংবা অনুভব করা জো নেই। অথচ পুরো ব্যপারটাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য খুব বেশি কিছু নয় শুধু ফেরীওয়ালা ও ভিক্ষুকদের নিরাপদ দূরত্ব রাখলেই চলত। আরাফাতে যাবার পথে রাস্তার পাশেই পাহাড়ের উপর দেখলাম ছোট্ট কংক্রিটের তৈরি একটি চিহ্ন। হাবিব বলল, এই জায়গাতেই নাকি হজরত ইবরাহিম তাঁর সন্তান ইসমাইলকে কোরবানি দিয়েছিলেন। ওই পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে সৌদি বাদশাহর বিশাল প্রাসাদ। ক’দিন পরে ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন বুলডোজারের আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। আরাফাতের সীমানা ঘেঁষে রয়েছে একটি ব্রীজ। এই ব্রীজের কাছেই নাকি কাবা ধ্বংস করতে আসা আবরাহার বাহিনী আবাবিল পাখির ছুুড়ে দেয়া পাথরের আঘাতে কুপোকাত হয়েছিল।
হেরা গুহার সন্ধানে (এপ্রিল ১৩, ২০০৯): নুর পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হেরা গুহা। আমার কন্যা মুনিরাকে সাথে নিয়ে আছরের নামাজ পড়েই নুর পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। দেরি না করে শুরু করে দিলাম হেরা গুহার সন্ধানে পথ চলা।
আমাদের আশেপাশে বেশ কিছু তুর্কি হাজ্জীর দল দেখলাম। নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল ১৪০০ বছর আগে মহানবীর হেঁটে যাওয়া পথ বেয়ে চলতে পেরে। যেতে যেতে দেখলাম মানুষের উঠার সুবিধার জন্য পাথর দিয়ে সিঁড়ি তৈরি করে দেয়া হয়েছে ফলে পথ খুঁজে পেতে অসুবিধা হচ্ছিল না। নুর পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আবার একটু নেমে গেলেই পাওয়া যাবে হেরা গুহা। হেরা গুহার কাছেই রয়েছে একটি দোকান, ঠান্ডা পানীয় ও স্যুভেনিয়র বিক্রি হয় এখানে। পাকিস্তানী পাঠান কিংবা ভারতীয় কাস্মিরী মুসলিমরা চালাচ্ছে এই দোকান। জানতে পারলাম, স্থানীয় উপমহাদেশের স্বেচ্ছাসেবকেদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে তৈরি করা হয়েছে পাহাড় বেয়ে উঠার সরু রাস্তা।
উঠতে গিয়ে মনে হচ্ছিল এই তো এই পথ দিয়েই হয়ত মহানবী (সা.) পাহাড় বেয়ে উঠতেন। হয়তো ওই পাথরটাতে বসে কখনো জিরিয়ে নিতেন। কিছুদূর উঠার পর আমার বেশ শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল কিন্তু মুনিরাকে বেশ সতেজ মনে হল। প্রচুর পানি খাচ্ছিলাম আর ঘন ঘন জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। একটু পরেই হেরা গুহা ফেরত একজন হাজ্জী জানালেন, পানির বোতল সাবধানে রাখতে কারণ বেবুনের দল পানির বোতল ছিনিয়ে নিতে পারে। শুনে মুনিরা ভয় পেয়ে গেল। যাই হোক পানির বোতলগুলি প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে ভালো করে মুড়িয়ে নিলাম। অবশেষে প্রায় ৪০ মিনিটের মধ্যে পাহাড়ের চূড়ায় চলে এলাম। দেখলাম বেশ বড় সড় টিনের ছাউনি ও পাথরের গাঁথুনী দিয়ে তৈরি একটি দোকান। চাও বিক্রি হচ্ছে। অনেকে বেঞ্চে বসে জিরিয়ে নিচ্ছে অবার কেউবা চা কিংবা পেপসি খাচ্ছে। নুর পাহাড় শৃঙ্গের উচ্চতা প্রায় ২,৫০০ ফুট। হেরা গুহার অবস্থান নূর পাহাড়ের ঠিক চূড়াতে নয়। তাই আর দেরি না করে আমরা পাহাড়ের চূড়া বেয়ে হেরা গুহার দিকে নামতে থাকলাম। নামার পথ খুবই খাঁড়া।
