পবিত্র রমজান মসে দেশের প্রায় প্রতিটি মসজিদেই তারাবিহ নামাজে কুরআন খতম দেয়া হয়। উদ্দেশ্য, বছরে অন্তত একবার নামাজরত অবস্থায় শুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআন শোনা এবং কুরআন থেকে আল্লাহর দেয়া নির্দেশনা গ্র্রহণ করা। আল্লাহ তায়ালা সুরা বাকারায় বলেছেন, ‘রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।’ (২ : ১৮৫, অনুবাদ: মুহীউদ্দিন খান)।

কিন্তু হাফেজ সাহেবের তেলাওয়াত থেকে আমরা যা শুনছি তার কতটুকু আমরা বুঝতে পারি? কুরআন এসেছে আমাদের সঠিক পথ দেখানোর জন্য। সেই কুরআনের বাণীর মর্ম উপলব্ধি করতে না পারি তাহলে শুধু পাঠ করে কিংবা শ্রবণ করে কি আমরা আল্লাহর দেয়া দিক-নির্দেশনার সন্ধান পাবো?

মুসলিম হিসাবে ছোটোবেলায় আরবি পড়া ও লেখা শিখেছি। কিন্তু ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক অর্থাৎ ভাষার অর্থ বুঝে পড়াটাই শেখা হয়নি। তাই তারাবিহ নামাজ পড়তে গিয়ে মনে হয়, কুরআন খতম করে নেকি অর্জন করাটাই যেন মূল বিবেচ্য বিষয়। কেবল কুরআন তেলাওয়াত করলে সোয়াব পাওয়া যায়, হাদিস ও কুরআনে এর স্বপক্ষে দলিল রয়েছে (কুরআন ২৯ : ৪৫, হাদিস নং ১০০৩, তিরমিজি)।

কিন্তু মানবজাতির কাছে কুরআন পাঠানোর উদ্দেশ্য কি কেবল নেকি অর্জন করা? আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে প্রতিটি মুসলিমকে কুরআনের অর্থ বুঝে তার মর্মার্থ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সুষ্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। ‘তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’ (৪৭ : ২৪, অনুবাদ: মুহীউদ্দিন খান)। বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যার মাত্র ১৫ ভাগ হলো আরব। আরবি জানেন এমন অনারব মুসলিমদের বাদ দিলে দেখা যায়, মুসলিম জনতার প্রায় ৮০ ভাগই আরবি জানেন না। ফলে কুরআন বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত পুস্তক হলেও দুঃখজনকভাবে সর্বাধিক না বুঝে পড়া গ্রন্থও বটে!

কুরআনের অর্থ শতভাগ অনুবাদ করা সম্ভব নয়। কবি নজরুলের একটি বিখ্যাত কবিতা হলো ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’। এই কবিতা বিদেশি কোনো ভাষায় যতই সতর্কতার সাথে অনুবাদ করা হোক না কেন কবিতার পংক্তিমালায় উৎসরিত আবেগ, বেদনার রং কি মূল কবিতার মতো পাঠকের হৃদয় ছুঁতে পারবে? পবিত্র কুরআনের ক্ষেত্রেও তাই। কুরআনের সঠিক ভাব ও মর্মার্থ বুঝা একমাত্র আরবি ভাষাতেই সম্ভব। নামাজ পড়ার সময় আমরা অনেকটা কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে ইমামের তেলাওয়াত শুনে যাই কিন্তু কিরাতের অর্থ বুঝতে পারি না বলে আল্লাহর বাণী আমাদের হৃদয়কে আলোড়িত করতে পারে না। নামাজের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে মনোনিবেশ করতে না পারার এটাও একটা অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি। অথচ রাসুলের (সা.) সাহাবিদের নামাজে মগ্ন হয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেবার ঘটনা আমরা শুনেছি। নামাজের মধ্যে মনোনিবেশ করে তারা তুষ্টি পেতেন, আল্লাহর সান্নিধ্য পেতেন। নামাজের মধ্যে কি আমরা সেই তৃপ্তি খুঁজে পাই? তাই কুরআন বুঝতে হলে আরবি ভাষা শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তবে কুরআনের বিশদ ব্যাখ্যা করার জন্য কেবল আরবি ভাষা জানাটাই যথেষ্ট নয়। কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হবার প্রেক্ষাপট, যেমন প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এবং হাদিস সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে হবে। আর এ জন্য আলেম, উলামা কিংবা কুরআন বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে কুরআন বুঝে পড়ার দায়িত্ব কোনো মুসলিম এড়িয়ে যেতে পারেন না। বাড়তি কিছু ভাষা জানা থাকা কখনোই ক্ষতিকারক নয়। তবে ভাষা শেখার সর্বোত্তম সময় হল শিশুকাল। ভাষাবিদদের মতে একজন শিশু একই সাথে ৫টি ভাষা রপ্ত করতে পারে। তবে ইচ্ছে থাকলে বয়সটা বাধা হবার কথা নয়।

