দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ আসে এক ভিন্ন ধরনের উচ্ছ্বলতা, মুক্ততা ও আনন্দের আমেজ নিয়ে। ইসলাম আনন্দ উৎসবকে পুরোপুরি বাদ দেয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন নুতন পোশাক পরিধান করে বেড়াতে এবং আনন্দ করতে উৎসাহিত করেছেন। কিন্তু সেই আনন্দে থাকবে পরিশীলতা, থাকবে না আনন্দের নামে অশ্লীলতা কিংবা যথেচ্ছাচারিতা। রাসুলুল্লাহর (সা.) মৃত্যুর পর ইসলাম আরব উপত্যকা পেরিয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিমদের স্থানীয় সামাজিক আচার, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে ঈদ উৎসব দেশে দেশে তাই ভিন্ন আঙ্গিকে উদযাপিত হয়।
জীবিকার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্যের মরুর দেশ কাতারে আসার সুবাদে আরবদের ঈদ পালনের রীতিনীতি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। আরব অঞ্চলে রমজানের শুরু থেকেই উত্তেজনার ভাব লক্ষ্য করা যায় যেটা পুরো মাস ধরে চলে। ফলে আমাদের দেশের মতো ঈদের দিনে আবেগ ও আনন্দের বিস্ফোরণ সচারচর ঘটতে দেখা যায় না। আরবরা ইফতারির পর থেকে সেহরির সময় পর্যন্ত অনেকেই বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় আসা যাওয়া করেন। তারাবিহ নামাজের পর চলে রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা, শিশা পান ও খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি।
প্রতি বছর রোজার মরশুমে অর্থাৎ ঈদের আগেই কাতারীরা সাধারণত বাড়ির ফার্নিচার বদল করে নতুন ফার্নিচার দিয়ে ঘর সাজান। ফলে কাতারের ফার্নিচার মার্কেট ‘সুক হারেজে’র বাংলাদেশী ফার্নিচার ব্যবসায়ীদের জন্য রমজান হচ্ছে রমরমা ব্যবসার মাস।
কাতারে ঈদের নামাজের সময় দেখে ভড়কে গেলাম। নামাজ হয় খুব ভোরে ফজর নামাজের আনুমানিক এক ঘন্টা পর। ফলে আমাদের দেশের মতো দলবদ্ধ হয়ে পরিবার পরিজনসহ ঈদের জামাতে যাবার দৃশ্য এখানে তেমন একটা চোখে পড়ে না। গরম আবহাওয়ার জন্যই হয়তো সূর্যের তাপ বাড়ার আগেই নামাজ শেষ করে ফেলার এই নিয়ম। এখানে প্রায় সব বড় মসজিদ এবং সরকারি স্কুল প্রাঙ্গনে ঈদের জামায়াতের আয়োজন করা হয়। নামাজ শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ পর এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দেখি সবাই টানা ঘুম দিচ্ছেন। বন্ধু ঘুম থেকে উঠে দরোজা খুলে দিয়ে আমাকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, ভোরে নামাজ পড়ে এসে আবার একটু ঘুমিয়ে নেবার পরই শুরু হয় তাদের ঈদের দিন।
যারা পরিবার নিয়ে কাতারে আছেন, দেশের মতো এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়িয়ে জমিয়ে পালন করেন ঈদ উৎসব। তবে ব্যাচেলরদের জন্য তেমন কিছু নেই। নামাজ শেষে বাসায় খাবার দাবার সেরে সবাই দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েন। ভালো লাগার জায়গাগুলো হচ্ছে রাজধানী দোহা শহরের কর্নিশ, দুখান কিংবা ওয়াকরার মতো সমুদ্র সৈকত। কানে হেডফোন লাগিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত ফেলে আসা পরিবার পরিজনদের সাথে ফোনালাপ সেরে তবেই বাড়ি ফেরেন।
