সেদিন দেশে থেকে বড় ভাইয়ার চিঠি পেলাম, সাথে কিছু ছবিও। চিঠি পড়া শেষ করে মনে করতে চেষ্টা করলাম, শেষবারের মতো কখন কলম দিয়ে চিঠি লিখেছি। বিস্মিত হলাম! গত এত দশকে কাউকে চিঠি লেখা হয়নি। ভাইয়ার চিঠির উত্তর আর দেয়া হল না, কারণ টেলিফোন করেই চিঠির বিষয়বস্তু নিয়ে আলাপ সেরে নিয়েছি। এই হল যান্ত্রিকতায় ভরা একুশ শতকের জীবন। কম্পিউটার এবং মুঠোফোনের যুগে হাতের লেখা চিঠির প্রয়োজন যেন ফুরিয়ে গেছে চিরতরে। শুনেছি মায়ের চিঠি পেয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাঁতরে পাড়ি দিয়েছিলেন তরঙ্গ-বিক্ষুদ্ধ হুগলী নদী। তবে মায়ের এসএমএস কিংবা ইমেইল পেলে তিনি ঝড়ের মধ্যে সাঁতার কেটে নদী পাড়ি দেয়ার মতো আবেগে উদ্বেলিত হতেন কিনা বলা মুশকিল।
আমার ছেলেবেলার কথাই ধরা যাক। তখন ছিল নিবের কলম (ফাউন্টেন পেন), কালির দোয়াত আর ব্লটিং পেপারের যুগ। ফাউন্টেন পেন হাতে এলে প্রথম কাজ ছিল ধারাল নিবটা একটু ভোতা করে নেয়া যাতে খাতার পাতায় আটকে না যায়। স্কুলজীবনে পরীক্ষার সময় হাত থেকে কলম পড়ে গিয়ে নিব ভোতা হয়ে যাওয়া কিংবা খাতার উপর কালির দোয়াত উল্টে পড়ে যাবার মতো ঘটনাও ঘটেছে ক’বার। ফাউন্টেন পেনের অভিজাত মার্কা হল পার্কার, সেফার, ওয়াটারম্যান ইত্যাদি। মনে পড়ে, ভাইয়ার পুরোনো পার্কার পেন দিয়ে লেখার জন্য কেমন তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতাম।
নিবের কলমের পর আসলো বলপয়েন্ট কলমের যুগ। বলপয়েন্টের কলম বাজারে চালু হলেও শিশুদের পেন্সিল কিংবা ফাউন্টেন পেন দিয়ে হাতের লেখা অনুশীলন করতে উৎসাহিত করা হতো, কারণ বল পয়েন্টে লিখলে নাকি হাতের লেখা খারাপ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। তবে কলেজে পা রাখার পর থেকে বল পয়েন্ট ছাড়া ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করেছি বলে মনে পড়ে না। কোথায় গেল নিবের কলম আর ব্লটিং পেপারের হাসিকান্না মাখা স্মৃতিময় সেই দিনগুলি? ইদানিং কবি সাহিত্যিক ও কলামিস্টরা আর হাতে লেখালেখি করেন না। হাতের লেখা পান্ডুলিপির বড্ড আকাল পড়েছে এখন।
আশি দশকের মাঝামাঝি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ পাড়ি দেই। ওই সময় আমার কম্পিউটার ল্যাবে ছিল কেবল ডেস্ক পিসি, যার হার্ডডিস্কের ধারণ ক্ষমতা ছিল ২৫০ মেগাবাইট! যদিও এখন শুনলে হাসি পাবারই কথা কিন্তু সেই যুগে এটা ছিল বিশাল ব্যাপার। আর এখন ৩২ গিগেরও USB Falsh Drive বাজারে পাওয়া যাচ্ছে!
ইমেইলের নামই শুনিনি তখন। ইমেইল ৭০ দশকের মাঝামাঝি আবিষ্কার হলেও, পুরোদমে অনলাইন সার্ভিসের যাত্রা শুরু হয় ৯০ দশকের শুরুতে। তাই হাতের লেখা চিঠি এবং পোস্টকার্ডই ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। মনে পড়ে, সপ্তাহের একটি বিশেষ দিনে আমরা সবাই দেশ থেকে চিঠি এলো কিনা সেই আশায় অধীর আগ্রহে ডর্মেটরির পোস্টবক্সের সামনে হা করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কোনো চিঠি না পেলে বিষন্ন হয়ে রুমে ফিরতাম। ইদানিং হাতের লেখার যে ধরনের আকাল পড়েছে তাতে মনে হয়, কিছুদিনের মধ্যে হাতে লেখা চিঠি ডাইনোসরের মতো মিউজিয়ামেই জায়গা করে নেবে।
হাতের লেখা যাতে সুন্দর হয় সেজন্য ছাটেবেলায় প্রচুর সাধ্যসাধনা করতে হতো। কারণ লেখা সুন্দর যার পরীক্ষার খাতায় বাড়তি নম্বর তার। কিন্তু আজকের অনলাইনের যুগে হাতের লেখা কেমন হল তাতে কি আসে যায়? ইদানিং পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হচ্ছে মাল্টিপল চয়েসভিত্তিক, তাই হাতে লেখার তেমন সুযোগ নেই; উত্তরপত্রে একটি করে টিক চিহ্ন দিলেই হলো। মনে হচ্ছে কিছুদিন পর পরীক্ষার হলে থাকবে সারি সারি কম্পিউটার টার্মিনাল, যা দেখতে অনেকটা কল সেন্টারের মতোই মনে হবে। কোনো পরীক্ষকের আর প্রয়োজন হবে না। তখন হয়তো নতুন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হবে, যেমন পরীক্ষার্থীরা সিস্টেম ক্রাশ হবার দাবি করে আরো সময় চাইবে কিংবা কোনো দুষ্টু ভাইরাস তার উত্তর ডিলিট করে দিয়েছে এমন দাবি করে পুনঃপরীক্ষারও আবেদন জানাবে।
