একজন প্রবাসীর মন স্বদেশে ফেলে আসা প্রিয়জনদের ভাবনায় উৎকন্ঠিত থাকে সারাক্ষণ। দূর পরবাসে বিশেষ করে গভীর রাতে তাই টেলিফোন এলে এক অজানা আশংকায় বুকটা কেঁপে ওঠে। ভাবি, দুর্ভাগা টলিফোনটা দেশ থেকে না জানি কি দুঃসংবাদ বয়ে আনলো! ২০০০ সালের কথা। দিনটি ছিল শনিবার। আমি তখন সিডনি শহরে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাড়িতে কয়েকজন বন্ধু এসেছে রাতে আড্ডা দিতে। রাত সাড়ে এগারোটা হবে, হঠাৎ করে টেলিফোনটা বেজে উঠলো। শোবার ঘরে গিয়ে ফোনটা আমিই ধরলাম। কয়েক মুহূর্ত নিরবতার পর ওপাশ থেকে কান্নাডোবা কন্ঠে সেজদা বললেন, ‘মা আর আমাদের মাঝে নেই। মাকে এখন তাঁর শেষ ঠিকানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
যে দুঃস্বপ্নের কথা আমি কখনোই ভাবতে চাইনি আজ তা সত্যি হল। দেহটা কেমন যেন অবশ হয়ে এলো। টেলিফোনের রিসিভারটা হাতে নিয়েই মাটিতে বসে পড়লাম। অতিথিদের সবাই ব্যাপারটা দ্রুত জেনে গেল। ব্যথিত মন নিয়ে পরিচিত মানুষগুলো একে একে বাড়ি ফিরে গেল। ঘরের পরিচিত চার দেয়ালের মধ্যে নিজেকে মনে হচ্ছিল একা, ভীষণ একা। এই একাকিত্বের মুখোমুখি দাঁড়াবার মতো শক্তি যেন আমার নেই। মা দূরে থাকলেও যতদিন বেঁচে ছিলেন নিজকে কখনো একা মনে হয়নি।
জানতাম, মায়ের নির্ভেজাল মমতার আশ্রয়ে ঠাঁই আমার হবেই। আজ তাঁর চলে যাওয়াটা তাই কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। এলোমেলো ভাবনায় পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। মৃত্যুর ছ’মাস আগে মায়ের সাথে আমার শেষ দেখা। সেবার বিদায় নেবার সময় হঠাৎ করে মা বললেন, ‘তোর সাথে মনে হয় আর দেখা হবে না।’ মায়ের কথাই যে সত্যি হল। মায়ের জীবন সায়াহ্নের দিনগুলিতে কাছে থাকতে না পারার কষ্টে বুকটা টনটন করছিল। প্রার্থনা করছিলাম, আল্লাহ মাকে যেন জান্নাতবাসী করেন আর আমার মতো দুর্ভাগা কপাল যেন কোনো সন্তানের না হয়।
কক্সবাজারের অদূরে মুহুরীপাড়া গ্রামের একটি রক্ষণশীল পরিবারে আমার মায়ের জন্ম। ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ থাকলেও শিক্ষার প্রতি আমার নানা ছিলেন আপোষহীন। যে কোনো মূল্যে সন্তানদের শিক্ষিত করার জন্য তিনি ছিলেন অবিচল। লেখাপড়া করেননি বলে বড় মামাকে ঘর থেকে বের করে দেন আমার নানা। পাড়ার মাতব্বর, অন্যান্যদের আপত্তি এবং অবর্ণনীয় সমালোচনা উপেক্ষা করে তিনি ছোট মামার সাথে আমার মাকে স্কুলে পাঠাতেন। ওই সময় মা ছিলেন স্কুলের একমাত্র ছাত্রী। মামার কাছে শুনেছি, স্কুলে যাবার পথে মাকে বিভিন্ন রকমের টিটকারীর সম্মুখীন হতে হতো। ওই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীর পর কোনো ক্লাস না থাকায় মায়ের আর পড়া হয়নি।
