দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর অবশেষে বাংলাদেশ সরকার কওমি মাদরাসাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন দাওরায়ে হাদিসের সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স ডিগ্রির (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমানের বলে গন্য করা হবে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ লক্ষাধিক ছাত্র-ছাত্রী আনুমানিক ৭৫ হাজার কওমি মাদরাসা থেকে লেখাপড়া শেষ করে বেরুচ্ছেন। এত বড় একটি জনগোষ্ঠী মূলধারা থেকে দূরে থাকায় দেশের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছিল। তাই কওমি মাদরাসার শিক্ষাকে সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে মূলধারায় নিয়ে আসাটা ছিল সময়ের দাবি। কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা এবং সনদের স্বীকৃতি খুবই আশাব্যঞ্জক। তবে এই সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে কওমি মাদরাসাগুলোর দায়িত্ব এখন আরো বহু গুণ বেড়ে গেল।

সমতার প্রশ্নে ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞানার্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, শিক্ষার অবস্থান ইত্যাদি বিবেচনা করে প্রচলিত কওমি শিক্ষা পাঠ্যক্রমকে আধুনিকায়ন করার ভবিষ্যত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। স্নাতকোত্তর ডিগ্রির মূল ভিত্তি হচ্ছে এসএসসি, এইচএসসি এবং স্নাতক কোর্স। তাই স্নাতকোত্তরের আগের শিক্ষার স্তরগুলোর মান উন্নত করে কিভাবে মূলধারার সমপর্যায়ে আনা যায়, সেটাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা এখন ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। অন্যদিকে কওমি মাদরাসায় পড়ানোর খরচ নেই বললেই চলে। ফলে মাদরাসায় সাধারণ শিক্ষার খরচ বহন করতে পারে না এমন দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের আধিক্য দেখা যায়। ব্যয়বহুল শিক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানকে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা দিতে চান। তাই মাদরাসা শিক্ষায় আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

মাদরাসা থেকে পাশ করলে একমাত্র মসজিদের ইমাম কিংবা মুয়াজ্জিন হওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই, এমন একটি ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। মাদরাসায় মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাস পড়ানো হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মাদরাসার পাঠ্যক্রম, শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের পরিষ্কার ধারণা নেই। তাই অনেক বাবা-মা ইচ্ছে থাকলেও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের মাদরাসায় পাঠাতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। ফলে অধিকাংশ মেধাবী ছাত্ররা মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার দিকেই ঝুঁকে পড়ে। তবে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পাশ করা অনেক ছাত্র-ছাত্রী নিজ মেধা এবং চেষ্টায় সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে গেছেন। ইংল্যান্ড, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় এমন অনেকের কথা জানি, যারা প্রথমে মসজিদের ইমাম হিসাবে এলেও পরে পিএইচডি সম্পন্ন করে শিক্ষকতা করছেন।

বিশ্বজুড়ে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন খাতে মাদরাসা থেকে পাশ করা গ্রাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সরকার পরিচালিত মসজিদে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের পদে বহু বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁদের সফলতা দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে। ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ক্রমবর্ধমান মুসলিম জন্যসংখ্যার কারণে মসজিদ এবং ইসলামিক সেন্টারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। ফলে ওইসব দেশে ইমাম ছাড়াও শিক্ষকতা, ইসলামিক ব্যাংকিং, বিমা, হালাল খাবারের তদারকি এবং সার্টিফিকেশনসহ বিভিন্ন সংস্থায় মাদরাসা শিক্ষিত জনশক্তির ব্যাপক চাহিদা আছে।

দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ার থাকার সুবাদে ওই দেশের কিছু অভিজ্ঞতার কথা এখন তুলে ধরছি। অস্ট্রেলিয়ার অধিকাংশ মসজিদ বিভিন্ন মুসলিম কমিউনিটির সংঘবব্ধ প্রচেষ্টায় ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠা করা হয়। নব্বই দশকের প্রথম দিকে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে সিডনি শহরের ‘সেফটন’ এলাকায় একটি পুরোনো গির্জা ক্রয় করে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়। এই মসজিদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজের সাথে আমি সংযুক্ত ছিলাম। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ইমামের দায়িত্ব পালন করার জন্য গভীর ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় দখল থাকাটাও খুব জরুরি। দেখা গেছে, অনেক সময় নিজ মাতৃভাষায় দেয়া ইমামের খুতবা এবং বক্তব্যের অনুবাদ বিকৃত হয়ে মিডিয়ায় তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে। এতে ইসলাম এবং মুসলিমদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়।

ইংরেজি ভাষায় অদক্ষ একজন ইমাম অস্ট্রেলিয়ার বড় হওয়া মুসলিম তরুণ এবং যুবক সমাজের কাছে যৌক্তিকতার মাধ্যমে ইসলামের বার্তা তুলে ধরতে ব্যর্থ হন বলে তাদের অনেকেই মসজিদ ও ধর্মবিমুখ হয়ে পড়ে। কেউ আবার উগ্রপন্থী মুসলিম সংগঠনের সাথে সংযুক্ত হয়ে সন্ত্রাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করার লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়ান ইমাম কাউন্সিল এখন নবাগত ইমামদের জন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। অস্ট্রেলিয়ার জীবনধারা এবং মূল জনগোষ্ঠীর মূল্যবোধ সম্পর্কে এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখন অস্ট্রেলিয়ায় ইমামের চাকরি নিয়ে যেতে হলে দক্ষ ক্যাটাগরিতে অভিবাসনের প্রার্থীদের মতো ইংরেজি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ফলে প্রার্থীর ইংরেজি দক্ষতা নিয়ে এখন আর ভাবতে হয় না।

