মহানবীকে (সা.) নিয়ে ২০০৫ সালে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশ করে ডেনমার্কের একটি পত্রিকা। এর প্রতিবাদে মুসলিম বিশ্ব ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিশ্বব্যাপী দাঙ্গা হাঙ্গামা ও পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলায় অনেক প্রাণহানি ঘটে। এই সুযোগে মহানবীকে নিয়ে আঁকা কুর্ট ওয়েস্টারগার্র্ডের কার্টুনের মূল্য আকাশ ছুঁয়ে যায়। কার্টুনের মূল কপি বিক্রি হয় প্রায় দুই লক্ষ ডলারে!
ডেনিশ কার্টুন সংকটের সময় অনেক মুসলিম দেশ ডেনমার্কের তৈরি পণ্য বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। দেখা গেছে, এতে কিছু ডেনিশ কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি হলেও ডেনমার্কের মূল অর্থনীতি মোটামুটি অক্ষত থেকে যায়। অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জের হিসেবে পর্যটন শিল্পের উপর নির্ভরশীল মিসরে স্ক্যান্ডিনেভিয়েন দেশগুলি থেকে আসা পর্যটকের সংখ্যা ৩০ শতাংশ কমে যায়। ফলে মিসরের অর্থনীতি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পশ্চিমা পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার জন্য মিসরকে মরিয়া হয়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে হয়।
এরপর ফ্রান্সের রম্য সাময়িকী শার্লি এব্দো ২০১৫ সালে মহানবীকে (সা.) নিয়ে সিরিজ কার্টুন প্রকাশ করে। এটি প্রকাশের পর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় পত্রিকাটির ১২ সাংবাদিক নিহত হন।
২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসের শহরতলী এলাকায় এক স্কুল শিক্ষককে গলা কেটে হত্যা করা হয়। হামলাকারী চেচেন জাতিগোষ্ঠীর একজন মুসলিম এবং জন্ম রাশিয়ার মস্কোতে। নিহত ওই শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়াতেন। ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ ক্লাসে তিনি শিক্ষার্থীদের মহানবীর (সা.) কার্টুন দেখিয়ে ছিলেন। তারপর তাকে হত্যা করা হয়। বলাবাহুল্য, মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে বলে কার্টুন প্রদর্শনের আগে ওই শিক্ষক ক্লাসের মুসলিম ছাত্রদের ক্লাস ছেড়ে চলে যাবার পরামর্শ দেন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি।
মহানবীর (সা.) কার্টুন বন্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় ফ্রান্সের সব ধরনের পণ্য বয়কটের ডাক দেয় কুয়েত। ফ্রান্সের পণ্য বয়কটের ডাক দিয়ে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। তাদের এ আন্দোলনে প্রথমে ব্যাপক সাড়া মিললেও বয়কটের ডাক ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়।
উপরের ঘটনা থেকে দুটো বিষয় সামনে চলে আসে। প্রথমত মহানবীকে ব্যাঙ্গ করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মুসলিমরা দেশের প্রচলিত আইন না মেনে হিংসার পথ বেছে নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত মুসলিমরা পণ্য বয়কটের ডাক দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ঐক্যের অভাবে পুরোপুরি সফল হতে পারছে না।
পশ্চিমা বিশ্বের বহু দেশে আমাদের মতো অসংখ্য মুসলিমের বসবাস। এদের মধ্যে একটা বড় অংশ মানবিক কারণে কিংবা জীবনের নিরাপত্তার জন্য শরণার্থী হয়ে ওইসব দেশে আশ্রয় পেয়েছেন। কারণ যেটাই হোক না কেন, আমরা স্বেচ্ছায় পশ্চিমা দেশগুলোতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই একজন সুনাগরিক হিসাবে আমাদের উচিত ওই দেশের আইন-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। প্রতিবাদ করতে হলে নিয়মের আওতায় থেকে শান্তিপূর্ণভাবে তা করা। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মানুষ হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিবাদের নামে সহিংসতার আশ্রয় নিয়ে পক্ষান্তরে আমরা ইসলাম সম্পর্কে বহির্বিশ^কে ভুল ধারণা দিচ্ছি।
