বৃহত্তর সিডনির পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর হচ্ছে প্যারামাট্টা। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী অ্যাবোরোজিনালদের ‘বুরামাট্টা’ শব্দ থেকেই নাকি এই শহরের নামের উৎপত্তি। তবে আমাদের অনেকে প্যারামাট্টার সাথে ‘পরমাত্মা’ শব্দেরও মিল খুঁজে পায়।
রাস্তার দু’পাশের সারিবদ্ধ অফিস বিল্ডিংয়ের একটিতেই রয়েছে এই মসজিদ, যা ভেতরে না ঢুকলে বোঝার উপায় নেই। শুক্রবার এই দেশে কাজের দিন। তাই মানুষের সুবিধার জন্য ১:১০, ১:৫০ এবং ২:৩০ মিনিটে খুতবাসহ তিনবার জুমআ’র নামাজের জামাত হয়।
মসজিদ থেকে ফুটপাত দিয়ে দু’শ মিটার হেঁটে গেলেই পড়ে প্যারামাট্টা পুলিশ হেডকোয়ার্টার। ২০১৫ সালের অক্টোবরের এক বিকেলে এই জায়গাটি পরিণত হয়েছিল এক রণক্ষেত্রে। এখানেই মুসলিম তরুণ ফরহাদ পুলিশ সার্ভিসের কার্টিস চ্যাঙ নামের একজন কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে। যিনি ছিলেন পুলিশ বাহিনীর ফাইন্যান্স বিভাগের একজন বেসামরিক কর্মী।
খুব কাছ থেকে ঠান্ডা মাথায় কার্র্টিসকে গুলি করে হত্যা করেছে ১৫ বছর বয়সী কিশোর ফরহাদ জাবর। পরবর্তীতে পুলিশের গুলিতে কিশোর ফরহাদ নিহত হয়। সিডনি শহরের গোলাগুলি বাংলাদেশ থেকে দশ হাজার মাইল দূরে ঘটলেও এটা ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। কারণ দুঃখজনকভাবে নিরাপত্তারহীনতার কারণে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর বাতিল হবার ঠিক পরপরই ঘটেছে সিডনির এই সন্ত্রাসী হামলা।
বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের মতো সিডনি শহরে খুন খারাবীর ঘটনা নতুন কিছু নয়। পরিসংখ্যান দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছরে অস্ট্রেলিয়ায় গড়ে আড়াইশ’রও বেশি মানুষ বিভিন্ন কারণে খুন হয়েছে। তবে তফাৎ হচ্ছে, সিডনির এই হত্যাকান্ডের নায়ক হল একজন মুসলিম কিশোর। তাই মিডিয়া এবং সবার শ্যেন দৃষ্টি সিডনির পুরো মুসলিম কমিউনিটির উপর পড়ে।
বরাবরের মতো আত্মপক্ষ সমর্থন করে মুসলিমদের সাফাই গাইতে হচ্ছে। তবে এই ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ না হয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তার উত্তরসূরী টনি এ্যাবোটের মতো পুরো মুসলিম কমিউনিটির দিকে সন্দেহের তীর না ছুড়ে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য যে পদক্ষেপ নিলেন তা মূলধারার অস্ট্রেলিয়ানদের মধ্যে ইসলামোফোবিয়া ও ঘৃণার আগুনে যেমন তড়িৎ জল ঢেলে দিয়েছে, তেমনি মুসলিম কমিউনিটির অস্বস্তি এবং আতঙ্ক কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছে।
কিশোর ফরহাদ ইরাকি-কুর্দিশ বংশোদ্ভুত এবং তার জন্ম ইরানে। ১৫ বছর আগে কুর্দিস্তান থেকে নিরাপদ জীবন ও জীবিকার সন্ধানে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছে তার পরিবার। আর দশটা টিনেজারের মতো এলাকার আর্থার ফিলিপ হাই স্কুলে পড়াশোনা করছিল ফরহাদ। পুলিশের খাতায় তার সম্পর্কে নেই কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড। ঘটনার দিন সকালে ফরহাদ তার মা’কে রাতে ডিনারের জন্য তার প্রিয় খাবার মুরগি এবং সাদা ভাত রান্না করার তাগিদ দিয়ে যায়। কিন্তু সেই খাবার আর তার খাওয়া হয়নি। সবার মনে এখন প্রশ্ন, মাত্র ১৫ বছর বয়সী একজন কিশোর এমন ভয়ংকর কাজ কেন করতে গেল? আর এই তরুণের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দিলই বা কে?