দুই দশকেরও বেশি সময় অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে কাটিয়েছি। মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের তুলনায় মুসলিম সংখ্যালঘু দেশে ঈদ ও রমজানের আমেজ পুরোপুরি ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়ায় ঈদের দিনে কোনো সরকারি ছুটি নেই। অনেকেই অফিস থেকে ছুুটি নিয়ে ঈদ পালন করেন। যাদের কাজের তাড়া আছে তারা নামাজ সেরেই আবার অফিসে ফিরে যান। ঈদ যদি সাপ্তাহিক বন্ধের দিন অর্থাৎ শনি কিংবা রবিবারে পড়ে যায় তাহলে সত্যিকার জমে উঠে ঈদের আনন্দ। ঈদের পরের সপ্তাহে বিভিন্ন এলাকায় আয়োজন করা হয় ঈদ মেলা। তবে মুসলিম-অধ্যুষিত মহল্লায় না থাকলে আশপাশের মানুষ ও পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে আনন্দের বারতা নিয়ে এসেছে ঈদ। সেই তুলনায় কাতারে প্রায় সপ্তাহখানেক ঈদের ছুটিকে বিধাতার আশীর্বাদের মতোই মনে হয়েছে।
সিডনি শহরের অন্যতম মুসলিম এলাকা হচ্ছে ল্যাকেম্বা। যা একসময় লেবানিজ মুসলিমদের আখড়া হিসাবে বিখ্যাত ছিল। কিন্তু এই এলাকা এখন বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ানদের দখলে। রমজানের সময় এই এলাকার ফুটপাতে বসে ইফতারের হাট। ল্যাকেম্বার গেলে মনে হয় যেন বাঙালি পাড়াতে ঢুকেছি। সিডনি শহরের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত হয় ল্যাকেম্বার বড় মসজিদে। অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী সিনেটর ও মন্ত্রী ঈদের নামাজে আসেন মুসলিমদের শুভেচ্ছা জানাতে।
ঈদের নামাজ মূলত মসজিদে পড়ানো হলেও ইদানিং এলাকার খেলার মাঠেও নামাজ পড়ার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশি কমিউনিটিও বিভিন্ন এলাকায় তৈরি করেছেন বেশ কিছু মসজিদ। অনেক ক্ষেত্রে খ্রিষ্টানদের গির্জা কিনে সেটাকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এর বাড়তি সুবিধা হচ্ছে ধর্মীয় কার্যক্রম করার জন্য গির্জার অনুমোদন থাকায় মজিদের জন্য নতুন করে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয় না।
তবে স্বদেশের ঈদের সাথে অন্য কিছুর তুলনা হয় না। দেশে ঈদের চাঁদ দেখার মধ্য দিয়েই শুরু হতো ঈদ-আনন্দ যাত্রা। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার মধ্যে ঈদের চাঁদ দেখার জন্য দেখা যেতো টান-টান উত্তেজনা। কোন জায়গায় দাঁড়ালে ঈদের চাঁদ দেখা যেতে পারে সে নিয়ে চলতো গবেষণা। ছোটোবেলায় চাঁদ দেখার জন্য দল-বল নিয়ে আমরা কোনো উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদে কিংবা খোলা মাঠে গিয়ে দাঁড়াতাম। কোনো কারণে চাঁদ দেখতে না পেলে যেমন কষ্টে ভেঙ্গে পড়তাম তেমনি আবার চাঁদ দেখতে পেলে দিকে দিকে উপচে পড়তো আনন্দের ফোয়ারা। সাইরেন, আতশবাজির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠতো চারদিক।
ঈদের আগমনী বার্তা শোনার পর সারারাত ধরে বাড়িতে চলতো বিভিন্ন ধরনের ক্রিয়াকলাপ। যেমন ঘরবাড়ি ধুয়ে মুছে পরিস্কার করা, দর্জির দোকান থেকে আনা নতুন জামা কাপড় ইস্ত্রি করা, মেহেন্দী লাগানো ইত্যাদি। ওদিকে মা-খালারা বিভিন্ন পদের সেমাই ও রান্নার কাজে থাকতেন ব্যাতিব্যস্ত। ইদানিং হাই-রাইজ বিল্ডিংয়ের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছে বলে খালি মাঠ তেমন চোখে পড়ে না। রিয়েল স্টেটের দালান-বাড়িগুলো যেন অসুরের মতো গ্রাস করে নিয়েছে সমস্ত সবুজ মাঠ।
