নবীর শহরে কিছুক্ষণ (এপ্রিল ১৬, ২০০৯): বৃহস্পতিবার সকালে আল-হাতিম হোটেল থেকে বাস ছাড়ল মদিনার পথে। মদিনার আসল নাম ছিল ‘ইয়াতসরিব’। কিন্তু মহানবীর আগমনে শহরের নাম হয় মদিনাতুন্নবী অর্থাৎ নবীর শহর। মক্কা শহর ছেড়ে যাবার সময় কেন জানি না মনটা খচ্ খচ্ করছিল। কোথায় জানি একটু ব্যথা অনুভব করছিলাম। একটানা আট দিন থাকার পর মক্কাকে নিজের অজান্তেই নিজের শহর বলে মনে হচ্ছিল। শহরের রাস্তাঘাট অনেক কিছুই যেন অনেক দিনের চেনা। বাস চলতে শুরু করল দ্রুতগতিতে। চার ঘন্টার মধ্যেই মদিনার কাছাকাছি চলে এলাম। মদিনার যতই কাছে আসছি ততই দু’পাশে সবুজের সমারোহ দেখতে পাচ্ছিলাম যা মক্কার পরিবেশ থেকে বেশ ভিন্ন। প্রথমে বাস এসে থামল মসজিদুল কুবায়।
মক্কা থেকে হিজরতের ১২তম দিনে রাসুলুল্লাহ মদিনা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত কুবা এলাকায় উপস্থিত হন। এই কুবাতেই রাসুলুল্লাহ তৈরি করেন ইসলামের প্রথম মসজিদ। কুবা মসজিদের ডিজাইনও তাঁর নিজের করা। এই মসজিদের পাশেই ছিল হজরত আলী ও ফাতেমার বাড়ি। বিয়ের পর পর এ বাড়িতেই তাঁরা থাকতেন। অন্যান্য জায়গার মতো এই বাড়িটিকেও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মসজিদে কুবার পর গেলাম মসজিদে কিবলাতাঈনে। এখানেই নামাজ চলাকালীন রাসুলুল্লাহ বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে ঘুরে গিয়ে কাবার দিকে কিবলা নির্ধারণ করেন।
এরপর এলাম ওহুদের ময়দানে। এই যুদ্ধের ময়দানে মুসলিমরা পরাজিত হয়েছিল। মহানবীর (সা.) সাথে অন্যান্য নবীর পার্থক্য হচ্ছে, তিনি শুধু ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, ছিলেন একাধারে সামজিক ও রাজনৈতিক নেতা, সফল শাসনকর্তা ও ব্যক্তিগত জীবনে পরিবারের কর্তা, যুদ্ধক্ষেত্রে একজন বিচক্ষণ সেনাপ্রধান। যুদ্ধ পরিচালনা ও পরিকল্পনায় তিনি ছিলেন অসাধারণ। ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি যুদ্ধে (বদর, ওহুদ ও খন্দক) তাঁর রণকৌশল ছিল আরবের প্রচলিত কৌশলের চেয়ে ভিন্ন ও উন্নত। ফলে প্রতিটি যুদ্ধেই কুরাইশ বাহিনীকে অপ্রত্যাশিত কৌশলের সম্মুখীন হতে হয়েছে। যেমন বদরের প্রান্তরে যে দুটি পানির কূপ ছিল, তা দখল করে নিয়ে মুসলিমবাহিনী অবস্থান নেয়। মরুভূমির রুক্ষ পরিবেশে পানির অভাবে শুরুতেই কুরাইশ বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। অন্যদিকে পরিখার যুদ্ধে সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে পারস্যে প্রচলিত যুদ্ধ কৌশলের অনুকরণে পরিখা খননের সিদ্ধান্ত নেন রাসুল (সা.)।