নিহত ফরহাদের বাড়ি তল্লাশী করে সন্দেহজনক কোনো কিছু খুঁজে পায়নি পুলিশ। টুইটারে রিয়েলিটি ট্যালেন্ট শো ‘দি ভয়েস’ সম্পর্কে একটি মন্তব্য ছাড়া ফরহাদের সোস্যাল মিডিয়া একাউন্টগুলো ২০১৩ সাল থেকে ছিল মোটামুটি ইনঅ্যাক্টিভ। তাই এ ঘটনায় সে একাই জড়িত ছিল বলে মনে প্রথমে ধারণা করা হলেও, ধীরে ধীরে গোলাগুলির ঘটনার সাথে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং সন্ত্রাসের যোগসূত্র পরিষ্কার হয়ে আসছে। এখন মনে হচ্ছে, এটা ফরহাদের একার কাজ নয়। এর সাথে অন্য কোনো গোষ্ঠীর যোগসূত্র থাকতে পারে। ফারহাদের ব্যাকপ্যাকে একটি চিঠি পাওয়া গেছে। ওই চিঠিতে সিডনির রাস্তায় রক্তগঙ্গা বইবে বলে বার্তা দিয়েছে। পুলিশ স্কুলের কাছেই একটি ময়লার বিন থেকে এই ব্যাকপ্যাকটি উদ্ধার করে।
স্কুলের বন্ধুরা জানায়, ঘটনার আগে কিছুদিন ধরে ফরহাদের চাল চলনে ভিন্নতা ছিল লক্ষণীয়। যেমন ফরহাদ তার প্রিয় বাস্কেটবল এবং ফুটবল খেলা বন্ধ করে দেয় বলে পুলিশকে জানিয়েছে স্কুলের সহপাঠীরা। ইতিমধ্যে ফেসবুকে ফরহাদের স্মৃতিতে একটি পেইজ খোলা হয়েছে যাতে ফরহাদের ঠান্ডা মাথার এই হত্যাকাণ্ড আল্লাহর ইচ্ছে পূরণের জন্য করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ বিভাগে কর্মরত একজন নিরস্ত্র কর্মচারীকে এভাবে খুন করা কি ইসলাম অনুমোদন করে? এছাড়া এই পেইজে অস্ট্রেলিয়ার ফ্ল্যাগ পোড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিদ্বেষপূর্ণ এবং উস্কানীমূলক ম্যাসেজ পোস্ট করা হচ্ছে। যা সত্যিই আশঙ্কাজনক।
ব্যক্তি সন্ত্রাসের কারণে বিশ্বের সব দেশেই প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে। সেদিন আমেরিকার একটি স্কুলে গোলাগুলিতে প্রাণ হারালো বহু নিরীহ ছাত্র-শিক্ষক। ক্রোধ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, পার্থিব মোহ, আধিপত্য বিস্তার, শত্রুতা, মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি বহুবিধ কারণে ব্যাক্তিগত সন্ত্রাস হয়ে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা মনগড়া ধর্মীয় মতবাদ অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য যে সন্ত্রাস করা হয় তা অনেক বেশি ভয়ংকর। কারণ এ ধরনের সন্ত্রাসের লক্ষ্যবস্তু হয় নিরপরাধ নাগরিক ও রাষ্ট্র্রযন্ত্র। এমনকি প্রার্থনার স্থানও এ থেকে রক্ষা পায় না। অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন, ফরহাদ জাবর যদি একজন শ্বেতকায় তরুণ হতো তাহলে তাকে সান্ত্রাসী না বলে হয়তো একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত তরুণ বলে আখ্যা দেয়া হতো। এই যুক্তি এখানে খাটে না। আমাদের মধ্যকার কিছু চরমপন্থী ফরহাদের কর্মকাণ্ডকে ধর্মীয় রং দিয়ে যেভাবে সাফাই গাইছেন তখন সেটা আর ব্যক্তিগত সন্ত্রাসের পর্যায়ে থাকে না।