আমি জীবিকার খাতিরে এক যুগেরও বেশি মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশ কাতারে থেকেছি। এসব দেশে আইন ভেঙ্গে কিছু করার কথা ভাবাই যায় না। মুসলিম দেশ হলেও ধর্ম সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় রূপরেখার বাইরে কোনো কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বেতনের মতো ন্যায্য দাবি নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বহু প্রবাসীকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আর এধরনের কর্মকাণ্ডে যদিও খুব অল্পসংখ্যক মানুষ অংশ নেয় কিন্তু তাতে শান্তি পায় পুরো কমিউনটি। ফ্রান্সে স্কুলের শিক্ষকের হত্যাকাণ্ডের পর পুরো মুসলিমসমাজকে ভাবা হচ্ছে জঙ্গী। প্রসাশন তাদের দেখছে বাঁকা চোখে। ইসলাম ধর্মকে জঙ্গীবাদের কালিমায় কলুষিত করা হচ্ছে।
যে ১৮ বছরের যুবক ফ্রান্সে হত্যাকাণ্ড ঘটালো সে চেচনিয়া থেকে আসা একজন শরণার্থী। একজন আশ্রয়হীন মানুষকে যেই দেশ মাথা গুজবার ঠাঁই দিল, সেই দেশের আইনকে অগ্রাহ্য করে একজন নাগরিক হত্যা ওই দেশের প্রশাসন ও জনগণ কিভাবে দেখেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফ্রান্স একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। ইসলাম ও মুসলিদের প্রতি তারা ততটা সহানুভূতিশীল নয়। কিন্ত এর পরও মানবতার কথা বিবেচনা করে ২০১৮ সালে ফ্রান্স এক লক্ষ ২২ হাজার ৭৪৩ জন শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে যাদের ৩৫% হল মুসলিম।
এখনো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনিক বহু মুসলিম অধ্যুষিত দেশের হাজারো নির্যাতিত মুসলিম ফ্রান্সে প্রবেশের জন্য নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। এইসব মুসলিমদের আর্তনাদ শুনতে যখন অধিকাংশ মুসলিম দেশগুলো ব্যর্থ হচ্ছে, তখন জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো তাদের আশ্রয় দিতে এগিয়ে এসেছে। তবে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সহিংসতার আশ্রয় নিলে ইউরোপের দেশগুলো মুসলিমদের আশ্রয় দেয়ার আগে ভেবে দেখবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে পণ্য বর্জনের ডাককে আমি সমর্থন করি। বিশে^র ১.৭ বিলিয়ন মুসলিম যদি সংঘবদ্ধ হয়ে পণ্য বর্জনে অংশ নেয় তাহলে যে কোনো দেশের অর্থনীতিকে বিকল করে দেয়া সম্ভব। কিন্তু ডেনমার্ক ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে মুসলিদের পণ্য বয়কটের ডাক কি সফল হয়েছে? কুয়েত ফ্রান্সের বিরুদ্ধে পণ্য বয়কটের ডাক দিয়েছে ঠিকই কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব অবস্থাপন্ন আরবদের ফ্রান্স, আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রয়েছে বাড়ি কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট। গ্রীষ্মকালের একটা বড় অংশ ওইসব বিলাস বাড়িতে তারা সময় কাটায়, আয়েশ করে। প্রতিটি তেল সমৃদ্ধ আরব দেশে রয়েছে ফ্রান্স চেইন ডিপার্টমেন্ট স্টোর Carrefour. প্রতিবাদ করতে গিয়ে এই ডিপার্টমেন্ট স্টোরের শাখাগুলো কি তারা এখনো বন্ধ করতে পেরেছে? সত্যি বলতে কি, মুসলিমরা এতটাই বিভক্ত যে, এ পর্যন্ত কোনো বয়কটের ডাকেই তারা সফল হতে পারেনি।
ফেসবুকে দেখেছি মহানবীকে (সা.) নিয়ে হ্যাশটাগের ছড়াছড়ি। কিন্তু হ্যাশট্যাগ করার পাশাপাশি নিজেদের জীবনে নবীর চরিত্রের প্রতিফলন ঘটাতেই আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। এতেই নবীর আসল সম্মান বাড়বে। আমরা যদি সত্যই নবীর সম্মান রক্ষা করতে চাই তাহলে মুসলিমদের চুরি, দুর্নীতি ও পাপকাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। একমাত্র তখনই মানুষ বুঝতে পারবে আমরা আমাদের নবীকে সত্যিকার ভালোবাসি।
মহানবীর সম্মান রক্ষার নামে আমরা যে ধরনের সন্ত্রাসী খেলায় মেতে উঠেছি তা দেখে কি নবী সত্যিই খুশি হতেন? মানুষকে যখন খুনই করা হয় তখন তার প্রত্যাবর্তনের পথই বন্ধ করে দেয়া হয়। কার কখন পরিবর্তন আসবে সেটা কেবল আল্লাহই বলতে পারে। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, চেঙ্গিস খানসহ ভারতের বহু হিন্দু রাজার উত্তরসূরী পরবর্তীতে মুসলিম হয়ে ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন।
ফেইসবুক ও টুইটারের মতো সামজিক মাধ্যম মুসলিমদের স্বার্থরক্ষায় খুব একটা সোচ্চার নয়। ফেইসবুকের নীতিমালায় জাতি, ব্যক্তি বিদ্বেষী কোনো পোস্টিং করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। দেখা যাক ফেসবুক নীতিমালা কি বলেঃ
Article 3. Safety
Clause 6 – You will not bully, intimidate, or harass any user.