এছাড়া আরবি খুবই কঠিন ভাষা, শিখবো কি করে? এ ধরনের একটি ভীতি আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে। ধরা যাক অফিসের সিইও বললেন, ছয়শ পাতার একটি নতুন ডিজাইন ম্যানুয়াল এসেছে অফিস লাইব্রেরিতে। ছয় মাসের মধ্যে সেটা রপ্ত করতে পারলে বেতন বেড়ে যাবে দুই গুণ। এই ঘোষণার পর ম্যানুয়ালের প্রতিটি শব্দ মগজে ঢুকিয়ে নিতে অফিসের কর্মচারীদের মধ্যে কি ধরনের তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি বাড়িতে স্ত্রী হয়তো বলবেন, ম্যানুয়াল রপ্ত করতে বেশি বেশি সময় দাও, অন্যান্য কাজ আমি সামলাবো। অথচ যে গ্রন্থে বর্তমান এবং পরকালের মুক্তির ফর্মুলা আছে বলে মুসলিমদের বিশ্বাস, সেই কুরআনের মর্মার্থ উদ্ধার করতে আমরা কতটুকু উদ্দীপ্ত হই? কুরআন বুঝে পড়ার গুরুত্ব নিয়ে অধিকাংশ মুসলিমদের মধ্যে কোনো সংশয় না থাকলেও কুরআনের ভাষা শিখার জন্য তারা সেরকম সচেষ্ট নন।

পবিত্র কুরআনে অল্লাহ তায়ালা বার বার বলেছেন, (আল-কামার ৫৪ : ১৭, ২২, ৩২, ৪০) ‘আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি?’ (অনুবাদ : মুহীউদ্দিন খান)। কুরআনের এই আয়াতটি পড়ার পর আপাতঃদৃষ্টিতে মনে পড়ে, যাদের মাতৃভাষা আরবি নয় তাদের জন্যও কুরআন বুঝা কেমন করে সহজ হতে পারে? তার মানে আল্লাহর এই বাণীতে এমন কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে যা আমরা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছি।

ভারতের ভূ-পদার্থবিদ এবং বিশিষ্ট কুরআন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আজিজ আব্দুর রহীম দীর্ঘ ২০ বছর গবেষণা করে কুরআন শিক্ষার যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রণয়ন করেছেন তার মাধম্যে যে কোনো সাধারণ মুসলিমের পক্ষে খুব সহজেই কুরআনের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব। ভারতের হায়দ্রাবাদ শহরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘আন্ডারস্ট্যান্ড কুরআন একাডেমি’ (understandquran.com)। বিদেশি ভাষা দ্রুত শেখার জন্য বর্তমান বিশ্বের সেরা মনোবিজ্ঞানী এবং ভাষাবিদদের তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী পদ্ধতি TPI (Total Physical Interaction প্রয়োগ করে তিনি তৈরি করেছেন কুরআন শিক্ষার কোর্স। এবারে ড. আব্দুল আজিজের কুরআন বুঝার জন্য আরবি ভাষা শেখার পদ্ধতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি।