তবে এটাও সত্য, অস্ট্রেলিয়ার অমুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মধ্যে বিরাজমান ইসলামোফোবিয়া মুসলিম তরুণ ও যুব সমাজকে সন্ত্রাসের দিকে যেতে ইদ্ধন যোগাচ্ছে। রেডিও টক শো, ট্যাবলয়েড পত্রিকায় হরহামেশা বলা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ান মূলধারার সাথে মুসলিমরা মিশতে চায় না, মুসলিম মানেই সন্ত্রাসী, তারা যেখান থেকে এসেছে তাদের সেখানে ফেরত পাঠানো উচিত ইত্যাদি। এ ধরনের বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেয়া তরুণদের আহত করে। তারা ভাবতে শুরু করে, এই দেশ হয়তো তাদের জন্য নয়।
তরুণদের এই হতাশার সুযোগ নিয়ে ইসলামি চরমপন্থীরা খুব সহজেই তাদের মগজ ধোলাই করে সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ডে নামিয়ে দেয়। ফরহাদের মতো কিশোররা যাতে এই হতাশার ফাঁদে না পড়ে সেজন্য কর্তৃপক্ষ এবং অস্ট্রেলিয়ান কমিউনিটির সবাই মিলে সচেষ্ট হতে হবে। তবে ইসলামের শান্তির বাণীকে যেভাবে কিছু মুসলিম নামধারী উগ্রপন্থীরা হাইজ্যাক করার চেষ্টা করছে। সেটাকে রুখে দেবার দায় আমার মতে, অন্যদের চেয়ে মুসলিমদের অনেক বেশি।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসী অধিকাংশ মুসলিমই অস্ট্রেলিয়ার জীবনধারা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মুসলিম কমিউনিটির একটি খুব নগন্য অংশ জঙ্গী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মুসলিম তরুণ ও যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করছে। যার ফলশ্রুতিতে ফরহাদের মতো বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ যার হাতে ক্রিকেট ব্যাট থাকার কথা, সে তুলে নিচ্ছে পিস্তল। তাই সম্প্রতি বেশ কিছু মুসলিম অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকের সিরিয়ায় আইএসের সাথে যোগ দেয়ার ঘটনা আর হালকা করে দেখার অবকাশ নেই। এই ব্যাপারে মুসলিম সমাজ এবং বাবা-মাদের সদা সচেতন থাকতে হবে।
ফরহাদ যা করেছে, যে কারণেই করে থাকুক না কেন, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মুসলিম কমিউনিটিতে কোনো ধরনের সন্দেহজনক তৎপরতা চোখে পড়লে আমাদের আগ বাড়িয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বহিনীকে জানাতে হবে। প্রয়োজনে অপরাধীকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। অস্ট্রেলিয়াকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব সেই দেশে বসবাসকারী অন্যদের মতো মুসলিমদেরও সমান। তাই এখনই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সচেষ্ট না হেল সেটা একদিন বুমেরাং হয়ে নিজেদের দিকেই ফিরে আসবে।
প্যারামাট্টা মসজিদে ফরহাদের যাওয়া আসা ছিল। স্বভাবতই স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ ও তোপের মুখে পড়ে প্যারামাট্টা মসজিদ। একসময় মসজিদে তালা ঝুলিয়ে দেয়ারও দাবি ওঠে। ধীরে ধীরে যদিও প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয়েছে এই মসজিদ। তবে একজন মুসলিম তরুণের এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সমাজের ভাবমূর্তির যে চরম সর্বনাশ করেছে, তা কখনো মেরামত করা যাবে বলে মনে হয় না।