Clause 7 – You will not post content that: is hateful, threatening, or pornographic; incites violence; or contains nudity or graphic or gratuitous violence.
এছাড়া আর্টিকেল ৫, মানুষের অধিকার রক্ষার কথা বললেও প্রায় দুই বিলিয়ন মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করার জন্য ফেসবুকে যে পাতা খোলা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বাকস্বাধীনতার সাফাই গেয়ে বরং আত্মপক্ষ সমর্থন করেছে। বিশেষত মুসলিমদের ক্ষেত্রে ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ডেনিশ সংকটের সময় স্পষ্ট ধরা পড়ে। ২০০৫ সালে ডেনমার্কের যে পত্রিকা মহানবীর কার্টুন ছাপে ২০০৩ সালে সেই একই পত্রিকা যিশুকে নিয়ে আঁকা কার্টুন ছাপাতে অস্বীকৃতি জানায়। ২০০৬ সালে ভিয়েনার রাস্তার বিলবোর্ডে রানী এলিজাবেথ, জর্জ বুশসহ একটি নগ্ন নারীর পোস্টার টাঙানো হয়। প্রতিবাদের মুখে ওই পোস্টারগুলি কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলে। ধর্মবিদ্বেষী ও উষ্কানিমূলক কাজ ইউরোপে নিষিদ্ধ। অথচ যে কার্টুন বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ মানুষকে সন্ত্রাসী বলে কটাক্ষ করল তা ডেনমার্কের আইনে অপরাধ বলে বিবেচিত হয়নি।
ইসলামোফোবিয়া ও দ্বিমুখী নীতি মুসলিমদের মনে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করছে, এটা আমি স্বীকার করি। কিন্তু তাই বলে আবেগের বশবর্তী হয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামার পথ বেছে নিয়ে মুসলিমরা ইসলামবিদ্বেষীদের পাতা ফাঁদেই পা দিচ্ছে বারবার। ফ্রান্সে ম্যাকরনের মতো হিংসাবাদী যেমন আছে, মানবতাবাদী মানুষও আছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, মুসলিমরা ম্যাকরনের নিজ স্বার্থ হাসিলের খেলায় তার পক্ষ হয়েই খেলছে। এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই মুসলিমদের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। যার কিছু নমুনা ইউরোপে ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেমন হিজাব ও মসজিদের মিনার নিষিদ্ধকরণ। ফ্রান্সে বহু মসজিদ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে সরকার। ভবিষ্যতে আরো যে কি হবে কে জানে!
মনে রাখতে হবে, ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রমাণের দায় দায়িত্ব কিন্তু মুসলিমদের, খ্রিষ্টান কিংবা ইহুদিদের নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিমবিদ্বেষীদের গায়ে পড়া উস্কানির মোকাবেলা করার জন্য যে ধৈর্য্য, সহনশীলতা ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন তা মুসলিম বিশ্বে অনুপস্থিত। ফলে বারবার বিজয় হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষীদের। তারা আঙ্গুল তুলে বলছে ইসলামে সহনশীলতা বলে কিছু নেই। ইন্টারনেটের যুগে কোনো রকম নিষেধাজ্ঞায় কাজ হয় না। যে কোনো তথ্য কিংবা বই পিডিএফ করে অন্তর্জালে ছেড়ে দিলেই হল। কিছু কার্টুন দেখে, রুশদীর বই পড়ে যারা ইসলাম ছেড়ে চলে যেতে চান তাদের যেতে দেয়াই ভালো। এমন ঠুনকো বিশ্বাসীদের ইসলামে প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আর তাই যদি হত ৯/১১ পর আমেরিকা ও ইউরোপে মুসলিম হবার ঘটনা শোনা যেত না। অথচ বাস্তবে ঘটছে ঠিক তার উল্টো।