আরবদের পরিখা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। গভীর পরিখা পার হতে ব্যর্থ হওয়ায় কুরাইশ সৈন্যবাহিনীর মূল চালিকাশক্তি অশ্বারোহী বাহিনী অচল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ওহুদের যুদ্ধের সময় রাসুল (সা.) মদিনা শহরের ভেতরে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, এ লড়াই বদরের চেয়ে হবে অনেক কঠিন। কিন্তু তিনি নবী হয়েও সবার সাথে যুদ্ধের কৌশল নিয়ে পরামর্শ করেন এবং সাহাবিদের মতামত জানতে চান। কিছু অতি উৎসাহী সাহাবি যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, রাসুলের নেতৃত্বে মদিনার বাইরে গিয়ে কুরাইশদের প্রতিহত করার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ফলে অনেকটা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যান্য সাহাবির মতামতের মর্যাদা দিয়ে শহরের বাইরে ওহুদের প্রান্তরে গিয়ে তিনি যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। দেখা গেছে, ওহুদে তাঁকে ৩০০০ কুরাইশ বাহিনীর মুকাবেলা করতে হয় যাদের ছিল ২০০ অশ্বারোহী সৈন্য। অথচ মুসলিম সেনাবাহিনীর সংখ্যা ছিল ১০০০ আর অশ্বারোহী সৈন্য ছিল মাত্র চার জন। আর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ৩০০ জন ফিরে গেলে মুসলিম সৈন্য সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭০০।
যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি মুসলিমবাহিনীর জন্য বেছে নেন কৌশলগত দিক থেকে সবচেয়ে ভালো অবস্থান। মুসলিমবাহিনী ওহুদ পাহাড়কে পেছনে রেখে দাঁড়ায়। ফলে সারাসরি পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। তবুও শেষ রক্ষাকবচ হিসাবে তিনি একটি মাঝারি আকারের পাহাড়ের উপর (ছবি দেখুন) ৫০ জন (মতান্তরে ৭০ জন) তীরন্দাজকে বসিয়ে রাখেন, যাতে মুসলিম সৈন্যবাহিনী সামনে এগিয়ে গেলে পেছন দিক থেকে শত্রুবাহিনী অতর্কিতে হামলা করতে না পারে। তিনি জানতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের এটাই হল সবচেয়ে দুর্বল স্থান। তাই তিনি তীরন্দাজদের নির্দেশ দেন, জয় পরাজয় যেটাই হোক না কেন, কোনো অবস্থাতেই যেন তারা নিজস্ব স্থান পরিত্যাগ না করে। পরে দেখা যায়, এই তীরন্দাজ বাহিনী তাদের অবস্থান থেকে সরে গেলেই বিপর্যয় নেমে আসে। যুদ্ধে রাসুল (সা.) গুরুতর আহত হন। নিহত হন মুসলিমবাহিনীর প্রধান জেনারেল কুরাইশ বীর হামজা।
ওহুদের যুদ্ধে রাসুলকে হত্যা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায় কুরাইশবাহিনী। একপর্যায়ে তারা মহানবীর খুবই কাছে চলে আসে। পশ্চাত দিক থেকে কুুরাইশ অশ্বারোহী বাহিনীর আকস্মিক আক্রমণের মুখে মুসলিমবাহিনী হতবাক হয়ে যায়। এই বিশৃংখল অবস্থায় কে কার বিরুদ্ধে লড়াই করছে তাও বোঝা মুশকিল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ঘটনার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে গিয়ে কিছু সাহাবি আত্মরক্ষায় জন্য রাসুলকে ছেড়ে চলে যান। ফলে মহানবীর নিরাপত্তা অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
