জাতিসংঘ মানবাধিকারের ঘোষণায় (Universal Declaration of Human Rights) বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (Freedom of Speech or Expression) নিশ্চিত করা হয়েছে; যা বিশ্বের অধিকাংশ দেশ কর্তৃক স্বীকৃত। তবে এই অধিকার প্রয়োগের সময় দায়িত্ববোধ বা নৈতিকতাবোধ বিসর্জন না দেয়ার কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া জাতিগত পরিচয়, ধর্ম, লিঙ্গ, ইত্যাদি নিয়ে কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী যাতে ঘৃণার শিকার না হয় সেজন্য বিভিন্ন দেশে রয়েছে Hate Speech Law. অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের সংবিধানে বাক-স্বাধীনতার অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বাক-স্বাধীনতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো খুবই সোচ্চার। আমেরিকানরা তাদের সংবিধানের ‘প্রথম সংশোধনী’ (First Amendment) নিয়ে রীতিমতো অহংকার করে থাকে। নিজের মতামত ব্যক্ত করার যে উচ্চ মানদন্ড পশ্চিমা দেশে আছে তা অস্বীকার করলে সত্যের অপলাপ করা হবে। পশ্চিমা দেশগুলোতে যারা দীর্ঘদিন অভিবাসী হয়ে বসবাস করছেন তাদের অনেকেই এর সুফল পেয়েছেন। তাই ওইসব দেশে যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভয়ানক বিচ্যুতি এবং দ্বিমুখী আচরণ দেখি তখন হতাশ হই। এবার কয়েকটি ঘটনার দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক।
জুন ২০১১: প্যারিসের লা পার্ল ক্যাফেতে এক ইহুদি দম্পতিকে কটুক্তি করার জন্য ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মাননা (Legion of Honour) প্রাপ্ত প্রখ্যাত বৃটিশ ফ্যাশন ডিজাইনার জন গালিয়ানোকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এজন্য গালিয়ানোকে দেয়া লিজিয়ন অফ অনার সম্মাননাও প্রত্যাহার করে নেন ফরাসী প্রেসিডেন্ট। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তাকে বাঁচাতে পারেনি।
এপ্রিল ২০১২: মার্কিন নাগরিক তারেক মেহান্না আফগানিস্তান ও ইরাকে হাজারো মুসলিম হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন, মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির সমালোচনা করেছিলেন। আমেরিকার প্রথম সংশোধনীতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু আদালত আল-কায়দাকে সাহায্য করার অজুহাতে দোষী সাব্যস্ত করে তারেককে ১৭.৫ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে। স্যাম বেসিলের চলচ্চিত্রটি বিশ্বজুড়ে আমেরিকার নিরাপত্তা যেভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে, সেই তুলনায় তারেকের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা মার্কিন নিরাপত্তাকে কতটা হুমকির মুখে ফেলেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সেপ্টেম্বর ২০১২: ব্রিটেনের রাজবধূ কেইটের সমুদ্র সৈকতে বিশ্রামরত নগ্ন ছবি ছাপিয়েছে ফ্রান্সের একটি পত্রিকা। এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে ফ্রান্সের বিচার বিভাগ। নগ্ন ছবি প্রকাশের দায়ে ক্লোজার নামক পত্রিকার প্রচার ও প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছে। বাক-স্বাধীনতাকে বুটের নিচে দলে দিয়ে ফটোগ্রাফারকে খুঁজতে পত্রিকা অফিসে হানা দিয়েছে ফ্রান্স পুলিশ।