মদিনা শরিফ ও মক্কার মসজিদুল হারামে যে কুরআনের কপি পাওয়া তা ‘মদিনা মুসহাফ’ নামে পরিচিত। এই মদিনা মুসহাফের পাতার সংখ্যা হল ৬০০, যার প্রতিটি পাতার রয়েছে ১৫টি লাইন এবং প্রতিটি লাইনে রয়েছে গড়ে নয়টি করে শব্দ। সেই হিসাবে কুরআনের মোট শব্দ সংখ্যা হল প্রায় ৭৮,০০০। ড. আব্দুল আজিজ গবেষণা করে দেখেছেন, আমরা নিয়ত থেকে শুরু করে নামাজের মধ্যে যে সব দোয়া-দরুদ, সুরা ফাতিহাসহ কুরআনের শেষ পারার ছোট ছোট সুরা এবং কুরআনের সুপরিচিত আয়াত হামেশা তেলাওয়াত করি, তাতে যতগুলো শব্দ রয়েছে সেগুলো কুরআনে ৫৫,০০০ বার এসেছে। যা কুরআনের মোট শব্দ সংখ্যার ৭০ শতাংশ!

কুরআনে একই শব্দ বার বার ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন نَحْنُ هُوَ، هُمْ، أَنْتَ، أَنْتُمْ، أَنَا ইত্যাদি শব্দ ১২৯৫ বার কুরআনে এসেছে। কেবল সুরা ফাতিহায় ব্যবহৃত শব্দগুলো কুরআনে এসেছে ৭৫০০ বার! আরবি ভাষার প্রতিটি ক্রিয়া এবং নামপদের মূলে রয়েছে একটি করে তিন অক্ষর বিশিষ্ট মৌলিক শব্দ। এই মৌলিক শব্দের সাথে এক বা অধিক অক্ষর যোগ করে লিঙ্গ, বচন এবং কালের প্রকারভেদে ভিন্ন ভিন্ন অর্থের অসংখ্য শব্দ তৈরি করা যায়; যা বাংলা কিংবা ইংরেজি ভাষায় সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, আরবি শব্দ দারস (درس)-এর মানে হল পাঠ বা Lesson। পাঠের সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্য দুটো শব্দ হলো শিক্ষক (Teacher) এবং বিদ্যালয় (School)। আরবিতে যার অর্থ হল যথাক্রমে মুদাররিস المدرس এবং মাদরাসা مدرسة। লক্ষণীয়, আরবি ভাষার এই তিনটি শব্দেরই মূল হচ্ছে দাল-রা-সা এই তিন অক্ষরের একটি মৌলিক শব্দ। বাংলা কিংবা ইংরেজিতে পাঠ, শিক্ষক, বিদ্যালয় বোঝাতে আমাদের তিনটি নতুন শব্দ শিখতে হচ্ছে; অথচ আরবিতে একটি মূল মৌলিক শব্দ জানলেই সামান্য রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন শব্দ জানা যাচ্ছে।

কুরআনের মোট মৌলিক শব্দের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ১৮৫০। ড. আব্দুল আজিজের হিসাবমতে মাত্র ২৫০টি মৌলিক শব্দ শিখতে পারলেই কুরআনের ৭০ শতাংশ শব্দ জানা হয়ে যায়। সবচেয়ে আনন্দেন কথা হলো, নামাজের প্রয়োজনীয় দোয়া ও সুরা পড়তে গিয়ে আমরা প্রায় ৫০টি বাক্য তেলাওয়াত করি। যার মধ্যে রয়েছে আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০টি শব্দ। কেবল এই বাক্যগুলো বোঝার চেষ্টা করলেই বাড়তি কোনো পরিশ্রম ছাড়া আরবি ভাষার কাঠামো সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে। ড. আব্দুল আজিজ হিসাব কষে দেখিয়েছেন, মনোযোগ ও আন্তরিকতার সাথে তার পদ্ধতি অনুসরণ করলে মাত্র ২০০ ঘন্টার মধ্যে পুরো কুরআনের অর্থ আয়ত্তে আনা যায়। কেউ যদি সপ্তাহে কুরআন শিক্ষার জন্য মাত্র ৪ ঘন্টা করে সময় বের করতে পারেন তাহলে এক বছরের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জন করার সম্ভব। আরো বিস্তারিত জানার জন্য উৎসাহী পাঠকদের অন্তর্জলে understandquran.com ওয়েবসাইটি দেখতে অনুরোধ করছি।