একবার দক্ষিণ আফ্রিকার একটি সম্মেলনে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর বক্তৃতা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু একই অনুষ্ঠানে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও বক্তৃতা করবেন জানার পর সম্মেলনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান আর্চবিশপ টুটু। লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ান পত্রিকায় এর কারণ উল্লেখ করে তিনি কলাম লিখেছেন। গণবিধ্বংসী অস্ত্রসম্ভার থাকার মিথ্যা অজুহাতে সমস্ত বিশ্বকে বোকা বানিয়ে ২০০৩ সালে যিনি আমেরিকার সাথে ইরাকে হামলা চালিয়েছেন, সেই টনি ব্লেয়ারের সাথে একই মঞ্চে বসতে রাজি হননি ডেসমন্ড টুটু। শুধু তাই নয়, ইরাকে যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে সে জন্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের বিচারের জোর দাবি জানিয়ে যুক্তরাজ্যের দৈনিক অবজার্ভার পত্রিকায় কলাম লিখেছেন তিনি।
ডেসমন্ড টুটুর এই প্রতিবাদ বিশ্বের মানবতাবাদী জনতার বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত টুটুর কলামে দেয়া পাঠকদের শত শত মন্তব্যে জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ার এই দুই আপরাধীর প্রতি কেবল ঘৃণা ও ধিক্কার প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ডেসমন্ট টুটু যা করেছেন সে জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বেড়ালের গলায় ঘন্টা কে বাঁধবে? ডেসমন্ড টুটু যাদের কথা বলছেন সেই বুশ, টনি ব্লেয়ার এবং ন্যাটো জেনারেলরা নিজেরাই হলেন বিচারপতি এবং জল্লাদ। এদের বিচার করবে কে?
টনি ব্লেয়ারের মিথ্যাচারের কথা বিশ্বের সবাই জানেন। অথচ এজন্য জবাবদিহি না করে উল্টো তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে মানবাধিকারের সবক দিয়ে বেড়াচ্ছেন। নিজের সাফাই গাওয়া জীবনচরিত প্রকাশ করে কিংবা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির পরিচালকের পদ অলংকৃত করে কামাচ্ছেন বেশুমার টাকা। দক্ষিণ আফ্রিকার সেই সম্মেলনে নোবেলজয়ী টুটু বিনামূল্যে বক্তব্য দিতে রাজি হলেও সেলামী হিসাবে টনি ব্লেয়ার হাতিয়ে নিয়েছেন দেড় লক্ষ পাউন্ড !
যুদ্ধকালে নিরীহ মানুষের উপর নির্যাতন ও নৃসংশতার ইতিহাস অনেক পুরোনো। দুঃখজনক হলো, প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সংগঠিত বহু অপরাধের জন্য কাউকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। নব্বই দশকে প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়া ও রুয়ান্ডার গণহত্যা বিশ্ববিবেককে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এইসব অপরাধের বিচার করার দাবি ক্রমে জোরালো হয়। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের রোম সম্মেলনে ১২০টি দেশে ‘হ্যাঁ’ এবং ৭টি দেশের ‘না’ ভোটের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। ‘না’ ভোট প্রদানকারী ৭টি দেশ হল যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইসরায়েল, ইরাক, লিবিয়া, কাতার এবং ইয়েমেন।
২০০২ সালের ১ জুলাই রোম সংবিধি কার্যকর হয়। সংবিধির শর্তানুযায়ী, এই তারিখের পূর্বের কোনো অপরাধের বিচার এ আইনের অধীনে হবে না। আর রোম সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোতেই কেবল এ আইন কার্যকর হবে। এ কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য দালাল আইনের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। এ পর্যন্ত মোট ১২৩টি রাষ্ট্র এই সংবিধিকে অনুমোদন করেছে। ৪২টি দেশ সংবিধিতে স্বাক্ষর করেনি যার মধ্যে ভারতও রয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন ২০০০ সালে রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করলেও সেটা আমেরিকার সিনেট অনুমোদন করেনি।
পরবর্তীতে ২০০২ সালে আমেরিকা রোম সংবিধি মেনে না চলার ঘোষণা দেয়। আমেরিকার যুক্তি হলো, সংবিধান মতে একজন আমেরিকার নাগরিকের বিচার আমেরিকার আইনের আওতায় আমেরিকার মাটিতেই হতে হবে। কিন্তু আসল কথা হলো, আফগানিস্তান, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে আমেরিকার সেনাবাহিনী যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে পারে বলেই আমেরিকা আন্তর্জাতিক আদালত থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।
গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে যে কয়জন হাই প্রোফাইল আসামীর বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে তার মধ্যে কঙ্গোর থমাস লুবাঙ্গা, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের বেম্বা এবং সার্বিয়ার জেনারেল ম্লাদিচ অন্যতম। লুবাঙ্গাকে ১৪ বছর এবং ম্লাচিদকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় নেয় আর পরাশক্তিরগুলোর বাধার কারণে বহু অপরাধীদের কাঠগড়ায় তোলা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দ্বৈতনীতি খুব সহজেই চোখে পড়ে। যেমন অপরাধীদের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের অধিকাংশই হলেন তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক। মনে হয়, বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো কখনোই যুদ্ধাপরাধীর জন্ম দেয় না। এছাড়া জাতিসংঘের বিশেষ ট্রাইবুনাল এবং বিশেষ আদালতও প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়া, লেবানন এবং ইস্ট তিমুরে যুদ্ধাপরাধী খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু খোদ নিউ ইয়র্ক ও লন্ডনে যেসব অপরাধী রয়েছে সেটা তাদের কখনো চোখে পড়েনি। একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে হেগের আদালতে যদি এশিয়া ও আফ্রিকার নেতাদের বিচার হতে পারে তাহলে বুশ এবং ব্লেয়ারের বিচার হবে না কেন?
