মালালা, তালেবান ঘাতকের ছোড়া গুলি তোমার মাথার খুলি বিদীর্ণ করে গেছে। ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটের নির্জনতার শুয়ে আছো তুমি। জীবন মৃত্যুর অস্বাভাবিক নিরবতা ঘিরে আছে তোমাকে। কিন্তু তুমি হয়তো জানো না, তোমার নিথর দেহ থেকে উৎসারিত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দহীন ধ্বনি হাসপাতালের চার দেয়াল ভেদ করে ছুঁয়ে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে আমার মতো অগণন মানুষের হৃদয়। সবাই উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছে, কখন ফিরে আসবে তুমি।
তোমার নেই পেন্টাগনের মতো দুর্ভেদ্য কোনো কমান্ড সেন্টার; যেখানে বসে স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রিত ড্রোন কিংবা স্টিল্থ বোমারু হেলিকপ্টার দিয়ে ঘায়েল করতে পারো শত্রুপক্ষকে। তোমার হাতে নেই কোনো গ্রেনেড কিংবা রকেট লঞ্চার, তবুও তোমাকে ওদের মতো ভয় কিসের? তোমার হাতে ছিল শুধু একটি কলম। বাবার কিনে দেয়া অতি সাধারণ একটি কলম হাতে নিয়ে তুমি লিখছিলে ব্লগ, ফিরে পেতে বন্ধ হয়ে যাওয়া তোমার প্রিয় স্কুল, ফিরে পেতে তোমার নিলীন অধিকার।
বর্বরতা আর অসভ্যতার বিরুদ্ধে তুমি মাথা তুলে দাঁড়াতে চেয়েছিলে। এই কি ছিল তোমার অপরাধ? তোমার লেখনীর তীব্রতা তালেবানদের দুর্গে যেরকম কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিল, তা দেখে নিশ্চিত হলাম, ‘অসির চেয়ে কলমই বেশি শক্তিধর।’ ভেবে অবাক হই, মালালার মতো একটি কিশোরীকে হত্যা করতে উদ্যত এই কাপুরুষের দল কিভাবে নিজেদের সেই মুজাহিদিন কিংবা গাজীর উত্তরসূরী বলে দাবি করে, যারা পরাভূত করেছিল প্রবল পরাক্রমশালী সোভিয়েত রাশিয়ার আগ্রাসী বাহিনীকে।
ওদের কাছে তোমার খুব বেশি কিছু একটা চাইবার ছিল না। তুমি আর দশটা কিশোরীর মতো চেয়েছিলে স্কুলে যেতে, চেয়েছিলে শিক্ষার দিপ্তীতে নিজেকে আলোকিত করতে। ওরা যেভাবে হাজারো মেয়েদের স্কুল বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছিল, মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করছিল, বিবিসির উর্দু ব্লগে ডায়েরি লিখে সেই সিদ্ধান্তেরই উচ্চকিত প্রতিবাদ করেছিলে তুমি। মালালা, আমারও তোমার মতো একটি ফুটফুটে মেয়ে আছে। সেই ছোটবেলা থেকে ওকে আমি যখন হাত ধরে স্কুল বাসে তুলে দিতাম তখন মনে হতো একজন শিক্ষার্থীর জন্য এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর কি হতে পারে? কিন্তু সেই স্কুল বাসই তোমার জন্য হলো কাল। তোমার পবিত্র রক্তে ভিজে গেল বাসের হরিৎ আসন, লুটিয়ে পড়লে তুমি মেঝেতে।
মালালা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভূ-স্বর্গ বলে খ্যাত পাহাড়ী ভূমি সোয়াতের মেয়ে তুমি। আরিয়ান, গ্রীক থেকে শুরু করে মোগল ও ব্রিটিশ সভ্যতার সুস্পষ্ট চিহ্ন বিদ্যমান এই পাখতুন ভূমিতে। এই সোয়াতে যেমন ছিলেন বায়জিদ আনসারী, সৈয়দ আলী পীরবাবার মতো দরবেশ, ফজলুর রহমান ফায়জন, সাইফুল মুলুক সিদ্দীকির মতো কবি; তেমনি এই সোয়াতের গর্বিত বুকেই জন্মেছে মালালাই আন্নার মতো অসম সাহসী নারী যোদ্ধা। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আফগানদের মুক্তির লড়াইয়ে এই মহিয়সী নারী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছিলেন। তোমার নাম রাখা হয়েছে কিংবদন্তি সেই মালালাই আন্নার নামে। তাই তোমার লড়াইয়ের সূচনা হলো কৈশোরে, এটাই তো স্বাভাবিক। তবে পার্থক্য হচ্ছে, তুমি লড়ছো নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডুকতা বিনাশের জন্য।
ধর্মের দোহাই দিয়ে যারা তোমাকে হত্যা করতে এসেছিল ওরা কি জানে, ওদের ব্যাখ্যার সাথে মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশের কতটুক সাদৃশতা আছে? ধর্মের ব্যাপারে ওদের ব্যাখ্যাই হলো শেষকথা, এ সত্য সবাইকে মানতে হবে, না হলে অবধারিত মৃত্যু। এই অধিকার তাদের দিল কে? শরিয়ত কি কেবল তালেবানরাই বোঝে? ‘একজন নিরপরাধ মানুষ হত্যা সমগ্র মানবতাকে হত্যা করার সমতুল্য।’ মালালাকে গুলি ছোঁড়ার সময় মহানবীর এই সাবধানবাণীর কথা ভেবে কি ঘাতকদের একটি বারের জন্যও হাত কাঁপলো না?