সেপ্টেম্বর ২৪ ২০১২: চলচ্চিত্র এবং কার্টুনের পর এবার এসেছে মুসলিম বিদ্বেষী বিজ্ঞাপনী পোস্টার। পামেলা গেল্লার নামের একজন ব্লগার (Atlasshrugs2000.typepad.com) নিউইয়র্কের পাতাল রেলের ১০টি স্টেশনে চরম মুসলিমবিদ্বেষী একটি পোস্টার দিয়েছে। পোস্টারে লেখা রয়েছে: In any war between the civilized man and the savage, support the civilized man. Support Israel. Defeat Jihad. নিউইয়র্ক ট্রান্সপোর্ট অথরিটি এই বিজ্ঞাপনটি টাঙ্গানোর অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালেও আমেরিকার সংবিধানে বর্ণিত বাক-স্বধীনতার আওতায় এই বিজ্ঞাপন দেয়া যেতে পারে বলে রায় দিয়েছে মার্কিন আদালত।
হল্যান্ডের চরম ডানপন্থী রাজনীতিক এবং সাংসদ গার্ট ওয়াইল্ডার্স নির্বাচনী প্রচারণা ও বক্তৃতায় মুসলিম অভিবাসন বন্ধ করা, কুরআন পড়া এবং মসজিদ নির্মাণ নিষিদ্ধ করে দেয়ার আহ্বান জানান। মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে তাকে আদালতের মুখোমুখি করা হলেও বেকসুর খালাস পেয়ে যান তিনি। বিচারকের রায় অনুযায়ী গার্টের মন্তব্য মুসলিমদের কাছে আপমানজনক এবং কুরুচিপূর্ণ বলে মনে হলেও তা বিধিসম্মত রাজনৈতিক বিতর্কের সীমানা অতিক্রম করেনি।
বাক-স্বাধীনতার মূলমন্ত্র বলে খ্যাত যে উক্তিটি মুক্তচিন্তার প্রবক্তাদের মুখে প্রায়ই শোনা যায় তা হলো, I disapprove of what you say, but I will defend to the death your right to say it. কিন্তু দেখা গেছে, ইসরাইলের সমালোচনার প্রশ্ন উঠলেই বাক-স্বাধীনতার বিশুদ্ধ মন্ত্রটি গোল পাকিয়ে যায়। বিশ্বের প্রতিটি জাতি, গোষ্ঠীর প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। তবে প্রশ্ন জাগে, বাক-স্বাধীনতার নামে একটি সম্প্রদায় কেন সবাইকে ডিঙ্গিয়ে বিশেষ আনুকূল্য পাবে?
অক্টোবর ২ ২০০৮: অস্ট্রেলিয়ান ঐতিহাসিক ড. ফ্রেডরিক টোবেনকে ইউরোপে ইহুদি গণহত্যা বা হলোকস্ট নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার অপরাধে লন্ডনে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি দুই দফায় ১০ মাস জেল খাটেন। অস্ট্রেলিয়াসহ প্রায় সব পশ্চিমা দেশে জার্মান নাৎসীদের হাতে কথিত ইহুদি নিধন অস্বীকার বা সন্দেহ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। তবে মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য যতই কুরুচিপূর্ণ হোক না কেন, তা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না।
জুন ২০১০: আমেরিকার অন্যতম খ্যাতনামা জার্নালিস্ট এবং লেখক হেলেন থমাস একটি সাক্ষাৎকারে ইসরাইলকে অধিকৃত প্যালেস্টাইন থেকে সরে যাবার কথা বলার এক মাসের মাথায় চাকরি হারান। তার দীর্ঘ ৫৭ বছরের সাংবাদিক জীবনকে কলঙ্কিত করা হয়। শুধু তাই নয়, ওয়াইন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় তার নামে প্রচলিত বিশেষ ‘মিডিয়া এওয়ার্ড’ বাতিল করে দেয়। এই প্রসঙ্গে হেলেন দুঃখ করে বলেন, The leaders of Wayne State University have made a mockery of the First Amendment and disgraced their understanding of its inherent freedom of speech and the press.