কম্পিউটারে সুন্দর ও আকর্ষণীয় ফন্ট দিয়ে যতই মেইল লেখা হোক না কেন, হাতের লেখা চিঠির সাথে তার কি তুলনা হয়? চিঠিতে হৃদয়ের আবেগ, ভালোবাসা ও কষ্টের অনুভূতি কলমের কালির হয়ে কাগজের পাতায় যেভাবে ঝরে পড়ে, কম্পিউটারে তা হয় না। ইমেইলে লম্বা চিঠি লেখা যায় বটে তবে হৃদয়ের সব রং উজাড় করে দিয়ে রচনা করা যায় না অনুরাগের মাস্টার পিস। হাতের লেখা চিঠিতে সত্য লুকোনো যায় না। চিঠিতে ইচ্ছে করে কেউ মিথ্যে লিখে কাউকে ঠকাতে চায় না, তাই চিঠির পঙক্তিমালায় বুকের সত্যটাই কথা বলে।
চিঠি রয়েছে হরেক রকমের যেমন বৈষয়িক চিঠি, পারিবারিক চিঠি, বন্ধুর কাছে বন্ধুর লেখা চিঠি, রয়েছে প্রেমের চিঠি ইত্যাদি। নীলখামে ভরা প্রথম প্রেমের চিঠি, লুকিয়ে সেই চিঠি পড়া, গোপনে উত্তর লেখা আর প্রতিউত্তরের জন্য প্রতিক্ষা ইত্যাদি ভালোবাসায় মানবিক মাত্রা যোগ করে যা ডিজিটাল প্রেমের চিঠিতে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই তো ভালোবাসার মানুষের লেখা চিঠি হারিয়ে গেলে এত কষ্টের, পুড়িয়ে ফেলা এত জ্বালার মতো যন্ত্রণার।
দেবদাস ছায়াছবিতে পার্বতীর লেখা চিঠি পোড়ানোর দৃশ্য পাঠকদের মনে থাকার কথা। ইমেইলে লেখা প্রেমপত্র ডিলিট করার পর কি বুকের মধ্যে এমন রক্তক্ষরণ হবে? স্কুলে পড়তে প্রথমবার যখন মাকে ছেড়ে থাকতে হল, মায়ের হাতের লেখা চিঠি সবার অগোচরে বার বার পড়তাম। মায়ের চিঠিখানা কখনো পকেটে নিয়ে ঘুরতাম, মনে হতো যেন মা সাথেই আছেন।
গল্প, উপন্যাস ও চলচ্চিত্রেও এই চিঠি একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। অনেক সময় নায়ক কিংবা নায়িকার লেখা একটি চিঠি নাটকীয়ভাবে ঘুরিয়ে দিতে পারে কাহিনীর মোড়। রবি ঠাকুরের ছোটগল্প ‘রবিবারে’ বিভার কাছে লেখা অভিকের চিঠি এবং শেষের কবিতায় অমিতের কাছে বন্যার লেখা কাব্য-পত্র হচ্ছে গল্পের প্রাণ। অসাধারণ চিঠির কারণেই আমি বারবার পড়েছি রবি ঠাকুরের এই লেখা দুটো।
চলচ্চিত্রেও চিঠির প্রভাব লক্ষণীয়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া আলোচিত হলিউড মুভি হচ্ছে ‘ডিয়ার জন’। জন নামের একজন আমেরিকান সৈনিকের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তার প্রেমিকার মধ্যে চিঠির আদান প্রদানই ছিল এই ছবির প্রধান বিষয়বস্তু যা ছুঁয়েছে র্দশকদের হৃদয়-মন। আর গানে? জগন্ময় মিত্রের গাওয়া চিঠি (১ এবং ২), গানের জগতে কিংবদন্তী হয়ে আছে, ‘যত লিখে যাই তবু না ফুরায়, চিঠিতো হয় না শেষ…’। এছাড়া আমাদের আধুনিক ও লোক সঙ্গীতের অনেক জনপ্রিয় গান এই চিঠি নিয়েই আবর্তিত, চিঠি দিও প্রতিদিন, আমি কেমন করে পত্র লিখিরে বন্ধু…
ফোন করে, ইমেইল কিংবা টেক্সট ম্যাসেজ পঠিয়ে খুব সহজেই চিঠির কাজ সারা যায় বলে কলম দিয়ে চিঠি লেখা এখন আর হয় না বললেই চলে। তরুণ সমাজ মুঠোফোনে টেক্সট করে, অন্তর্জালে চ্যাট কিংবা ব্লগে আড্ডা দিয়ে যেমন সময় কাটায় তেমনি আমরা প্রায় সবাই স্কাইপ ও ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে বন্ধুবান্ধব ও দেশবিদেশে ছড়িয়ে থাকা আপনজনদের সাথে যোগাযোগ রাখি। সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা যদিও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ হয়েছে তেমনি সুখ-দুঃখের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো যান্ত্রিকতার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
ব্রিটেনে ৭ থেকে ১৪ বছরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে নেয়া এক জরিপে দেখা গেছে, এই বয়সের ছেলেমেয়েদের ১০ ভাগ কোনোদিন হাতে চিঠি লেখেনি অথচ এদের ৫০ ভাগই জরিপ নেয়ার সপ্তাহ খানেক আগে কাউকে ইমেইল পাঠিয়েছে। সুপ্রিয় পাঠক, সম্প্রতি ক’খানা চিঠি লিখেছেন তা একবার ভেবে দেখবেন কি?