কার্টুনের পর মুসলিমবিদ্বেষীরা আরো সংঘবদ্ধ হয়ে উস্কানিমূলক কা- ঘটিয়ে যাবে এটা নিশ্চিত। ইতিমধ্যে নিউ ইয়র্কের কিছু বাসের গায়ে একটি বিজ্ঞাপন দেখা গিয়েছে Leaving Islam? Fatwa on your head? Is your family threatening you? মুসলিমদের জন্য নিঃসন্দেহে এটা আরেকটি দুঃসংবাদ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে একজন মুসলিমের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? উত্তর হবে, আমাদের মহানবী এমন পরিস্থিতিতে কী করতেন তা সবার আগে অনুসন্ধান করে দেখা। সঙ্গে সঙ্গে কুরআন ও হাদিসে কী নির্দেশনা রয়েছে তা ঘেটে দেখা। একটু ভেবে দেখুন, কার্টুন দিয়ে ব্যাঙ্গ করে মহানবীর সত্যিকারের কোনো ক্ষতি করা কি সম্ভব? সৌদি স্কলার আল-গাইনের মতে, যারা এসব করছে তারা যেন সূর্যের দিকে কিছু বালি ছুড়ে মারছে যা আবার তাদের মুখেই এসে পড়বে।
মহানবী ইসলাম প্রচারের সময় মক্কায় চরম আবমাননা ও বিদ্বেষের মুখোমুখি হয়েও কখনো সংঘাতের পথ বেছে নেননি। একপর্যায়ে তিনি মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনা হিজরত করেন। তায়েফের ঘটনা আমরা জানি। তায়েফবাসীদের হাতে চরম লাঞ্ছিত হবার পরও তিনি তাদের অজ্ঞতার কথা ভেবে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহর রোষানল থেকে তায়েফবাসীদের রক্ষা করার জন্য প্রার্থনা করেছেন। মক্কা বিজয়ের পর শত্রুদের নতজানু পেয়েও সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
রাসুল (সা.) যখন মদিনায় তখন মক্কার কুরাইশগণ তাঁর চরিত্র হননে মেতে ছিল। মহানবীকে ব্যাঙ্গ ও বিদ্রুপ করে রচিত হচ্ছিল কবিতা ও গান। নবীকে যখন উপহাস করা হচ্ছিল কখন তিনি বলতেন, ওদের কল্পনায় আমি যা, আমি তো আসলে তা না। আমি জানি আমি কে। মক্কা বিজয়ের পর মহানবী এদের সবাইকে ঢালাওভাবে হত্যার নির্দেশ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।
মুসলিমরা জানে মহানবী কে। তাই কিছু মূর্খ মানুষের সমালোচনা নিয়ে মুসলিমদের এতটা বিচলিত হতে হবে কেন? এসবের জবাব শান্তিপূর্ণ উপায়ে দিতে হবে। মানুষ হত্যা করে যদি আমরা মনে করি, ফ্রান্স নমনীয় হবে, নবীর সম্মান বাড়বে, সেটা ভুল। জোর জবরদস্তি করে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করা যায় কিন্তু সম্মান ও ভালোবাসা তো আদায় করা যায় না।
নবীকে অসম্মান করা হলে কী করা উচিত তার নির্দেশনা কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে পাওয়া যায়। সেগুলো হলো, সুরা আ’রাফ (৭ : ১৯৯), সুরা নাহল (১৬ : ১২৫), ও সুরা কাসাস্ (২৮ : ঃ৫৪-৫৬)। আল্লাহর নির্দেশ হলো, মূর্খদের অসার কর্মকা- উপেক্ষা করে চলা আর ভালো দ্বারা মন্দের মোকাবেলা করা। বুখারি শরিফে উদ্ধৃত হাদিসে মহানবীর একই ধরনের নির্দেশনা পাওয়া যায়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত কুসংস্কার ও ভুল ধারণাই খ্রিষ্টান অধ্যুষিত পশ্চিম বিশ্বে মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাবের মূল কারণ। ইতিহাসের পাতা থেকে এই তত্ত্বের সমর্থন মেলে। হিটলার খ্রিষ্টান ধর্মান্ধ কিনা জানি না, তবে খ্রিষ্টান সংস্কৃতিতে চরম ইহুদিবিদ্বেষ হিটলারকে ইহুদিনিধনে ইন্ধন যুগিয়েছে বলে অনেকের ধারণা। ইসলামে যিশুর স্থান হল একজন নবী হিসাবে। পবিত্র কুরআনে যিশুর নাম এসেছে ২৮ বারেরও বেশি। অন্যদিকে মুসা নবীর কথা এসেছে ১৩৬ বারেরও বেশি। কিন্তু হজরত মুহাম্মদকে (সা.) খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা কখনোই নবী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে ইসলামের শুরু থেকেই খ্রিষ্টান শাসক গোষ্ঠী ও চার্চ এস্টাব্লিশমেন্ট ইসলাম ও মহানবীর নামে কুৎসা রটনা ও বিভিন্ন ধরনের প্রোপাগান্ডা চালিয়ে এসেছে।