একটু পরেই চলে এলাম হেরা গুহায় মুখে। তবে ঢোকার মুখেই রয়েছে একটি বিশার পাথর ফলে এপাশ থেকে বোঝার উপায় নেই যে ওপাশে রয়েছে গুহা। পাথরটির দু’পাশে রয়েছে খুবই সরু দু’টো পথ যা বেশ অন্ধকার ও ভয়ংকর মনে হল। ওই সরু পথ দিয়ে বের হলেই চোখে পড়ল হেরা গুহা। তখন গুহার মুখে বেশ ভীড়। চারদিক তাকিয়ে দেখে অবাক হলাম। দূরে দেখা যাচ্ছিল ধুয়োর আচ্ছাদনে ঢাকা মক্কা শহরের স্কাইলাইন ও মসজিদুল হারামের পাশের সেই বিশাল টাওয়ার। হেরা গুহার অবস্থান এমন যে, ভেতরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে কেবলামুখী হয়ে নামাজ পড়া যায়। গুহাটি বেশ ছোট, দৈর্ঘ ও প্রস্থে যথাক্রমে ৬ ও ১২ ফুট হবে আর উচ্চতায় একজন মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াবার মতো জায়গা নেই। ভাবছিলাম ১৪০০ বছর আগে এটা ছিল জনমানবহীন একটি দুর্গম পাহাড়। সৃষ্টিকর্তাকে জানার অদম্য আগ্রহ নিয়ে এই পাহাড় বেয়ে নিয়মিত উঠে রাতের গহীন অন্ধাকারে হেরা গুহার নির্জনতায় বসে ধ্যান করা একজন মানুষের পক্ষে কি করে সম্ভব তা ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। রাসুল (সা.) একজন অসাধারণ মানুষ বলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। মনে হল, এত বই পুস্তক পড়ার পরও হেরার গুহায় নিজে না গেলে এই সত্য অনুধাবন করা কখনোই সম্ভবপর ছিল না।
নুুর পাহাড় ও হেরা গুহা কর্তৃপক্ষের চোখের আড়ালে বড্ড অবহেলায় পড়ে আছে। পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে বিভিন্ন ভাষায় লেখা বিশাল এক সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে যদিও পাহাড়ে আরোহণের ব্যপারে রাসুলুল্লাহর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে কিন্তু ঐতিহাসিক সূত্রমতে জানা যায়, রাসুল নিজেও পরবর্তীকালে সাহাবিদের সাথে নিয়ে নুর পাহাড়ে এসেছেন। শুনেছি হেরা গুহা ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করেছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। সাইনবোর্ডের লেখা দেখেই বোঝা যায় কর্তৃপক্ষ চায় না মানুষ এখানে আসুক। মানুষ যাতে ইসলামবিরোধী কাজ করতে না পারে সে জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য কয়েকটি পুলিশ কিংবা সিকিউরিটি গার্ড দিলেই কাজ হয়ে যেতো।
