বাবাকে নিয়ে এভাবে লিখতে বসবো ভাবিনি কখনো। নয় ভাই ও দুই বোনের সংসারে সবার ছোট ছিলাম বলে আমার যাবতীয় আবদার ছিল আপু ও মায়ের কাছে। পরীক্ষার রেজাল্ট শিটে দস্তখত নেয়া ছাড়া তেমন একটা প্রয়োজনে বাবার কাছে যাওয়া হতো না। হয়তো তাই নিজের অজান্তেই ধীরে ধীরে বাবার সাথে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। মাসের শেষে বেতনের টাকাটা মার হাতে তুলে দিয়ে বাবা নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন আপন ভুবনে। ব্যস্ত থাকতেন কুরআন, হাদিস পড়া ও ইবাদত নিয়ে। এত বড় সংসার এক হাতে চালাতেন মা। তবে মা যদি সংসারের নাবিক হন বাবা ছিলেন দিগন্ত-সীমানায় ভাসমান জ্বলজ্বলে লাইট হাউজ; দূর থেকে মাকে শক্তি যোগাতেন।
কাকডাকা ভোরে উঠে বাবা কখন যে মসজিদে যেতেন, টের পেতাম না। কিন্তু মসজিদ থেকে ফিরে এসে অসাধারণ সুরেলা কন্ঠে যখন সুরা ইয়াসিন কিংবা দরুদে হাজারী পড়তেন তখন বুঝতে পারতাম বাবা এখন ঘরে। অত্যন্ত পরহেজগার ছিলেন বলে বাবার নামের আগে মৌলবী জুড়ে দেয়া হয়েছিল, যদিও তার কোনো মাদরাসা শিক্ষা ছিল না। ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ থাকলেও ধর্মচর্চার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি চর্চায় বাবা আমাদের কখনো বাধা দেননি। মাঝে মধ্যে ভাই বোনদের ঘরোয়া গানের জলসায় এসে তিনি বসতেন আর বলতেন, ওই গানটা কর না! এ ধরনের পারিবারিক আসরে কিছুক্ষণ থেকে আবার চলে যেতেন।
কুরআন শিক্ষা নিয়ে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। ছোটবেলায় শুদ্ধ করে কুরআন পড়ার জন্য বড় ভাইয়া একজন মৌলবী সাহেব যোগাড় করে আনলেন, মাসিক বেতন ৬০ টাকা। সেই যুগে কুরআন পড়ানোর জন্য ৬০ টাকা বেতন মোটামুটি ভালোই বলা যায়। কিন্তু বাবা জানতে পেরে মৌলবী সাহেবের বেতন আরো চল্লিশ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘ইংরেজি-বাংলা শিক্ষার জন্য প্রাইভেট টিউটরকে আমরা ১০০ টাকা বেতন দিতে পারি অথচ আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান গ্রন্থ কুরআন শিক্ষার মূল্য এত কম হবে কেন?’ বাবার কথা হলো, কুরআন শেখার জন্য আমরা উচিত মূল্য দিচ্ছি না বলেই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ধর্মের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে।
সরকারি চাকুরে হিসেবে বাবার সততা ছিল কিংবদন্তীর মতো। বাবার অনেক জুনিয়র বন্ধুরা পদের চাতুরী খাটিয়ে সহজেই গাড়ি বাড়ি করে ফেলেছিলেন। এত বড় টানাপোড়েনের সংসার চালাতে গিয়ে মা মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বাবাকে বলতেন, ‘তোমার বন্ধুদের দিকে একটু তাকিয়ে দ্যাখো, তোমার তো কিছুই হলো না।’ বাবা মুচকি হেসে বলতেন, আমার সন্তানরাই হলো আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। সততা বিসর্জন দিলে তোমার ছেলেমেয়েরা কখনোই মানুষ হতে পারবে না। বাবার সেই কথা যে কতখানি সত্য এখন তা বুঝতে পারি।
বাবা মানুষকে খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করে বসতেন। দু-একটি মিষ্টি কথা বলে বাবাকে খুব সহজেই পটানো যেতো। বাবার সরলতা আমাদের কাছে ছিল যতটা উপভোগ্য, মা’র জন্য ছিল ততটা বিরক্তিকর। বাবাকে খুব একটা বাজারে যেতে হতো না। অফিসের পিয়ন নিয়মিত বাজার করতো। কিন্তু যেদিন বাবা বাজারে গেলেন, সেদিনই মা’র কপাল পুড়বে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। বাজারের থলে খুলে মা দেখবেন বাজার থেকে আনা শাক-সবজি ও মাছের বেশ কিছু পচা। দোকানদার খুব সহজেই বেশ কিছু পচা মালামালও বাবার বাজারের থলেতে ঢুকিয়ে দিতো। মা জিজ্ঞাসা করলে বাবা মলিন মুখে উত্তর দিতেন, ‘সবাই যদি ভালোটাই কেনে তবে বেচারা দোকানদার বাকিগুলি নিয়ে করবে কি?’