পবিত্র কুরআনে মহানবীকে (সা.) দেয়া আল্লাহর প্রথম নির্দেশ ছিল, ‘তুমি পড়ো তোমার প্রভুর নামে…’ (৯৬ : ১); অথচ ২০০৭ সালে তালেবানরা সোয়াত উপত্যকা দখলে নেয়ার পর বোমার আঘাতে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল প্রায় দুই শত মেয়েদের স্কুল। মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করে জারি করেছিল ফতোয়া, নির্দেশ অমান্যকারীদের দিয়েছিল হত্যার হুমকি। বিশ্বের দেড় বিলিয়ন মুসলিম যে ধর্মের অনুসারী সেই ইসলাম কি এমন কথা বলে? নারীশিক্ষা ইসলামের জন্য হুমকিস্বরূপ, এমন ভাবাদর্শ তারা পেলো কোথায়?
ভিন্নমত পোষণ করলে প্রতিপক্ষকে বুলেটে ঝাঁঝরা করে দিতে হবে, এ কেমন শিক্ষা? ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) একবার জুমার খুতবায় নারীদের দেনমোহর নিয়ে কথা বলছিলেন। বিয়ের সময় ধার্যকৃত দেনমোহর যদি মহানবীর (সা.) স্ত্রী ও কন্যাদের ক্ষেত্রে যা ছিল তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সেই বাড়তি অর্থ জব্দ করে তিনি বায়তুল মালে জমা দেয়ার কথা বলেছিলেন। তখন নামাজে আগত একজন বৃদ্ধা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে হজরত ওমরের (রা.) ফতোয়াকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ইসলামি শারিয়ায় বিরল জ্ঞানের অধিকারী ওমর (রা.) ভিন্নমত পোষণের জন্য বৃদ্ধাকে ভৎর্সনা করা তো দূরে থাক বরং খুতবার মঞ্চ থেকে নেমে এসে বলেছিলেন, ‘ওমরের চেয়ে এই বৃদ্ধা নারীও অনেক বেশি জানে।’ অথচ তালেবানদের ফতোয়ার সাথে দ্বিমত পোষণ করলে কি কারো রক্ষা আছে?
কিশোরী মালালার উপর এই আক্রমণ ঘৃণিত এবং নিন্দনীয় কাজ। মুসলিম হিসাবে শর্তহীনভাবে আমাদের এর প্রতিবাদ করতে হবে। অনেকে মালালার ওপর আক্রমণের সাথে ড্রোন হামলা, ইরাক ও আফগানিস্তানে নিহত অসংখ্য মুসলিমদের প্রসঙ্গ টেনে এনে বিষয়টিকে হালকা করার চেষ্টা করছেন। শুধু তাই নয়, চিরাচরিত প্রথায় এতে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খুঁজে বেড়াচ্ছেন। মুসলিমবিশ্বে আমেরিকার আগ্রাসন ও নিরপরাধ মানুষ হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এ নিয়ে আমিও প্রতিবাদী কলাম লিখেছি। কিন্তু মালালার ওপর বর্বর হামলার সাথে একে গুলিয়ে ফেললে চলবে না।
ধর্মের অজুহাত দিয়ে এখন যেসব জঙ্গী কার্যকলাপ চলছে, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মুসলিম সমাজকে তার নিন্দা করতে হবে। বেরেলভী, দেওবন্দী, ওয়াহাবী, আহলে-হাদিস কিংবা সালাফি, যে উপদলই হোক না কেন, সব মুসলিম মুফতিদের একযোগে ফতোয়ার মাধ্যম এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। যারা মনে করেন, শরিয়ত নারীদের শিক্ষা অনুমোদন করে না; হয় তারা অজ্ঞ, না হয় জেনে শুনে তারা ভুল করছেন। এতএব তাদের সেই চিন্তা-চেতনা সহসা পাল্টাতে হবে। না হলে ওদের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র মুসলিম সমাজের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে।
মালালা, তুমি আমার শত্রুর দেশের মেয়ে। তুমি কি জানো, একাত্তরে আমার দেশের কত নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছিল পাক-বাহিনী? আমি নিজেও পকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে দু’হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমার সেই দু’টি হাত তোমার জন্য প্রার্থনায় ঊর্ধ্বমুখী। আজ শুধু আমি নই, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের লক্ষ কোটি মানুষ সৃষ্টিকর্তার দরবারে দু’হাত তুলেছে তোমার জন্য। সবার শুধু একটি প্রার্থনা, তুমি কখন আসবে ফিরে, নারীশিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আবারও ধরবে কলম, দিকে দিকে ছড়িয়ে দেবে আলোর জ্যোতির্ময় শিখা। মালালা, তোমাকে ছোড়া ঘাতকের কয়েকটি গুলি বদলে দিয়েছে গতানুগতিক পৃথিবী। বিশ্বের তাবৎ চৌদ্দ বছর বয়সী কিশোরী এখন মালালা। কত মালালাকে হত্যা করবে ওরা?
(২০১২ সালের অক্টেবরে ১৫ বছরের পাকিস্তানী তরুণী মালালা ইউসুফজাই গুলিবিদ্ধ হবার পর লেখা)