মানুষ ধর্মবিরোধী কাজ করতে পারে সেই ভয়ে সব কিছু ভেঙ্গে ফেলে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে এ কেমন কথা? প্রতিটি জাতির বিশেষ করে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য তাদের অতীত ইতিহাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের ফেলে আসা নিদর্শন ও ইতিহাস থেকে একটি জাতি সামনে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা ও দিক নির্দেশনা খুঁজে পায়। যে জাতির অতীত নেই তার ভবিষ্যত থাকবে কি করে? দুঃখজনক হলেও সত্য সৌদি কতৃপক্ষ ধর্ম রক্ষার নামে ইতিহাস মুছে ফেলে নিজেদের সাথে সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের সামনে চলার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
সৌদি সরকারের অনেক পদক্ষেপ স্ববিরোধী। মসজিদুল হারামের চতুর্দিকের গেইটগুলোর ঐতিহাসিক নাম বদলে দেয়া হচ্ছে। মসজিদুল হারামে প্রবেশের সবচেয়ে বড় গেইটের নামকরণ করা হয়েছে সৌদি বাদশাহের নামে যেটা ইসলামের অন্যতম খলিফা হজরত উমরের নামে যে গেইট রয়েছে তার প্রায় ১০ গুণ বড়।
শিরিকের আশংকায় ইসলামিক ইতিহাসের চিহ্ন মুছে ফেলা হচ্ছে অথচ সৌদি বাদশাহের বিশাল প্রতিকৃতি ঝুলিয়ে রাখতে কোন বাধা নেই। কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি হাজ্জীদের আচরণ দেখেও হতাশা ও ক্ষোভে ভরে গেল মন। হাজ্জীদের ছুড়ে ফেলা বোতল ও ক্যানে সমস্ত পাহাড় যেন একটা খোলা ময়লার বিনে পরিণত হয়েছে। পুণ্য করতে আসা মানুষের এই আচরণ সত্যিই বেদনাদায়ক। আবর্জনা ফেলার জন্য কিছু গার্বেজ বিন দেয়া যেতো। কিন্তু সমস্যা হল এই বিন নিয়মিতভাবে পরিস্কার করবে কারা? সওর ও নুর পাহাড়ের সবকিছুই চলছে কিছু স্বেচ্ছাসেবকদের প্রচেষ্টাতে। এ নিয়ে কতৃপক্ষের কোন মাথাব্যথা আছে বলে বলে মনে হল না।
সওর পাহাড়ে হিজরত গুহা: চোখের পলকে সাতটি দিন কিভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। আগামীকাল (এপ্রিল ১৬, ২০০৯) বাস যাবে মদিনায়। তাই আজই যেতে হবে সওর পাহাড়ে। আমার মেয়েকে সাথে নিয়ে বিকেল ৪ টার দিকে সওর পাহাড়ে চলে এলাম। রোদের আঁচ তখনো কমেনি। খাঁ খাঁ করছে চারিপাশ। পাহাড়ে উঠার রাস্তার কোনো হদিস পাচ্ছিলাম না। আমরা বাপ-বেটি তাই অনেকটা ফ্যাল ফ্যাল করে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কাছেই রয়েছে একটি ভ্যারাইটি স্টোর। দোকানদার আমাদের লক্ষ্য করছিল। পাকিস্তানী কিংবা ভারতীয় হবে হয়ত। আমাদের দ্বিধা দ্বন্দ্ব দেখে ভদ্রলোক কাছে এসে বললেন চিন্তার কারণ নেই সোজা চলে যাও রাস্তা দেখতে পাবে। তখন একটু সাহস পেলাম। বিসমিল্লাহ বলে রওনা দিলাম। নুর পাহাড়ের তুলনায় উঠার রাস্তা অনেক প্রশস্ত ও ভালো মনে হল। উঠতে শুরু করলাম। কিছদূর এগুনোর পর মুনিরাকে বেশ ক্লান্ত মনে হল। কিন্তু এবার আমার ততটা অসুবিধা হচ্ছিল না। সওর পাহাড়ের উচ্চতা সম্পর্কে তেমন সঠিক ধারণা ছিল না। ভেবেছিলাম হয়তো নুর পাহাড়ের চেয়ে কিছুটা বেশি হবে। কিন্তু উঠছি তো উঠছিই, পথ যে ফুরোয় না। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের চূড়াতে একটি সাদা চিহ্ন, দেখে মনে হচ্ছিল এই তো এসে গেলাম বলে। কিন্তু পেচানো পথের যে আরো অনেক বাকি!