ঈদের দিন ভোরে কে আগে বাথরুম দখল করবে সে নিয়ে বাড়িতে চলতো প্রতিযোগিতা। গোসল সেরে চোখে সুরমা লাগিয়ে নতুন পায়জামা, পাঞ্জাবী ও নাগরা পায়ে দিয়ে ছুটতাম সবাই ঈদগাহের পানে। চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠেই হতো তখন ঈদের সবচেয়ে বড় জামাত। এখন অবশ্য পলো-গ্রাউন্ড কিংবা জামায়াতুল ফালাহ’র মাঠে বড়সড় জামাত হয়। নামাজ শেষে বাড়ি এসে শুরু হতো সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব, সালামী নেবার পালা। বড়দের সালাম করলে সালামী পেতাম।
বাবা ঈদের সালামী দেবার জন্য ব্যাংক থেকে নিয়ে আসতেন কড়কড়ে নতুন নোট। নতুন নোটের সুগন্ধটাই ছিল অন্যরকম। কে কত বেশি সালামী যোগাড় করতে পারে সে নিয়ে চলতো দুরন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বাড়িতে সালাম নেয়া শেষ হলে পাড়াতো চাচা, খালারাও সালামীর দাবি থেকে রেহাই পেতেন না। দিন শেষে পকেটে কত জমা হলো তার উপর ভিত্তি করে ঠিক করতাম সালামীর টাকা নিয়ে কি করা যায়। এমন করে এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়ানোতে সারাটা দিন কেটে গেলেও কখনো ক্লান্ত মনে হতো না। তখন নিয়েছি সালামী আর এখন উল্টো সালামী দিচ্ছি। সালামী নেয়ার চেয়ে দেয়াতে যে কতটা আনন্দ তা এখন বুঝতে পারছি।
হাইস্কুলে পড়ার সময় ঈদের দিনের একটি নিয়ম ছিল বন্ধুদের নিয়ে সিনেমা দেখা। ওই একটি দিন সিনেমা দেখার জন্য বাড়িতে থেকে কোনোরকম ছাড়পত্র লাগতো না। লালদীঘি মাঠের অদূরে ছিল চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সিনোম হল রঙ্গম। এখানে আঁতেল কিংবা এলিট শ্রেণীর লোকজনেরা সিনেমা দেখতে আসতেন না। পাকিস্তান আমলের কথা। ঈদের দিনের এই সিনেমা হলে ঘটা করে মোহাম্মদ আলী কিংবা ফাইটিং স্টার সুধিরের মারদাঙ্গা ছায়াছবি রিলিজ দেয়া হতো। শহরের সহজ সরল আম-জনতা অধীর উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এই ধরনের ছবি উপভোগ করতেন। অন্যান্য সিনেমা হল বাদ দিয়ে নির্ভেজাল আনন্দের জন্য এই সিনেমা হলকেই আমরা বেছে নিতাম। তবে মাঝেমধ্যে আনন্দের সাথে ছাড়পোকার কামড়ও খেতে হতো।
একবার রঙ্গমে গিয়েছি সিনেমা দেখতে। চলছে খুবই জনপ্রিয় ছবি নবাব সিরাজউদ্দৌলা। সিনেমার শেষ পর্ব। নবাব যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন। নবাবরূপী কিংবদন্তি অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের জ্বালাময়ী সংলাপ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল সবাই। চারদিক পিনপতন নিরবতা। সিনেমা শেষ হবার পর বিষন্ন মনে সবাই বের হচ্ছিলেন হল থেকে। হঠাৎ শুনতে পেলাম আমার সামনের সারিরই একজন দর্শকের মন্তব্য। উনি তার বন্ধুকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলছিলেন, ‘পলাশীর মাঠে নবাব সিরাজের পাশে যদি সুধির (জনপ্রিয় ফাইটিং অভিনেতা) থাকতো তাহলে নবাব কখনোই যুদ্ধে পরাজিত হতেন না। সুধীর একাই ইংরেজদের কাবু করে ফেলতো।’ বুঝুন অবস্থা! দর্শকটির কথা শুনে হাসিতে দম আটকে যাচ্ছিল। কিন্তু পাছে বিমর্ষ দর্শকদের রোষানলে পড়ি সেই ভয়ে কোনো রকমে হলের বাইরে এসে আমরা সবাই বাঁধভাঙ্গা হাসিতে ফেটে পড়লাম। রঙ্গমে শোনা এই মন্তব্য এখনো আমার স্মৃতিতে এক চিলতে রৌদ্দুর হয়ে ভালো লাগার দীপ্তি ছড়ায়।
ঈদ আসে ঈদ যায়। প্রবাস জীবনের ভালোমন্দ মিশিয়ে মোটামুটি ভালোই কাটে ঈদের দিনগুলো। তবুও দেশের ফেলে আসা স্মৃতিগুলো মনে পড়লে এলোমেলো হয়ে যাই। মনে হয় কোথাও যেন রয়ে গেছে একটুখানি অপ্রাপ্তি আর শূন্যতা, ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না, সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।’