৭ম শতকে রোমান শাসিত আফ্রিকার বহু দেশ ও খোদ ইউরাপের স্পেন মুসলিমদের হাতে চলে এলে খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার ভয়ে সেই প্রোপাগান্ডা ও বিদ্বেষ আরো ভয়ংকর রূপ নেয়। মুসলিমদের অগ্রযাত্রা বন্ধ করার জন্য তারা উঠে পড়ে লাগে। মুসলিমসমাজ এবং মহানবীকে জঙ্গী বলে বই-পুস্তক ও ইতিহাসের পাতায় কুৎসা রটানো হয়। যা পরবর্তীতে ইউরোপের দোরগাড়ায় অবস্থিত তুরস্কে মুসলিম সুপারপাওয়ার উসমান সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনের পর থেকে খ্রিষ্টান সমাজের চিন্তা ও চেতনায় গেঁড়ে বসে। পশ্চিমা দেশের মূল ধারার ইতিহাসে ৮ম শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত ইসলামের যে স্বর্ণযুগ ছিল বলে আমরা জানি তার কোনো উল্লেখই নেই। ফলে ছোটবেলা থেকে মুসলিম সভ্যতা সম্পর্কে ওইসব দেশের নাগরিকদের কোনো সম্যক ধারণা থাকে না বললেই চলে। যার ফলশ্রুতিতে মুসলিমদের নিয়ে যুগ যুগান্তরের লালিত জুজুর ভয় ওদের তাড়িয়ে বেড়ায়। পশ্চিমা বিশে^র অনেক সহকর্মীদের সাথে আমার কথাবার্তায় এই অজ্ঞতা ও ভীতি আমি লক্ষ্য করেছি।
মুহাম্মদকে (সা.) একজন মুসলিম যে রকম ভালোবাসবে, একজন অমুসলিমের কাছ থেকে সেরকম ভালোবাসা আশা করাটা একবারেই অবান্তর। কিন্তু যারা মহানবীর জীবনচরিত নিয়ে বিস্তারিত লেখাপড়া করেছেন, তারা সবাই তাঁর উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কখনো দ্বিমত পোষণ করতে পারেননি। লিও তলস্তয়, গ্যাটে, ইরভিং, বানার্ড শ, এডওয়ার্ড গিবনের মতো এমন বহু পশ্চিমা চিন্তাবিদ রয়েছেন যারা মহানবীকে মানবজাতির ইতিহাসের একজন সফল এবং শ্রেষ্ঠ মানব হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।
ইসলামফোবিয়ার জন্য একতরফাভাবে পশ্চিমা বিশ্বকে দায়ী না করে কিভাবে এই ফোবিয়া দূর করা যায় সেটা নিয়ে মুসলিমদের এখন ভাবতে হবে। ইদানিং পশ্চিমা বিশ্বেও বড় হওয়া বেশ কিছু মুসলিম তরুণ ইন্টারনেটে বিভিন্ন উগ্রপন্থি মুসলিম নেতাদের বক্তৃতা শুনে বিভ্রান্ত হচ্ছে। ফলে তারা খুব সহজেই সন্ত্রাসের পথে পা বাড়াচ্ছে। এ ব্যাপারে মুসলিম সমাজকে সচেতন হতে হবে।
একজন মুসলিমের কার্যকলাপ, আচার-ব্যবহার দেখেই ইসলাম ও মহানবীর শিক্ষা সম্পর্কে অমুসলিম সমাজ সম্যক ধারণা পাবে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশে বসবাসরত মুসলিমদের দায়িত্ব অন্যান্য মুসলিমদের চাইতে অনেক বেশি বলে আমি মনে করি। মুসলিমসমাজ ও ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা ও জুজুর ভয় দূর করতে হলে মুসলিমদের নিজস্ব কম্যুনিটির চার দেয়ালের বাইরে এসে ওইসব দেশের আমজনতার সাথে মিশতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সম্প্রীতির সেতু বন্ধন, দেখিয়ে দিতে হবে মুসলিমরাও অন্য দশজনের মতো শান্তিপ্রিয় মানুষ। সহিংসতা নয়, ইসলামবিদ্বেষীদের কর্মকা-কে উপেক্ষা করে তাদের কাছেই মহানবীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, মহত্ত্ব ও অন্যান্য গুণাবলী তুলে ধরাটাই হবে মহানবীকে ব্যাঙ্গ করে আঁকা কার্টুনের সর্বোত্তম জবাব।