বাবা, নয় ভাই ও দুই বোনসহ মায়ের ছিল তেরোজনের বিশাল সংসার। আমাদের লেখাপড়া থেকে শুরু করে শাসন, বাজার ও সংসারের যাবতীয় দিকগুলো মাকেই সামলাতে হতো। শুধু তাই নয়, এগারোজন সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভুলোমনা বাবাকেও তাঁর দেখে রাখতে হতো। শিক্ষার প্রতি মায়ের আপোষহীনতার কারণেই আমরা সবাই লেখাপড়া করতে পেরেছি। আমার মা কোনো জমিদারের আদরের দুলালী ছিলেন না কিংবা তাঁর হাতে ছিল না কোনো আলাদিনের চেরাগ। আমাদের মানুষ করতে মা সারাটা জীবন সংগ্রামই করে গেছেন। বাবার টানাপোড়েনের মতো বড় সংসার তিনি কিভাবে একহাতে চালিয়েছেন সে কথা ভাবলে খেই হারিয়ে ফেলি। আমরা সত্যিই ভাগ্যবান যে এমন একজন মহিয়সী মা পেয়েছি। যতদূর জানি, বাবার সংসারে মা যখন পা রাখেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। সংসারের কিই বা বুঝতো ১৪ বছরের একজন উচ্ছ্বল কিশোরী? অথচ কৈশরের সেই সময় থেকে মা আমাদের শুধু দিয়েই গেছেন, বিনিময়ে চাননি কিছু।
মা ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী। সংসারের হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনীর পরও সময় বের করে শাক-সবজির বাগান করতেন। ঘরের উঠোনে ছিল ছোট্ট একটি মুরগীর খামার, সাথে ছিল দুটি রাজহাঁস। সেলাই কাজেরও তিনি ছিলেন দক্ষ শিল্পী। রংবেরংয়ের কাঁথা ও শীতের সোয়েটারও বুনতেন। মা উর্দু ও ফারসি জানতেন। ‘বেহেশতি জেওর’ উর্দু কিতাব থেকে ধর্মীয় অনুশাসন ও ঘটনাবলী আমাদের পড়ে শোনাতেন। ধর্মীয় পরিবেশে বড় করলেও শিল্প ও সাহিত্যচর্চায় মা আমাদের বরাবর উৎসাহ দিতেন।
বাড়ির সবচেয়ে ছোট সন্তান হিসাবে আমি মায়ের কাছে একটু বাড়তি আদর ও ছাড় পেতাম। মা চাইতেন আমি যেন তাঁর কাছেই থাকি। কিন্তু তা হয়নি। মায়ের স্নেহের দেয়াল ডিঙিয়ে আমিই চলে গেলাম সেই সুদূর অস্ট্রেলিয়ায়। মনে পড়ে, ছোটবেলায় এটা ওটা নিয়ে মাকে যখন খুবই বিরক্ত করতাম তখন মা বলতেন, ‘এখন মা ছাড়া তোদের চলে না, কিন্তু যখন বড় হবি তখন তোরা সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি। নিজেদের সংসার নিয়েই থাকবি সদা ব্যস্ত।’ আমি তখন মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, ‘দেখো মা, আমি কিন্তু তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।’ আমি কথা রাখিনি।
পড়াশোনার জন্য সেই স্কুলজীবন থেকেই মাকে ছেড়ে চাটগাঁ গিয়েছিলাম, তারপর প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে তেপান্তরে। মায়ের বুক খালি করে সন্তানদের দূরে চলে যাওয়াটা যে কত কষ্টের, সেটা নিজের সন্তানের কথা ভেবে এখন কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারি। অথচ একে একে এতগুলো সন্তানের চলে যাওয়াটা মা কিভাবে সয়েছিলেন জানি না। মাকে ছেড়ে চলে গেলেও সন্তানের জন্য মায়ের মন থাকে সদা ব্যাকুল। বিয়ের পর আমার নতুন স্ত্রীকে একটি কথাই মা বলেছিলেন, ‘আমার ছেলেটোকে দেখে রেখো। আমার কাছে ছিল না বলে পছন্দের অনেক কিছুই ওকে খাওয়াতে পারিনি।’ আমার স্ত্রীকে মা দেশীয় পিঠা ও আমার পছন্দের খাবারের রান্না শিখিয়ে দিয়েছিলেন। হায়রে মায়ের মন !