১৯৭১ সালের কথা। বাবার সরকারি চাকরির সৌজন্যে আমরা তখন কুমিল্লায়। ২৫ মার্চের রাতে পাকবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসে কুমিল্লা শহরতলীতে হানা দিয়েছে। দেশজুড়ে চলছে স্বাধীনতার লড়াই। সপ্তাহখানেক পর একদিন বাবা থমথমে মুখ নিয়ে মাকে জানালেন, তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া আমার ভাই যিনি ছাত্র আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভাইয়াকে সর্বশেষ রামগড় সীমান্তে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরদ্ধে লড়াই করতে দেখা গেছে। শুনে আমাদের হার্টফেল করার দশা। সেই থেকে বাবাকে দেখতাম চেয়ার নিয়ে বারান্দায় চুপচাপ বসে থাকতে আর কানে রেডিও লাগিয়ে খবর শুনতে। আবার কখনো দেখতাম কারফিউ উপেক্ষা করে চোরাপথে বন্ধুদের বাসায় যেতে, ভাইয়ার খোঁজ নিতে। কিন্তু মাসখানেক পরেও ভাইয়ার কোনো খোঁজ না আসায় মা নিশ্চিত হলেন, তাঁর ছেলে শহীদ হয়েছে।
সেই ধারণা বুকে নিয়ে মা প্রায় প্রতিদিনই বিলাপ করে কাঁদতেন আর বাবা মরা ইলিশের মতো নিথর চোখে শুধু মা’র দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কিন্তু একদিন হঠাৎ করে মা’র কাছে গিয়ে অনেকটা ধমকের সুরে বললেন, ‘তোমার কান্না বন্ধ করো। তোমার ছেলে মরেনি, আল্লাহ আমাকে কথা দিয়েছেন তোমার ছেলে তোমার কাছে ফিরে আসবে।’ এর কিছুদিন পর আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে ভাইয়া কুমিল্লায় হাজির হলেন। ভাইয়া এখন গেরিলা যুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার! জানালেন, রামগড় সীমান্ত দিয়েই তিনি ভারতে চলে যান আর দেরাদুন মিলিটারী একাডেমিতে গেরিলা ট্রেনিং নেন। মা’র থেকে পরে জানতে পারি, ভাইয়ার ব্যাপারে এতটা নিশ্চিত হবার কারণ হলো, বাবা ইস্তিখারা করে জানতে পারেন যে ভাইয়া বেঁচে আছে। খোদার ওপর এমন অবিচল আস্থার কথা ভেবে বাবার জন্য এখনো শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে।
স্বাধীনতার পরপরই বাবা অবসর নিলেন সরকারি চাকরি থেকে। রিটায়ারমেন্টের পর মা ও আমাকে সাথে করে হজ্জে যাবেন, এই ছিল বাবার স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ করে অগ্ন্যাশয়ে ক্যান্সার ধরা পড়লে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন বাবা। অপরেশন হলো, কেমো চলল, কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হলো না। বাবার মুখে শেষ বিকেলের ছায়া দেখতে পেলাম। তবে তাঁকে পুরো ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি কখনো। তিনি মাকে বলতেন, একটু ভালো হলেই আমরা হজ্জে যাবো। কিন্তু বাবার সেই স্বপ্ন আর সত্যি হয়নি। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের চার বছরের মাথায় বৈশাখের এক ভর দুপুরে আমাদের ছেড়ে বাবা পাড়ি জমালেন জীবন নদীর পরপারে।
বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন দীর্ঘ ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে। আমি নিজেও এখন বাবা হয়েছি। কখনো সন্তানের জন্য মনটা যখন আকুল হয়, নিরবে কাঁদে, তখন কেন জানি না বাবার ছায়া দেখতে পাই নিজের মধ্যে। বাবাদের কাঁদতে নেই। বাবার ভালোবাসার প্রকাশের ধরণটা ছিল ভিন্নতর। বাবার কাছে ভালোবাসার স্থান ছিল মুখে নয়, বুকের মধ্যে। বাবাদের ভালোবাসা হয়তো এমনই হয়ে থাকে।
হয়তো তাই, বাবা বেঁচে থাকতে বুকের গভীরে আমাদের জন্য সযত্নে তুলে রাখা বাবার আদর ও স্নেহের কথা আমি কখনো জানতে পারিনি। অথচ এখন নিজে বাবা হবার পর কত সহজেই তা বুঝতে পারি। ক’দিন আগে আমার মেয়ে গিটার হাতে নিয়ে বায়না ধরল, আমার সাথে গান করবে। বাবা ও মেয়ের গান খুঁজতে গিয়ে মনের মধ্যে হঠাৎ করে ঢেউ তুলল হেমন্ত আর শ্রাবন্তীর গাওয়া ‘আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয় …’ গানের সুর। আমার কন্যার সাথে গানটির সুরে গলা মিলাতে গিয়ে দেখি বুকের ওয়েবসাইটে দপ্ করে জ্বলে উঠল হাজারো স্মৃতির বাতি, সেই আলোতে দেখতে পেলাম বাবার মুখ। খুব ইচ্ছে হলো নীলিমার মাইক্রোফোনে মুখ রেখে ফিস্ ফিস্ করে বলি, ‘বাবা, তোমাকে ভালোবাসি।’