ইতিমধ্যে রাসুলের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে মুসলিমদের মনোবল আরো ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু রাসুলের মৃত্যুসংবাদ সহসা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। ফলে যেসব সাহাবি রাসুলকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তাঁরা আবার ফিরে এসে রাসুলের চারপাশে নিজের শরীর দিয়ে দুর্ভেদ্য ব্যুহ রচনা করে ধীরে ধীরে ওহুদ পাহাড়ের একটি গুহার নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে লড়াই করতে করতে এগুতে থাকেন। অন্যদিকে কুরাইশবাহিনীও মরিয়া হয়ে রাসুলকে হত্যার জন্য তীর, বর্শা ও পাথর ছুড়তে থাকে। রাসুলের দিকে ছুড়ে দেয়া তীর ও বর্শার আঘাত নিজের শরীরে তুলে নিয়ে এইসব সাহাবি একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকেন কিন্তু তবুও রাসুলের নিরাপত্তাকে এতটুকু ক্ষুন্ন হতে দিলেন না। কুরাইশদের ছুড়ে মারা পাথরের আঘাতে রাসুল (সা.) একপাশে ঢলে পড়ে যান, কেটে যায় তাঁর ঠোট। আর রাসুলের মুখে ঢুকে যাওয়া মাথার হেলমেটের দুটি চেইনস্ট্র্যাপ তোলার সময় তাঁর দুটো দাঁতও উঠে আসে। এছাড়া কুরাইশবাহিনীর খোড়া চোরা গর্তে পড়ে গিয়েও তিনি আঘাত পান।
প্রতিকূলতার মুখেও আবস্থানগত সুবিধার কারণে মুসলিমবাহিনী পেছনে সরে এসে ওহুদ পাহাড়ের উপরের দিকে উঠে এসে অবস্থান নিতে সমর্থ হয়। কুরাইশ অশ্বারোহী বাহিনী পাহাড়ের উঁচুতে আরোহন করতে না পারায় মুসলিমদের আর তাড়া করতে পারেনি এবং পরে তারা যুদ্ধ জয়ের স্বাদ নিয়ে ফিরে যায়। কিন্তু একজন অসাধারণ কমান্ডার ইন চিফ রাসুল (সা.) কুরাইশবাহিনী যাতে বিধ্বস্ত মুসলিমবাহিনীকে ফের আক্রমণ করতে না পারে সে জন্য শত্রুবাহিনীকে তাড়া করার জন্য একদল সৈন্য বাহিনী পাঠান। কুরাইশবাহিনী ভাবে, মুসলিমরা এখনো সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তাই আর ফের আক্রমণ চালাতে সাহস করেনি। না হলে এই ওহুদের প্রান্তরেই হয়তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত ইসলাম।
ওহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয় হলেও পরে সেটা পরিপূর্ণ বিজয়ের সহায়ক হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপ্রধানের কথা অমান্য করলে কী পরিণাম হতে পারে তা অনুধাবন করল মুসলিমবাহিনী। এই ওহুদের যুদ্ধেই আত্মপ্রকাশ ঘটে পরবর্তীকালের শুধু মুসলিম নয় মানব ইতিহাসের অন্যতম সফল জেনারেল খালিদ বিন ওয়ালিদের, যিনি একাধারে ১০০টি যুদ্ধ জয়লাভ করেন যা বিশ্বের যুদ্ধ ইতিহাসে বিরল। ওহুদ যুদ্ধে তিনিই ছিলেন কুরাইশদের বিজয়ের অন্যতম রূপকার। মুসলিম তীরন্দাজদের তাদের জায়গা থেকে সরে যাওয়াটা তিনিই লক্ষ্য করেন এবং বাকি যে কয়জন তীরন্দাজ তখনো জায়গা ছেড়ে যাননি, তাদের সহজেই খতম করে তিনি মুসলিমদের পেছন থেকে আক্রমণ করেন।
ওহুদের প্রান্তরে গিয়ে ইতিহাসের খেই ধরতে পারছিলাম না। বিরাট প্রাচীর ঘেরা কবরস্থান এবং তীরন্দাজদের পাহাড় ছাড়া আর কিছুই বোঝার উপায় নেই। এই ছোট পাহাড়ের পাদদেশেই বর্শার আঘাতে শহীদ হন বীর হামজা। জানা যায়, এই পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গিয়ে হামজার বক্ষ বিদীর্ণ করে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ। এখন এই পাহাড় ফেরিওয়ালাদের দখলে। এভাবে চললে কিছুদিন পর এই পাহাড়ও ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ইচ্ছা থাকলেও ওহুদের পাহাড়ের যে গুহায় রাসুল (সা.) আহত হবার পর বিশ্রাম নিয়েছিলেন সেখানে যাবার আর সময় হল না।