মা ছিলেন স্বাবলম্বী এবং অনেক বাস্তববাদী। একাকিত্বের ব্যাপারে কখনো অনুযোগ করতেন না। মা কখনো নিজে কিছু যেচে চাইতেন না। মাকে বলতে শুনেছি, ‘মা কি চায় তা সন্তানদের বুঝে নিতে হবে। হাত পেতে আমি কিছু নিতে রাজি নই।’ মা কারো ওপর নির্ভর না করে নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করতেন। তিনি সন্তানদের ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাননি, তাই একাকিত্ব বরণ করেও বাবার ভিটেতে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছেন।
দৃঢ় ব্যক্তিত্বের আধিকারিণী হলেও মায়ের ভেতরটা ছিল তুলোর মতো নরম। অন্যান্য সবার মতো একটু সেবা ও আদর-যত্নের জন্য মাকেও কখনো ব্যাকুল হতে দেখেছি। একবার রিক্সায় চড়ে বাজারে যাবার সময় জীপের ধাক্কায় রাস্তায় পড়ে গিয়ে মায়ের পাজরের তিনটি হাঁড় ভেঙ্গে যায়। সেবার শয্যাশায়ী মায়ের পাশে থেকে সেবা করার অল্প সুযোগ আমার হয়েছিল। যে সাহসী মা আমার আত্মবিশ্বাসে আবিচল থেকে এতবড় সংসার চালিয়েছেন, সেই মাকে অসহায় শিশুর মতো আমাকে আঁকড়ে ধরে ঘুমুতো দেখেছি।
ইদানিং মা দিবস এলে আমার মনের গহীনে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। মা বেঁচে থাকতে নিঃশব্দে পার হয়ে গেছে কত মা দিবস, মাকে টেলিফোন করা হয়নি। প্রবাস থেকে দেশে গিয়ে ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে কখনো চমকে দিতে পারিনি মাকে। কখনো জিজ্ঞাসা করা হয়নি, মা তুমি কেমন আছো? শূন্য ঘরে কেমন কাটছে তোমার দিন? তোমার কি কিছু খেতে ইচ্ছে করে? কিংবা ইচ্ছে করে দূরে কোথাও ঘুরে আসতে? কিন্তু আমার সময় কোথায় সময় নষ্ট করবার? ক্যারিয়ার ও প্রতিষ্ঠার নেশায় বুদ হয়ে ক্রুজ মিসাইলের মতো আমি ছুটে গেছি এক শহর থেকে অন্য শহরে। পুরোনো মডেলের সিডান ছুড়ে ফেলে নতুন ফোর-হুইল নিয়ে চষে বেড়িয়েছি সিডনির রাজপথ। অথচ আমার মা, তীব্র নিঃসঙ্গতা বুকে নিয়ে তখন সন্তানের অপেক্ষায় গুনেছেন কষ্টের প্রহর।
সংসারের কর্তা হিসেবে আমার সংসারের সবার আশ্রয়স্থল হলাম আমি। কিন্তু কখনো এমন সময় আসে যখন অবসাদ আর ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়ি, মনে হয় ব্যস্ত জীবনের ভার যেন আর বইতে পারছি না। তখন ছেলেবেলাকার মতো মায়ের বুকের উমে সিক্ত হতে ভীষণ ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে, মায়ের কোলে মাথা রেখে চোখ বুজে সবকিছু ভুলে থাকতে। ইচ্ছে করে, তপ্ত-কপালে মায়ের স্নেহমাখা হাতের একটুখানি পরশ পেতে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে পাই, বুঝতে পারি এ যে আর হবার নয়। ‘মায়ের চেয়ে বড় কিছু নাই যে দুনিয়ায়, মায়ের নাম মুখে নিলে শান্তি পাওয়া যায়…।’ গানটির কথার সাথে ভিন্নমত পোষণ করবে এমন সাধ্য আছে কার? মায়ের জায়গাটা আসলে এমন, সে শূন্যতা কখনো পূরণ হবার নয়।
