১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ সভায় ২২ মার্চকে বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সুপেয় জল এবং পানিসম্পদের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বাড়ানোই হলো এই বিশেষ দিনটির মূল লক্ষ্য। প্রতিবছর বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে একটি বিশেষ স্লোগানকে সামনে রেখেই বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয়। এ বছরের পানি দিবসের উপপাদ্য হল ‘পানি সহযোগিতা’ (Water Cooperation)।

জাতিসংঘের হিসাবে সারাবিশ্বের প্রায় ১১০ কোটি মানুষ নিরাপদ পানি পান করতে পারে না। প্রতিবছর ৫০ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে দূষিত পানির কারণে, মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিন ৬ হাজার নিষ্পাপ শিশুর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ২০২৫ সাল নাগাদ ৪০০ কোটি মানুষ পানির অভাবে ভুগবে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরগুলোতে এখন পানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিনিয়ত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ওয়াসার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বছরে ৩ মিটার বা ৯ ফুট করে নেমে যাচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ওয়াসার রিপোর্ট অনুযায়ী ঢাকা শহরের শতকরা ৮৪ ভাগ পানি সরবরাহ হয় ভূগর্ভস্থ পানি থেকে এবং বাকি ১৬ ভাগ আসে নদী থেকে। কিন্তু ক্রমশ খাল-বিল, নদী-নালা একের পর এক দখল, স্থাপনা নির্মাণের জন্য ভরাট করে ফেলার কারণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মাত্রা বেড়েই চলেছে। ফলে এক নতুন সঙ্কটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতে পানির চাহিদা আরও বাড়বে। তাই পানির সঙ্কট মোকাবেলা করাটাই হবে আমাদের জন্য আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, সুরমার মতো বড় বড় নদী, অসংখ্য উপনদী ও খাল-বিল আবৃত করে রখেছে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশে প্রবাহিত প্রধান নদীগুলোর পানির একটি বড় অংশ আসে অন্য দেশ থেকে। বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর উজানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে বলে এরই মধ্যে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল মরুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশের ১৯টি জেলা কম-বেশি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। উপকূল এলাকায় কৃষি উৎপাদন অশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের মনিপুর রাজ্যে প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হলে বাংলাদেশের উত্তারঞ্চলও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে না পারলে স্বাদু পানির সঙ্কটে ডুবে যাবে বাংলাদেশে। প্রাকৃতিক পানির উৎসসমূহ রক্ষা এবং এর সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলো বিশেষত ভারতের সাথে পানি সহযোগিতা সুদৃঢ় করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

১৯৯৫ সালে বিশ্বব্যাংকের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা সুস্পষ্ট আশংকা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘এই শতাব্দীতে যুদ্ধ হয়েছে তেল নিয়ে, আগামীতে যুদ্ধ হবে পানি নিয়ে।’ ইতিমধ্যে সেই আশংকা ফলতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাপী সুপেয় পনির অভাব, পানির উৎস এবং আন্তর্জাতিক নদীর পানি বন্টন নিয়ে আন্তর্জাতিক বিরোধ বিশ্বশান্তিকে বিঘ্নিত করছে। ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি নিয়ে ভারত-চীনের মধ্যে চলছে ঠান্ডা লড়াই। চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ এই নদী মরে যাচ্ছে বলে ভারত যে অভিযোগ তুলেছে তা অস্বীকার করছে চীন।

মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার নদীর পানি বন্টন নিয়ে চলছে বিরোধ। ইসরাইলের স্বাদু পানির সরবরাহ আসে জর্দান নদী থেকে। তুরস্কের তাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর পানির ওপর নির্ভর করে সিরিয়া ও ইরাকের কৃষি। তুরস্ক এই দুটো নদীতে বেশ কিছু বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে, যা সিরিয়া ও ইরাককে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। অন্যদিকে মিশর, সুদান ও ইথিওপিয়ার কৃষিখাতকে বাঁচিয়ে রেখেছে নীলনদের পানি। উজানের দেশ সুদান কিংবা ইথিওপিয়া, পানির প্রবাহে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে চরম খাদ্য সঙ্কটে পড়বে মিসর। সম্প্রতি রুয়ান্ডার গণহত্যা, সুদানের দারফুরের যুদ্ধের সাথে পানি নিয়ে বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সার্ক অঞ্চলে পানি নিয়ে সম্ভাব্য বিরোধের ফ্লাস পয়েন্ট হলো বাংলাদেশ। ফারাক্কা ব্যারেজ, তিস্তা নদীর পানি বন্টন, টিপাইমুখ বাঁধ ইত্যাদি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেকার সম্পর্কে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে তিস্তা পানি বন্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু জলপাইগুঁড়ি, দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, কোচবিহার ও মালদহ জেলায় সেচ সুবিধা দেয়ার জন্য তিস্তা নদীর উজানে গজলডোবায় ব্যারেজ নির্মাণ করেছে ভারত। গোটা তিস্তা এখন শুকিয়ে ধূ ধূ মরুতে রূপ নিয়েছে। ফলে অর্থহীন হয়ে পড়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প। লালমনিরহাটসহ গোটা উত্তরাঞ্চলের ৩০টির মতো নদী এখন মৃতপ্রায়।

তিস্তা চুক্তি কখন কার্যকর হবে সেই আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জনগণ। উল্লেখ্য, ১৯৯৬-এর ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ৩০ বছর মেয়াদী ঐতিহাসিক গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি ১৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। চুক্তির পর বিগত বছরে বাংলাদেশ তার পানির ন্যায্য অংশ পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘের পানি দিবসকে মাথায় রেখে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানি বন্টন চুক্তিগুলো পরখ করে দেখার এখনই উপযুক্ত সময়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বল্গাহীন দূষণ, নদীর গতি পরিবর্তন, পনি সম্পদ ব্যবস্থাপনার অসহযোগিতা এবং পানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশে অগণিত নদী মরে গেছে অথবা মরে যাবার উপক্রম হয়েছে। এক সময় দেশে এক হাজারেরও বেশি নদী ছিল, তা এখন ৩০০-তে নেমে এসেছে। পানি সঙ্কট আমেরিকা ও রাশিয়ার মতো দুই পরাশক্তিকেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ করেছে। চাঁদ এবং মঙ্গল গ্রহে পানির সন্ধানে যৌথ গবেষণা চালানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এই দুটো দেশ। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা তাই একান্ত জরুরি। প্রয়োজনে এশিয়া অঞ্চলের সার্ক, আসিয়ান এবং বিমসটেক-এর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।