আমেরিকায় যে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে তার সাথে মার্কিন সরকারের কোনো যোগাযোগ নেই, সে কথা বার বার বলা হচ্ছে সর্বোচ্চ মহল থেকে। এমন কি পাকিস্তানের মিডিয়াতেও এ নিয়ে হাজার ডলার খরচ করে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে মার্কিন সরকার। কিন্তু গুয়ান্তানামোর কারাগারে ধারাবাহিকভাবে মার্কিন সেনাবাহিনী কর্তৃক কুরআন অবমাননা করার সুনির্দিষ্ট তথ্য পেন্টাগনের কাছে থাকার পরও কমান্ডার-ইন-চিফ হিসাবে প্রেসিডেন্ট ওবামা কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন কেন জানি না। যতদূর জানি, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা যারা ভঙ্গ করেন তাদের শাস্তি দেয়ার সময় বাক-স্বাধীনতা বাধা হয়ে দাঁড়াবার কথা নয়। দুর্ভাগ্যবশত ৯/১১-এর পর, ‘প্যাট্রিওটিক এক্টের’ মাধ্যমে আমেরিকায় বাক-স্বাধীনতার গলা চেপে ধরা হয়েছে। ৯/১১ কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করলে তা যতই যুক্তিযুক্ত কিংবা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পন্ন হোক না কেন, মার্কিন মিডিয়া ও সরকার তাকে চক্রান্তকারী ও দেশের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করতে বিলম্ব করছে না, যা সত্যি আশংকাজনক।
মুসলিম কিংবা ইসলামের কুৎসা রটনা করলে বাক-স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয় না এমন একটা ডকট্রিন আজকের বিশ্বে চালু হয়ে গেছে। যার ফলে দেখা যাচ্ছে, ডেনিশ আর্টিস্ট কুর্ট ওয়েস্টারগার্ড, স্যাম ব্যাসিলের মতো গোঁড়া ধর্মান্ধরা পাচ্ছেন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, নাইট উপাধিতে পুরস্কৃত হচ্ছেন সালমান রুশদীর মতো লেখকরা। অন্যদিকে জার্মান কবি গুন্টার গ্রাস যখন ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইসরাইলকে পারমাণবিক সাবমেরিন সরবারাহ করার সমালোচনা করেন তখন তার বাক-রুদ্ধ করে দেয়ার কথা উঠছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবার জন্য নিজেদের অজান্তে মুসলিমরাই অগ্রগন্য ভূমিকা পালন করে চলেছে।
যেমন ‘ইনোসেন্স অফ্ মুসলিম’ নামের একটি ইসলামবিদ্বেষী ভিডিও ২০১২ সালে জুলাই মাসে ইউটিউবে ছাড়া হয়েছিল, যা অধিকাংশ মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। ভিডিওটি আপলোড করার দু’মাসের মধ্যে মাত্র ত্রিশটির মতো হিট হয়। কিন্তু আরবি ডাবিংসহ দুই মিনিটের একটি দৃশ্য মিসরের ইসলামপন্থী টিভি স্টেশন আল-নাস সম্প্রচার করলে মধ্যপ্রাচ্যে তোলপাড় শুরু হয়। নিউইয়র্কের পাতাল রেলে পামেলা গেল্লারের দেয়া ইসলামবিরোধী পোস্টারের সংখ্যা হল মাত্র ১০টি। অন্যদিকে পাতাল রেলের মোট বিজ্ঞাপনী পোস্টারের সংখ্যা হল ১১,০০০! হাতেগোনা কয়েকটি পোস্টার নিয়ে যদি মুসলিমরা আবারো বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তাহলে পামেলা গেল্লারের মতো ইতরেরা বিশ্বব্যাপী আবারো প্রচারণা পাবে।
হজরত মুসা (আ.) কিংবা ঈসাকে (আ.) নিয়ে একজন মুসলিম কোনো কটুক্তি করবে এমনটি ভাবাই যায় না। কারণ তাঁদের আমরা নবী হিসাবে মানি। কিন্তু মহানবীর (সা.) ক্ষেত্রে একই ধরনের আচরণ ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টানদের কাছ থেকে আমরা আশা করতে পারি না। কারণ তারা মুহাম্মদকে (সা.) নবী হিসাবে স্বীকার করে না। ইসলাম ও মহানবীকে (সা.) নিয়ে কুৎসা রটনা যে চলতেই থাকবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। তবে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ আমরা যাই করি না কেন, দেশের প্রচলিত নিয়ম মেনে করতে হবে এবং প্রতিবাদের ভাষা কি হবে সে নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। একচক্ষু আদালতে গিয়ে মুসলিমরা এখন সুবিচার পাচ্ছেন না, একথা ঠিক। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, শুধু মুসলিম কেন, আদালতে খ্রিষ্টানরাও মামলা ঠুকে The Last Temptation of the Christ চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করতে পারেনি। তাই কোনোভাবেই সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। তাতে মুসলিমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচেয়ে বেশি, কলঙ্কিত হবে মহানবীর (সা.) ভাবমূর্তি।
