আবু হামজা, একজন আরব মুসলিম। আশির দশকে ডাক্তারী পড়তে যায় বসনিয়ায়। এরই মধ্যে শুরু হয় বসনিয়ার লড়াই। একদিন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসে সার্ব বাহিনীর হাতে ধর্ষিতা একজন মা ও তার ১৩ বছরের কন্যা। ঘাতকের দল মেয়েটির বাবাকে হত্যা করার পর তার চোখের সামনে মাকে ধর্ষণ করে এবং এরপর তাকেও ছাড়েনি। মেয়েটি শোকে বোবা হয়ে গেছে। এই ঘটনা আবু হামজার বিবেকের উঠোনে ঝড় তোলে। যারা এমন কাজ করতে পারে তারা মানুষ হতেই পারে না। তাই সেই পশুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আবু হামজা ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে তীব্র তাগাদা অনুভব করতে থাকে। অবশেষে বসনিয়ানদের সাথে কাঁধে কাঁধ রেখে সার্ব বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ে আবু হামজা। লড়াই শেষ হবার পর তিন সন্তানের জননী বসনিয়ার এক বিধবাকে বিয়ে করে আবু হামজা সারিয়েভোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
বসনিয়া সরকার যুদ্ধে অবদান রাখার জন্য তাকে বসনিয়ার নাগরিকত্ব দান করেছে। কিন্তু ৯/১১ সবকিছু বদলে দিয়েছে। আমেরিকার চাপে পড়ে বসনিয়ান সরকার আবু হামজার নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু আবু হামজা তাতে বিচলিত নয়। সে বলল, ‘আমি একজন মানুষ এবং মুসলিম। আমি যুদ্ধ করেছি ন্যায়ের জন্য, কোনো পার্থিব পুরস্কারের লোভে নয়। আমার কাজের পুরস্কার দেবেন আল্লাহ।’ আল-জাজিরা টেলিভিশনে বসনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে আবু হামজার কাহিনী আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। যে ধর্ম ও বিশ্বাস মানুষকে নিজের জীবন বাজী রেখে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে শেখায়, যৌবনের চাওয়া পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে একজন টগবগে যুবককে তিন সন্তানের জননী বিয়ে করতে উদ্বুদ্ধ করে, আজ সেই ধর্মের বিশ্ব¦াসীদের কেউ কেউ কেন সন্ত্রাসের পথে যাচ্ছে?
মুসলিম জনতার একটি ক্ষুদ্র অংশের সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়ার যেসব প্রধান কারণ আমরা উল্লেখ করে থাকি সেগুলি হলো, মুসলিম অধ্যুষিত দেশে পশ্চিমা শক্তিবর্গের আগ্রাসন এবং যার ফলশ্রুতিতে লাখো নিরপরাধ জনতার মৃত্যু, বৃহৎশক্তি কতৃক দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনা ইত্যাদি। অথচ বর্তমান অবস্থার জন্য মুসলিমরাও যে অনেকাংশে দায়ী সে নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি বলে মনে হয় না। দেখা যায়, অধিকাংশ মুসিলমই নিজেদের সমস্যার জন্য ঢালাওভাবে তৃতীয় কোনো শক্তিকে দায়ী করছেন। মুসলিমদের চিন্তা-ভাবনায় পশ্চিমাশক্তি কিংবা ইহুদিদের কন্সপিরেসী থিউরি খুব বেশি কাজ করে। পশ্চিমাশক্তি ও তাদের দোসররা যদি মুসলিমদের শত্রু হয় তাহলে ওদের আনুকুল্য মুসলিমরা আশা করে কিভাবে? মনে রাখতে হবে, অন্যের দিকে একটি আঙ্গুল যখন তোলা হয় তখন হাতের তিনটি আঙ্গুল নিজের দিকেই তাক করা থাকে।
অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, মুসলিমদের নিয়ে কোনো বিতর্কের সূত্রপাত হলে মুসলিম কমিউনিটির নেতারা উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুজে অপেক্ষা করতে থাকেন, কখন বিতর্কের অবসান হবে। নিজের কমিউনিটির মধ্যে যে সমস্যা রয়েছে সেটা তারা কখনো স্বীকার করেন না কিংবা সমস্যার মোকাবেলা করতে চান না। ইসলাম ও মুসলিমদের উত্থান থামানোর লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদী মোর্চার যে কালো নকশা আছে, সে ব্যাপারে আমার কোনো দ্বিমত নেই। তবে আগ্রাসন যে সব সময় বাইরে থেকে আসছে তাও নয়। একটু মনোযোগ দিয়ে চলমান বিশ্বের ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করলে দেখা যায়, মুুসলিমদের আসল শত্রু কিন্তু মুসলিমরা নিজেই। প্রচলিত ভাষায় যাকে বলা যায় ঘরের শত্রু বিভীষণ।
২০০৮-২০০৯ সালে গাজ্জার যুদ্ধে প্রায় ১৪০০ প্যালেস্টাইনী প্রাণ হারান। জানা যায়, গাজ্জায় ইসরাইলী হামলার নেপথ্যে প্যালেস্টাইনী প্রেসিডেন্ট আব্বাসের আশীর্বাদ ছিল। হামাসের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যতই থাকুক না কেন, দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে নিজের জনগণকে যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিয়ে আব্বাসের হাত কি রক্তে রাঙা হয়নি? মুসলিমরা মুসলিমদের সর্বনাশ করতে কতটা সিদ্ধহস্ত তার কিছু নমুনা উঠে এসেছে উইকিলিক্সের নথি থেকে। সৌদি আরব, আমিরাত ও বাহরাইনের শাসকরা ইরানের উপর হামলা চালাতে বারবার তাগাদা দিয়েছে আমেরিকাকে। জর্জ বুশকে ইরাক আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করেছে এই আরব মুসলিম শাসকরাই। আজ যদি প্রতিবেশী ইরানে যুদ্ধ শুরু হয়, তার আঁচে আমেরিকা নয়, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলিই আগে পুড়বে। ইরাক, ইরান ও আফগানিস্তানে যুদ্ধের ফলে যে লক্ষ লক্ষ বেসামরিক জনগণের মৃত্যু হচ্ছে আর সন্ত্রাসের কালো থাবা ধীরে ধীরে গ্র্রাস করছে মুসলিম সমাজকে, সে জন্য নিজেদের দায়ভার কি মুসলিম সমাজ এড়াতে পারে?
মুসলিম অধ্যুষিত দেশে আজ কি হচ্ছে চারিদিক? ধর্মরক্ষার নামে সন্ত্রাস ও বোমবাজীতে হাট-বাজার, ধর্মীয় সমাবেশ ও মসজিদে হত্যা করা হচ্ছে হাজারো নিরীহ মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশু। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, এমনকি সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ও রক্ষা পাচ্ছে না এই হত্যাযজ্ঞ থেকে। দখলদার বাহিনীর সাথে লড়াই কিংবা ধর্মযুদ্ধের সাথে এর সম্পর্ক কোথায়? দুঃখজনক হলো, যারা এইসব তান্ডব চালাচ্ছেন তারা নিজেদের ইসলামের সত্যিকার অনুসারী বলেই দাবি করছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘একজন নিরপরাধ মানুষ খুন করা মানে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমতুল্য (৫ : ৩২)। আল্লাহ তায়ালা মুসলিম হয়ে অন্য মুসলিমকে হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন (৪ : ৯২-৯৩)।
আমরা নিরপরাধ মুসলিমদের হত্যার জন্য আমেরিকা ও তার সহযোগীদের কঠোর সমালোচনা করি, কিন্তু মুসলিমরা যখন নিরপরাধ মানুষ ও অন্য মুসলিমদের হত্যা করে তখন তাদের সমালোচনা করতে আমরা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ি। মুসলিমদের অপকর্ম ও মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে আমরা ততটা সোচ্চার হই না। গ্যাস দিয়ে সাদ্দাম যখন নিজের মুসলিম নাগরিকদের হত্যা করে, কুয়েত ও ইরানে আগ্রাসী হামলা চালায় তখন আমরা বলি এর পেছনে পশ্চিমা শক্তির ইন্ধন আছে। কিন্তু উপনিবেশিক শক্তির প্ররোচনায় প্রলুব্ধ হয়ে যারা অপকর্ম করছে তারাও একই দোষে দোষী নয় কি?