ইরাকে আমেরিকা ও তার মিত্রশক্তির আগ্রাসনের মূল্য এখনো দিয়ে চলেছেন ইরাক ও আফগানিস্তানের জনগণ। রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার লাখেরও বেশি ইরাকীর মৃত্যু হয়েছে, ৩০ লাখ মানুষ হয়েছে গৃহহারা। আর কতজন ইরাকী আহত হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। আমেরিকান সৈন্য নিহত হয়েছে ৪,৪২৪ জন, বত্রিশ হাজারেরও বেশি হয়েছে হতাহত। শুধু এই হিসাবের ভিত্তিতে পশ্চিমা নেতাদের বিচার হওয়া উচিত ছিল। নিরপরাধ মানুষ হত্যা যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মানদন্ড হতো তাহলে ইতিহাসের অনেক বড় বড় সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে মরতেন কিংবা ফাঁসিতে ঝুলতেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুটো ঘটনার কথাই ধরা যাক। জার্মানের ড্রেসডেন শহরের ঘনসবতিপূর্ণ প্রাণকেন্দ্রে আমেরিকা ও ব্রিটিশ বিমানবাহিনী ৩,৯০০ টন বোমা ফেলে। সামরিক বিচারে গুরুত্বহীন এই শহরে নির্বিচার বোমা বর্ষণের ফলে ২৫,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়। অথচ যার নির্দেশে এই হামলা চালানো হয়, সেই চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম ব্রিটিশ নায়কের মর্যাদা পান। আমেরিকার বিমানবাহিনী জাপানের এমন কোনো শহর নেই যেখানে নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করেনি। হিরোশিমা ও নাগাশাকিতে আনবিক বোমার আঘাতে তৎক্ষনাত আড়াই লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে রেডিয়েশনে দগ্ধ হয়ে এবং লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ধুঁকে ধুঁকে যারা মরেছেন তাদের হিসাব নাই বা দিলাম। ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন ২০ লক্ষ ভিয়েতনামী নাগরিক। এজন্য আমেরিকার কাউকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।
লস এঞ্জেলস্ টাইমসের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ভিয়েতনামে আমেরিকান সেনাবাহিনীর মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেন্টাগনের কাছে থাকার পরও আমেরিকা আপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। হেগের অপরাধ আদালত এখন শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য পশ্চিমা শক্তির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত একটি ক্যাঙ্গারু কোর্টে পরিণত হয়েছে। এখানে শক্তিধরেরাই ন্যায়বিচারের মানদন্ড কি হবে তা নির্ধারণ করেন। যুদ্ধাপরাধী হবার জন্য আপনি কি করলেন তা যথেষ্ট নয়; বরং আপনি কে, আপনার প্রভাব প্রতিপত্তি কতটুকু, আপনি কোন দেশের নাগরিক, আপনার পাসপোর্ট কিংবা চামড়ার রং কি সেটাই হল সবচেয়ে বিবেচ্য বিষয়।
মিথ্যাচারের মাধ্যমে অজুহাত তৈরি করে ইরাক এবং আফগানিস্তানে দু দু’টো আগ্রাসী যুদ্ধের পর যখন আবার দেখি ইরানের উপর আক্রমণের পাঁয়তারা চলছে তখন সত্যিই আতঙ্কিত হই। কিন্তু রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্ট্যাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে ডেসমন্ড টুটুর মতো মানুষেরা যখন কথা বলেন, শক্তিধরদের দিকে আঙ্গুল তোলেন, তখন নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যেও আলোর দেখা পাই। জানি, ডেসমন্ট টুটুর এই প্রতিবাদ হয়তো খুব সহসা শূন্যে মিলিয়ে যাবে। কিন্তু টনি ব্লেয়ারের মিথ্যাচারের কুৎসিত মুখোশটা আবারো খুলে দিয়ে বিশ্বের শান্তিকামী বিশাল মৌন জনগোষ্ঠীর পছন্দের কাজটিই করলেন ডেসমন্ড টুটু।