পাহাড়ের বিভিন্ন স্তরে রয়েছে নামাজ পড়ার জন্য কার্পেট বিছানো সমতল জায়গা। পাহাড়ের মাঝামাঝি উচ্চতায় গিয়ে দেখলাম নুর পাহাড়ের মতন একটি খাবারের দোকান, অদূরেই থাকার জন্য ছাপরা জাতীয় দুটো ঘর। অবশেষে প্রায় সোয়া ঘন্টা পর কাংখিত স্থানে এসে পৌছলাম। মুনিরার মুখে হাসি দেখলাম, ক্লান্তির রেশ মুছে গেছে নিমিষেই। সওর গুহাকে ঘিরেই দেখলাম একটি খাবারের দোকান। গুহার ঐতিহাসিক কোনো নিদর্শন আর নেই। তবে গুহার মুখে লেখা উচ্চতা দেখে চক্ষু চড়াক গাছ! সওর পাহাড়ের উচ্চতা হল ৫,৪০০ ফুট! নুর পাহাড়ের উচ্চতার দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। এখন বুঝতে পারলাম কেন উঠার পথ এত দীর্ঘ মনে হচ্ছিল।
গুহায় তাকিয়ে দেখি পেছনের দিকটা খোলা, যা হবার কথা নয়। দোকানের ভদ্রলোক বললেন, ঢোকার সুবিধার জন্য পেছনের দিকটা কেটে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এর কাছেই দেখলাম আরেকটি গুহা, কিন্তু মনে হল প্রথমে মানুষ ভুল করে ওটাকেই সওর গুহা ভেবেছিল। তবে এটা এখন যাচাই করা দুঃসাধ্য কাজ। সওর পাহাড়ের শৃঙ্গে অবস্থিত এই গুহাটিও ইসলামিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ৬২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মহানবী (সা.) আবু বকরসহ গোপনে মক্কা ছেড়ে মদিনার পথে পা বাড়ান আর এই গুহাতে তিন দিন লুকিয়ে কাটান। বাইরে তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যা সমাগত প্রায়। দেরি না করে নামতে শুরু করলাম।
কিছুদূর নামতেই দেখি দু’জন তুর্কি অশীতিপর বৃদ্ধ লাঠি হাতে নিয়ে উঠে আসছেন। তাদের দেখে নিজেই লজ্জা পেলাম। অর্ধেক পথ নামতেই মাগরিবের সময় হয়ে গেল। পাহাড়ের উপর নামাজ সেরে নিলাম। ৪০ মিনিটের মধ্যেই নেমে আসলাম রাস্তায়। অন্য রকম এক অনুভূতি কাজ করল চেতনায়। পরিতৃপ্ত মনে হল নিজেকে। এতদিন ধরে মনের মধ্যে যে ইচ্ছে লালন করে আসছিলাম তার কিছুুটা হলেও আজ পূর্ণ হল।
মক্কায় ঐতিহাসিক নিদর্শনের সমাধি: ইতিহাসের প্রতি আমার সীমাহীন আকর্ষণ ছোটবেলা থেকেই। ছেলেবেলায় দেখা বগুড়ার মহাস্থান গড়, নাটোরের রাজবাড়ি, চাটগাঁর ওয়ার সিমেট্রি কিংবা কুমিল্লার কোটবাড়ির ঐতিহাসিক নিদর্শন এখনও আমাকে টানে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে মাত্র ১০০ বছরের পুরোনে নিদর্শন ধরে রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের যে প্রচেষ্টা দেখেছি। অথচ মক্কার হাজারো বছরের ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য সরকারের তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়ল না। যা আমাকে হতাশ করেছে।
মসজিদুল হারাম নিয়েই শুরু করা যাক। মসজিদুল হারামের মাত্র ১০০ মিটারের মধ্যে গড়ে উঠেছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, বহু তারকা খচিত হোটেল ও বাদশার প্রাসাদ। ১নং গেইটের ঠিক উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে ‘আবরাজ আল-বাইত’ টাওয়ার যা মনে হয়েছে বিশাল দানবের মতো গ্রাস করছে কাবাকে। মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে বসে কাবার দিকে তাকালে চোখ কেড়ে নেয় এই টাওয়ার, হিল্টন, ইন্টার কন্টিনেন্টালসহ আরো অনেক স্কাইস্ক্রেপার। মসজিদুল হারামের তুলনায় আবরাজ টাওয়ার এতই বিশাল যে মানুষ কাবাঘর বাদ দিয়ে ওই স্কাইস্ক্রেপারের ছবি তুলতে ব্যস্ত। মসজিদুল হারামের ভিতর প্রবেশ না করলে দূর থেকে এখন বুঝার উপায় নেই যে কাবার কাছে এসেছি।