সন্ত্রাসের কথা উঠলেই আমরা বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে তৃপ্তি পাই। যেমন, আত্মঘাতী হামলা প্রথম শুরু করে শ্রীলংকার তামিল টাইগার, মুসলিম দ¦ারা সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনা অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠিদের চেয়ে কম, খ্রিষ্টানরা আরও বেশি হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে (যেমন হিটলার, বিশ্বযুদ্ধ) ইত্যাদি। এসবই সত্য, কিন্তু ওরা করছে বলে মুসলিমদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লংঘন কিংবা জঙ্গী কার্যকলাপ কোনোভাবেই বৈধতা পায় না। এ ধরনের মানসিকতা আত্মপ্রবঞ্চনারই শামিল। সংখ্যা যাই হোক না কেন, নিরপরাধ মানুষ হত্যা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না, সেটাই হচ্ছে মূল কথা (কুরআন ৬ : ১৫১, ১৭ : ৩৩)। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ড্রোনের আঘাতে ন্যাটো বাহিনীর নিরীহ মানুষ হত্যা এবং মুসলিম কতৃক মসজিদে প্রার্থনারত মুসল্লিদের হত্যার মধ্যে কোনো পার্থক্য আমি দেখি না।
মুসলিম সমাজ আজ বিভিন্ন মত ও উপগোষ্ঠিতে বিভক্ত। কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যাতে সনাতন ইসলামের উদারতা ও সহিষ্ণুতার দেখা মেলে না। নিজের ভাবাদর্শগত ও রাজনৈতিক পার্থক্য মেটাবার জন্য ফতোয়া ও পাল্টা ফতোয়া দেয়া, কোনটা নিষিদ্ধ কোনটা হালাল, কে কাফের কে মুরতাদ, এইসব বিতর্কেই আমাদের ধর্মীয় নেতাদের শক্তি প্রায় নিঃশেষ। পরিবেশ, খাদ্য সমস্যা, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, শিল্প, দর্শন নিয়ে ভাববার সময় কোথায়? আমাদের উপমহাদেশেরই সুন্নী মুসলিমের দু’টি উপগোষ্ঠি বেরেলভী ও দেওবন্দীপন্থীরা একে অন্যকে মুসলিম বলেই মনে করে না। ভারতের উত্তরপ্রদেশে এক দেওবন্দী ইমামের পেছনে জানাজার নামাজ পড়ার ফলে প্রায় ২০০ বেরেলভিপন্থী মুসল্লী কাফের হয়ে গেছে বলে ফতোয়া দেন তাদের ইমাম। ফলে কলেমা পড়ে তাদের আবার মুসলিম হতে হয়। শুধু তাই নয়, মৌলবী ডেকে তাদের স্ত্রীর সাথে পুনরায় বিয়ে পড়াতে হয়, এর মধ্যে ৮০ বছরের বুড়ো বুড়ীরাও রয়েছেন। (সূত্র: দি টাইমস অব ইন্ডয়া, সেপ্টেম্বের ৬, ২০০৬)
২০০৫ সালে জার্মানিতে ফুটবল বিশ্ব¦কাপের ঠিক আগে সৌদি আরবের আল-ওয়াতান পত্রিকায় নামবিহীন একজন শেখের ফুটবল সংক্রান্ত একটি ফতোয়া পড়ার পর সৌদি আরবের একটি বিখ্যাত ফুটবল ক্লাবের তিনজন খেলোয়াড় ফুটবল খেলা ইসলামে নিষিদ্ধ ভেবে ক্লাব ছেড়ে আল-কায়দায় যোগ দেয়। ওদেরই একজন কিছুদিন পর ইরাকে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানোর সময় ধরা পড়ে। ওই শেখের ফতোয়ামতে, কাফেরদের তৈরি নিয়মে ও পরিভাষা ব্যবহার করে ফুটবল খেলা সিদ্ধ হবে না। যেমন চারটি