ওহুদের প্রান্তরে নওমুসলিম সমাজ চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। অথচ আজ ওহুদের সেই সমরক্ষেত্রের এই করুণ দশা দেখে ১৪০০ বছর আগে মুসলিম যোদ্ধারা কী ধরনের প্রতিকূলতার মুখে যুদ্ধ করেছিলেন আর রাসুলকে (সা.) কী অবর্ণনীয় কষ্ট ও আঘাত সহ্য করতে হয়েছিল, তা অনুধাবন করা অসম্ভব। আমি মনে করি, ওহুদ যুদ্ধক্ষেত্রের পুরো এলাকাটা সংরক্ষণ করে গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা করা উচিত।
ওহুদের প্রান্তর থেকে বাস আমাদের হোটেলে নিয়ে এলো। মদিনার হোটেলের অবস্থা বিশেষ সুবিধার মনে হলো না। ম্যানেজার আরবি ছাড়া কিছুই বলতে পারে না। যাই হোক, থাকব মাত্র দু’টো রাত তাই এ নিয়ে আর মাথা ঘামালাম না। হোটেলে আসার পর পরই আছরের আজান শুনতে পেলাম। দেরি না করে রাস্তায় বের হলাম। আমাদের হোটেল থেকে বের হয়ে বা দিকে সোজা জান্নাতুল বাকির দেয়াল ঘেঁষে হেঁটে গেলে প্রায় ৫০০ মিটার দূরেই মসজিদে নববী। মসজিদে নববী অনেকটা মক্কার মসজিদুল হারামের আদলে সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
মসজিদের বাইরে রয়েছে বিশাল খোলা চত্বর, রয়েছে অনেক মোটরচালিত ছাতা, দুপুরের কড়া রোদ থেকে মুসল্লিদের বাঁচাতে ওই ছাতাগুলি খোলা হয়। আমি সরাসরি মসজিদের নববীর যে অংশে রাসুলের কবর রয়েছে সেখানে চেষ্টা করলাম ঢুকতে। প্রচন্ড ভীড়। রওজা নামে যে জায়গাটাকে বেহেস্তের অংশ বলা হয় সেখানে গিয়ে নামাজ পড়া সম্ভব হলো না। কারণ কেউ নিজের জায়গা ছাড়তে রাজি নন। মহিলাদের রওজাতে যাবার জন্য একটা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে তখন পুরুষদের ঢুকতে দেয়া হয় না। ভাবলাম, ফজরের নামাজের পর আবার রাসুলুল্লাহর কবর জিয়ারত করার চেষ্টা করব। আছরের নামাজ শেষ করে জান্নাতুল বাকিতে গেলাম।
জান্নাতুল বাকি: এটি শুধু একটি সমাধিক্ষেত্র নয়, এর ধুলোবালিতে মিশে আছে দীর্ঘ ১৪০০ বছরের ইতিহাস। কিছু পাথরের টুকরো ছাড়া কবরের কোথাও কোন চিহ্ন নেই। কয়েকজন বাঙালিকে জিজ্ঞেস করলাম, তারাও কিছু বলতে পারছিলেন না কার কবর কোনটা। কিন্তু ইরানি, তুর্কি হাজ্জীদের সবার কাছেই দেখলাম জান্নাতুল বাকির একটা ম্যাপ যাতে বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের নাম লেখা রয়েছে। মনে হলো, একটা ম্যাপ সাথে না এনে ভুলই করলাম। এভাবে অন্ধের মতো জিয়ারত করার কোনো মানে হয় না। কী করব ভাবছিলাম, হঠাৎ দেখলাম আমার ঠিক সামনে একটি কেরালা হাজ্জীদের দল। তাদের দলনেতা বিস্তারিত বলছেন মালায়ালম ভাষায়। যদিও কী বলছেন পুরোটা বুঝতে পারছিলাম না কিন্তু কার কবর সেই নামটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। তাই সেই কেরালা হাজ্জীদের গ্রুপের সাথে মিশে গিলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলাম। জান্নাতুল বাকিতে ঢোকার মুখেই ডান পার্শ্বে রয়েছে রাসুলল্লাহর পরিবারবর্গের কবর আর তাঁরা হলেন, বিবি ফাতেমা, ইমাম হাসান, ইমাম জয়নাল আবেদীন, ইমাম বাকের, ইমাম জাফর ও রাসুলুল্লাহর চাচা হজরত আব্বাস। এখানে দেখলাম শিয়া হাজীদের প্রচন্ড ভীড়। এই এলাকাটা গ্রিল দিয়ে ঘেরাও করা, কাছে যাওয়া যায় না। সৌদি সেনাবাহিনীর সদস্যদের এখানে টহল দিতে দেখলাম।