মসজিদে খুতবা দেয়া ও নামাজ পড়ানোর পাশাপাশি একজন ইমামকে সমাজের বিভিন্ন পেশা ও স্তরের মানুষকে ধর্মীয় অনুশাসনের ভিত্তিতে সঠিক নির্দেশনা ও পরামর্শ দেয়ার গুরুদায়িত্বও পালন করতে হয়। একজন ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তারকে তাদের পেশাদার কাজ চালানোর জন্য ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ না হলেও চলে। কিন্তু একজন ইসলামিক চিন্তাবিদ বা ইমামকে ধর্মীয় গন্ডীর বাইরের বহু বিষয় সম্পর্কে জানতে হয়। এজন্য কওমি মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ চলমান বিশ্বের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো সম্পর্কে পাঠদানের সুযোগ রাখতে হবে। এর ফলে মাদরাসা থেকে পাশ করা একজন ইমাম বর্তমান বিশ্বের আর্থ-সামাজিক এবং জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হবেন।

এমন একটা সময় ছিল যখন জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা থেকে শুরু করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখাতেই মুসলিম বিজ্ঞানীরা ছিলেন সবার শীর্ষে। দশ শতকের আরব বিজ্ঞানী ইবনে আল-হাইথামকে বিশ্বের প্রথম পরিপূর্ণ বিজ্ঞানী হিসাবে মানা হয়। একাধারে গাণিতিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল-হাইথাম নিউটনের ৬০০ বছর আগে গতিদ্যিার প্রথম সূত্রের ধারণা অবিষ্কার করেন। এছাড়া অপটিক্স বা আলোকবিদ্যার জনক হচ্ছেন তিনি। তাঁর সূত্র ধরেই তৈরি হয়েছে আধুনিক ক্যামেরা। আজকের চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যবহৃত বহু আবশ্যকীয় যন্ত্রপাতির আবিষ্কারক হচ্ছেন দশ শতকের মুসলিম বিজ্ঞানী আল-জাহরাবি। কিন্তু এখন বিজ্ঞানের প্রসারে মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে। মুসলিম সমাজের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের দূরত্ব যেন বেড়েই চলেছে। আমরা বলি বিজ্ঞানময় কুরআন। অথচ ফরাসি চিকিৎসাবিদ মরিস বুকাইলকে লিখতে হলো কুরআনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। মুসলিম বিশে^ আরেকজন আল-হাইথাম যে কবে জন্ম নেবেন জানি না।

কওমি মাদরাসার সিলেবাসে উর্দু ও ফারসি ভাষার ওপর যেরকম জোর দেয়া হয়, বাংলা এবং ইংরেজিচর্চার ওপর তেমন একটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। মাদরাসার অধিকাংশ পাঠ্যবই উর্দু ও ফারসি ভাষায় হওয়াটাই হয়তো এর কারণ। বর্তমান বিশ্বের বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও অধিকাংশ গবেষণাই ইংরেজিতে প্রকাশিত হচ্ছে। তাই উচ্চতর গবেষণার জন্য ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা খুবই দরকার। মাদরাসার পাঠ্য এবং রেফারেন্স বইগুলো যাতে মাতৃভাষা বাংলা এবং ইংরেজিতে অনূদিত হয় সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

ইসলামিক বিশেষজ্ঞ হতে হলে কুরআন এবং হাদিসের ভাষা আরবিতে ভাষাগত ব্যুৎপত্তি থাকা আবশ্যক। মাদরাসার সিলেবাসে আরবি ভাষা বুঝা এবং লেখার সক্ষমতা অর্জনের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। দেখা গেছে, মাদরাসা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়ার পরও অনেক শিক্ষার্থীর আরবি ভাষাজ্ঞান পর্যাপ্ত নয়। এজন্য কওমি শিক্ষাবোর্ডের তত্ত্বাবধানে ভাষা শিক্ষার ট্রেনিং সেন্টার খোলা যেতে পারে, যেখানে কোনো ছাত্র চাইলে ভাষা শিক্ষার জন্য বিশেষ কোর্স করতে পারে। এছাড়া স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সহায়তা করার জন্য মাদরাসায় রেফারেন্স লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে। এখন আর আগের মতো লাইব্রেররর তাকে বই রাখার দরকার নেই। ডিজিটাল সংযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই প্রয়োজনীয় বই এবং গবেষণাপত্রের নাগাল পেতে পারে।

কওমি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা এখন অন্যান্যদের সাথে সরকারি চাকরির জন্য অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। তাই কওমি শিক্ষার্থীদের মসজিদ ও মাদরাসার মতো গতানুগতিক পেশায় না গিয়ে অন্য পেশায় যাবার কথাও এখন ভাবতে হবে। এই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিতে হবে। আমার বিশ্বাস, ইসলামি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ কওমি শিক্ষিতরা দুর্নীতি, প্রতারণায় ও সংঘাতে ভরা আমাদের আজকের এই সমাজকে অবক্ষয়ের দ্বার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। তবে সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে যাতে তারা অবদান রাখতে পারে সেজন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করার দায়িত্ব আমাদের সবার।