দাগের মধ্যে খেলা, কর্নার কিক্, গোল, ফাউল পরিভাষা ব্যবহার করা ইত্যাদি। সৌদি সরকারের মুফতিরা এই ফতোয়া প্রত্যাখ্যান করে যারা ফতোয়া প্রকাশ করেছেন তাদের শারিয়া কোর্টে বিচারের সুপারিশ করেন। যদিও এই ফতোয়া আরব জনসংখ্যার উপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি, কিন্তু নামবিহীন একজন মুফতির ফতোয়া কিভাবে একজন পেশাদার খেলোয়াড়কে রাতারাতি আত্মঘাতী বোমাবাজে পরিণত করতে পারে সেটা আমাদের ভেবে দেখা দরকার। তাই ঘটনা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, উড়িয়ে দেয়া যায় না।
ফতোয়াটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ফুটবলকে জিহাদের সাথে সম্পৃক্ত করা। ফতোয়ায় বলা হয়, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করার উদ্দেশ্য নিয়েই ফুটবল খেলতে হবে। খেলার সময় বল নিয়ে দৌড়, আক্রমণ, পিছু হটা ইত্যাদি জিহাদের মাঠের কার্যকর ট্রেনিং বলেই গণ্য করতে হবে।’ মুসলিমদের ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টানদের অনুকরণ করা উচিত নয় বলে বর্ণিত রাসুলের (সা.) হাদিসটির ওপর ভিত্তি করেই ফতোয়াটি দেয়া হয়েছে বলে পত্রিকায় দাবি করা হয়। কিন্তু হাদিসের অর্থকে কিভাবে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা হলো উপরের ঘটনাটি হচ্ছে তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
উগ্রপন্থীরা সংখ্যায় গুটিকতক হলেও এখন আর ওদের উপেক্ষা করা যায় না। কারণ ওদের জন্যই ইসলাম ও ১.৬ বিলিয়ন মুসলিম বিশ্বের কাছে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হচ্ছে। নিজের কায়েমী স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য ইসলামের বাণীর বাঁকা ব্যাখ্যা করে ধর্মরক্ষার নামে যারা ইসলামের ভাবমূর্তিকে হাইজ্যাক করছে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আমাদের দ্বিধা; শুধু উগ্রপন্থী নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে।
অন্যের ঘাড়ে দোষ না চাপিয়ে আবু হামজার মতো হাজারো ধর্মভীরু ও সচেতন মুসলিমদের চেতনা যাতে সঠিকপথে প্রবাহিত হয়, সেজন্য ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা ও উগ্রতার বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে বিশেষ করে ইসলামি পন্ডিতদের পরিষ্কার অবস্থান নিতে হবে। মসজিদের খুতবাতে যদি কাজ না হয় তাহলে রেডিও, টিভি ও ইন্টারনেট মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে কুরআন ও হাদিসের আলোকে উগ্রপন্থীদের যুক্তি খন্ডন করতে হবে। এখন সময় এসেছে, সবার আগে মুসলমানদের নিজের ঘরের শত্রুর সাথে বোঝাপড়া করার। আধুনিক ও সভ্য জাতি হিসাবে বর্তমান বিশ্বে এগিয়ে যেতে হলে এছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