তবে রাসুলের কন্যা বিবি ফাতেমার কবর এখানে কিনা সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেকের মতে, তাঁকে তাঁর নিজের ঘরেই দাফন করা হয় যা এখন মসজিদে নববীর অন্তর্ভুক্ত। জান্নাতুল বাকিতে আরো যাদের কবর রয়েছে তাঁরা হলেন, রাসুলের তিন কন্যা, রাসুলের নয় জন স্ত্রী, রাসুলের চাচী, ইমাম মালিক, রাসুলের শিশু পুত্র ইবরাহিম, রাসুলের দুধমাতা বিবি হালিমা, ইসলামের তৃতীয় খলিফা ওসমানসহ আরও অনেকে। হজরত উসমানের সমাধির কাছে এসে থমকে দাঁড়ালাম। মগজের ভেতর ঝড়ো গতিতে উল্টে যাচ্ছিলাম ইতিহাসের পাতা।
ইসলামের তৃতীয় খলিফার কবর জান্নাতুল বাকিতে ঢোকার মুখ থেকে বেশ দূরে যা দেখে একটু খট্কা লাখে। তবে ইতিহাসের ঘটনাবলী থেকে এর কারণ জানা যায়। মুসলিমদের প্রথম গৃহযুদ্ধের শিকার হজরত উসমান। বিদ্রোহীরা উসমানের বাড়ি ঘিরে ফেলে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং তাঁর পদত্যাগ দাবি করতে থাকে। তিনি পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। তাঁকে গোপনে মক্কা কিংবা সিরিয়ায় সরে যাবার পরামর্শ দেয়া হলেও মদিনা ছাড়তে তিনি রাজি হননি। অবশেষে বিদ্রোহীরা গৃহে প্রবেশ করে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাঁর মৃতদেহ তিন দিন এভাবে পড়ে থাকার পর রাতের অন্ধকারে জান্নাতুল বাকির বাইরে দাফন করা হয়। সে সময় জান্নাতুল বাকির পরিধি ছিল অনেক ছোট। পরবর্তীতে সম্প্রসারণের ফলে হজরত ওসমানের সমাধি জান্নাতুল বাকির সীমানায় মধ্যে চলে আসে। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে জান্নাতুল বাকি থেকে বের হয়ে এলাম।
পরদিন শুক্রবার ফজরের নামাজ পড়েই নবীর কবর জিয়ারতের চেষ্টা করলাম। হাজ্জীদের তিনটি লাইন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু এতই ভীড় যে সবার চাপে পিষ্ট হয়ে অনেকটা স্রোতে ভেসে কখন যে মসজিদ থেকে বের হয়ে এলাম টেরই পেলাম না। যাই হোক, মসজিদে নববীতে জুমার নামাজ আদায় করলাম আর আছরের পরে রাসুলের সমাধির মূল দরজার উল্টো দিকে কাছে যাবার সুযোগ পেলাম। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আধো আঁধারে খুব বেশি কিছু দেখা যাচ্ছিল না। মনে হলো, সমাধির চারপাশ ঘিরে আরো একটি দেয়াল তোলা হয়েছে।
রাতে এশার নামাজ শেষ করে হোটেলে ফিরে এলাম। ভোর ছয়টায় নবীর শহর ছেড়ে যাত্রা শুরু করল আমাদের বাস। স্বল্প সময়ের মধ্যে মক্কা ও মদিনা শহর হৃদয়ের গভীরে এতাটা জায়গা করে নেবে ভাবিনি। বিদায়ের ঘন্টা বাজছে। সবার মনটা ভারাক্রান্ত। ফিরে যাচ্ছি কাতারের নিশ্চিত গন্তব্যে। তবে মনে হচ্ছিল, কাবার পথে আমাদের যাত্রার এ যেন কেবল শুরু।