হাজ্জীদের থাকার জন্য হোটেল ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রয়োজন আছে কিন্তু তা ইতিহাসকে ধ্বংস করে নয়, কাবার আধ্যাত্মিক আত্মাকে গ্রাস করে নয়। মসজিদুল হারামকে ঘিরে এক কিলোমিটারের মধ্যে আকাশছোঁয়া অট্টালিকা যাতে না ওঠে সেদিকে খেয়াল রেখে উচ্চতার ব্যাপারে বিধি নিষেধ আরোপ করে অনায়াসেই বিল্ডিং নির্মাণ করা যেতো। আমার মনে হয়েছে কিভাবে মুনাফা করা যায় সেটাই হল কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য। পরিবেশ, ইতিহাস ও পুরোনো স্থাপত্য কোন বিবেচনায় নেই। কাবার কাছে ধারের জায়গাগুলি হল রিয়েল এস্টেটের মানদন্ডে সবচেয়ে মূল্যবান। তাই ঐতিহাসিক মন্যুমেন্ট উপড়ে ফেলে কাবার পাশেই বিগ ব্রাদারের মতো গড়ে তোলা হয়েছে এই সব দালান বাড়ি। সম্প্রতি মসজিদুল হারাম সম্প্রসারণের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টের কাজ চলছে। এই প্রজেক্টের আওতায় মসজিদুল হারামের গা ঘেঁষে তৈরি হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ তলার হোটেল ও অ্যাপার্টমেন্ট।
আল্লাহর নির্দেশে তৈরি কাবার চতুর্পাশ পরিণত হচ্ছে মানুষের তৈরি ইট পাথরের তৈর পার্কিং লট, যাতে চাকচিক্য থাকবে অনেক কিন্তু থাকবে না শুধু মহান সৃষ্টিকর্তার প্রাণ। মাত্র তিন বছর আগেও জমজম কূপের কাছে যাওয়া যেতো। এখন কংক্রিট স্ল্যাবে ঢেকে দেয়া হয়েছে পুরো এলাকা। সাফা পাহাড়ের কাছেই ছিল ছোট্ট একটি ঘর যেখানে রাসুল (সা.) ইসলামের দাওয়াত দিতেন এবং এইখানেই হজরত ওমর ইসলাম গ্রহণ করেন। চিহ্নস্বরূপ এই জায়গায় ছিল দারে-আরকাম নামে একটি গেইট। অনেক খুঁজেও তা পেলাম না।
যতদূর জানা যায়, রাসুলল্লাহর সময়কার মাত্র ২০টির মতো ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ এখনো টিকে আছে। তবে এগুলি যে কোন সময়ে বুলডোজারের ঘায়ে হারিয়ে যেতে পারে। মহানবীর মাতা আমিনা বেগমের কবর বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। রাসুলল্লাহর জন্মস্থানে এখন যে লাইব্রেরিটা রয়েছে সেটা ভেঙ্গে ফেলে গাড়ির পার্কিং তৈরি করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রাসুলুল্লাহর জন্মস্থানের পাশেই তৈরি হয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং। এখানেই ছিল আবু তালিবের উপত্যকা যেখানে ইসলাম প্রচারের প্রথম যুগে রাসুল (সা.), তাঁর পরিবার ও অনুসারীদের সমাজ থেকে আলাদা করে দিয়ে অনেকটা নির্বাসনে রাখা হয়েছিল। এছাড়া বিবি খাদিজার বাড়ি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে, হজরত আবু বকরের বাড়ি ভেঙ্গে তৈরি হয়েছে হিল্টন হোটেল।
সাফা পাহাড়ের কাছেই হল জাবালে কুবাইস যা ভেঙ্গে মসজিদুল হারামের ১৫০ মিটারের মধ্য তৈরি হয়েছে সৌদি রাজার প্রাসাদ। এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে রাসুল (সা.) প্রথম খোলামেলাভাবে কুরাইশদের ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেই ঘটনার কথা অনেকরেই জানা। তাছাড়া এই পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে রাসুলের চন্দ্র দু’ভাগ করার ঘটনা মানুষ দেখেছিল। জাবালে কুবাইসেই ছিল বিলাল মসজিদ, কিন্তু সেটাও রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তার কারণে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। আগামী ক’বছরের মধ্যে হয়তো আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষার জন্য সৌদি পত্র পত্রিকায় সে দেশের অনেক প্রতœতত্ত্ববিদ ও বিজ্ঞানীদের লেখা আমি পড়েছি। কিন্তু তাঁদের আকুতি সৌদি কর্তৃপক্ষের কানে গিয়েছে কিনা জানি না। উমরা করার পর মনে হয়েছে, এ বছর যা দেখলাম আগামী বছর তার হয়তো অনেক কিছুই থাকবে না। নিজেকে ধিক্কার দিলাম আরো আগে না আসার জন্য।
